যারা আবেগীয় সুস্বাস্থ্যের অধিকারী তারা আবেগ এবং তাদের ব্যবহার দ্বারা পরিচালিত হয়। তারা জীবনের অসম্ভব চ্যালেঞ্জকে সম্ভব করতে পারে, আন্তরিক ও গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে, সুফলাফলে ও সাফল্যে পূর্ণ থাকে তাদের জীবন এবং তাদের জীবন ভরপুর থাকে উদ্দীপনায়। যখন খারাপ কিছু ঘটে তারা সেটাকে সামনে নিয়ে এগিয়ে চলে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো বেশির ভাগ এ ধরনের লোক বিপদে পড়লে তাদের এ ক্ষমতাকে কাজে লাগায়। কিন্তু এটি মানসিক, শারীরিক সুস্বাস্থ্যের সাথেও জড়িত। তাই শারীরিক সুস্বাস্থ্যের জন্যও আবেগীয় সুস্বাস্থ্যের প্রয়োজন। আপনি আপনার আবেগমূলক সুস্বাস্থ্যের জন্য যত সময় ব্যয় করবেন ততই তা দৃঢ় হবে। সমুখের কথা হলো আবেগীয় সুস্বাস্থ্যের উন্নয়নের জন্য অনেক পদ্ধতি রয়েছে। যেমন আপনি আপনার মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন, জীবন থেকে আরো আনন্দ পেতে পারবেন, আরো উদ্দীপ্ত হতে পারবেন।
মানসিক বা আবেগীয় স্বাস্থ্য কী?
আবেগীয় স্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্য মনের সুস্বাস্থ্যের পরিপূরক। এটা হচ্ছে নিজেকে অনুভব করার ক্ষমতা, সম্পর্কের উন্নয়ন করার ক্ষমতা, অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করে বাধাকে বা দুঃসময়কে অতিক্রম করার ক্ষমতা। মানসিক অসুস্থতার অনুপস্থিতিই শুধু ভালো মানসিক স্বাস্থ্য নয়। মানসিক সুস্বাস্থ্যের অধিকারী তারাই নয় যারা বিষণ্নতা, উদ্বেগ অথবা মানসিক রোগাক্রান্ত নয় বরং তারাই মানসিক সুস্বাস্থ্যর অধিকারী যারা মানসিকভাবে সুস্থ এবং ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যে ও চিন্তাধারায় ভরপুর।
যারা মানসিক এবং আবেগীয় দিক থেকে
সুস্থ তাদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে-
১. আনন্দের অনুভূতি রয়েছে
২. উদ্দীপকমূলক, হাসার, কৌতুককর অনুভূতি রয়েছে।
৩. মানসিক চাপ সামলানোর ক্ষমতা রয়েছে।
৪. তাদের কাজকর্ম ও সম্পর্কে উন্নতি ও উদ্দীপনার দক্ষতা রয়েছে।
৫. নতুন কিছু শেখা এবং পরিবর্তনমূলক দক্ষতা রয়েছে।
৬. কাজ এবং খেলার মধ্যে বিশ্রাম ও কাজের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে।
৭. নিজের সম্পর্কে দৃঢ় আত্মবিশ্বাস এবং উঁচু মনোভাব রয়েছে।
উপরোল্লিখিত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন লোক উন্নয়নমুলক, গঠনমূলক কাজকর্ম এবং গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। তারা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং মানসিক চাপের সময় স্থির থাকতে পারে।
মানসিক ও আবেগীয়
সুস্বাস্থ্যের জন্য আনন্দের ভূমিকা
মানসিক ও আবেগীয় সুস্বাস্থ্যের অধিকারী মানে এই নয় তারা কখনো খারাপ সময় অথবা মানসিক ও আবেগীয় খারাপ সময় অতিবাহিত করেনি। আমাদের সবাইকে হতাশা, লোকসান এবং পরিবর্তনের মধ্যে যেতে হয়। যখন এগুলো জীবনে স্বাভাবিক হয়ে যায় তখন ঘটে দুঃখজনকভাব, বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও মানসিক চাপ।
সাধারণ লোকের চেয়ে মানসিক সুস্বাস্থ্যের অধিকারী লোকের পার্থক্য হচ্ছে তারা দুর্যোগ, দুর্ভাবনা, মানসিক চাপ পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে পারে। ওই ক্ষমতাকেই বলা হয় উজ্জীবন বা উদ্দীপনা। এ ধরনের লোকে কঠিন সময় মোকাবেলার দক্ষতা রয়েছে এবং সর্বদা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। তারা সব সময় স্বকেন্দ্রীয়, উদ্বেগহীন সৃজনশীল থাকতে পারে সেটা ভালো অথবা খারাপ যে সময়ই হোক না কেন।
আবেগের ভারসাম্য রক্ষা করা তাদের চাবিকাঠি নিজের ক্ষমতার ওপর বিশ্বাস রাখা, আবেগের সঠিক বহিঃপ্রকাশ তাদেরকে বিষণ্নতা, উদ্বিগ্নতা এবং নেতিবাচক মনোভাব থেকে দূরে রাখে। আরেকটি চাবিকাঠি হচ্ছে তাদের খুব কঠিন সমর্থক রয়েছে যা তারা তাদের চরিত্র দ্বারা সৃষ্টি করেছে। কটিন ও জটিল সময়ে তাদের সমর্থন, বিশ্বাস, উৎসাহ এ ধরনের লোকদের সকল কষ্ট কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে।
আনন্দময় জীবন তৈরি
মানসিক চাপে ভরপুর জীবনের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনই হচ্ছে আনন্দময় জীবন। এটি বিভিন্ন উপায়ে ঘটে থাকে-
- জীবনকে শক্ত ও কঠিন আবেগীয় অনুভূতির মধ্যে দিয়ে যেতে দিন, বুঝতে চেষ্টা করুন যখন আপনার এ অনুভূতি কাজের জন্য ক্ষতিকারক হয়ে দাঁড়ায়।
- আগে বাড়ুন এবং কাজ করুন দৈনন্দিন জীবনের সাথে সামঞ্জস্য রাখুন এবং নিজেকে চাঙা করুন।
- প্রিয়জনের সাথে সময় ব্যয় করুন, তার উৎসাহ এবং সমর্থন আপনার প্রয়োজন।
- অন্যকে এবং নিজেকে বিশ্বাস করুন।
শারীরিক সুস্বাস্থ্য মানসিক এবং
আবেগীয় সুস্বাস্থ্যের সাথে সম্পর্কযুক্ত
দেহের যত্ন নেয়া মানসিক সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজন। মন এবং দেহ একে অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। যখন আপনি শারীরিক দিক থেকে ভালো থাকবেন তখন আপনার মানসিক স্বাস্থ্যও ভালো থাকবে। যেমন, যখন আপনি ব্যায়াম করবেন দেখবেন আপনি শারীরিক দিক থেকে ভালো থাকবেন এব্ং আপনার শরীরের অ্যানডোরফিন নির্গত হয় যা একটি শক্তিশালী রাসায়নিক পদার্থ যা আপনাকে উদ্দীপিত করবে এবং আপনার মনকে ভালো রাখবে।
বিশ্রাম করুন
মানসিক এবং আবেগীয় স্বাস্থ্য ভালো রাখতে আপনার শরীরের যত্ন নিন এবং পরিমিত ঘুমান। প্রতিটি মানুষের দৈনিক ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমানো উচিত।
পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করুন
অনেকেই পুষ্টিকর খাদ্যের অভ্যাস করেন না। কিন্তু যতই আপনি পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করবেন ততই সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হবেন।
মানসিক চাপ মুক্তির চেষ্টা করুন এবং মনকে কাজের প্রতি উদ্যোগী করে তুলুন
ব্যায়াম একটি শক্তিশালী ওষুধ মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা ও হতাশা কাটানোর জন্য। কাজের চেষ্টা করুন যেমন সিঁড়ি দিয়ে ওঠা, হাঁটতে বের হওয়া। প্রতিদিন ৩০ মিনিটের ব্যায়াম আপনাকে দেবে মানসিক ও শারীরিক সুস্বাস্থ্য।
নিয়মিত সূর্যের আলোর পরশ নিন
সূর্যের আলো আপনার মনকে ভালো করবে, তাই প্রতিদিন কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫ মিনিট সূর্যের আলো গায়ে মাখুন। এটা ব্যায়ামের সময় বাগান করার সময় অথবা সামাজিক কাজকর্ম করার সময় সূর্যের আলোর সংসপর্শে থাকতে পারেন। অ্যালকোহল, সিগারেট এবং অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় ওষুধ বর্জন করুন
নিজের যত্ন নেয়ার মাধ্যমে আবেগীয় এবং
মানসিক সুস্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটান
মানসিক এবং আবেগীয় সুস্বাস্থ্যের জন্য নিজের চাহিদা, অনুভূতির প্রতি যত্নশীল হোন। নেতিবাচক চিন্তা এবং মানসিক চাপও মাথায় আনবেন না। আপনার দায়িত্ব এবং আনন্দের সামঞ্জস্য রক্ষা করুন। যদি আপনি সুস্বাস্থ্যের প্রতি নজর দিন তাহলে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আপনি মনোবল পাবেন।
নিজের যত্ন নেয়ার উপায়
নিজের অনুভূতির প্রতি যত্নবান হোন ৫টি অনুভূতির মাধ্যমে শান্ত এবং উদ্দীপিত থাকুন-দৃষ্টি, শব্দ, সংসপর্শ, স্বাদ এবং গন্ধ। আপনার মন ভালো রাখতে গান শুনুন, ফুল দিয়ে সাজান এবং ঘ্রাণ নিন, হাত-পায়ের যত্ন নিন এবং ভালো পানীয় পান করুন।
গঠনমূলক, অর্থপূর্ণ এবং সৃজনশীল কাজে নিযুক্ত থাকুন
এমন কাজ করুন যা আপনার সৃজনশীলকে চ্যালেঞ্জ করবে এবং আপনাকেও কঠিন কাজকে সহজ করতে চেষ্টা করবে দীর্ঘস্থায়ী সুস্বাস্থ্য আপনার বুদ্ধিমত্তাকে বৃদ্ধি করবে। বুদ্ধিমত্তা অন্যের সাথে মিশতে, অন্যকে বুঝতে, সমস্যা সমাধানে সাহায্য করবে।
মানসিক এবং আবেগীয় সমস্যার ঝুঁকি
মানসিক ও আবেগীয় স্বাস্থ্য গড়ে ওঠে ছোট থেকে বড় হওয়ার মধ্যে যে ঘটনা ঘটে তার অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। শৈশবের স্মৃতি এতে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বংশগত এবং জৈবিক দিকও এতে ভূমিকা রাখে কিন্তু পরবর্তীতে অভিজ্ঞতার কারণে তা পরিবর্তন হতে পারে।
- প্রাথমিক লালন-পালনকারীর সাথে দুর্বল সমাজে এটা হচ্ছে-একাকিত্ববোধ করা, বিচ্ছিন্ন হওয়া, নিরাপত্তাহীনতা, গালমন্দের শিকার হওয়া।
- শৈশবে মারাত্মক ক্ষতি হওয়া-বাবা-মায়ের মৃত্যু, ভীতিজনক অভিজ্ঞতা, যুদ্ধ, হাসপাতালে থাকতে হওয়া ইত্যাদি।
- অসহায়বোধ করা- নেতিবাচক অভিজ্ঞতা যা অসহায়বোধের জন্ম দেয়া এবং আপনার জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনায় আপনার কোনো হাত বা নিয়ন্ত্রণ না থাকলে।
- অসুস্থতা-যখন এটি দীর্ঘস্থায়ী হয়, কর্মক্ষমতা কমায় এবং অন্যদের থেকে আলাদা করে।
- ওষুধের বিরূপতা-অনেক সময় ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।
- অন্য সমস্যা-অ্যালকোহল, ড্রাগ, মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে এবং পূর্বের সমস্যাকে আরো ঘনীভূত করে।
অন্তর্লীন এবং বাহ্যিকে কারণ যাই হোক কোমলতা ও মমতা এ কারণগুলোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ঢেকে দিতে পারে। শক্তিশালী পারিবারিক বন্ধন, একটি সুস্থ জীবনধারা, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে।
যখন আপনার পেশাগত সাহায্যেরপ্রয়োজন হয়
মানসিক সুস্বাস্থ্যের জন্য
যখন আপনি চেষ্টা করছেন ভালো মানসিক এবং আবেগীয় সুস্বাস্থ্যের জন্য কিন্তু আপনি ভালোবোধ করছেন না তখন প্রয়োজন পেশাগত সাহায্যের। পেশাগত সাহায্য আপনাকে সাহায্য করবে সেই কাজ করতে যেগুলো আপনি নিজে থেকে করতে পারছেন না।
আপনার অনুভূতি ও আচরণের
নিম্নমুখিতার কারণে সতর্ক সংকেত
- ঘুমাতে না পারা
- বেশির ভাগ সময় সাহায্যহীন অসহায় বোধ করা
- মনোযোগের সমস্যা
- ধূমপান করা, অতিরিক্ত খাওয়া, ড্রাগ নেয়া, অ্যালকোহল নেয়া, কঠিন সমস্যাকে ভুলে থাকার জন্য।
- নেতিবাচক বা আত্মধ্বংসকারী চিন্তা যা আপনি রোধ করতে পারছেন না।
- আত্মহত্যার চিন্তা।
যখন আপনি এ সমস্যার সমমুখীন হবেন তখন মানসিক রোগের ডাক্তারের পরামর্শ নিন যত দ্রুত সম্ভব। যতই সময় যাবে এ সমস্যা ততই বাড়তে থাকবে।



