ছোটবেলা থেকেই একটা বিষয় আয়ত্ত করে ফেলেছি বেশ ভালোভাবে। আর তা হলো ২৪ ঘণ্টাই কষ্টকে মনে করা চেতন আর অবচেতন মনে। আজ ৩০টি বছর এ কাজটিই হয়ে যাচ্ছে। কোনোমতেই পারছি না তার পরিবর্তন ঘটাতে। আর এর একটাই মাত্র কারণ তা হলো পরিবার থেকে ভালোবাসার অর্থ কী, দেখতে কেমন সে ভালোবাসা, এর প্রয়োগ কীভাবে হয়, কোথায় করতে হয় এবং এর প্রয়োগে কী হয় না হয় তা শিখিনি, জানি না। এ তো গেল আমার পরিবারের কথা। কিন্তু আজ যার কথা বলব সে আমার নিজস্ব পৃথিবীর বাইরে আমার বৃহৎ পৃথিবীর খুবই আদর্শবান, ভালো এবং নীতিবান মনে হওয়া একজন চাচার কথা। যে নাকি নিজেকে সব সময় তাদের পরিবার থেকে নিজেকে একটু আলাদাই ভাবতেন। আজ তার কথাই মনে পড়ল আমার। আর কোনো চাচার কথা মনে পড়ছে না। মনে পড়ছে না আর কোনো অভিভাবকের কথা। তাহলে এবার বুঝুন সে আমার কাছে ছিল কতটা সমমানিত ব্যক্তি। কারণ এই বর্তমান সমাজব্যবস্থায় কেউ কাউকে প্রয়োজন ছাড়া মনে রাখতে চায় না। তাই নয় কি?
আজ আমি আমার জীবনের কিছু কিছু নোংরা অভিজ্ঞতার কথা বলব। মানুষের জীবন যে জটিল, আর এই পৃথিবীটা যে কত জটিল তা এখন প্রতিদিন একবার বুঝতে পারি বললে ভুল হবে প্রতিদিন কয়েকবার করে বুঝি এবং বুঝতে বুঝতে সবার কাছেই এখন এই পৃথিবী জটিল, জটিল মানুষের মন-এই বিষয়গুলো খুব স্বাভাবিক হয়ে গেছে। যাই হোক এবার আসি মূল কথায়। যে কষ্টের ঝড় বা সুনামি বা নার্গিস থেকে যেটাই বলেন না কেন আজ এই লেখার উদ্ভাবন সৃষ্টি সেই ঝড়ের উৎস কোথা থেকে সেই জ্ঞান ও ব্যক্তির কথা উল্লেখ করতে গিয়ে আজ নিজের একান্ত পৃথিবীর কিছু মানুষের কথা বলতে হয়। তাহলে শুনুন আজ সেই গল্প।
আমার বাবারা ৪ ভাই। আমার বাবা সবার বড় তারপর নিজাম চাচা, এমাদ চাচা ও হেলাল চাচা। নিজাম চাচা সরকারি চাকরি করেছেন সারা জীবন সততা ও নিষ্ঠার সাফাই গেয়ে নিজেকে একজন আদর্শ ও নীতিবান এবং পরোপকারী ব্যক্তি হিসেবে সবার চোখে ধুলো দিয়ে চলার চেষ্টা করেছেন। এ সত্যটাই আমার কাছে পরিষকার।
আমার বাবা ছিল প্রচণ্ড বদমেজাজী। বদমেজাজী হলেও এক কথা ছিল। এমনই এক জটিল চরিত্রের মানুষ ছিল যে সব সময় তার মেজাজ খারাপ থাকত এবং আমাদের সবার সাথে তির্যকভাবে কথা বলত। এমনকি আমার বাবা তার ভাইবোন সবার সাথেই এ ধরনের কথা বলত। সর্বোপরি সে ছিল একজন মানসিক রোগী। আমার তৃতীয় নম্বর চাচা অর্থাৎ এমাদ চাচা সেও ছিল খুব রাগী। তবে সে স্বার্থসংশ্লিষ্ট কারণ ছাড়া কখনোই রাগত না। আর প্রয়োজনের তাগিদে রেগে গেলেও বা কারো সাথে খারাপ ব্যবহার করলেও পরে তা নিজ গুণে বা বুদ্ধি দিয়ে নিজেকে এবং পরিবেশকে নিজের পক্ষে নিয়ে যেতে পারত। আর ছোট চাচা ছিল খুবই নিরীহ টাইপের মানুষ। সেই ছিল ব্যতিক্রম পরিবারের মধ্যে। আর এ ব্যতিক্রম হওয়ার কারণেই আজ তার অবস্থা করুণ। পাগলের মতো জীবন যাপন করছে সে। প্রত্যেকে গেম খেলছে তার সঙ্গে। ভাইদের মধ্যে বিন্দুমাত্র বনিবনা ছিল না। কেউ কারো কথা সহ্য করতে পারত না, চারটা ভাই একসাথে হলেই প্রত্যেকে যার যার জ্ঞান বুদ্ধি প্রকাশের যুদ্ধে লেগে যেত। যার জন্য কোনো ব্যাপারেই তারা আজ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি। বরং মারামারি, ঝগড়া-ঝাঁটি লেগে যেত এবং তা এতটাই নোংরা ছিল যে জনসমুক্ষে করতে দ্বিধা করত না। এর মধ্যে আমার নিজাম চাচা যার বুদ্ধিমত্তা, সৃজনশীলতা এবং ধৈর্য সব সময় আমাকে উৎসাহিত করত। ভাবতাম এটাই যে এই রকম জটিল পরিবেশে থেকে যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে সুতরাং এই নিজাম চাচার চিন্তা-চেতনায় তার কর্ম পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। তার মধ্যেও অনেক সমস্যা ছিল কিন্তু তিনি যেহেতু একজন প্রতিষ্ঠিত, সামাজিকভাবে সমমানিত তাই তার অন্যান্য হীনতা নিচতাকে আমলে নিইনি। ভেবেছি এরকম পরিবেশে থেকে নিজের ভুলের জন্য একটা ভালো ভবিষ্যতের জন্য নিজাম চাচা ছোটবেলা থেকে মানসিক কষ্ট সহ্য করেছে। যার ফসল আজকের নিজাম চাচা। কিন্তু আজ বুঝতে বাকি রইল না যে মানুষকে চেনার শেষ নেই। সারা জীবনই মানুষকে চিনে যেতে হয়, বুঝে যেতে হয়।
বেশ কিছুদিন আগের কথা। যানজটবিষয়ক একটি লেখা লিখেছিলাম পত্রিকায়। চাচা তার কিছুদিন পর আমাদের বাসায় তার বড় মেয়ের বিয়ের দাওয়াত দিতে আসে। অনেক দিন পর চাচাকে পেয়ে আমরাও বেশ খুশি। (উল্লেখ্য আমাদের পরিবারটা এমন যে যখন কোনো আত্মীয় আসত তখন মনে হতো ঈদের দিন) এর কারণ আমাদের পরিবারটা সব সময় ‘বাবা’ আর বড় ভাইয়ের জন্য ভুতুড়ে পরিবেশ হয়ে থাকত। যাই হোক চোচাকে খুব প্রাণবন্ত মনে হচ্ছিল। কারণ দীর্ঘজীবন সরকারি ভালো চাকরি করার পর অবসরে যেয়ে পাঁচতলা বাড়ি করে ফেলেছে এবং এখন আবার সংসারের প্রথম বিয়ে তাও আবার বড় মেয়ে। সবকিছু মিলিয়ে সে ছিল প্রাণবন্ত। অনেকক্ষণ কথা বলার পর হঠাৎ আমার মাথায় এলো আমার লেখা ‘যানজট’ বিষয়ক চাচাকে দেখাই। আমার রুমে যেয়ে পত্রিকাটি এনে চাচাকে বললাম চাচা আমার একটা লেখা ছেপেছে পড়েন। অর্ধেক পড়েই চাচা বলল দেখ আমরা তো এগুলো বুঝি কম দেখ চেষ্টা করে বড় লেখক হতে পারিস কি না এমন তো হতে পারে ‘হাসিনা’ তোমাকে ডেকে নিয়ে দীপু মণি না হোক মন্ত্রী হিসেবে খুকু মণি ােনাতে পারে। আমি আকাশ থেকে পড়লাম। তাৎক্ষণিক তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। আর ভাবলাম জীবনের এই সময়ে আজ আমি বুঝি আপন অভিভাবক যদি আপনের পরিচয় না দেয় তবে আর কেউ তা করে না।
ভালোবাসার বাহ্যিক অভিনয় করে যায় সবাই। এটাই স্বভাবিক। এটাই বাস্তব। বুঝতাম অনেক আগে থেকেই এই বাস্তবতা কিন্তু উপলব্ধি করতে চাইত না আমার এ অবুঝ মন। জীবনের একদম শুরুতে একটা সন্তানের মনে ও মস্তিষেক দরকার হয় যেসব উপাদান তার কিছুই ছিল না আমার। তাই আমার আপন পৃথিবী ছেড়ে বৃহৎ পৃথিবীর যার কাছ থেকে যে ভালোবাসা, স্নেহ, টুকটাক যা পেয়েছি তাকেই সত্য বলে মেনে নিয়েছে এই মন। কিন্তু সবাই ছিল প্রতারণা। সবই ছিল ভুল। মানুষের জীবন চলে যুক্তিতে। মানুষের দেহ ও মনও চলে বৈজ্ঞানিক হিসাবনিকাশে।
আপনার লেখা পত্রিকা ‘মনোজগত’ পড়ে আসছি সেই ছোটবেলা থেকেই। যখনই কোনো মনোজগতের ওপর বই পেয়েছি তখনই কিনে পড়েছি। এভাবেই বেঁচে আছি আজ ত্রিশটি বছর। আমি যখন চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র তখন একদিন আমি ঘুমিয়ে আছি হঠাৎ আমার বাবা আমাকে গালে এক চড় দেয় ঘুমন্ত অবস্থায়। আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি। ভয়ে ভীতু হয়ে কাঁদতে থাকি। আমি যখন একেবারে ছোট ছিলাম কোলে থাকা অবস্থায় তখনো সে নাকি গালাগাল করত। অপয়া ছেলে হিসেবে আমার এসএসসি পরীক্ষার সময় আমার বাবা আমাকে খেলাধুলার অপরাধে বাসা থেকে বের করে দেয়। যেদিন এসএসসি পরীক্ষা দিতে যাই সেদিন আমার বাবা আমাকে চড় দেয়। আমি কাঁদতে কাঁদতে হলে যাই। প্রতিদিনই একবার করে শুনতাম আমার মতো ছেলে পাস করবে না। কিন্তু সেই আমি ক্লাস নাইন থেকে প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় বিভাগ পেয়েছিলাম। তারপর এইচএসসি পরীক্ষার সময়ও সে আমাকে মেরে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। তখন আশ্রয় নিয়েছিলাম আমার এই নিজাম চাচার বাড়ি চট্টগ্রামে। যে আমার আজকের লেখার মূল নায়ক। যার জন্য আজ আমার হৃদয়ে বাঁধভাঙা ঝড়। যার জন্য বহু বছর পর হৃদয়ের মৃত অনুভূতির শরীরে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে দুর্বার গতিতে। আমি তোমাকে ধন্যবাদ জানাই চাচা তুমি আমর মৃত মরে যাওয়া অনুভূতিকে জাগিয়ে তুলেছ। বাবা তো শুধু জন্ম দিয়েই চলে গিয়েছিল। কোনো কিছু তো শিখতে পারিনি বাবা -ায়ের নিকট থেকে।
মা থাকত বাবার অত্যাচারে সব সময় ভীত। বাবার সামনে আমার ও আমাদের চার ভাই বোনের সাথে খোলা মনে কথা বলতেও ভয় পেত। কারণ আমার বাবা এমন লোক ছিল যে সে যদি আমার মায়ের সাথে আমাদের কারো হাসিখুশিভাবে কথা বলতে দেখত তাহলে সন্দেহ করত। অথচ দেখা গেছে যে বাবার কোনো ব্যাপার নিয়ে আলাপ হচ্ছে না। তাই আমার মা সব সময় আমাকে ও বাকি তিন ভাই বোনকে এড়িয়ে চলত। আমাকে যেহেতু বাবা অন্য রকম চোখে দেখত অর্থাৎ ভাগ্যহীন একটা ছেলে। আমি পৃথিবীতে আসার পর নাকি বাবার ব্যবসা, চাকরি অনেক কিছুই ক্ষতির সমমুখীন হয়। আজ দশ বছর হলো বাবা আমার আরেক বিয়ে করে চলে গেছে। এই দশ বছরের পূর্ব পর্যন্ত প্রতিদিন না হোক সপ্তাহে অন্তত দুবার তিনবার শুনতাম যে আমি কতটুকু দুর্ভাগ্য নিয়ে এসেছিলাম পৃথিবীতে। ছোটবেলায় আমি চঞ্চল ছিলাম, খেলাধুলা করতাম, বাইরে বাইরে থাকতাম বেশির ভাগ সময় বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতাম একসাথে। এসব কারণে যে হয়তো বাসায় যেয়ে দেখব বাবা আছে, কী দরকার বাসায় যেয়ে। তার চেহারার সামনা-সামনি হওয়া মাত্র একটা বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়া তাই সব সময় লুকিয়ে লুকিয়ে থাকতাম। আর এসব কারণে আজ সব আত্মীয়স্বজন থেকে আমার বাবা দূরে, কারো কাছে সমমান পায় না। আর এসব ভেবে আমার ‘মন’ সব সময় ছোট হয়ে থাকত এবং আজো থাকে। আত্মীয়-স্বজন কারো সাথে দেখা হলে কথায় কথায় জিজ্ঞেস করত তোমার বাবা কি পরিবর্তন হয়েছে। তখন অজান্তেই মনটা ছোট হয়ে যেত। তারপর যতক্ষণ থাকতাম ততক্ষণই মন ছোট হয়ে থাকার ব্যাপারটা কাজ করত এভাবেই। ছোট হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা মনের মধ্যে দৃঢ় হয়ে যায়। যা এখন বুঝি আপনার লেখা মনোজগত ও আরো অন্যান্য বই পড়ে।
আজ একটা ঘটনা আমার মনে পড়ে। আমার তৃতীয় নম্বর চাচার ছেলে সেলিম বলেছিল, যখন সেলিম এইচএসসি পাস করল তখন একবার নিজাম চাচা বাড়িতে যায়। নিজাম চাচাকে পেয়ে সেলিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার স্বপ্নের কথা বলে। কারণ সেলিমের বাবা অর্থাৎ এমাদ চাচা ছিলেন অশিক্ষিত। তথাপি খুব কষ্টে ছেলের পড়াশোনা করাচ্ছেন। সেলিমের স্বপ্নের কথা শুনে নিজাম চাচা সেলিমকে বলল, আকাশ-কুসুম স্বপ্ন না দেখে কাছাকাছি গ্রামের বা ফরিদপুরের যে কোনো স্থানীয় কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য। অথচ নিজাম চাচা কিন্তু তার ছেলেমেয়েকে ঠিকই কাউকে রাজশাহী কাউকে চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটিতে পড়াচ্ছে। সেলিম যখন আমাকে আক্ষেপ করে এ কথা বলছিল তখন আমি ভেবেছিলাম সেলিমের কষ্ট লাগাটা স্বাভাবিক কিন্তু চাচা হয়তো সেলিমদের আর্থিক অসচ্ছলতার কথা ভেবে বলেছে।
কিন্তু না এখন আর পজিটিভ ভাবি না। ভাবি না আর কোনো সত্যকে সুন্দরভাবে। আমার বৃহৎ পৃথিবীর কোনো অভিভাবকের উপদেশ শুনতে গেলে, হাসিমাখা কথা শুনতে গেলেই সচেতন হয়ে যাই। সচেতন হয়ে যাই প্রতারণার ভয়ে। কারণ একটাই, নিজস্ব পৃথিবীর প্রধান দুই অভিভাবক কোনো দিন উপদেশমূলক কথা ও হাসিমূলক কথা বলতে পারেনি। ‘মা’ পায়নি সুযোগ বাবার ভয়ে। আর বাবার চরিত্রটা তো ভিনগ্রহের প্রাণীর মতো। যার জন্য পার্থক্য করতে শিখিনি।
মা ছিল আমার অতিরিক্ত সহজ-সরল। বোকাসোকা একজন মানুষ। পৃথিবীর কোনো জটিলতা সে কোনো দিন বোঝেনি। মানুষের যদি স্বাভাবিক সুস্থ মন মানসিকতা থাকে তবে সে বোকা হলেও ঘাত-প্রতিঘাতে অনেক কিছু শেখে। কিন্তু আমার মাও স্বামীর ভালোবাসা পায়নি। উপরন্তু পেয়েছে শুধু তিরস্কার, অপমান আর বাবাকে দেখেছি সেই ছোটবেলা থেকেই মাকে একটুতেই মারত। অথচ মা ছিল একজন শিক্ষিত মহিলা এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। মা আমার ছিল ভদ্র। কখনোই উচ্চবাচ্য করতে পারত না। বিয়ের পর যখন আমার বাবার মুখোশ খুলে গেল তখন থেকে মা আমার নানার দেয়া উপদেশ বা তাবিজ যেটাই বলেন না কেন সেটা নিয়েই বেঁচে আছে অন্ধের মতো। বড় অভিমানী মন আমার মায়ের বড় ভীতু। বাবার আচরণ পরিষকার হয়ে যাওয়ার পর সবার কাছে নানা চেয়েছিল মাকে ফরিদপুরে নিয়ে যেতে কিন্তু কী ঝামেলায় যেন আর হয়নি। আজ নানা বেঁচে নেই, নানুও চলে গেছে মাস ৬ হলো। বড় ভাই হয়ে গেছে পাগল। বহুবার বাবার সাথে বড় ভাই মারামারি করেছে। আব্বার সব কথার উত্তর দিতে যেয়েই এমনটি হতো। আর আমি উত্তর না দিয়েও মার খেতাম। ছোটবেলায় বড় ভাই বাবার আদরের ছিল। বুদ্ধিমান হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রশংসা পেত সবার। পেত গ্রহণযোগ্যতাও। যা আমি পাইনি। বড় ভাইকে যেমন সবাই মূল্য দিয়ে কথা বলত, আমার ব্যাপারে ছিল ভিন্ন দৃশ্যপট। মূল্য না দিক যদি ছোট হিসেবে যে ব্যবহার বা স্নেহ পাওয়ার কথা সেটা পেতাম তাহলেই চলত বা তিরস্কারমূলক ব্যবহার না করলেও চলত, তাহলে আর আজকের আমি আবিষকার হতাম না।
বড় ভাইও আমার সাথে করেনি কোনোদিন ভালো ব্যবহার। বরং এখন সে আমাকে দেখলে তেড়ে আসে মারতে। সেদিনও মেরেছিল। এখন না হয় সে পাগল, আগে তো পাগল ছিল না। আগে তো সবার প্রিয় ব্যক্তি ছিল। আমার বাবার কার্বন কপি হলো আমার বড় ভাই। আমার বাবা ও বড় ভাইয়ের মধ্যে মানবিক কোনো গুণাবলির অস্তিত্ব ছিল না। ছোটবেলা থেকেই বড় ভাই আমাকে হিংসা করত। আমার মনে পড়ে ছোটবেলায় যখন অনেক দিন পরপর মামার বাড়িতে যেতাম তখন মনে হতো যেন জেলখানার বন্দিশালা থেকে মুক্ত আকাশের নিচে নিঃশ্বাস নিতে এসেছি। যে কয়দিন থাকতাম সে কয়দিনই ভালো কাটত। বড় ভাইয়ের জন্য পুরোপুরি ভালো কাটত। আর আমার জন্য মন্দের ভালো। কারণ সারাক্ষণই বড় ভাই মামার কাছে আমি এটা পারি ওটা পারি মারুফ কিছুই পড়ে না গাধা একটা। অভিভাবকরা এরূপ বলে কিন্তু বড় ভাইও প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে তির্যকপূর্ণ কথা দিয়ে বুঝিয়ে দিত আমি নির্জীব প্রাণী। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্যি যে তখন আমার কাছের অভিভাবকরা তাকে কিছুই বলত না। যার ফলে তার নোংরা মন তার অবচেতন মনের নোংরা আবরণকেই সমর্থন করে হৃষ্টপুষ্ট করে সজীব করে তুলেছে। মামারা তার আচরণ পরিবর্তনের ব্যাপারটা আমার অনুপস্থিতিতে পাল্টাতে বলত হয়তো কিন্তু তাতে তার কোনো চেতনা আসত না। যার পরিণতি আজকের মামুন। সে এখন পাগল।
বাবা আমার দ্বিতীয় বিয়ে করার পর আমি বুঝিয়ে শুনিয়ে বাবাকে বাসায় নিয়ে আসি। কিন্তু বড় ভাইয়ের সাথে মারামারি করে বাবা চলে যায় হালুয়াঘাট। সেই থেকে সে আজও হালুয়াঘাট অবস্থান করছে। সেখানে সে অনেক জায়গা জমি করেছে। বাবা যখন রাগ করে চলে গেল তখন ভেবেছিলাম মনে মনে এবার হয়তো স্বৈরশাসন থেকে মুক্তি পাওয়া গেল। আর ভেবেছিলাম বড় ভাই হয়তো এবার সুস্থ মন-মানসিকতার হবে। কিন্তু না বিধিবাম। এত দিন আমিও ভেবেছিলাম বাবার অতিরিক্ত শাসনে হয়তো ভাই আমার নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারেনি যা আমি পারতাম। কিন্তু সেটা আর হয়নি। বাবা চলে যাওয়ায় সে ঘোষণা দিল বাপ না থাকলে পরিবারের দায়িত্ব পালন করে কে? ‘বড় ভাই’ তাই না। সুতরাং সবাই আমার কথা শুনবি। নতুবা বুঝতেই পারস ফলাফল কী হবে। আমি সামাজিক টাইপের ছিলাম। সবার সাথে হাসিখুশি থাকতে পছন্দ করতাম। আর বড় ভাই তা পারত না। যার ফলে সে আমাকে প্রতিদিন বকাঝকা এমনকি মারামারি করত। যখন আর ঠিক থাকতে পারতাম না তখন আমিও বাধ্য হয়ে মারতাম। এভাবেই চলছিল আমার সমস্ত বেড়ে ওঠা। একদিন ঘটিয়ে ফেলল সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা। সকাল ৬টা বাজে। আমি ঘুমিয়ে আছি হঠাৎ শুনি চিল্লাচিল্লি। বড় ভাই আমাকে মারার জন্য প্রচণ্ড ক্ষেপেছে। দা নিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে, আমি সামনে যেয়ে জিজ্ঞেস করলাম কী হয়েছে? সাথে সাথে সে আমাকে দিল এক কোপ। আমি হাত দিয়ে ঠেকানোতে গলায় না লেগে একটা আঙুল কেটে পড়ে যায়। আমি কিছুই বলিনি তাকে। চিৎকারও করিনি। পাশের দোকানের এক ছেলে চলে আসে, তাকে আমি বলি ‘শামীম’ কেউ যেন না জানে এই বলে আমি ‘বাঁ’ হাতটা প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে চলে যাই হাসপাতালে। তিনদিন পর আমার ‘মা’ যায় আমাকে দেখতে। প্রিয় পাঠক একটা জিনিস হয়তো বুঝতে পারছেন যে আমি ওই দোকানের ছেলেটিকে কেন বলেছি, শামীম কেউ যেন না জানে এত বড় একটা ঘটনা।
শ্রদ্ধেয় ডাক্তার সাহেব অনেক বেশি লিখে ফেললাম হয়তো। কিন্তু তারপরও না লিখে উপায় ছিল না। এখন আমার শারীরিক মানসিক অবস্থা তেমন ভালো না। নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে আর সবার কাছে মানসিকভাবে ভালো থাকার অভিনয় করতে করতে মনের অজান্তে যে নিজের কত বড় ভুল করেছি তা আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। এ পর্যন্ত ১৪টি চাকরি করেছি। কোনোটাই ধরে রাখতে পারিনি। মেজাজ হয়ে গেছে খিটখিটে। কেউ যদি একটু ইঙ্গিত দিয়ে কোনো খারাপ কথা বলে আমার সেটা নিয়ে মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। মাথার মধ্যে শুধু অপ্রয়োজনীয় চিন্তা ঘুরপাক করে। পরিকল্পনামাফিক কাজ করতে পারি না। মানুষের একটু অবহেলা পেলে মনটা ভেতরে ভেতরে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং দীর্ঘক্ষণ সে বিষয় মাথার মধ্যে থাকে। আবার দেখা যায় যে কারো ওপর যদি মনটা ক্ষিপ্ত থাকে ঘুম থেকে উঠেই মাথায় তার চিন্তা আসে। কল্পনায় আসে তার সাথে ঝগড়া করছি। যার ফলে দেখা যায় মনটাকে কোনো ভালো দায়িত্বশীল কাজে নিয়োজিত রাখতে পারি না।
আপনার লেখা বই ও অন্যান্য বই পড়ে নিজেকে অনেক পরিবর্তন করেছি। আমার স্মৃতিশক্তি অনেক ভালো। অনেক কিছু মনে রাখতে পারি। যখন যে অফিসে চাকরি করেছি কাজের খুব দক্ষতা দেখাতে পেরেছি। আমার মানসিক শক্তি খুব প্রবল। অনেক কিছু বুঝি। আমিও বুঝি একটু প্রাণবন্ত পরিবেশ পেলে আমার ভেতরের নেগেটিভ চিন্তাগুলো আর থাকত না। সবকিছু মিলিয়ে আমার মনটা এখন বোবা হয়ে গেছে। আমি বাঁচতে চাই।
এখন আমি নিঃসঙ্গ। বিয়ে করেছিলাম, পারিবারিক এই অবস্থার কারণে বউ মায়ের সাথে শুধু খারাপ ব্যবহার করত এবং আমাকে খোঁচা দিয়ে কথা বলত। এটা এতটাই প্রকট হয়ে পড়ে যে মনের জিদে ও কষ্টে বউকে ছেড়ে দিয়েছি। উল্লেখ্য যে আমার বড় ভাই যখন আমার হাতে কোপ দেয় তার পরের বছরই আমার ১৪ বছরের প্রেম ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। এখন আমার বয়স ত্রিশ বছর। আজ অবধি যে পরিবেশে আছি এই পরিবেশ আমার পিছু ছাড়বে না। আমার মায়ের অবস্থা ভালো না। এখন আমার প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে চিন্তায় আসে আমার মা মরে গেলে আমি কী নিয়ে বাঁচব। কাকে দেখে সাহস পাব পথচলার। তখন হয়তো আমার জীবন হয়ে যাবে একেবারেই গতিহীন। সবারই তো একটা সময় বাবা, মা মারা যায়। সবাই একটা সময় মেনে নিতে পারে সব কষ্ট। কিন্তু আমার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। আমার বুকে তো কোনো সম্পদ নেই। নেই কোনো শক্ত স্তম্ভ। নেই কোনো মানসিক বেজমেন্ট। তবে আমি কী করে বাঁচব এই বিশাল পৃথিবীতে।
সবশেষে চাচাকে আবারও ধন্যবাদ জানাই যে চাচার দেয়া আঘাত আমাকে ভাবতে শেখায়। আমাকে অনুভূতিহীন থেকে অনুভূতিশীল করেছিল। এই চাচাই আমাকে শিখিয়েছে অভিভাবকের পার্থক্য। এখন আমি তার কাছ থেকে শিখতে পেরেছি মুখে মধু আর অন্তরে বিষ রেখে কীভাবে চলতে হয়।



