Skip to main content

ডায়াবেটিস ও খাদ্য

আখতারুন নাহার আলো

সাধারণ স্বাস্থ্য রক্ষায় যেমন সুষম খাদ্যের প্রয়োজন, তেমনি ডায়াবেটিসের বেলায়ও এর ব্যতিক্রম হয় না। তবে এই রোগটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে গেলে খাদ্যের ব্যাপারে কিছু বিধিনিষেধ মেনে চলা জরুরি। তিনটি বিষয় মনে রাখতে পারলে এই রোগটিকে আয়ত্তে আনা কোনো ব্যাপার নয়।

প্রথমত: নিষিদ্ধ খাবার বর্জন।

দ্বিতীয়ত: পরিমাণমতো খাবার গ্রহণ।

তৃতীয়ত: প্রতি ৩ ঘণ্টা পর পর খাবার খেতে হবে।

নিষিদ্ধ খাবারগুলো হলো
চিনি, গুড়, মধু, গ্লুকোজ, খেজুরের রস, কেক, পেস্ট্রি, জ্যাম, জেলি, সিরাপ, মিষ্টি বিস্কুট, মিষ্টি, হালুয়া, কোল্ড ড্রিংকস, আইসক্রিম, মিষ্টি দই ইত্যাদি।

পরিমাণমতো খাবার গ্রহণ
প্রতিটি ডায়াবেটিস রোগীর খাবারের পরিমাণ পৃথক হয়ে থাকে। পরিবারে একজনের ডায়াবেটিস হলে তাকে যে পরিমাণ খাবার নির্ধারণ করে দেয়া হয় সেই পরিমাণ খাবার অন্যদের জন্য নয়। কারণ যদি খাবারের পরিমাণ বেশি হয় তবে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যাবে। আর যদি কম হয় তাহলে গ্লুকোজের মাত্রা কমে যাবে। এই কারণে যার জন্য যে পরিমাণের খাবার নির্দিষ্ট করে দেয়া হয় তাই খেতে হবে।

সময়মতো খাবার খেতে হবে
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সময় ঠিক রাখা খুবই জরুরি। একেক দিন একেক সময়ে খাবার খাওয়া একেবারেই উচিত নয়। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খেতে হবে এবং প্রতি তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা পর পর খেতে হবে। অনেকক্ষণ না খেয়ে থাকা ডায়াবেটিসের জন্য খুবই বিপজ্জনক। এতে বিপাকক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটে এক কিটোসিসের মতো জটিলতা দেখা যায়। এদিকে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পরপর খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা কমানো যায় না।

খাবার হবে এ ধরনের-
চিনি-মিষ্টি, মধু বাদ দিতে হবে, ভাত-রুটি-আলু পরিমাণমতো, পাতাজাতীয় ও পানসে সবজি ইচ্ছামতো। টকজাতীয় ফল ইচ্ছামতো। তবে ডায়াবেটিস বা রক্তশর্করা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে মিষ্টি ফল না খাওয়াই উত্তম।

শর্করাজাতীয় খাদ্য
অন্যান্য স্বাভাবিক লোকের মতোই শর্করাজাতীয় খাবার দৈনিক ৫০-৬০ ভাগ দিতে হবে। এ ধরনের খাবার শরীরে শক্তি জোগায়। শর্করা প্রধানত দুই প্রকার। চিনিযুক্ত শর্করা ও শ্বেতসারযুক্ত শর্করা। সকল শর্করাই শোষিত হয়ে দেহে গ্লুকোজে রূপান্তরিত হয়। তবে সহজ শর্করা যেমন-চিনি, গুড়-গ্লুকোজ এগুলো খাওয়া মাত্র সরাসরি রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়ায় এবং শ্বেতসারজাতীয় খাদ্য ধীরে ধীরে বাড়ায়। এ কারণেই চিনি-গুড় একেবারেই নিষেধ করা হয় এবং শ্বেতসার অর্থাৎ ভাত-রুটি, শস্যজাতীয় খাবার সীমিত পরিমাণে খেতে বলা হয়।

শর্করাজাতীয় খাবার হলো
রুটি, ভাত, আলু, বিস্কুট, নুডুলস, চালের গুঁড়া, পরিকা, ভুট্টা, সাগু, বার্লি, সুজি, চিঁড়া, মুড়ি, খই, চিনি-গুড়, গ্লুকোজ, মধু, সেমাই ইত্যাদি।

আমিষজাতীয় খাদ্য
আমিষ প্রধানত দুই ধরনের হয়ে থাকে। প্রাণিজ আমিষ ও উদ্ভিজ্জ আমিষ। সাধারণত প্রাণিজ আমিষের চেয়ে উদ্ভিজ্জ আমিষের গুণগত মান কম। তবে উভয় প্রকার আমিষই পরিপাক হয়ে অ্যামাইনো এসিডরূপে রক্তে শোষিত হয়। খাদ্যের মোট ক্যালরির ২০-৩০ ভাগ আমিষজাতীয় খাবার থেকে আসা উচিত। আমিষ শর্করার মতো রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়ায় না এবং চর্বির মতো অধিক ক্যালরি উৎপন্ন করে না। তবে এটা শরীর গঠন, বৃদ্ধি ও ক্ষয়পূরণ করে দেহে রোগ প্রতিরোধ শক্তি বাড়িয়ে দেয়। এ কারণে ডায়াবেটিস রোগীদেরও আমিষজাতীয় খাদ্য স্বাভাবিক লোকের মতোই গ্রহণ করতে হবে। আমিষজাতীয় খাবার হলো-ডিম, দুধ, মাছ, মাংস, ডাল, বাদাম, সিমের বিচি, সয়াবিন ইত্যাদি।

চর্বিজাতীয় খাদ্য
সারাদিনের খাবারের মোট ক্যালরির ২০-৩০ ভাগ আসা উচিত চর্বিজাতীয় খাদ্য থেকে। তবে সম্পৃক্ত চর্বি যেমন-ঘি, ডালডা এবং মাংসের চর্বি যতটা সম্ভব পরহার করা উচিত। কারণ সম্পৃক্ত চর্বিতে দেহের রক্তে কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লাইসারাইডের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। এ জন্য ডায়াবেটিস রোগীদের সম্পৃক্ত চর্বি যতটা সম্ভব কম খাওয়া উচিত। কারণ তারা অন্যদের তুলনায় সহজেই হৃদরোগে আক্রান্ত হতে পারে। রান্নায় সয়বিন তেল,  সূর্যমুখীর তেল, জলপাইয়ের তেল ব্যবহার করাই উত্তম।

খাদ্যের আঁশ
খাদ্যের আঁশ দেরিতে হজম হয় বলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। আবার পরিমাণের অতিরিক্ত আঁশ পেটে গ্যাসের সৃষ্টি করে। পেটে ব্যথা হয়, পেট ফেঁপে যায় ও পাতলা পায়খানা হয়। সে জন্য যাদের গ্যাসট্রাইটিসের সমস্যা আছে এবং যাদের আলসার আছে তাদের এই জাতীয় খাবার বাদ দেয়া উচিত। আঁশজাতীয় খাবার হলো-ভুসিযুক্ত রুটি, লাল চাল, আঁশযুক্ত সবজি ও খোসাসহ ফল।

সবশেষে বলা যায়, যেহেতু ডায়াবেটিস সারা জীবনের রোগ সে জন্য প্রতিটি রোগীরই আত্মসচেতনতা প্রয়োজন। বলা হয় একজন নিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস সম্পন্ন লোক অনেক বেশি ভালো, ডায়াবেটিস নেই এমন একজন লোকের চেয়ে। কারণ তিনি শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবন যাপন করেন এবং সব সময় চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকেন।