অধিকাংশ মহিলা গর্ভবতী অবস্থা থেকেই ভীষণ আতঙ্কগ্রস্ত থাকেন যে, যখন সন্তানের জন্ম হবে তখন তার কী অবস্থা হবে ইত্যাদি নিয়ে। তাই প্রসব প্রক্রিয়া সম্বন্ধে ধারণা পেলে তার নিজের ওপর আস্থা ফিরে আসবে এবং সে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকবে।
প্রথমেই দরকার প্রসবের তারিখ খুঁজে বের করা। একটি ক্যালেন্ডার নিন। গর্ভবতী মহিলার কাছ থেকে জেনে নিন তার শেষ মাসিকের প্রথম দিনের তারিখটা। তারপর ক্যালেন্ডারের পাতায় নয় মাস গুণে যান। যেদিন নয় মাস পূর্ণ হলো সেখানে থামুন ও দাগ দিন এবং সঙ্গে সাত দিন যোগ দিন। এটিই প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ। সাধারণত এ তারিখে শতকরা ৫ থেকে ১০ জনের ডেলিভারি হয়ে থাকে, তবে এক সপ্তাহ আগে ও পরে অধিকাংশ ডেলিভারি হয়ে থাকে।
ধরুন যদি কোনো মহিলার ১ জানুয়ারি মাসিকের প্রথম দিন হলো তবে তার ডেলিভারির তারিখ হবে ৮ অক্টোবর। এ তারিখ জানার প্রয়োজন এ জন্য যে, প্রসব ব্যথা সাধারণত এর কাছাকাছি সময়ে হয়ে থাকে, কাজেই আপনিও সেভাবে প্রস্তুত থাকতে পারবেন।
প্রসবক্রিয়া
প্রসব ব্যথা ওঠার পর থেকে শুরু করে সন্তানের জন্মদানের প্রক্রিয়াকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়।
১ম পর্যায়-প্রসব ব্যথা ওঠার শুরু থেকে জরায়ুর মুখ সম্পূর্ণ খোলা পর্যন্ত।
২য় পর্যায়-জরায়ুর মুখ সম্পূর্ণ খোলার পর থেকে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত।
৩য় পর্যায়-সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকে গর্ভফুল পড়া পর্যন্ত।
জরায়ুর মুখ যখন খুলতে থাকে তখন শিশুটি পানির ব্যাগের ভেতর থেকে জরায়ুর গা থেকে সামান্য আলগা হয়ে যায়, এ কারণে সামান্য রক্ত মেশানো পিচ্ছিল পদার্থ যোনিপথ দিয়ে বের হয়ে আসে। এ রক্ত মেশানো পিচ্ছিল পদার্থকে ইংরেজিতে বলে ‘শো’। কাজেই এ ‘শো’ প্রসব ব্যথা ওঠার আরেকটি লক্ষণ। প্রসব ব্যথার চাপে যখন জরায়ুর মুখ খুলতে থাকে তখন পানির ব্যাগটি এক সময় ভেঙে যায় এবং বেশ খানিকটা পানি যোনিপথ দিয়ে বের হয়। পানি ভাঙার পর থেকে প্রসব ব্যথা আরো বেশি হতে থাকে। সন্তান না হওয়া পর্যন্ত এ প্রক্রিয়া চলতে থাকে। একসময় জরায়ুর মুখ সম্পূর্ণ খুলে যায় এবং যোনিপথের সঙ্গে এক হয়ে মিশে যায়, সেই সঙ্গে সন্তান ভুমিষ্ঠ হওয়ার জন্য এক পথ তৈরি হয়ে যায়। জরায়ুর মুখ সম্পূর্ণ খুলে গেলে শিশুটি যোনিপথের দিকে অগ্রসর হতে থাকে, এ সময় মায়ের ঘন ঘন এবং প্রচণ্ড ব্যথা হতে থাকে। নাড়ির গতি বেড়ে যায় ও ঘাম হয়। এভাবে একসময় শিশুটি যোনিপথের মুখের কাছে চলে আসে, শিশুটির মাথার চুল দেখা যায় এবং মায়ের পায়খানার বেগ হতে থাকে। এ মুহূর্তে মাকে ব্যথার সঙ্গে প্রচণ্ড শক্তি খরচ করতে হয়। প্রথমে শিশুটির মাথা বের হয়ে আসে এবং এর পরপরই শরীরের বাকি অঙ্গ বের হয় এবং শিশুটির কান্না জানিয়ে দেয় তার উপস্থিতি। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর মায়ের ব্যথা একেবারে কমে যায় এবং মা বিরাট একটা কষ্ট থেকে মুক্তি পেয়ে কিছুক্ষণ আরামবোধ করেন। কয়েক মিনিট পর থেকে আবার একটা মাঝারি ধরনের ব্যথা হয়, সেই সঙ্গে গর্ভফুল জরায়ু থেকে আলগা হয়ে আসে, ফলে কিছুটা রক্ত যোনিপথ দিয়ে বের হয়। এ সময় জরায়ু শক্ত ও ছোট হয়ে আসে এবং ব্যথার সঙ্গে সঙ্গে গর্ভফুল অন্যান্য পদার্থসহ বের হয়ে আসে। এই দীর্ঘ প্রসব প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে প্রায় দশ-বারো ঘণ্টা লেগে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে মায়ের শরীরে প্রচুর শক্তি খরচ হয় এবং ক্লান্ত মা পরিশ্রান্ত হয়ে কিছুক্ষণের জন্য ঘুমিয়ে পড়েন। মোটামুটিভাবে এ হলো শিশুর জন্মগ্রহণের প্রক্রিয়া।
প্রসবের সময় মায়ের সেবা
একজন গর্ভবতী মায়ের হালকা প্রসব ব্যথা হলে সাবান দিয়ে গোসল করে নেবেন। বিশেষ করে নিম্নাঙ্গ সাবান দিয়ে পরিষকার করে ধুয়ে ফেলবেন। মাথার চুল শুকিয়ে নিয়ে টাইট করে দুটি বেণী করে নেবেন। পরিষকার করে ধোয়া ঢিলা পেটিকোট ও ব্লাউজ পরে নেবেন। গরম দুধ বা শরবত খেয়ে নেবেন। পায়খানার রাস্তায় গ্লিসারিন সাপোজিটরি দুটো ব্যবহার করবেন। যাতে পরিষকারভাবে পায়খানা হয়ে যায়। যখন ব্যথা থাকবে না তখন হাঁটাহাঁটি করবেন এবং বিশ্রাম নেবেন। গর্ভবতী মা যেভাবে যে অবস্থায় বসে, শুয়ে বা কাত হয়ে আরাম পান সেভাবেই থাকতে দিন। বারবার তরল খাবার মাকে খেতে দিন। ব্যথা বাড়তে থাকলে রোগীকে আশ্বস্ত করুন এবং সব সময় একজন মায়ের পাশে থাকবেন। স্বামী বাড়িতে থাকা ও কাছে থাকা খুব প্রয়োজন। কারণ কখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রয়োজন পড়লে স্বামীর সহায়তা ও সহযোগিতা খুবই দরকার।
শিশুর মাথা বের হলে প্রথমেই দেখা হয় গলায় নাড়ি প্যাঁচানো আছে কিনা। যদি নাড়ি প্যাঁচানো থাকে তাহলে নাড়িটা সামান্য টেনে ঢিলা করে দেয়া হয় অথবা বাচ্চার মাথার ওপর দিয়ে গলিয়ে দেয়া হয়। পরিষকার কাপড় দিয়ে শিশুর মুখ ও নাক পরিষকার করা দরকার। এরপর আর একটা ব্যথা আসবে সেই সঙ্গে নবজাতকের বাকি শরীর বের হয়ে আসবে। শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিষকার কাঁথা বা শুকনো কাপড়ে জড়িয়ে নেবেন এবং শিশুর শরীরটা মুছে দিয়ে আরেকটা শুকনো কাপড়ে ঢেকে মায়ের বুকের ওপর রাখবেন। শিশুর শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া শিশুর জন্য খুব ক্ষতিকর। এবার সিদ্ধ সুতা দিয়ে নাভি থেকে দু আঙুল দূরে পরপর তিনটি বাঁধন দেয় হয়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় বাঁধনের মাঝে সিদ্ধ ব্লেড দিয়ে নাড়ি কাটা হয়। নাভি কাটার আগে হাত সাবান দিয়ে ধুবেন অথবা জীবাণুমুক্ত গ্লভস পরবেন। শিশুটি কাঁদার পর মায়ের বুকের ওপর দিয়ে রাখবেন। দেখবেন কিছুক্ষণের মধ্যেই শিশুটি আস্তে আস্তে মায়ের স্তন চুষতে থাকবে। এই চুষতে থাকার ফলে মায়ের শরীরে অক্সিটোসিন নামক একটি হরমোন নিঃসরণ হয় এবং এ কারণে জরায়ু তাড়াতাড়ি সংকোচন হয় এবং গর্ভফুলটি আলগা হয়ে পড়ে এবং মায়ের রক্তক্ষরণ কম হয়।
প্রসব ব্যথা শুরুর লক্ষণ
প্রসব ব্যথার একটি বিশেষ ধরন আছে ও কিছু লক্ষণ আছে। এ ব্যথা সাধারণত কোমরের পেছন দিকে শুরু হয়ে তলপেটের নিচের দিকে নামতে থাকে। ছন্দে ছন্দে ব্যথা আসে কিছু মুহূর্তের জন্য, আবার চলে যায়। শুরুতে হালকা ব্যথা হয় এবং দেরিতে আসে। এরপর ব্যথার জোর বাড়তে থাকে। ঘনঘন ব্যথা ওঠে এবং বেশ কিছুক্ষণ থাকে। ব্যথার সঙ্গে পেট বেশ শক্ত হয়ে যায়। পেট শক্ত হওয়া মানে জরায়ু সংকোচন হওয়া। জরায়ুর সংকোচন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুটিকে নিচের দিকে ঠেলতে থাকে এবং সন্তান বের হওয়ার পথের দিকে এগোতে থাকে।
প্রসব-পরবর্তী প্রথম দুঘণ্টা
মাকে পরিষকার দুটি স্যানিটারি প্যাড বা কাপড় পরানো হয়। মাকে এক গ্লাস গরম দুধ বা যে কোনো পানীয় খেতে দিন। মায়ের শরীর পরিষকার করে শুকনো জামা-কাপড় পরিয়ে দিন। ইনফেকশন না হওয়ার জন্য অ্যান্টিবায়োটিক খেতে দেয় হয়। মাকে পূর্ণ বিশ্রামে রাখুন। ১৫ মিনিট পরপর তলপেটে হাত রেখে ম্যাসেজ করুন কমপক্ষে ২ ঘণ্টা এবং আধ ঘণ্টা পর আবার স্যানিটারি প্যাড পরীক্ষা করে দেখুন রক্তক্ষরণের পরিমাণ কেমন। স্বাভাবিক থাকলে কিছু করার প্রয়োজন নেই। রক্তক্ষরণ বেশি হলে (৫০০ সিসি বা ১ পোয়ার বেশি) তলপেটে মালিশ বা ম্যাসাজ দিন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সন্তান প্রসবের পরপরই মাকে একটি ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল (২ লাখ ইউনিটের) খেতে দিন। ভিটামিন ‘এ’ মায়ের দুধকে ভিটামিনসমৃদ্ধ করবে এবং শিশুকে অনেক রোগ থেকে রক্ষা করবে। যদি সঙ্গে সঙ্গে দেয়া না হয় তবে ছয় সপ্তাহের মধ্যে অবশ্যই একটি ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়াতে হবে।
শিশুকে মায়ের দুধ ছাড়া আর কোনো খাবার দেয়ার প্রয়োজন নেই। শুধু ঘণ্টায় ঘণ্টায় এবং শিশুর চাহিদা অনুযায়ী বারবার বুকের দুধ দেবেন। প্রসূতি মাকে সব রকমের খাবার এবং বাড়তি খাবার খেতে দিন এবং তরল খাবারের পরিমাণ বাড়িয়ে দিন। দেখবেন মা ও শিশু দুজনই খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ ও সবল হয়ে উঠবে।
লেখক: প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ
সেন্ট্রাল হসপিটাল লিঃ, ঢাকা
কোন বয়সে মা হবেন: হবু মায়েরা জেনে নিন
ডা. কানিজ ফাতেমা ডোনা
আজকের মেয়েরা উচ্চশিক্ষিত, স্বাবলম্বী, প্রগতিশীল। তাই আগের মতো মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে করার প্রবণতা কমে গেছে। আর তাই বেশি বয়সে বিয়ে, বেশি বয়সে মা হওয়ার প্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে। বেশি বয়সে মা হতে গেলে গর্ভস্থ শিশু ও মায়ের শারীরিক নানা রকম জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই বেশি বয়সে মা হতে গেলে প্রত্যেক হবু মাকে অনেক সচেতন হতে হবে। সন্তান ধারণের ক্ষেত্রে মায়ের বয়স বিরাট ভূমিকা রাখে। মা হওয়ার জন্য মেয়েদের শরীর ভালোভাবে তৈরি থাকে ২১ থেকে ২৮ বছরের মধ্যে। যাদের একটু বেশি বয়সে বিয়ে হয়েছে তাদের বিয়ের পরপরই বাচ্চা নিয়ে নেয়া উচিত। তবে বেশি বয়সে বিয়ে হয়েছে বলে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই। বিয়ের পরপরই স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে যথাযথ কাউন্সিলিং ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে নিয়ে সন্তান ধারণের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে এবং সন্তান গর্ভে আসার সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে তার দেয়া নির্দেশমতো চলতে হবে।
কীভাবে হয় কাউন্সিলিং
- বিভিন্ন দম্পতির সঙ্গে আলোচনা করে জেনে নেয়া হয় কোনো অসুস্থতা আছে কি না।
- চিকিৎসাযোগ্য অসুখ-বিসুখ যেমন ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন, রক্তশূন্যতা আছে কি না।
- মেয়েটির নিজের অথবা তাদের বংশে কোনো জড়বুদ্ধি, বিকলাঙ্গ শিশু থাকলে সে সম্পর্কে বিস্তারিত কারণ অনুসন্ধান করা।
- কোনো বংশগত অসুখ যেমন থ্যালাসেমিয়া, হিমোফিলিয়া, মেটাবলিক ডিসঅর্ডার বা জন্মগত হার্টের রোগ, হাইড্রোকেফালাম ইত্যাদি।
- ওজন, উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি না কম।
- হবু মায়ের টিটেনাস, হেপাটাইটিস-বি, রুবেলা টিকা দেয়া আছে কি না ইত্যাদি।
- এসব অনুসন্ধানের পর প্রয়োজন অনুযায়ী বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নেয়া হয়।
- কিছু সাধারণ অসুখ-বিসুখ আছে আর হবু মা যদি এসবের শিকার হন ও যথাযথ চিকিৎসা না করান তবে গর্ভস্থ শিশু ও প্রসূতি দুজনেরই নানা বিপদ হতে পারে।
- ক্রনিক কিডনি সমস্যা থাকলে গর্ভস্থ বাচ্চা মারা যেতে পারে ৪০-৪৬ শতাংশ। এছাড়া মিসক্যারেজ, প্রিটার্ম লেবার ওটড ওটএজ ইত্যাদির সম্ভাবনা প্রবল।
- হবু মায়ের অ্যানিমিয়া থাকলে গর্ভাবস্থায় প্রি-এক্লাম্পশিয়া, হার্ট ফেইলিওর, প্রি-টার্ম লেবারের সম্ভাবনা থাকে।
- প্রিকনসেপশনাল কাউন্সিলিংয়ের প্রধান উদ্দেশ্য হলো সুস্থ মায়ের কোলে সুস্থ শিশু তুলে দেয়া।
- বেশি বয়সে বিয়ে হলে চিকিৎসকরা দ্রুত বাচ্চা নেয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এর কারণ হলো বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ্যাত্বের একটা সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া হবু মায়ের হাইপারটেনশন, ডায়াবেটিস, ক্রোমোজোমের ত্রুটিজনিত সমস্যার চান্স বাড়ে। তাই প্রতিটি দম্পতির উচিত ৩০ বছরের মধ্যে প্রথম এবং ৩৫ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দেয়া।
বেশি বয়সে মা হতে গেলে কী কী সমস্যা ও কেন
- বয়স বাড়লে জরায়ু ও জরায়ু মুখ বা সারভিক্সের পেশির স্থিতিস্থাপকতা কম থাকায় সারভিক্সের প্রসারণ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় প্রসব বেদনা ও সেই সংক্রান্ত জটিলতা বাড়ে।
- ক্রোমোজোমাল অ্যাবনরমালিটি হওয়ার চান্স বেশি থাকে। যার ফলে শিশু জন্মাতে পারে কাটা ঠোঁট বা তালু (অর্থাৎ ক্লেথট লিপ ও প্যালেট) আনোরেক্টাল ম্যালফরমেশন নিয়ে অথবা ডাউনস নামে এক সাংঘাতিক মানসিক প্রতিবন্ধকতার রোগী হয়ে।
- মায়ের বয়স যত বাড়ে এই ধরনের অস্বাভাবিক শিশুর জন্মের সম্ভাবনাও বাড়তে থাকে। এছাড়া প্রকৃতিও তার নিজের রাজ্যে অস্বাভাবিকতাতে বাড়তে দেয় না। তাই প্রাকৃতিক নিয়মে অস্বাভাবিক ভ্রূণের সব সময়ই একটা মিস ক্যারেজ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এজন্য বয়স্ক মায়েদের গর্ভপাত বেশি হয়।
- বয়স্ক মায়েদের প্রিম্যাচিউর ডেলিভারির সম্ভাবনা অন্যদের তুলনায় প্রায় চারগুণ বেশি থাকে।
সিজারিয়ান সেকশনের সম্ভাবনা অল্প বয়সী মায়েদের তুলনায় ৫ গুণ বেশি থাকে।
কাজেই বেশি বয়সে যারা প্রথমবারের মতো মা হতে চাইছেন, একজন ভালো স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হোন। তার কাছ থেকে প্রিকনসেপশনাল কাউন্সিলিং নিন। চিকিৎসক যদি প্রয়োজন মনে করেন, এমন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে নেন, তার নির্দেশমতো চলুন। যে কোনো ছোট-বড় সমস্যা নিজের মধ্যে লুকিয়ে না রেখে আপনার চিকিৎসকের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করুন। সুস্থ থাকুন, সুস্থ ও সুন্দর শিশুর গর্বিত মা হোন।
গর্ভবতী ও প্রসূতির পুষ্টি
অধ্যাপক শাহ মোঃ কেরামত আলী
গর্ভবতী মায়ের পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে আমাদের দেশের অধিকাংশ মা-ই রক্তস্বল্পতা, অপুষ্টিসহ নানা রকম রোগে ভোগেন, ফলে দুর্বল মায়েদের অনেক সময় অকাল গর্ভপাত অথবা গর্ভস্থ ভ্রূণের ক্ষতি হয়ে অনেক সময় অপরিণত, বিকলাঙ্গ এমনকি মৃত শিশুর জন্ম হতে দেখা যায়। সুতরাং গর্ভবতী মায়ের খাদ্য ও স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ নজর দেয়া উচিত। গর্ভস্থ শিশুর সঠিক গঠন ও বৃদ্ধির জন্য মাকে অতিরিক্ত খাবার সুষমভাবে গ্রহণ করতে হবে। এই অতিরিক্ত খাদ্যের পরিমাণ মোটামুটিভাবে মেয়েদের স্বাভাবিক খাদ্য চাহিদার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বেশি। মায়ের স্বাস্থ্য যদি ভালো হয় তবে গর্ভের প্রথম তিন মাস স্বাভাবিক খাদ্য খেলেই চলবে। শুধু কিছু আমিষজাতীয় খাদ্য বেশি খেতে হবে। আর যদি গর্ভবতী মা রুগ্ন হন তবে গর্ভের প্রথম মাস থেকেই খাদ্যের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে হবে। অনেক গর্ভবতী প্রথম অবস্থায় যা কিছু খেয়ে থাকেন অনেকেই তা বমি করে ফেলে দেন। ২ থেকে ৩ মাস এ অবস্থা থাকে পরে আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়ে আসে। প্রথমদিকে এ অবস্থা উত্তরণের জন্য নরম ও সহজপাচ্য খাবারের ব্যবস্থা করে তার পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে হবে।
তাপ ও শক্তিদায়ক খাদ্যগুলোর মধ্যে যে খাবার ভালো লাগে বা খেতে ইচ্ছা করে সেটা সুস্বাদু এবং রুচিসমমত করে রান্না করে গর্ভবতীকে খাওয়াতে হবে। একবারে খেতে না পারলে বারবার অল্প অল্প করে খেতে হবে। স্বাভাবিক অবস্থায় শক্তিদায়ক খাবার যতটুকু খাওয়া হয় তার চেয়ে ৫০ গ্রাম (এক ছটাক) পরিমাণ খাদ্য আস্তে আস্তে বাড়াতে হবে।
গর্ভবতী মায়েদের খাদ্য তালিকায় আমিষজাতীয় খাদ্য পরিমাণে সবচেয়ে বেশি থাকা দরকার। কারণ এ সময় গর্ভস্থ ভ্রূণের গঠন, বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তৈরি এবং সেগুলোর বৃদ্ধির জন্য প্রচুর আমিষজাতীয় খাদ্য যেমন-মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ইত্যাদি বেশি করে খাওয়ানো দরকার। কিন্তু এগুলো দামি খাবার হওয়ায় অনেকের পক্ষেই খাওয়া সম্ভব হয় না। তবে ডাল বেশি করে খেলেও আমিষের চাহিদা পূরণ হয়। প্রতিদিন অবশ্য ডাল খেতে ভালো লাগবে না। তাই বৈচিত্র্যের জন্য ডাল বিভিন্নভাবে রান্না করে খেতে হবে যেমন-ডাল ও চালের খিঁচুড়ি, ডালের চচ্চড়ি, সবজি দিয়ে ডাল, ডালের বড়া, পিঁয়াজু, ডালের ভর্তা, ডাল ঘন করে রান্না করে। গর্ভকালীন সময় এসব খাবার খেতে ভালো লাগবে। চীনাবাদাম ও সীমের বীচি ভেজে খেলেও বাড়তি আমিষের চাহিদা পূরণ করা যায়।
রোগ প্রতিরোধক খাদ্য গর্ভবতীর খাবারে বিশেষভাবে থাকা দরকার, তাই প্রচুর শাক-সবজি ও ফল গর্ভবতীকে প্রতিদিন খেতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় এ সময় কোনো কোনো মহিলা চোখে কম দেখেন, আবার বাচ্চা প্রসবের পর আস্তে আস্তে তাদের দৃষ্টিশক্তি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। তাই গর্ভবতী মায়ের ভিটামিন ‘এ’ জাতীয় খাবার যথা রঙিন শাক-সবজি, ফলমূল ও মাছ-মাংস খাওয়া উচিত। সঙ্গে পেয়ারা, আমড়া ও আমলকী ইত্যাদি তাজা ফল প্রচুর খেলে গর্ভবতীর ভিটামিন ‘সি’ চাহিদা পূরণ হবে। প্রথম মাস থেকে দৈনিক ৬৫০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম বেশি খেতে হবে। এ জন্য প্রচুর দুধ, ছোট মাছ ও শাক-সবজি খেতে হবে। গর্ভকালীন সময়ে মায়ের শরীরে রক্তের পরিমাণ ঠিক রাখা জরুরি। এ জন্য এ সময়ে মাকে দৈনিক ৩৩ মিলিগ্রাম লৌহ প্রাপ্তির জন্য শাক-সবজি, মাছ, মাংস খেতে হবে। খাদ্যদ্রব্য থেকে প্রাপ্ত ভিটামিন ও খনিজ লবণ সহজে হজম হয় এবং শাক-সবজির ‘আঁশ’ এ অবস্থায় মায়ের কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।
গর্ভাবস্থায় খাবারে অরুচি আসতে পারে অথচ এ সময় তাকে দুজনের খাবার খেতে হবে-তাই খাদ্য পরিবেশনায় আকর্ষণীয়তা বাড়াতে পর্যাপ্ত মসলা দিয়ে, খানিকটা বেশি তেল দিয়ে সুগন্ধি ও সুস্বাদু করতে হবে। যাতে করে মা অল্প অল্প করে ২-৩ ঘণ্টা অন্তর অন্তর কিছু খায়। পরিবারের লোকজনকে এ সময় অনুপ্রেরণা জোগাতে হবে। ফলে অতিরিক্ত ৭৫০ কিলো ক্যালরি শক্তির প্রাপ্ততা নিশ্চিত হবে। নিম্নে সাধারণ কর্মক্ষম মহিলার স্বাভাবিক, গর্ভবতী এবং প্রসূতি অবস্থার একটি দৈনিক খাদ্য তালিকা প্রদান করা হলো-
| খাদ্যের নাম | স্বাভাবিক মহিলা | গর্ভবতী মহিলা | প্রসূতি মহিলা |
| চাল/আটা | ৩৫০ গ্রাম | ৪০০ গ্রাম | ৪৪০ গ্রাম |
| ডাল | ৪০ গ্রাম | ৬০ গ্রাম | ৭০ গ্রাম |
| মাছ/মাংস/ডিম | ৬০ গ্রাম | ৬০ গ্রাম | ৬০ গ্রাম |
| আলু/কচ | ৬০ গ্রাম | ৬০ গ্রাম | ৬০ গ্রাম |
| শাক | ১৫০ গ্রাম | ১৮০ গ্রাম | ১৮০ গ্রাম |
| সবজি | ৯০ গ্রাম | ৯০ গ্রাম | ৯০ গ্রাম |
| চিনি/গুড় | ৯০ গ্রাম | ৯০ গ্রাম | ৯০ গ্রাম |
| ফল | ২০ গ্রাম | ৩০ গ্রাম | ৪৫ গ্রাম |
| তেল | ৫৫ (১টা) | ৫৫ (১টা) | ৫৫ (১টা) |
| খাদ্যশক্তি | ২১০০ কি. ক্যালরি | ২৪৫০ কি. ক্যালরি | ২৮০০কি. ক্যালরি |
| আমিষ | ৪৬ গ্রাম | ৬০ গ্রাম | ৬৭ গ্র |
শিশু বুকের দুধ পাচ্ছে তো
ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী
- মায়ের বুকে শিশু যদি সঠিকভাবে অবস্থান নেয় তবে শিশু ভালোভাবে বুকের দুধ পানে সমর্থ হয়। কিছু লক্ষণ দেখে বোঝা যায় শিশু সঠিকভাবে বুকের দুধ পাচ্ছে কি না।
- শিশুর শরীর মায়ের শরীরের যথাসম্ভব কাছাকাছি থাকবে।
- শিশুর মুখ মায়ের বুকের দিকে সম্পূর্ণ ফেরানো থাকবে।
- বাচ্চার মুখ বড় করে হাঁ করা থাকবে।
- শিশুর থুতনি মায়ের স্তনে লাগানো থাকবে।
- শিশুর নিচের ঠোঁট নিচের দিকে বাঁকানো থাকবে।
- বাচ্চার মুখে স্তনের বোঁটা ও তার চারপাশের কালো অংশ ঢোকানো থাকবে।
- শিশু যে চুষছে ও গিলছে তা বাইরে থেকে বোঝা যাবে।
- শিশুর দুই গাল ফোলা থাকে।
- অনেক সময় বাচ্চার দুধ পানের শব্দ শোনা যায়।
- মা যখন একদিকের বুকে খাওয়াতে থাকেন তখন অন্য বুক থেকে কখনো কখনো দুধ ঝরবে।
- শিশুকে খাওয়ানোর সময় ও পরে মা বোঁটাতে কোনো ব্যথা অনভব করবেন না।
- দুধ পানের পর শিশু পরিতৃপ্ত থাকবে এবং কান্নাকাটি করবে না। এসব লক্ষণ থাকলে বোঝা যায় শিশু ভালোভাবে বুকের দুধ পাচ্ছে।
প্রসূতি মার প্রাতঃকালীন অসুস্থতা মর্নিং সিকনেস
ডা. নিলুফার শামস
গর্ভবতী মহিলাদের গর্ভাবস্থায় ৫ম থেকে ১২তম সপ্তাহ পর্যন্ত সময়ে সকালবেলা বমি বমি ভাব এবং বমি উপসর্গ খুবই সাধারণ। একে বলে প্রাতঃকালীন অসুস্থতা বা মর্নিং সিকনেস। এটা গর্ভাবস্থার প্রাথমিক লক্ষণ। গর্ভবতী মহিলার স্বাস্থ্যের কিংবা গর্ভাবস্থার কোনো ধরনের ক্ষতি না করেই স্বাভাবিক নিয়মে এটা ১৪তম সপ্তাহ চলে যায়। মর্নিং সিকনেস ‘হিউম্যান করিওনিক গোনাডট্রপিন’ নামক হরমোনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ফল হলেও আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মারগি প্রফেট এ সম্পর্কে দিয়েছেন বেশ কিছু নতুন তত্ত্ব। তার মতে, গর্ভধারণের প্রাথমিক সময়ে গর্ভবতী মহিলাদের এ ধরনের বমি বমি ভাব হলো গর্ভস্থ ভ্রূণকে অস্বাভাবিক ও বিষাক্ত জিনিস থেকে দূরে রাখার এক সহজাত ব্যবস্থা। শরীরের এই প্রাকৃতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে গর্ভবতী মহিলা তার খাদ্যবস্তুতে যেসব প্রাকৃতিক মিউটোজেন থাকে তা গ্রহণ করতে নিরুৎসাহিত ও পরিত্যাগে বাধ্য করে।
উল্লেখ্য, মিউটোজেন এমন এক রাসায়নিক উপাদান যা কোষের গঠন প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। যদিও স্বাভাবিক অবস্থায় এ সামান্য পরিমাণ রাসায়নিক উপাদান সুস্থ মানুষের তেমন কোনো ক্ষতি সাধন করতে পারে না। কিন্তু এটা সামান্য হলেও ভ্রূণস্থ বিভাজিত কোষগুলোর ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। সাধারণ মর্নিং সিকনেস শুরু হয় গর্ভাবস্থার প্রথম ৫০১২ সপ্তাহে। এ সময়েই ভ্রূণের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হতে থাকে এবং ভ্রূণের কোষগুলো দ্রুত বাড়তে থাকে। সামান্য কোষগত ত্রুটি (যা যে কোনো রাসায়নিক মিউটোজেন দিয়ে হতে পারে) পরে শিশুর অঙ্গে বিকৃতি ঘটাতে পারে। এ সময়ে তাই লক্ষ করা গেছে গর্ভবতী মহিলাদের বিভিন্ন খাদ্য যেমন-মাংস, কফি, ফল, সবজি প্রভৃতির প্রতি অনীহা দেখা দেয়। মারগি প্রফেট মনে করেন, পচনশীল মাংসের ব্যাকটেরিয়া কিংবা সবজিতে উৎপন্ন এক ধরনের টক্সিনের ঘ্রাণ এই বমি বমি ভাব ও বমি করে থাকে। এ টক্সিনগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মিউটোজেনিক এবং গর্ভপাতকারক।
কিছু কিছু অঞ্চলে এই উদ্ভিদজাত টক্সিন গর্ভপাতের জন্য ব্যবহৃত হয়। গর্ভাবস্থায় মহিলাদের ঘ্রাণশক্তিও অনেক বেশি থাকে, এর ফলে যে কোনো খাবারের প্রতি বিরূপ ভাব তার মধ্যে গড়ে ওঠে। তাছাড়া গর্ভাবস্থায় খাদ্যবস্তু পাকস্থলীতে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে। এর ফলে শরীরও কিছুক্ষণ সময় পায় একে গ্রহণ করবে কি করবে না তার সিদ্ধান্ত নিতে। গর্ভাবস্থায় প্রোজেস্টেরনের মাত্রা বেড়ে যায়, একই সঙ্গে ভ্রূণ থেকে করিওনিক গোনাডট্রপিন নামক হরমোন নিঃসৃত হয়। এই হরমোনগুলো মস্তিষেকর যে অঞ্চল বমি বমি ভাব ও বমি ঘটিয়ে থাকে তাকে অতিরিক্ত উত্তেজিত করে তোলে। আর তাই এ সময়ে বমির হারও বেড়ে যায়। মারগি প্রফেট মনে করেন, গর্ভবতী মহিলাদের এসব সহজাত ক্ষমতা মিলে এক ধরনের প্রাকৃতিক প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে ওঠে। যেসব খাবার শরীর এবং ভ্রূণের জন্য ক্ষতিকর তাকে শনাক্ত করে বর্জন করার এক সহজাত ক্ষমতা প্রকৃতিই গর্ভবতী মহিলাদের মধ্যে দিয়ে দিয়েছে।
কী করণীয়
মর্নিং সিকনেসে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। ১৪ সপ্তাহের আগে এটা স্বাভাবিক নিয়মে চলে যায়। এ সময়ে গর্ভবতী মহিলা স্বাভাবিক ও পুষ্টিকর খাবার খাবে। নিয়মিত স্বাস্থ্য চেকআপ করাবে। বমির মাত্রা বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শক্রমে বমিবিরোধী ওষুধ খাওয়া যেতে পারে।



