ইস, যদি বিদেশে পড়তে পারতাম! আশপাশে কান পাতলে এ রকম কথা প্রায়ই শোনা যায়। আমেরিকায় পড়তে যাওয়ার ইচ্ছা আছে অনেকেরই। স্যাট, টোয়েফল, জিআরই, জিম্যাট পরীক্ষা দেয়ার প্রয়োজনটা তখনই আসে। আমেরিকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির একটি অংশ এ পরীক্ষাগুলো।
স্যাট
স্কলাসটিক অ্যাপটিচ্যুড টেস্ট এবং স্কলাসটিক অ্যাসেসমেন্ট টেস্ট সংক্ষেপে পরিচিত স্যাট নামে। আমেরিকার কলেজগুলোতে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্ডারগ্রাজুয়েট পর্যায়ে ভর্তি হওয়ার জন্য স্যাট স্কোর থাকা প্রয়োজন। আমেরিকার অলাভজনক প্রতিষ্ঠান কলেজ বোর্ড স্যাটের সব বিষয় পর্যবেক্ষণ করে। ১৯০১ সাল থেকে চলে আসা এ পরীক্ষার নাম ও পরীক্ষার পদ্ধতি বেশ কয়েকবারই পরিবর্তন হয়েছে। ২০০৫ সাল থেকে পরিবর্তিত নিয়ম অনুযায়ী স্যাট পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সময় তিন ঘণ্টা ৪৫ মিনিট। ঢাকায় আমেরিকান সেন্টারের স্টুডেন্ট অ্যাডভাইজার আরেফিন জাহান বলেন, ‘বিদেশে প্রচুর বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যেগুলো অর্থনৈতিকভাবে ছাত্রদের সহায়তা করে থাকে। এ সহায়তাটুকু যেকোনো ছাত্র সহজেই পেতে পারে। তার জন্য তাকে স্যাট-১-এর পাশাপাশ স্যাট-২ পরীক্ষাটি দিতে হবে।’
পরীক্ষা পদ্ধতি
স্যাট-১ পরীক্ষায় মোট তিনটি অংশ আছে। পড়া, গণিত ও লেখা।
ক্রিটিক্যাল রিডিং
এর পরীক্ষা নেয়া হয় মৌখিকভাবে। তিনটি বিভাগে রিডিংয়ের পরীক্ষাগুলো নেয়া হয়। এর মধ্যে ২৫ মিনিট করে দুটো বিভাগ এবং একটি বিভাগের জন্য ২০ মিনিট সময়সীমা নির্ধারিত। বিভিন্ন ধরনের প্রশ্নগুলোর মধ্যে বাক্য সমাপ্তিকরণ, ছোট ও বড় প্যাসেজ সম্পর্কে প্রশ্ন থাকে। বাক্য সমাপ্তিকরণে সাধারণত ছাত্রদের শব্দজ্ঞান, বাক্য গঠন, বোঝার ক্ষমতা এবং সঠিক শব্দ দ্বারা বাক্য গঠনসম্পর্কিত প্রশ্নও থাকে। পরীক্ষায় দেয়া প্রশ্নগুলো পর্যায়ক্রমে সহজ থেকে কঠিন হতে থাকে।
গণিত
এ বিভাগটি পরিচিত ক্যালকুলেশন সেকশন নামে। তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে এটিকে। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাগের বেশির ভাগ অংশজুড়ে রয়েছে সঠিক উত্তর খুঁজে বের করার পদ্ধতি। এখানেও দুটো বিভাগ ২৫ মিনিট করে এবং তৃতীয় বিভাগের জন্য ২০ মিনিট সময় নির্ধারিত। পরীক্ষার্থীরা গণিত পরীক্ষার সময় গ্রাফিং ক্যালকুলেটর ব্যবহার করতে পারবেন।
লেখা
এ বিভাগে সঠিক উত্তর খুঁজে বের করা প্রশ্নগুলোর মধ্যে পাবেন শব্দ এবং প্যারাগ্রাফ উন্নতিকরণ প্রশ্ন। ভুল কিছু প্রশ্ন দেয়া থাকবে, যার ঠিক উত্তরটি দেয়ার মাধ্যমে আপনার সাধারণ জ্ঞানের ভান্ডার যাচাই করা হবে। এ ছাড়া ২৫ মিনিটের মধ্যে রচনা লিখতে হবে। সামাজিক এবং আপনার এত বছরের শিক্ষাজীবন থেকে অর্জিত অথবা দেখাশোনার অভিজ্ঞতা থেকেও রচনাগুলো লেখা যাবে। তবে লিখতে হবে অত্যন্ত দ্রুততর সঙ্গে। প্রতিটি রচনার জন্য ১-৬-এর ভেতর স্কোর দেয়া হবে। কোনো রচনা না লেখা হলে বিষয়বহির্ভূত রচনা, ইংরেজি ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় লেখা হলে এবং লেখা না হলে সেই রচনায় ০ স্কোর দেয়া হবে।
বছরের যে সময়ে স্যাট দেয়া যাবে
আমেরিকায় বছরের সাতটি সময়ে স্যাট পরীক্ষা দেয়ার সময় নির্ধারণ করা আছে। অক্টোবর, নভেম্বর, ডিসেম্বর, জানুয়ারি, মার্চ অথবা এপ্রিল, মে ও জুন। নভেম্বর, ডিসেম্বর, মে ও জুনের পরীক্ষা নেয়া হয় মাসের প্রথম শনিবারে। আমেরিকান সেন্টার থেকে জেনে নেয়া যাবে পরীক্ষার তারিখ।
টোয়েফল
বিদেশি ভাষা হিসেবে ইংরেজির পরীক্ষা হলো (ঞঙঊঊখ-ঞভপ ঞপঢ়য় সফ ঊষবলমঢ়ভ থঢ় থ ঋসড়পমবভ খথষবৎথবপ.) প্রাতিষ্ঠানিক ইংরেজি বোঝার ক্ষমতা এ পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করে নেয়া হয়। বিদেশে অবস্থানরত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হওয়ার অন্যতম প্রয়োজনীয় পন্থার একটি এই টোয়েফল পরীক্ষা। টোয়েফল পরীক্ষার ফলাফল দুই বছরের জন্য কার্যকর থাকে। কারণ, এরপরে একজন ব্যক্তির ইংরেজি বলা ও বোঝার ক্ষমতার পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এ কারণেই সদ্য টোয়েফল দেয়া ফলাফলকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে।
ইন্টারনেট পরীক্ষা
২০০৫ সাল থেকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে এ পরীক্ষা নেয়া হয়। চার ঘণ্টার পরীক্ষায় চারটি ভাগ থাকে। প্রয়োজনমতো নোট নেয়া যায়।
রিডিং
এ বিভাগে তিন থেকে পাঁচটি প্যাসেজ থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বই থেকে প্রশ্নগুলো নেয়া হতে পারে। শব্দজ্ঞান, বাক্য স্থাপনসহ বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। ইন্টারনেটে পরীক্ষায় নতুন সংযোজন হিসেবে টেবিলে তথ্য পূরণ অথবা সামারি পরিপূর্ণভাবে লেখার নির্দেশনা থাকে।
লিসেনিং
তিন থেকে পাঁচ মিনিটের ছয়টি প্যাসেজ থাকবে এ বিভাগে। দুজন ছাত্রের কথোপকথনসহ চারটি লেকচার অথবা আলোচনা থাকবে এখানে। মাত্র একবারই শোনার সুযোগ পাবে পরীক্ষার্থী। প্রতিটি কথোপকথনে পাঁচটি প্রশ্ন এবং প্রতিটি লেকচারে ছয়টি করে প্রশ্ন করা হবে। আসল ভাবসহ জরুরি তথ্য, আলোচনার ভেতরের চিন্তাধারা, যে ব্যক্তি কথা বলছিল তার কথা বলার কারণ, ভঙ্গি প্রভৃতি বোঝার ক্ষমতাই পর্যবেক্ষণ করা হবে লিসেনিংয়ে।
সিপকিং
এ বিভাগে ছয়টি কাজ সম্পন্ন করতে হবে। না থেমে কথা বলে যাওয়া এবং তাতে চিন্তাধারা পরিষকার ও যথাযথভাবে ব্যক্ত করতে হবে। ২০ মিনিটের পরীক্ষা হয় এ বিভাগে।
রাইটিং
৫৫ মিনিটের পরীক্ষা হয়। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো একটি বিষয়ের ওপর পড়তে হবে। সেই একই বিষয় আবার একজন বক্তার মাধ্যমেও শুনতে হবে। এর ওপর নির্ভর করেই একটি সামারি লিখতে হবে। এ ছাড়া নিজস্ব মতামত দিয়ে একটি বিষয়ের ওপর রচনা লিখতে হবে।
কাগজ-কলমে পরীক্ষা
ইন্টারনেট ছাড়া কাগজ-কলমেও পরীক্ষা নেয়া হয়। পরীক্ষার্থীকে আগেই অনলাইনে অথবা কাগজে-কলমে নিবন্ধন ফরম পূরণ করতে হবে। বছরের ছয়টি সময়ে নেয়া এ টোয়েফল পরীক্ষার সময় তিন ঘণ্টা।
লিসেনিং
তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে বিভাগটিকে। ছোট কথোপকথনের ওপর ভিত্তি করে ৩০টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে প্রথম ভাগটিতে। দ্বিতীয় ভাগে বড় কথোপকথনের ওপর ভিত্তি করে আটটি উত্তর লিখতে হবে। শেষ ভাগে ১২টি প্রশ্নের সমমুখীন হতে হবে লেকচার শুনে। ৩০-৪০ মিনিটের পরীক্ষা এটি।
স্ট্র্যাকচার অ্যান্ড রিটেন এক্সপ্রেশন-বাক্য সমাপ্তিকরণের ওপর ১৫টি এবং ভুল খুঁজে বের করার ওপর ২৫টি কাজ করতে হবে।
রিডিং কমপ্রিহেনশন
৫৫ মিনিটের মধ্যে ৫০টি প্রশ্নের দিতে হবে।
রাইটিং
২০০-৩০০ শব্দের একটি রচনা লিখতে হবে। সময় ৩০ মিনিট।
জি-ম্যাট, জিআরই
বিদেশে স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি করার ক্ষেত্রে জিআরই এবং জি-ম্যাট করতে হবে। পার্থক্য শুধু একটি। ব্যবসায় নীতিতে মেজর করার জন্য জি-ম্যাট করতে হয়। বাকি অন্য যেকোনো বিষয়ে পড়তে গেলে তাকে জিআরই করতে হবে।
স্কোর
স্যাট-১-এর স্কোর ২৪০০। স্যাট-২-এর স্কোর ২৪০০ এবং টোয়েফলের স্কোর ১২০। নির্ধারিত কোনো স্কোর নম্বর নেই আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে। একেক বিশ্ববিদ্যালয়ে একেক রকম স্কোর চায়।
প্রস্তুতি
স্যাট ও টোয়েফলের প্রস্তুতি নেয়ার আগে নির্ভুল তথ্য জেনে নেয়া দরকার। এ বিষয়ে আপনাকে সম্পূর্ণভাবে সহায়তা করবে আমেরিকান সেন্টার। বাংলাদেশে অবস্থিত আমেরিকার একমাত্র শিক্ষাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান। সদস্য ছাড়াও বাইরের যেকোনো ব্যক্তি এ সুবিধা পাবেন। তবে আপনাকে আগে থেকেই দেখা করার সময় ঠিক করে রাখতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ে গিয়ে দেখা করতে পারবেন। এখানে দুটি লাইব্রেরি আছে। লাইব্রেরিতে পড়া ছাড়াও এখান থেকে বই কিনতে পারবেন। জেনারেল আমেরিকান লাইব্রেরি থেকে বই এবং সিডি বাসায় নিয়ে আসা যাবে।
আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার অন্যতম মাধ্যম এই স্যাট এবং টোয়েফল। স্যাট এবং টোয়েফল দেয়ার জন্য দরকার বাড়তি প্রস্তুতি। এ ছাড়া স্যাট, টোয়েফল দেয়াসহ বাইরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া অনেকটা লম্বা সময়ের ব্যাপার। এ বিষয়ে আমেরিকান সেন্টারের স্টুডেন্ট অ্যাডভাইজার আরেফিন জাহান বলেন, ১২ থেকে ১৮ মাসের প্রস্তুতি হলো যথাযথ সময়। এ সময়টুকু দিতে না পারলে কম করে হলেও এক বছর সময় হাতে রাখতে হবে প্রস্তুতির জন্য। এ কারণে কলেজের প্রথম বর্ষ থেকেই এ প্রক্রিয়া শুরু করা উচিত। যাতে পরবর্তীতে কোনো সময়ের অপচয় না হয়।
বাড়িতে নিয়মিত ইংরেজি পড়া, লেখা ও শোনার বিষয়টি চর্চায় রাখতে হবে। আমেরিকান সেন্টারে সদস্যপদ লাভে মক টেস্ট দিতে পারবেন। আমেরিকান সেন্টার থেকে বুলেটিন সংগ্রহ করতে পারবেন। এ প্রতিষ্ঠান থেকে স্যাট ও টোয়েফল পরীক্ষা এবং নিবন্ধনের নির্দেশনাবলি পেয়ে যাবেন ঠিকই কিন্তু কাজগুলো আপনাকেই করতে হবে।
স্যাট পরীক্ষার জন্য ইংরেজি শব্দভান্ডার যথেষ্ট শক্তিশালী হওয়া চাই। এ জন্য প্রতিদিন নতুন শব্দ শেখা ও তা চর্চার অভ্যাস করতে হবে। গণিতে ভালো করতে হলেও অভ্যাসের কোনো বিকল্প নেই। নিজেকে তৈরি করার জন্য প্রতিদিন বাড়িতে একটি করে প্র্যাকটিস টেস্ট দিতে পারেন।
নিবন্ধন
স্যাট ও টোয়েফল, জিআরই, জি-ম্যাট পরীক্ষার ফরম এবং প্রাসঙ্গিক তথ্য পেতে হলে আমেরিকান সেন্টারে যোগাযোগ করতে হবে। দুভাবে নিবন্ধন করা যাবে। অনলাইন ও ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে। যাদের আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ড আছে তারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে নিবন্ধন করতে পারবেন। অন্যথায় যেসব ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের কাজ করে তাদের মাধ্যমে ব্যাংক ড্রাফট করে নিবন্ধন করতে হবে।
টোয়েফলের জন্য লাগবে ১৫০ ডলার। স্যাট-১-এর জন্য লাগবে ৭১ ডলার। স্যাট-২ -র খরচ নির্ভর করবে নির্বাচিত বিষয় সংখ্যার ওপর। একটি বিষয়ে ৫৫ ডলার, দুটি বিষয়ে ৬৪ ডলার এবং তিনটি বিষয়ের জন্য ৭৩ ডলার লাগবে। জিআরই-১৯০ ডলার এবং জি-ম্যাট-২৫০ ডলার।
অনলাইনে পরীক্ষার সাত দিন আগে নিবন্ধন করলেই হবে। টোয়েফল, স্যাট, জিআরই পরীক্ষার ক্ষেত্রে ব্যাংক ড্রাফট করে নিবন্ধন করতে চাইলে তা করতে হবে পরীক্ষার অন্তত চার সপ্তাহ আগে। তবে জি-ম্যাটের ক্ষেত্রে তিন সপ্তাহ আগে ব্যাংক ড্রাফট করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে নিবন্ধনের পর পরীক্ষার সময় যেন ছয় মাস পার হয়ে না যায়। আর পরীক্ষা দেয়ার জন্য অবশ্যই পাসপোর্ট থাকতে হবে।



