আপনি কয়েক দিন আগে জানতে পারলেন যে আপনার বন্ধুর বাইপোলার ডিসঅর্ডার রোগটি হয়েছে, তখন সম্ভবত আপনি বুঝতে পারবেন না যে এ সময় আপনি কী করবেন বা আপনার কী কথা বলা দরকার। আপনার বন্ধু হয়তো অন্য রকম আচার-আচরণ করছে এবং এমনকি সে এ ব্যাপারটাকে কোনো গুরুত্ব দিচ্ছে না বা আপনাকে কোনো কিছু বলছে না, তখনো তার জন্য আপনার সাহায্যের প্রয়োজন রয়েছে। তাই এ সময় আপনি তাকে এ কথা না বলে, ‘আমাকে বলো যদি তোমার কোনো কাজ করতে পারি’, আপনার বন্ধুকে কোন উপায়ে সাহায্য করা যায় তার একটি পরিকল্পনা করে নিন। বন্ধুর সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসুন।
বাইপোলার ডিসঅর্ডার কোন সময় কাকে আক্রান্ত করে তা আগাম জানার বা প্রতিরোধের উপায় নেই। এটা যে কারোরই হতে পারে।
ইরানে প্রায় ৮,১০০৩৮ জন মানুষ বাইপোলার রোগে আক্রান্ত। জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল সাইকিয়াট্রিতে ১৯৯৫ সালে লেখা হয়েছে যে নারীদের পুরুষের চেয়ে ৩ গুণ বেশি বাইপোলার ডিসঅর্ডারজনিত রেপিড সাইক্লিং বা দ্রুত উপসর্গের আক্রমণ ঘুরে-ফিরে আসতে থাকে। নারীদের পুরুষের চেয়ে বেশি বিষণ্নতার পর্যায় এবং মিশ্র পর্যায় দেখা দিয়ে থাকে।
বাইপোলার ডিসঅর্ডার
আপনার বন্ধুত্ব কীভাবে বদলায়
বাইপোলার ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত হলে ব্যক্তি স্বাভাবিক আচরণে থাকতে পারে না। এ সময় আপনার বন্ধুর মনোশারীরিক চাপ বা স্ট্রেসের কারণে আচরণের পরিবর্তন হতে পারে, তাই এ সময় আপনি যখন তাকে সাহায্য করতে যাবেন তখন সে হয়তো বিরূপ মনোভাব পোষণ করতে পারে। বাইপোলার ডিসঅর্ডার আপনার বন্ধুর মন-মেজাজের ওপরই প্রভাব ফেলে না, তা আপনার বন্ধুর-
- কাজের দক্ষতা
- শক্তি এবং
- তৎপরতার ওপর প্রভাব ফেলে
এ সময় আপনার বন্ধু হয়তো আপনাকে কড়া কথা শোনাতে পারে, বকাঝকা দিতে পারে। আসলে এগুলো সে অনিচ্ছাকৃতভাবে করে থাকে।
ডা. ভিগুরা বলেন, ‘এটা মনে রাখবেন যে কথা বলছে রোগ, আপনার বন্ধু নয়’ ‘এ রোগ সময়ের সাথে সাথে ধ্বংসকারী হয়ে ওঠে-যা প্রচুর অনুশোচনার পাহাড় তৈরি করে দেয়’।
আপনার এ কথাটি বোঝা উচিত যে আপনার বন্ধু, আপনি এবং আপনাদের সম্পর্ক অনেক পথ ধরে এসেছে এবং অনেক দীর্ঘ পথ ধরে এগিয়ে যাবে, তাই এ সময় রোগীর জন্য যেটা ভালো বা উপকারী আপনি তা করার চেষ্টা করবেন। বাইপোলার ডিসঅর্ডার শুধু আপনার বন্ধুর ওপরই প্রভাব ফেলে না, এটি আপনার ওপরও প্রভাব ফেলে। তাই এ সময় বন্ধুর অসুস্থতাকে সামাল দেয়ার দৃশ্য সহ্য করাটা একটু কঠিন ব্যাপারই বটে এবং এটি অনেক সময় সম্পর্কের ওপর একপ্রকার চাপ সৃষ্টি করে।
বাইপোলার ডিসঅর্ডার:
আপনি কীভাবে সাহায্য করবেন?
রোগীর সেবাদানকারী ব্যক্তি একাই আপনার বন্ধুর পুরো রোগজুড়ে সেবা করতে পারবে না-এটা একটি কঠিনতম বিষয়-এ সময় আপনি আপনার বন্ধুকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসতে পারেন। বিশেষ করে যখন তার চিকিৎসার কার্যক্রম শুরু হয় তখন। কারণ এ সময় আপনি আপনার বন্ধুর নানা রকম সমস্যার কথা তার ডাক্তারকে জানাতে পারেন। ডা. ভিগুরা বলেন, বন্ধু এবং পরিবার রোগীকে ভালো আচরণ করতে বা বোঝাতে বড় ভূমিকা পালন করতে পারেন, রোগীকে উৎসাহিত করতে পারেন, রোগীর চিকিৎসার অবস্থা এবং রোগের অন্য বাইপোলার ডিসঅর্ডারের এপিসোডের বা পর্যায়ের প্রাথমিক অবস্থাকে চিহ্নিত করতে পারেন।
আপনি যেভাবে আপনার বন্ধুকে সাহায্য করতে পারেন তার বাইপোলার ডিসঅর্ডারের সাথে সংগ্রাম করার ক্ষেত্রে। এগুলো হলো-
- বাইপোলার ডিসঅর্ডার সম্পর্কে জানুন। যত বেশি রোগ সম্পর্কে জানবেন তত বেশি বুঝতে পারবেন যে আপনার বন্ধুর রোগের অবস্থা কোন অবস্থায় যাচ্ছে এবং কীভাবে সাহায্য করা যায়। আপনি যত পারেন এ বিষয়ে পড়ার চেষ্টা করুন। বাইপোলার ডিসঅর্ডার সম্পর্কে আপনি নানা প্রবন্ধ, ফিচার, রচনা বা অন্যান্য তথ্য পড়তে পারেন। যেসব বিষয় পড়ার সময় আপনার বন্ধুর রোগের অবস্থা বা গতি জানা বা বোঝার জন্য প্রয়োজনীয় মনে করবেন তাতে কোনো চিহ্ন বা দাগ দিয়ে রাখতে পারেন। এগুলো থেকে পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আপনার ডাইরিতে লিখে রাখতে পারেন। অবসর সময়ে এসব লেখা বা তথ্য আপনি আবারও পড়তে পারেন। এভাবে আপনার রোগ সম্পর্কে অনেক কিছু জানা হয়ে যাবে। এগুলো তথ্য আপনি আপনার বন্ধুর বাইপোলার রোগ সামাল দেয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারেন। তবে মনে রাখার মতো কথা হলো যেভাবেই রোগীকে সাহায্য করুন না কেন, চিকিৎসা বা ওষুধের ব্যাপারে নিজের কোনো সিদ্ধান্ত বা তথ্য প্রয়োগ করতে যাবেন না-এ কাজটি আপনার বন্ধুর ডাক্তারের ওপরই ছেড়ে দিন। ডাক্তার রোগীর জন্য যেটা ভালো হয় তাই করবেন।
- বন্ধুর রোগ সম্পর্কে ডাক্তারের নিকট থেকে নানা রকম প্রয়োজনীয় বিষয় জেনে নিতে পারেন, পরে সেগুলো রোগীর উপকারে প্রয়োগ করতে পারেন।
- বাইপোলার ডিসঅর্ডারের প্রাথমিক বা প্রথমদিকের সতর্ককারী উপসর্গ বা চিহ্নগুলো জেনে রাখুন। প্রতিটি রোগীর আলাদা আলাদা সতর্ককারী রোগ উপসর্গ বা চিহ্ন থাকে একথা বলেছেন ডা. ভিগুরা। আপনি যদি দেখেন যে আপনার বন্ধু কোনো ম্যানিক বা বিষণ্নতার পর্যায়ের দিকে যাচ্ছে, যখন দেখেন যে সে
- খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে
- কয়েক দিন ধরে ঘুমিয়ে আছে
- খুব বেশি কথা বলছে/মজা করছে
- খুব বেশি মার্কেটিং করছে, কেনাকাটা করছে
- অত্যন্ত আনন্দে টগবগ করছে
- হুমকি দিচ্ছে
- গালাগালি করছে
- আক্রমণ করতে চাইছে
- আত্মহত্যার কথা বলছে
তখন আপনি আপনার বাইপোলার ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত বন্ধুকে সতর্ক করতে পারেন, তার ডাক্তারকে এ ব্যাপারে জানাতে পারেন। আপনার বন্ধুকে ভালো অভ্যাস গড়ে তুলতে উৎসাহিত করুন। যেমন তাকে উৎসাহিত করতে পারেন-
- প্রচুর ঘুমাতে/সময়মতো ঘুমাতে
- স্বাস্থ্যকর খাওয়া খেতে
- ব্যায়াম করতে
- ইবাদত বন্দেগি করতে
এ ধরনের উৎসাহ প্রদান আপনার বন্ধুর জন্য বড় ধরনের সাহায্য হবে এবং এগুলো করা খুবই সহজ ব্যাপার।
রোগীকে অর্থাৎ আপনার বন্ধুকে চিকিৎসার সাথে জড়িয়ে থাকতে বলুন। আপনার বন্ধুর সাথে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার জন্য অফার দিতে পারেন। ডাক্তারকে বলতে পারেন যদি আপনাকে রোগীর চিকিৎসা কার্যক্রমের সময় প্রয়োজন হয় তখন চাইলেই পাওয়া যাবে। ডা. ভিগুরা বলেন, আপনি আপনার বাইপোলার ডিসঅর্ডার আক্রান্ত রোগীর জন্য শক্তিশালী প্রভাবের কারণ হতে পারেন, আপনার এ প্রভাব হতে পারে আপনার বন্ধুর রোগনির্ণয় ও চিকিৎসার কাজে এবং ডাক্তারকে বন্ধু সমস্যা সম্পর্কে নানা তথ্য দিয়ে।



