Skip to main content

মানসিক চাপ

অধ্যাপক ডা. এ কে এম নাজিমুদ্দৌলা চৌধুরী

আমরা সবাই মানসিক চাপ নিয়ে কথা বলি কিন্তু আমরা জানি না, এটা আসলে কী? এর কারণ মানসিক ভালো বা খারাপ অবস্থা দুদিক থেকেই আসে, যা আমাদের চারপাশে ঘটে থাকে। যদি আমরা কোনো মানসিক চাপ অনুভব না করতাম তবে আমরা জীবিত থাকতাম না। মানসিক চাপ একটি সমস্যায় পরিণত হয় তখনই যখন আমাদের কাছে এটি সমাধানের কোনো উপায় থাকবে না। দুশ্চিন্তা এসে এর সাথে যোগ হয় এবং আমরা মানসিক চাপগ্রস্ত হই। তাই এটা গুরুত্বপূর্ণ যে যখন মানসিক চাপ আসে তাকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।

আমরা আমাদের চারপাশের ঘটনায় কিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাই এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। নিজেকে বোঝার মাধ্যমে এবং মানসিক চাপের সময় আমাদের আচরণ কী হয় তাই সাহায্য করে আপনাকে আপনার মানসিক চাপ কমাতে। সবচেয়ে প্রথমে লক্ষ করতে হবে কোন বিষয় তার ওপর বেশি প্রভাব বিস্তার করে। যেমন-গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যেমন বিয়ে বিচ্ছেদ, চাকরি হারানো বা পরিবর্তন করা, বাসা বদল করা, প্রিয়জনের মৃত্যুসংবাদ ইত্যাদি। দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তা, বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা, আর্থিক সমস্যা, অনেক দিন ধরে চলতে থাকা অসুস্থতা।

ট্রাফিক জ্যাম, দুর্ব্যবহার অথবা কিছু যন্ত্র যা আপনার দরকার। যখন আপনি কোনো ঘটনা নিয়ে মানসিক চাপ অনুভব করেন আপনার দেহ কিছু পরিবর্তনের সমমুখীন হয়। একেই বলে মানসিক চাপের প্রতিধ্বনি। এখানে মানসিক চাপের তিনটি ধাপ দেয়া আছে-

১. কাজে পরিণত শক্তি
প্রথমে আপনার দেহ থেকে অ্যাড্রেনালিন ক্ষরণ হবে, আপনার হার্টবিট বাড়বে, শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হবে, খারাপ এবং ভালো দুটি ঘটনাই এ অনুভূতি জাগ্রত করতে পারে। যেমন বিয়ের পূর্ব রাত্রি অথবা যেদিন আপনি চাকরি হারালেন।

২. ক্ষয়প্রাপ্ত শক্তি
আপনি প্রথম ধাপ থেকে পালাতে পারবেন না, আপনার দেহ নির্গত করবে শর্করা এবং চর্বি। এ সময় আপনি চালিত হবেন, চাপগ্রস্ত হবেন এবং ক্লান্তবোধ করবেন। আপনি বেশি কফি পান করতে পারেন, ধূমপান বেশি করতে পারেন, অ্যালকোহল পান করতে পারেন যা আপনার শরীরের জন্য ক্ষতিকর। এ সময় আপনি স্বাভাবিক না থাকলে আপনার দুশ্চিন্তা, স্মৃতিশক্তি হারানো, ঠাণ্ডা লাগা, ফ্লু হওয়া বেড়ে যেতে পারে।

৩. অন্য রোগের উপসর্গ দেখা দেয়া
আপনি যদি সমস্যার সমাধান করতে না পারেন তবে আপনার দেহের শক্তি কমে যাবে। কেননা আপনার দেহ শক্তি উৎপাদনে অক্ষম এবং আপনি স্থায়ী মানসিক চাপগ্রস্ত লোকে পরিণত হবেন। এ সময় আপনার ঘুম কমে যাবে, বিচারে ভুল হবে, ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন হবে, অনেক রোগাক্রান্ত হতে পারেন আপনি যেমন হার্টের অসুখ, আলসার, মানসিক অসুখ ইত্যাদি।

মানসিক চাপ সামলে ওঠার উপায়
আমরা মানসিক চাপ কমানোর সঠিক পদ্ধতি জানি না। তাই আমাদের পিছু ছাড়ে না এই মানসিক চাপ। এখানে দীর্ঘস্থায়ী ও ক্ষণস্থায়ী মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি দেয়া হলো-

আপনার সমস্যা চিহ্নিত করতে হবে
যদি আপনার চাকরি, কারো সাথে সম্পর্ক, আর্থিক চিন্তা আপনাকে মানসিকভাবে চাপে রাখে এবং অপ্রয়োজনীয় সমস্যা গভীর হয়ে যায় তবে আপনাকে নির্দিষ্ট করতে হবে কোন সমস্যাটি আপনাকে ভাবাচ্ছে।

আপনার সমস্যা সমাধান করুন
সমাধান সম্পর্কে ভাবতে শুরু করুন। আপনি কী করতে পারেন এবং এর ফলাফল কী হবে? কম চাপসম্পন্ন চাকরি করা কি আপনার জন্য উচিত হবে? আপনার কি বিবাহসংক্রান্ত কথা বলা প্রয়োজন? আপনার কি উচিত টাকা সঞ্চয় নিয়ে আলোচনা করা? আপনি যদি কিছু না করেন তবে কী হবে? আপনি যদি এই পদ্ধতি অবলম্বন করেন আপনার মানসিক চাপ কিছু কমবে। এই দীর্ঘস্থায়ী পদ্ধতি আপনার নয় সবার প্রয়োজন হতে পারে আগে কিংবা পরে।

আপনার সমস্যা নিয়ে আলোচনা করুন
আপনি যদি আপনার সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন এটা আপনার জন্য সহায়ক হতে পারে। পরিবার এবং বন্ধুরা আপনার সমস্যা নাও বুঝতে পারে। এক সময় তারাও বুঝবে। তারা আপনার জন্য সহায়ক হবে দুইভাবে। প্রথমত আপনার সমস্যাকাতর অনুভূতি শুনে, দ্বিতীয়ত আপনার সমস্যার সমাধান দিয়ে। যদি আপনার পরিবার ও বন্ধুরা বুঝতে না পারে তবে আপনি সাহায্য নিতে পারেন আপনার পারিবারিক চিকিৎসকের কাছে, যিনি আপনাকে মানসিক ডাক্তারের কাছে পাঠাবেন প্রয়োজন হলে।

মানসিক চাপকে নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল শিখুন
মানসিক চাপ কাটিয়ে ওঠার জন্য সহায়ক হিসেবে অনেক বই, সিনেমা, ভিডিও এবং কোর্স রয়েছে। অনেক আলোচক আছেন যারা মানসিক চাপ নিয়ে আলোচনা করেন, আপনার পারিবারিক ডাক্তারকে বলুন আপনাকে কোনো মানসিক চাপসংশ্লিষ্ট ডাক্তারের কাছে হস্তান্তর করতে। সেখানে চাপ নিয়ন্ত্রণ অনেক উৎস রয়েছে যা আপনাকে সাহায্য করবে।

টেনশন কমান
শারীরিক কাজ মানসিক চাপ কমানোর এক মহৌষধ। হাঁটুন, খেলুন, বাগানে কাজ করুন, ঘর পরিষকার করুন, কিন্তু আরামদায়ক শারীরিক চর্চাও আপনার জন্য উপকারী হতে পারে। গভীরভাবে শ্বাস নিন এবং মুখ দিয়ে আস্তে আস্তে বাতাস ছাড়ুন। আরেকটি ব্যায়াম হচ্ছে দেহকে শক্ত করুন, আস্তে আস্তে শিথিলায়ন করুন। এই পদ্ধতি আপনার টেনশন কমানোর জন্য সহায়ক হবে। এতে আপনি মানসিক শান্তি পাবেন এবং সমস্যা সমাধান করতে সাহায্য করবে।

মনকে সমস্যা থেকে দূরে রাখুন
আপনি হয়তো সাময়িকভাবে আপনার মানসিক চাপ কমাতে পারবেন উপরোল্লিখিত পদ্ধতিতে। আপনার শখকে প্রাধান্য দিন, খেলুন, কাজ করেন তবে আপনি শান্তিপূর্ণ ছুটি কাটাতে পারবেন। যদি আপনি কিছু সময়ের জন্য মানসিক চাপ ভুলে থাকেন এবং এক সময় আপনার সমস্যা সমাধানে এক ধাপ এগিয়ে যাবেন।

মানসিক চাপ প্রতিরোধক
আপনি হয়তো মানসিক চাপ কমাতে পারবেন, কিন্তু আপনি যদি চেষ্টা করেন মানসিক চাপকে প্রতিরোধ করতে তা আপনার জন্য আরো ভালো হবে। মানসিক চাপকে নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে তা প্রতিরোধ করা।

কিছু পদ্ধতি দেয়া হলো

  • সিদ্ধান্ত নিন। সেটাকে দুশ্চিন্তা এবং মানসিক চাপের উৎস হতে দেবেন না।
  • কাজ ফেলে রাখার চিন্তা বাদ দিন। একটি সাপ্তাহিক রুটিন করুন, এর মধ্যে অবসরের সময় কাটানো এবং শারীরিক কাজের সুযোগ রাখুন।
  • প্রতিনিধি নির্বাচন করুন। সব কাজ নিজের জন্য না রেখে কিছু কাজ প্রতিনিধিকে দিন।

মনে রাখবেন মানসিক চাপ ছাড়া জীবন অসম্ভব। আপনার লক্ষ্যকে এতটা জটিল করবেন না যা আপনার চাপকে তৃতীয় পর্যায়ে নিয়ে আপনার শক্তিকে নিঃশেষ করে দেবে। যত দিন আপনি এই পন্থা চালিয়ে যেতে পারবেন তত দিন আপনি দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের শিকার হবেন না।