Skip to main content

ভালোবাসা নাকি ভাঙা বাসা

রহিমা আক্তার

আজ নীলা ঘরে বসে বসে ভাবছে আসলে প্রতিটি মানুষেরই কি নিজস্ব একটা মেরুদণ্ড আছে? দুষ্ট আর চঞ্চল মেয়ে নীলা, আজ তার মনে বেদনার করুণ বাঁশি বাজে তা কেউ শোনে না, শুনতে পায় না, এই সুর যেন শুধুই নীলার। ছোটবেলায় কানামাছি গোল্লাছুট খেলে বাড়ি মাথায় করে রাখত নীলা। পরিবারের মধ্যমণি, জন্মের সময় না হলেও পরে সে হয়ে পড়ে আদরের সোনামণি। উপস্থিত যুক্তিতে মাঝামাঝি, নিজের স্বপ্নের কথা খুব একটা প্রকাশ করতে চায় না। তার পরও সবার মুখের কথা।

আমাদের নীলা সুন্দরী, গুণবতী, সাহসী আর অহংকারহীন। ভালোবাসে দেশকে, ভালোবাসে মা, মাটি আর মাটির মানুষগুলোকে। প্রতিদিন সে এক একটা বিশ্ব তৈরি করে নতুন করে, আবার ভেঙে নতুন করে সবকিছুকে পেতে চায়। নিজেকে সাজাতে চায় নতুনভাবে, নীলার ভাবনা মানুষের রূপ বদল হলেই কি মানুষ বদলে যেতে পারে। শিশু আর কিশোরের দিনগুলোকে বন্দী করে যৌবনের কাছে। যৌবনা মন যেন কী খুঁজতে থাকে। সেই খোঁজার সন্ধান যেন কাছে এসে ধরা দেয় না। এক পা দুই পা করে ১৬ বছরে পা বাড়ায় নীলা। বুঝতে চায় না কী আসল কী নকল, শুধু ভাবে জীবন তো একটাই। সেভাবে জীবনের ভাবনাগুলো হতে পারে অনেক কিছু কিন্তু নীলা মনে করে সে শুধু নারী নয় সে মানুষ। শহরের লাল, নীল বাতি যেন রূপের পরিবর্তন করতে চায়। সেই পরিবর্তনের সূত্র ধরে দিলু ভাই (পাশের রুমের ভাড়াটে) ও ভাবীর সাথে ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে নীলাদের। নীলা চায় মুক্ত পাখির মতো উড়তে কিন্তু কখন যে কীভাবে উড়বে সেই হিসাব করতে চায় না। হিসাবের খাতা কখনো খোলে আবার যৌবনের কাছে আর নিজের চঞ্চলতার মাঝে এসে হার মানায়। সেই চঞ্চলতার মাঝে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখতে গিয়ে পরিচয় হয় আনিসের সাথে। দুজনের পরিচয় হয় দুষ্টামি আর চঞ্চলতার মাঝে। একে অন্যের সম্পর্কে কিছু তথ্য আবিষকার করে। সেই সূত্র ধরে চলতে গিয়ে হোঁচট খায়। এক হোঁচটে মাত্র এক মাসের মাথায় স্তব্ধ হয়ে যায় সবকিছু। শহরের রঙগুলোর মাঝে যেন নিজেদের পরিচয়গুলোকে হারাতে বসে। লেখাপড়া, কাজ-কর্ম সবকিছু যেন চলছে তার গতিতে। তার মাঝেও একটা নিঃসঙ্গ মনোভাব আসে নীলার ভেতরে। সামান্য কিছুদিনের চঞ্চলতা আর বয়সের বেড়াজালে বারবার মনে পড়ে যায় আনিসের কথা। কিন্তু আনিসের কোনো খবর সে পায় না।

মাঝে মাঝে মনে হয় এটা একটা দুষ্টামি আবার মনে হয় এটা একটা ভালোবাসা। তবে এ কেমন ভালোবাসা। প্রতিনিয়ত বাবা-মায়ের সাথে কথা বলতে আশ্রয় নেয় মিথ্যার। দিন দিন নীলা নিজেকে মিথ্যার মাঝে গুটিয়ে রাখে। এই শহর অনেক বড়। শহরের এখানে সে কখনোই খুঁজে পাবে না আনিসকে। ভুলতে চায় কিন্তু পারে না। হঠাৎ একদিন রাস্তা ক্রস করছে নীলা আর পেছন থেকে ডাক পড়ছে। কে যেন নীলা বলে ডাকছে। নিজেকে সামলিয়ে নেয়।   রাস্তার ওই পারে গিয়ে দেখে আনিস আসছে। আনন্দে আত্মহারা হতে পারত, তার পরও নিজেকে নিজের মাঝে ধরে রাখে নীলা। ভদ্রতা দেখায় ওরা একে অন্যকে। আনিসের অনুরোধে বাবার নাম্বার দেয় নীলা। আনিসও তার নাম্বার দেয়। প্রয়োজনীয় কিছু কাজ সেরে বাসায় আসে নীলা। মায়ের সামনে বসে সত্য আর মিথ্যার ঝুলি খুলতে থাকে। মা তার মেয়ের মনের সব আবেগ বুঝতে পারে। তবে অতীতের মিথ্যা কথাগুলোকে আবেগ দিয়ে ঢাকতে পারে না। মায়ের কাছে কোনো কিছুই লুকাতে চায় না।

মা জানে নীলা আনিসকে ভালোবাসে। তবে কে কাকে কতটুকু ভালোবাসে তা তারা নিজেরাও জানে না। আনিসকে খুঁজে পাওয়ার পর নীলা তার কল্পনা থেকে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়ায়। পারিবারিক ইচ্ছা আর আবেগ অনুভূতির জোরে এক বন্ধনে আবদ্ধ হয় ওরা। নীলা স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে, তার স্বপ্ন যেন ওকে পাশ কেটে হাঁটতে চায়। প্রতিদিন সকালে উঠে ভাবে আজ কীভাবে পার করবে দিনটাকে। কিন্তু ওর ভাবনার সাথে বাস্তব মিল খায় না। সারা দিনের পর গোধূলি লগ্নে ক্লান্ত হয়ে পড়ে নীলা। আবার অন্ধকার রাতের নিস্তব্ধতা তাকে জাগিয়ে তোলে। আর পূর্ব আকাশের নতুন সূর্যের পবিত্রতার মাঝে গড়তে থাকে নতুন স্বপ্ন। নীলার ভাবনা আজ না হয় কাল একদিন ওর স্বপ্নগুলো বাস্তবে রূপ নেবে। মাত্র বিয়ের দুই মাসের মাথায় একটা খবর তাকে অন্য রকম কিছু ইঙ্গিত করছে। নীলা মা হবে। ও বুঝতে পারে না তাকে কী করতে হবে। শুধু ভাবে তার কোলে একটা ফুটফুটে বাচ্চা আসবে। ১৮ বছরের নীলা বুঝতে পারে ও দিন দিন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। বাবা-মাকে জানানোর আগেই খবর যায় শ্বশুরবাড়ির মানুষের কাছে। ওদের কথা, এত সকাল সকাল বাচ্চা নেয়া যাবে না। নীলাকে একটা হোমিওপ্যাথি ওষুধ এনে দেয়া হয়। নীলা ওষুধ ফেলে পানি ঢুকিয়ে খায়। কিছুই হচ্ছে না। নীলাকে গ্রামের বাড়ি নিয়ে যাওয়ার হুকুম করা হয়। যুবতী নীলা এই কথা কাউকে বলতে পারে না।

শ্বশুরবাড়ির সবার কথামতো চলে যায় গ্রামের বাড়ি। যাওয়ার মুহূর্তে একমাত্র বোনকে বলে গেল কিন্তু বোন কোনো বাধা দিতে পারল না। গ্রামে নিয়ে ওরা বাচ্চাটা নষ্ট করে দেয়। পরপর ৩ দিন ওরা নীলার সাথে কশাইয়ের মতো কাজ করে। ক্রমেই নীলা অসুস্থ হয়ে পড়ে। মৃত্যু যেন ওকে ডাকে। তবে নিতে চায় না। ও কিছুই বলতে পারে না কাউকে। শুধু ভাবে আমার ভেতরের প্রাণটাকে কীভাবে ধ্বংস করল ওরা। প্রায় ১৫ দিন অসুস্থ থাকার পর আনিস ওকে শহরে নিয়ে আসে। শহরে এসে পুনরায় অসুস্থ হয় নীলা। অনবরত ব্লিডিং হচ্ছে। ক্রমে সাদা হতে থাকে তার অতি আপন শরীরটা। নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে নিজেই অবাক হচ্ছে। নিজেকে যেন অচেনা মনে হয়। এই সেই শরীর যে শরীরের মালিক ছিল ২ মাস আগে নীলার মা-বাবা। আজ মাত্র একটা বন্ধনের সূত্রে এই শরীরটার মালিকানা বদল হয়েছে। যে শরীরটাতে নীলার মা জমিয়েছে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত আজ সেই শরীর থেকে নির্গত হচ্ছে রক্তের স্রোত। মা-বাবা খবর পেয়ে ছুটে আসে নীলার পাশে। নির্বাক বোবা চোখে শুধু তাকিয়ে থাকে সন্তানের দিকে। যে মেয়েকে প্রতিদিন মা বলে ডাকত আজ তার কী হলো? যে শরীরটাকে প্রতি রাতে ঢেকে দিত তুলতুলে লেপ দিয়ে সেই শরীরটা আজ মাংসকে বিদায় দিয়ে হাড়ের সতূপ হয়ে গেছে। জামাতা বাবুর ডাক্তারি তৎপরতা দেখে মুগ্ধ হয়। নীলার মা-বাবা তবুও মানতে পারছে না পরিস্থিতিটাকে। কিছুদিন পর নীলা সুস্থ হয়। যান্ত্রিক জগতের সাথে চলতে থাকে ওদের সংসার, কখনো আনন্দ কখনো বেদনা। সব চলছে চলার গতিতে। সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি নীলার সাথী হয় ওর ছোট দেবর লিটু। লিটুর পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকে নীলা। নীলা পড়ালেখায় খুব একটা ভালো ছিল না। তারপরও কারিগরি শিক্ষা নিতে চাইলেও সেখানে বাধা আসে। সব স্বপ্ন দেখা বন্ধ হয়ে আসে।

দুই বছরের মাথায় নীলার কোলে সন্তান আসে। সন্তানকে পেয়ে ভালোই যাচ্ছে নীলার দিনগুলো। কখনো হাসি কখনো কান্না। যাই হোক না কেন সময় কারো জন্য বসে থাকে না। আনিস তার কর্মব্যস্ততার মাঝে ভুলেই যায় ঘরে তার স্ত্রী-সন্ত্রান রয়েছে। সন্তানের দেখভাল করা সব যেন একাই দায়িত্ব নিয়েছে নীলা। প্রথম সন্তান গর্ভে থাকার সময় একদিন সামান্য ব্যাপারে আনিস নীলার গায়ে হাত তোলে। কষ্ট পায় কিন্তু ভাবে এটা হয়তো আনিসের ভুলের কারণে হয়েছে, আনিস খুবই ধূমপান করত। তবে নীলা তা সহ্য করতে পারে না। সন্তানের জন্মের পর থেকে প্রায়ই নীলা ধূমপান করতে নিষেধ করে কিন্তু কোনো লাভ হয় না। একদিন রাতে আনিস ঘরে বসে সিগারেট খাওয়া নিয়ে ওদের মাঝে কথা কাটাকাটি হয়।

সকাল বেলায় ঘর থেকে বের হওয়ার সময় সন্তানকে আদর না করে বের হতে চাইলে নীলা বাধা দেয়। তখনই ক্ষিপ্ত আগ্নেয়গিরিতে রূপ ধারণ করে আনিস। ঘরে ছিল একমাত্র লিটু, লিটুর সামনেই আনিস চড়াও হয়। নীলার গায়ে হাত ওঠায়। এক পর্যায়ে খাটের লাঠি নিয়ে মারতে থাকে নির্ভেজাল এই ভালোবাসার দেহটাকে। মার খেতে খেতে মাটিতে না শহরের ইট বালুর মেঝেতেই লুটিয়ে পড়ে। তখনই বাধা দিতে আসে ছোট লিটু। কিছুই যেন করার ছিল না ১৩-১৪ বছর বয়সী লিটুর। ওরই সামনে নিষ্ঠুর অমানবিক কাজ করছে একই মায়ের গর্ভের আরেক সন্তান। মুখে কোনো কথা আসছে ওর। আনিস ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। আর নীলা তার ৬-৭ মাসের       সন্তানকে কোলে নিয়ে শূন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। আর মনের ভেতরের আমিত্বকে প্রশ্ন করে, কী হলো? কেন হলো? কোনো উত্তর নীলার কাছে আসে না। আজও নীলা ঘরে বসে ভাবছে এটা কি আনিসের ইচ্ছাকৃত কাজ নাকি এটাও ছিল ওর ভুল। না, ভুল আর ইচ্ছা কোনো হিসাব মেলাতে পারে না নীলা। ছোট লিটু তার রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে রাখে। ও আজ কীভাবে মুখ দেখাবে ওর ভাবীকে। আনিসের শরীরে যে রক্ত বয়ে চলছে লিটুরও। তবে কেন লিটুর মনে কষ্ট হচ্ছে, একই বাবার ঔরসজাত সন্তান হলেই নাকি তাদেরও রক্ত একই হয়, একই কথা বলে। তবে কি একদিন লিটুও তার বিবাহিত বা ভালোবাসার মানুষের সাথে এমন করবে।

সকাল গড়িয়ে দুপুর হলো, লিটু ঘর থেকে বের হয় না। তার ভেতরের মনুষ্যটা ওকে ঘর থেকে বের হতে দিচ্ছে না। ওর ছোট চোখ দুটো পৃথিবীর আলো দেখতে চায় না। কিন্তু কিছুই করার নেই। বড় ভাইকে কিছু বলতে পারে না। দুপুর হলেই নীলা নিজেই ডাক দেয় ওকে। খাবার খেতে বলে, ঘর থেকে বের হয়ে লিটু ভাবীর স্বাভাবিক আচরণ দেখে নিস্তব্ধ ঘুণপোকার মতো তাকিয়ে থাকে প্রকৃতির দিকে। ও চোখ তুলে তাকাতে পারে না নীলার দিকে। ও ভাবে নীলা কীভাবে স্বাভাবিক হলো। তবে কি একেই বলে নারী জাতি।

লিটু জন্মের পর থেকে দেখে আসছে খুব কাছের কয়জন নারীকে। ওর মনে পড়ে কয়েক নারী চরিত্রের কথা। ও দেখেছে কর্মক্ষেত্রে মায়ের যুদ্ধের কিছু স্মৃতি, ও দেখেছে তার বোনদের জীবনযুদ্ধের সাথে সংগ্রাম করার স্মৃতি। কিন্তু আজ ও দেখছে ভালোবাসার সংসারের আবদ্ধতার মাঝে লুটিয়ে পড়া এক নারীর জীবন। লিটুর মনে প্রশ্ন আসে, তাহলে কি আমাদের সমাজের নারীদের চরিত্রগুলো এমনই। সেই ১১ বছর বয়সে লিটু পড়েছে ‘চরিত্র মানব জীবনের অমূল্য সম্পদ’ আজ কোন মূল্যে মূল্য দিচ্ছে এভাবে সমাজের নারীরা। তবে কি ওরা মানব নয়, শুধুই নারী?

নাকি এরই নাম নারীর ভালোবাসা। কিন্তু লিটু জানে নীলা ও আনিস দুজন দুজনকে ভালোবেসে বিয়ে করেছে। আস্তে আস্তে সব স্বাভাবিক হয়। রাতে বাসায় আসে আনিস, ভাব দেখে মনে হলো কিছুই যেন হয়নি কোথাও। এভাবে চলতে থাকল নীলার ভালোবাসার সংসার। চলাটা কোথাও যেন থামে না। থামতে চায় না, ১২ ঘণ্টা আর তিনটি কাঁটার ঘড়িটা যেভাবে চলছে নীলার সংসারও সেভাবে চলছে। প্রথম সন্তান বড় হচ্ছে, ওরা ভাবছে তাদের আরেকটা সন্তানের প্রয়োজন আছে, তবে এখন না আরো কিছু দিন পর। এরই মধ্যে মেয়েদের প্রতি মাসের প্রাকৃতিক নিয়মের কিছু ব্যাঘাত ঘটল, নীলা আনিসকে বলছে হয়তো সে আবার মা হবে। তখনই আনিসের একটা কথা নীলাকে পৃথিবীর সব বিশ্বাসের জায়গা থেকে সরিয়ে দিয়েছে। নীলার মুখের কথা শুনে ভালোবাসার স্বামী বলছে, এই সন্তান আমার না। তখনই নীলা বলে, তার মানে তুমি কী বলতে চাও। একটা নারীর পেটে কখন সন্তান আসে তুমি কি তা জান? তুমি আমাকে কতটুকু বিশ্বাস কর তার আর প্রমাণ চাই না। তবে আমি বুঝে গেছি আমার ভবিষ্যৎ কী হবে।

সৃষ্টিকর্তা তো আর কারো একা থাকে না। প্রকৃতির নিয়ম একটু বদল হতে পারে তবে সত্যের জয় থাকে চিরকাল। হায়রে সোনার সংসার তুমি কি শুধুই মানুষের বসতভিটা নাকি ভালোবাসার ভাঙা বাসা। নীলার কোলে দ্বিতীয় সন্তান আসে। নীলার ভাবনা ভুল না হলে এখন হয়তো আনিস ভাবছে একটা নারী ২ সন্তানের মা হয়েছে, দুঃখিত কাঙ্ক্ষিত আর অনাকাঙ্ক্ষিত মোট ৪ সন্তানের মা আমাদের নীলা। তার মাঝে আর কী থাকতে পারে। যা দিয়ে আনিস সাহেবের শারীরিক চাহিদা মেটাতে পারবে। আনিসের ২-১টা কাজের ব্যাপারে নীলা ওকে সন্দেহ করে কিন্তু এটা ভুল হয় না। আনিস দিন দিন কেমন জানি বদলে যেতে থাকে। ওর বদল হয়ে যাওয়াটা টের পায় নীলা। প্রায়ই বাসায় ফিরে মানসিকভাবে চাপে রাখে নীলাকে। নীলা কোনো প্রতিবাদ করতে পারে না। কারণ এই নীলার নিজের কোনো মেরুদণ্ড নেই। ওর মেরুদণ্ডে কোনো শক্তি নেই। মাঝেমধ্যে দুই একটা কথা বলতে চাইলে গায়ে হাত তোলে আনিস। পরিবেশটা তখন এমনই হয় প্রথমে দুজনের কথা কাটাকাটি পরে নীলার গায়ে হাত। আর নীলা ঘরে বসে বসে ওর নির্যাতন সহ্য করছে। নীলার বিছানা ছেড়ে আনিস অন্য রুমে যায়। কিন্তু মেরুদণ্ডহীন নীলা কাছে পেতে চায় আনিসকে। বিড়ালের মতো ছুটে যায় স্বামীর বিছানায় আর পথের কুকুরগুলোর মতো প্রতি রাতে লাথি খায় আনিসের।

বিবাহিত আনিসের ভাষা ‘আমার কাছে আসছ কেন রাস্তার পুরুষদের কাছে যাও’। কিন্তু নীলা তা পারে না। নীলার জীবনে পুরুষ বলতে একটাই ছিল সে হলো ভালোবাসার আর বন্ধনের আনিস। স্বামীর কটু কথা শুনে ফিরে আসে সন্তানদের কাছে। কত রাত কাটিয়েছে সন্তানকে বুকে নিয়ে, খোলা আকাশ দেখে। দূরের ওই আকাশটা নীলার সঙ্গী। মাঝেমধ্যে মেরুদণ্ডহীন নীলার মনে আসে যে চাহিদাটা মেটাতে শুধু একজন স্ত্রী স্বামীর প্রয়োজন আর স্বামীর স্ত্রীকে প্রয়োজন হয় তা আনিস কোথায় পাবে, এই ভেবেও কয়েক দিন গিয়েছে স্বামীর পাশে। তবে পৃথিবীর নিকৃষ্টতম প্রাণীর মতো ধিক্কার খেয়ে ফিরে আসে আমাদের নীলা। এরপর আস্তে আস্তে রক্ত আর মাংসের নীলা নীল পাথরে রূপ নেয়। দায়িত্ব আর যৌবন আবেগ ইমোশনালের সব স্মৃতি ভুলতে থাকে। তবে দায়িত্ব আর কর্তব্য যেন ওর চারপাশ ঘিরে ধরে-সন্তানের দায়িত্ব স্বামীর দায়িত্ব মা-বাবা, ভাই-বোন সমাজের সব দায়িত্ব পালন করতে চায় নীলা, কিন্তু নীলার প্রতি থাকে না কারো কোনো দায়িত্ব। নিজের জীবনের চাহিদাগুলোকে গলা টিপে হত্যা করেছে নীলা। সারাদিনের দায়িত্ব সেরে যখন রাত গভীর হয় আর জীবনের চাহিদাগুলো ওকে কুরে কুরে খায়, হায়রে মেরুদণ্ডহীন নারীরা তোমরা কতকাল নিজের চাহিদাগুলোকে মাটিচাপা দেবে আর অন্যের ক্ষণিকের সুধা পান করাবে। এভাবে কাটতে থাকে নীলার দিনরাত।

এখন আর স্বামীর বিছানায় যাওয়ার কথা ভাবে না, ভাবতে পারে না কিন্তু এও যে সহ্য হয় না আনিসের। মানসিক শারীরিক আর নীল পাথরের প্রায় ৩-৪ বছর পার হয়ে যায় নীলার জীবন থেকে। (ক্ষমা চাচ্ছি আমার পাঠক বন্ধুদের কাছ থেকে, এই লেখার এই পর্যন্ত আসার ঠিক সময়ে নীলার ফোন। নীলার ফোনের কথাটা না লিখে পারলাম না, নীলা বলছে, ‘আনিসের চারিত্রিক কিছু সমস্যা আছে আমি জানি তবে আজকের কথাটা তোমাকে না জানিয়ে পারলাম না। আনিস এতটাই নষ্ট হয়ে গেছে আমি ভাবতে পারি না। মাত্র কয়েক দিনের মাঝে এক রাতে আনিস আমার বাসার কাজের মানুষটির শরীর সপর্শ করে এবং কাজের মহিলাটি সকালে সব আমায় বলে, তুই বল এখন আমি কী করতে পারি। বলতে বলতে হাউমাউ করে কাঁদে নীলা।

আমাদের সমাজের এক লোক যার ঘরে মা বোন বিবাহিত স্ত্রী আর কন্যাসন্তান আছে সে তার ঘরের কাজের মেয়েকে খারাপ নজরে দেখছে। আজ আমার একটা প্রশ্নের জবাব কে দেবে? আমরা নারীরা আমাদের  একটা শান্তির আশ্রয় কোথায় খুঁজে পাব। কে দেবে আনিসের মা বোন স্ত্রী আর কন্যাসন্তানের আশ্রয়। নাকি ওরা সারা জীবন অন্যের গুপ্তধনের মতো গোপনেই চোখের পানি দিয়ে বালিশ ভিজিয়ে যাবে)। এরই মাঝে আনিস মাঝে-মধ্যে নীলাকে তার বিছানায় ডাকে কিন্তু নীলা যেতে চায় না। নীলা বলে তুমি আমার বিছানা ছেড়ে ভালো থাকার জন্য আলাদা হয়েছ, তাই থাক। আমার আবেগ অনুভূতির কোনো প্রয়োজন নেই। আনিসের পাশে ঘুমানোর অনীহা দেখায় তখনই বেরিয়ে আসে একটা কথা, আনিস বলছে ‘তুমি কেন অনীহা দেখাও তা হলে কি তুমি বাইরে তোমার চাহিদা মিটিয়ে আস’। নীলার যে শরীরটা মাংসের না একটা পাথরের সেই শরীরের চাহিদা আবার কাকে বলে। এই নিয়ে শুরু হয় আবার ওদের মাঝে অশান্তি। দন্তহীন নীলা কোনো আশ্রয় খুঁজে পায় না। কিসের আশ্রয় খুঁজবে নীলা? কার কাছে খুঁজবে? মা-বাবা-সন্তানের ভালোবাসার মূল্য দিয়েছে আজ নীলা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। মা-বাবাকে কিছুই বলছে না, দিনের ব্যস্ততা আর রাতের হট ড্রিংস (চোখের পানি) এর মাঝে হারায় জীবনের আনন্দ-বেদনার সব স্মৃতিকে। এখন সে পারে না সামান্য কিছু মুহূর্তের জন্য স্বামীর প্রিয় মানুষ হতে। নীলার সন্তানরাই ওর প্রিয়।

এক রাতে নীলা তার সন্তানকে ছোটবেলার খুব আদরের ছোট পাখির গল্প শোনায়। গ্রামের বাড়িতে দুপুর বেলায় ছোট পেয়ারা গাছে এসে টিকটিক করত এক ছোট পাখি। পাখিটি যখনি পেয়ারা গাছে আসত নীলা আনমনে ওই পাখির সাথে উড়ে বেড়াত। সকাল বেলায় জানালার পাশে বসে গল্পের বই পড়ছে হঠাৎ ওর কানে সেই আওয়াজ। পেছন ফিরে আমগাছের দিকে তাকাতেই দেখতে পায় ছোট সেই পাখি, নীলা সন্তানদের ডাক দেয় আর পাখিকে দেখায়। এখন প্রায়ই নীলা ওই পাখিকে দেখতে পায়। নীলার জীবনের অতীতের প্রিয় পাখি ফিরে এসেছে কিন্তু বাস্তবে ওর ভালোবাসা ফিরে আসে না। জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত পার করে নীলা আজ বুঝতে পারে কল্পনা আর বাস্তবের মাঝে অনেক ব্যবধান। আপনজনেরা ওকে বলে স্বপ্নবিলাসী কল্পনাবিলাসী। কিন্তু নীলা জানে তার বাস্তবতা, একদিন ওর সন্তানরা বড় হবে, শিক্ষিত পরে আগে মানুষের মতো মানুষ হবে। এই শিক্ষিত সমাজের অনেক চরিত্র দেখেছে কিন্তু শিক্ষার চেয়ে মানুষের মতো মানুষের বড় অভাব দেখতে পায়। ভালোবাসার প্রতি নীলার একটা দুর্বলতা ছিল। সেই ভালোবাসা আজ নীলাকে ভাঙা বাসায় এনে দাঁড় করেছিল। সমাজের মাঝে ভালোবাসা আছে তবে এই পরিবারগুলোর মাঝে নেই ভালোবাসার ছোঁয়া, আছে শুধু নির্যাতন। নীলা এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে, এখন ওর শক্তি আছে সাহস আছে। কিন্তু মাতৃত্বের কাছে হার মেনে আজও বসে আছে আনিসের ঘরে। নীলার বিরোধিতা হয়তো সমাজের চোখ খুলে দেবে। তবে এই বিরোধিতার  কারণে সন্তানদের হারাতে পারবে না। প্রতিনিয়ত অশান্তির মাঝে নিজেকে একবার মানুষ ভাবতে চায়। আনিসের মা আসে ওদের বাসায়। কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে বিধবা মা (আনিসের মা) নীলাকে বলে ‘আজ রাতের মাঝে তুমি আমার ছেলেকে বিয়ের অনুমতি দিতে হবে।’ কথার মাঝে শুরু হয় হাতাহাতি, নীলাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় আনিস। নীলা পড়ে গিয়ে রানের মাঝে ব্যথা পায়। ৪-৫ দিন পর নীলা আনিসকে দেখিয়ে বলে, ‘আজ এই মুহূর্তে তোমায় আমি জেলের ভাত খাওয়াতে পারি, কিন্তু খাওয়াব না, তোমার সন্তানকে মানুষ করার জন্য টাকা প্রয়োজন, শুধুমাত্র টাকার জন্য আজও আমি তোমায় জেলের ভাত না খাইয়ে আমার হাতের রান্না করা ভাত খাওয়াচ্ছি।’ আমাদের সমাজের নীলারা আজও ভাত রাঁধে আর ধোঁয়ায় চোখ মোছে।