রাগিণীর নাম রীনা আক্তার। বয়স ৪২ বছর। বাড়ি বরিশাল জেলার প্রত্যন্ত গ্রামে। শারীরিক গড়ন স্বাভাবিক। তিন সন্তানের জননী রীনা আক্তার একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে খেয়াল করল সে চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছে না। শুরু হলো জল্পনা-কল্পনা কেন সে দেখতে পাচ্ছে না কী করা যায়, কোথায় নেয়া যায়। পূর্বে গ্রামে এই ধরনের অসুখের নজির না থাকায় সবাই বিচলিত হয়ে উঠল। তাবিজ-কবজ, ঝাড়-ফুঁক, পানি পড়া কোনো কিছুই বাদ গেল না কিন্তু রোগী দিন দিন আরো অবনতির দিকে যেতে লাগল। গ্রাম্য ডাক্তার এলো, ওষুধ দিল কিন্তু কোনো উন্নতি নেই। তারই উপদেশে রোগীকে নিয়ে বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হলে সেখানে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানানো হলো চোখের কোনো সমস্যা নেই। এটা সম্ভবত মানসিক সমস্যা। তবুও আপনারা মনে করলে রোগীকে আরো ভালো কোনো চক্ষুবিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিতে পারেন-এই ব্যবস্থাপত্র দিয়ে চোখের ডাক্তার তার দায়িত্ব শেষ করলেন ঠিকই কিন্তু রোগী দৃষ্টি হারানোর ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে আরো অন্ধকারের দিকে দ্রুত পতিত হতে লাগল। চোখের অসুখ নিয়ে ডাক্তারের নিকট গেল আর ডাক্তার পাগলের ডাক্তারের নিকট যেতে বলল?
আত্মীয়-স্বজন সবাই মিলে ডাক্তারের ওপর খুব বিরক্ত হলো। অবশেষে সবাই মোটামুটি একমত হয়ে রোগীকে ঢাকায় আনার সিদ্ধান্ত হয়। গ্রামের এক লোক ঢাকায় চাকরি করার সুবাদে সে অনেক কিছুই চেনে বিধায় তার শরণাপন্ন হয়ে অবশেষে রোগীকে ঢাকায় আনা হয় চেখের বড় ডাক্তারের নিকট। কিন্তু সিরিয়াল না পেয়ে আরো দুই দিন অতিবাহিত হওয়ার পর ডাক্তারের দেখা পাওয়া গেল ঠিকই কিন্তু মন্তব্য পূর্বের চোখের ডাক্তারের মতোই। রোগী এবার পুরো হতাশ। আর কী করা! মানসিক ডাক্তার দেখিয়ে গ্রামে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রফেসর ডা. এ এইচ মোহামমদ ফিরোজ স্যারের মনোজগত সেন্টারে এলে স্যারের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী তাকে হাসপাতালে ভর্তির পর উপদেশমতো অ্যাব্রিয়েকশন করতে আমাকে ডাকা হয়। প্রথম দিন কোনো রেজাল্ট এলো না, দ্বিতীয় দিন রোগী বলে উঠল একটু আলো দেখতে পাচ্ছি। আমাদের আশাও আলোর মুখ দেখতে শুরু করল। তৃতীয় দিন রোগী পুরো দেখতে শুরু করল। চতুর্থ অ্যাব্রিয়েকশনের দিনে রোগী পুরো দেখতে শুরু করল। রোগী ভীষণ খুশি, সাথে আমরাও খুশি। আমি স্যারকে বলেছিলাম অসুখটা কী? স্যার উত্তর দিলেন, ‘হিস্টেরিকেল ব্লাইন্ডনেস’।
কেস নং দুই
রোগীর বয়স ২৬ বছর। নাম মাসুদ রানা। ঢাকা মোহামমদপুরের স্থানীয় বাসিন্দা। তিন ভাইয়ের মধ্যে রানা কনিষ্ঠ। ব্যায়াম করা পেটানো শরীর। মহল্লায় চলাফেরা করার সময় সবার দৃষ্টি তার দিকে থাকে, ঈর্ষণীয় ফিগার। দূর থেকে কারো বোঝার উপায় নেই যে সে ভীষণ মনঃকষ্টে আছে। কারণ তার কোনো বন্ধু-বান্ধব নেই, কারো সাথে কথা বলে না, কারো সাথে মেশে না। অবশেষে বাড়ির লোকজন অনুভব করতে শুরু করল যে রানা হঠাৎ কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। বাড়ির লোকজন বিভিন্নজন বিভিন্ন রকম মন্তব্য করে, মতামত দেয়, অপেক্ষা করে কিন্তু কোনো ফল আসে না, রানা কথা বলে না। অনেকেই জানে মানুষ মন খারাপ করলে, রাগ করলে, অভিমান করলে কথা বলা বন্ধ করে দেয়, আবার কিছুদিন গেলে কথা শুরু করে কিন্তু রানার বেলায় সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র সামনে আসতে লাগল। কথা বন্ধের সময়কাল গড়াতে গড়াতে এক বছর দুই বছর এভাবে তিন বছর পার হয়ে গেলে সবার টনক নড়ে। অবশেষে তারা রোগীকে নিয়ে মনোজগত সেন্টারে আসে। প্রফেসর ডা. এ এইচ মোহামমদ ফিরোজ স্যার অ্যাব্রিয়েকশন অ্যাডভাইস করেন। সাড়ে তিন বছর কথা বন্ধের রানা তিন দিনের মধ্যে কথা বলা শুরু করলেন। এই ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি বিস্ময়করও বটে তার নাম অ্যাব্রিয়েকশন। আমি স্যারকে প্রশ্ন করে জানতে পারলাম এই রোগটির নাম ‘হিস্টেরিক্যাল মিউট’।
অ্যাব্রিয়েকশন রিপোর্ট
সোমা ইসলাম। বয়স ১৯ বছর। বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার কোনো এক উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে। বিয়ের বয়স মাত্র ১৩ দিন। বাবা-মায়ের ইচ্ছায় তার বিয়ে হয়েছে, তখন সে উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্রী। স্বামী বিদেশ থাকে, দুই মাসের ছুটিতে দেশে এসে বিয়ে করেছে, বাড়ি পাশের গ্রামে। বিয়ের পর সোমাকে জামাইয়ের সঙ্গে থাকতে হবে কেননা জামাই বাবু অল্পদিন দেশে থেকে আবার বিদেশে চলে যাবে। স্বামীর বাড়িতে একদিন ভোরে ঘুম ভাঙলে সোমা লক্ষ করে তার ডান পা এবং ডান হাতে কোনো শক্তি নেই, একেবারেই অবশ। সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, দুই পক্ষের লোকজন এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করে পানি পড়া, তাবিজ পড়া, বাড়ি বন্ধ করা, বদ বাতাস, জিন-পরীর আসর নানামুখী অসুখের বিভিন্নমুখী সব ব্যবস্থাই যখন রোগীর রোগ সারাতে পারল না, রোগীর অবস্থা দিনকে দিন খারাপ থেকে খারাপ হতে লাগল। রোগী কথাও বন্ধ করে দিল। অবশেষে রোগীকে কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিয়ে এলে চিকিৎসকরা অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মতামত দিল, এই ধরনের প্যারালাইসিসের সঙ্গে যে ধরনের শারীরিক পরিবর্তন পাওয়া যায় সে ধরনের কোনো পরিবর্তন যেহেতু পাওয়া গেল না অতএব এটা মানসিক সমস্যা, মানসিক রোগের ভালো ডাক্তার দেখাতে পরামর্শ দিল। মুখে কথাগুলো বলল ঠিকই কিন্তু কাগজে লিখল সরকারি এক হাসপাতালের নাম।
ঢাকায় এসে সেখানে কোনো কূলকিনারা করতে না পেরে রোগীকে নিয়ে মনোজগত সেন্টারে প্রফেসর ডা. এ এইচ মোহামমদ ফিরোজ স্যারের নিকট আসে। স্যার যাবতীয় তথ্য গ্রহণ শেষে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তিসহ অ্যাব্রিয়েকশন সাজেস্ট করেন। অ্যাব্রিয়েকশনের জন্য আমি রোগীর নিকট যাই। সমস্ত নিয়ম-কানুন মেনে আমি অ্যাব্রিয়েকশন শুরু করি। প্রথম সেশনে রোগীর কোনো কথা শোনা গেল না, তবে তাকানোর মধ্যে একটু স্বাভাবিকতা লক্ষ করা গেল এবং ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলির একটু নড়া নজরে এলো। আশার আলো দেখা মাত্রই আশাবাদী হয়ে প্রথম সেশন সমাপ্ত হলো। দ্বিতীয় সেশনে রোগী কথা বলা শুরু করল, হাত নাড়া শুরু করল, হাতে শক্তি এলো পাও একটু একটু নড়ল কিন্তু হাঁটার মতো শক্তি এলো না। দ্বিতীয় সেশন শেষ হলো খুবই আশা নিয়ে, রোগীর লোকজনও খুবই খুশি। তৃতীয় সেশনে রোগী দাঁড়ানোর মতো শক্তি অর্জন করেছে মর্মে মনোবল দেখাল। চতুর্থ সেশনের পূর্বে লক্ষ করা গেল রোগী নিজে হেঁটে এসে অ্যাব্রিয়েকশন টেবিলে উঠল এবং প্রক্রিয়া শুরুর পূর্বে রোগী নিজে থেকে তার উন্নতির কথা বলল। অ্যাব্রিয়েকশন চলাকালীন মনের অনেক দুঃখের কথা, অসহায়ত্বের কথা, বেদনার কথাসহ আরো অনেক না বল কথা অকপটে অনর্গল বলে গেল, চোখের কোনায় পানি জমে উঠল, আস্তে আস্তে সেটা বড় হয়ে গড়িয়ে পড়ল, কথা ভারী হয়ে এলে অ্যাব্রিয়েকশন সেশন সমাপ্ত ঘোষণা করা হলো। প্রফেসর ফিরোজ স্যারের কেস সিলেকশন চমৎকার বলে অ্যাব্রিয়েকশনের রেজাল্ট চমৎকার কেননা এই কেসটা দেখেই স্যার রোগ নির্ণয় করেছিলেন ‘হিস্টেরিক্যাল মিউট অ্যান্ড প্যারালাইসিস’, যেটা আমাকে জানানো হয়নি।



