এফসিপিএসএমআরসিপি এফআরসিপি
সেইলর (Sailor) নাবিক
বিপজ্জনক প্রকৃতির কাজের জন্য পৃথিবীর সর্বত্র সমুদ্র অভিযাত্রিক দলের মধ্যে রয়েছে সবচেয়ে বেশি কুসংস্কারাচ্ছন্ন লোকের সমাবেশ। পালতোলা জাহাজের সময় অনেক আগে অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পরও আজ পর্যন্ত সেই সমস্ত পুরনো বিশ্বাস বেঁচে আছে। সমুদ্র সব সময়েই তার ওপরে সময় যাপনকারী লোকদের কাছ থেকে গভীর শ্রদ্ধা কুড়িয়ে এসেছে। প্রায় সব নাবিকেরাই তাদের জাহাজ ধ্বংস হওয়ার বা জলডুবি হওয়ার হাত থেকে সুরক্ষিত থাকার নিশ্চয়তা বিধানের জন্য কুসংস্কারের ওপর নির্ভরশীল থাকত।
একটা নিরাপদ যাত্রার জন্য সতর্কতা গ্রহণ করা হতো নাবিকের গৃহত্যাগ করার পূর্ব থেকেই। তার মধ্যে থাকত স্বর্ণের তৈরি কানের দুল পরা এবং একটি কাউলকে সযত্নে রক্ষা করা। এই দুটোকেই ডলডুবির ভয়াবহতা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য শক্তিশালী জাদু বলে মনে করা হতো। উলকি অঙ্কন সহকারে শরীরকে সুন্দর করে সাজানো খুব জনপ্রিয়। কারণ বলা হয়ে থাকে এর দ্বারা শয়তানী অপশক্তি দূরীভূত হয় এবং সমুদ্র অভিযাত্রিকদের সংক্রামক যৌনব্যধির হাত থেকে রক্ষা করে।
এমন একটা সময় ছিল নাবিকদের মধ্যে বেত্রাঘাত করার শাস্তি প্রচলিত ছিল। তার হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য অনেক নাবিক তাদের পেছনে যীশুর ক্রুশ বিদ্ধ ছবির উলকি আঁকত। তাদের বিশ্বাস ছিল তার দ্বারা তাদের সাজা লঘুতর হবে। আরো মনে করা হতো যীশুখ্রিষ্টের প্রতিচ্ছবির কারণে বেত্রাঘাত পিছিয়ে যাবে। সৌভাগ্যের জন্য একজন স্ত্রীর বা প্রেমিকার যৌনাঙ্গ সপর্শ করায় ও নাবিকদের বেঁচে থাকার সুযোগ বাড়িয়ে দেয় বলে দাবি করা হতো। যাইহোক যদি সকাল বেলা জেগে উঠে কেউ তার পোড়া মাটির জলপাত্রটি উল্টো হয়ে পড়ে আছে দেখতে পায় সেটাকে একটি কুলক্ষণ বলে ধরে নেয়া যেতে পারে এবং নাবিকটি সেদিনের জন্য জাহাজে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে পারে।
সেন্ট মার্কস ডে (St Mark's Day) সেন্ট মার্ক দিবস
চার্চের ক্যালেন্ডারে যদিও ২৫ এপ্রিলকে একটি আদর্শ দিন বলে মনে করা হয় যে সময় ভবিষ্যতে ভাগ্যে কী আছে তা জানার জন্য চেষ্টা করা শুভ। বিশেষ করে একটি বালিকা তার ভবিষ্যৎ প্রেমিকের সম্বন্ধে কিছু জানতে চাইলে তাকে এই দিন দুপুরে বারেটার ঘণ্টা বাজার সাথে বারোটি সেজ ফুল গাছের পাতা ছিঁড়তে হবে। তাতে হয়তো সে তার ভবিষ্যৎ স্বামীর চেহারা দেখতে পারবে অথবা রক্ত মাংসের শরীর নিয়ে সে স্বয়ং উপস্থিত হয়ে যাবে। বিকল্পে বালিকাটি সান্ধ্যভোজের সময় একটা আলাদা টেবিল সাজিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করতে পারে তাতে তার ভবিষ্যৎ প্রেমক এসে সেই টেবিলে তাদের সাথে বসবে। আরো অতিরিক্ত একটা অমঙ্গলজনক কুসংস্কারে দাবি করে যে যদি সেন্ট মার্কস দিবসের প্রাক্কলে জ্বালানো আগুনের ছাইয়ের মধ্যে এমন একটা পায়ের চিহ্না পাওয়া যায় যা হুবহু তাদের নিজেদের পায়ের চিহ্নের সাথে মিলে যায় তবে ধরে নিতে হবে সেই লোকদের মৃত্যু আসন্ন প্রায়। একই ধরনের অস্বাভাবিক হচ্ছে এই প্রথাটি যাতে বলা হয় যদি কেউ গির্জার বারান্দায় সেন্ট মার্কস দিবসের মধ্যে রাত্রিত বসে অপেক্ষা করতে থাকে তবে সে ওইসব লোকের ছায়া দেখতে পাবে যারা এক যাজকের অধিকৃত অঞ্চলে আগামী বারো মাসের মধ্যে মারা যাবে।
সেন্ট মার্টিনস ডে (St Martin's Day) সেন্ট মার্টিনস ডে
গির্জার দিনপঞ্জীতে ১১ নভেম্বরকে বছরের একটা অত্যন্ত অশুভ দিন বলে বিবেচনা করা হয়। আয়ারল্যান্ডবাসীরা এই দিনটির ওপর কিছুটা গুরুত্ব প্রদান করে বলে যে, এই দিনটিতে শস্য গুঁড়ো করার জন্য মিলমালিকদের এবং নারীদের জন্য কোনো চরকা ঘুরানো কাজ করা অত্যন্ত অশুভ। আর একটি কিছুটা ভয়ানক আইরিশ প্রথায় দাবি করা হয় যে সেন্ট মার্টিন দিবসটিকে চিহ্নিত করে রাখার জন্য একটি মোরগ উৎসর্গ করে তার রক্ত ঘরের চারদিকে ও চারকোণায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিতে হবে। যদি একটি মোরগ জোগাড় করা সম্ভব না হয় তবে সেইভাবে রক্ত ছড়ানোর কাজটি ইচ্ছাকৃতভাবে একটি আঙুল কেটে করা যেতে পারে। আগের দিনে মিলমালিকরা একটা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই দিনে একটি মোরগ মেরে একইভাবে মিলমেশিনারীর ওপর ছিটিয়ে দিত, যাকে বলা হতো ‘ব্রুডিং দ্য মিল’ প্রথা। তার পর মনে করা হতো সেই মিল মালিকটি আগামী একটি বছরের মধ্যে কোনো দুর্ঘটনার সমমুখীন হবে না।
সেন্ট পলস দিবস (St Paul's Day) পলস দিবস
গির্জার দিনপঞ্জীতে ২৫ জানুয়ারি হচ্ছে বছরের পরবর্তী সময়ে কেমন শস্য কর্তন করা যাবে সে বিষয়ে বিশেষ ভবিষ্যদ্বাণী করার দিন। সেন্ট পলস দিনে যদি বৃষ্টি হয় তাহলে অবশ্যই খুব কম শস্য ফলন আশা করা যায়।
সেন্ট ভ্যালেনটাইনস ডে (St Valentine's Day) ভালোবাসা দিবস
গির্জার দিনপঞ্জীতে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ব্যাপকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয় লিপি আদান-প্রদান এবং প্রেমিকদের মধ্যে লাল গোলাপ ও অন্যান্য উপঢৌকন আদান-প্রদানের দিন হিসেবে। প্রথা অনুযায়ী প্রেরিত লিপিতে দস্তখত দেয়া হয় না, তার জন্য পত্রের প্রাপক সুন্দর কল্পনার মাধ্যমে অতিবাহিত করে প্রেরকের পরিচয় জানার চেষ্টা করে (প্রথম দিকে প্রেরকেরা নিজেরাই লিপিগুলো নিজেদের হাতে এঁকে চিত্র দ্বারা সাজাত)। সেন্ট ভ্যালেনটাইন দিবস হচ্ছে একটি শুভ দিন যখন ভবিষ্যৎ জীবন সঙ্গী বা সঙ্গিনী সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বানী করা যায়। একটি প্রথায় আছে যে, ওই দিন যদি কোনো বালিকা সকাল সকাল ঘর থেকে বের হয়ে প্রথমেই একটি পুরুষ লোকের সাক্ষাৎ পায় তবে তিন মাসের মধ্যেই তার বিয়ে হবে (অনেকটা সম্ভাবনা আছে সেই লোকটির সাথেই বিয়ে হওয়ার)। তার জীবনের ভালোবাসার মানুষটিকে পাওয়ার সম্ভাবনা অনেকটা বেড়ে যাবে সে যদি তার জামার বোতামের ছিদ্রে একটা হলুদ বাসন্তী ফুল পরিধান করে। তার ভবিষ্যৎ প্রেমিক সম্বন্ধে আরো তথ্য জানতে পারবে যদি সে লক্ষ্য করে যে কোন প্রজাতির পাখি সে সবার আগে প্রত্যক্ষ করেছে।
স্যামন (Salmon) স্যামন মাছ
স্কটল্যান্ডবাসীদের কুসংস্কার অনুযায়ী স্যামন অনেকগুলো অবস্থাতেই একটা অশুভ মাছ। এটাকে দিনের প্রথম শিকারে প্রাপ্তিকে একটা বিশেষ অমঙ্গল চিহ্ন বলে মনে করা হয় এবং তাদের অনেকেই স্যামন শব্দটিকে অমঙ্গলসূচক শব্দ বলে মনে করে যা কখনো সমুদ্রে বসে উচ্চারন করা যাবে না।
সল্ট (Salt) লবণ
প্রাণীর জীবন রক্ষাকারী হিসেবে এবং আদিম মানুষের দৃষ্টিতে খাদ্য সংরক্ষণের জন্য জাদুকরী গুণাগুন উপস্থিত থাকার কারণে শতাব্দিকাল ধরে লবণকে উচ্চমূল্য প্রদান করা হয়েছে। রোমের সৈন্য ও শ্রমিকদের প্রায়ই বেতন দেয়া হতো লবণ দ্বারা। এই প্রথাটি নিয়ে প্রকৃতপক্ষে কতগুলো কুসংস্কার অনেক আগে থেকেই চলে এসেছে যখন প্রায়ই দেবতাদের সন্তুষ্টির জন্য লবণ উৎসর্গ করা হতো প্রয়োজনীয় চুক্তি অনুমোদনের ও অন্যান্য সামাজিক লেনদেনকে পবিত্র করণের জন্যও লবণ ব্যবহার করা হতো। অ্যাজটেক জাতির লোকেরা লবণের দেবীকে নিয়ে গর্ব করতো আর খ্রিষ্ট ধর্মের অতীন্দ্রিয় প্রকৃতির কথা তুলে ধরেছে লটের স্ত্রীর গল্পটিতে, যখন তিনি সোডস-এর অভিশপ্ত নগরীর প্রতি পিছু ফিরে তাকিয়ে লবণের স্তম্ভে পরিণত হয়ে গিয়েছিলেন (সেই নগরটি মৃত সাগরের অতিতিক্ত লবণ জলের বন্যায় ভেসে গিয়েছিল)। কিছু কিছু খ্রিষ্টিয় বড় ধরনের অনুষ্ঠানের লবণ ব্যবহার করা হতো।
স্কারলেট ফিভার (Scarlet fever) হাম জ্বর
লোক ওষুধিতে হামজ্বর ভালো করার জন্য অনেকগুলো হার্বালের ঐন্দ্রজালিক গুণাগুণ সম্বন্ধে গর্ব করে থাকে। একটি প্রতিষেধক যা আইরিশরা এক সময়ে বেশি ব্যবহার করত, সেটাই বেশিরভাগ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আর তা হচ্ছে রোগীর মাথার একগাছি চুল নিয়ে একটা গাধাকে খাইয়ে দেয়া।
স্কুল (School) বিদ্যালয়
অনেকগুলো বিদ্যালয় তাদের নিজস্ব ভঙিতে কুসংস্কারের দাবি তুলে থাকে যা সহপাঠীদের মধ্যে বংশানুক্রমে বহু বছর থেকে চলে এসেছে। কিন্তু অন্যান্য প্রথাগুলো ব্যাপকভাবে একসাথে পালন করা হয়ে থাকে। আরো বেশি ব্যাপকভাবে যেসব ধারণাগুলোকে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়ে থাকে তা হচ্ছে এই যে স্কুলে যাওয়ার পথে মূল পাঠ্যপুস্তক হাত থেকে পড়ে যাওয়া অমঙ্গলজনক, কারণ সংশ্লিষ্ট ছাত্রটি দিনের পরবর্তী সব সময়ের জন্যই এইরূপ ভুল করতে থাকবে এবং একজন ছাত্র যদি দীর্ঘসময়ের জন্য একজন শিক্ষকের পেছনের দিকে তাকিয়ে থাকে তাহলে পরীক্ষার হলে তাকে আলাদা করে বের করে দেয়া হবে (এটা হচ্ছে এক সময়ের একটা সমমানিত বিশ্বাসের উদাহরণ যে, একজন শিক্ষকের পেছনের দুটো চোখ থাকে)। যেসব স্কুলে শারীরিক শাস্তি প্রদান করা হয় সেখানে ছাত্ররা এই ধারণার ওপর বিশ্বাস করে যে, পেঁয়াজের রস দিয়ে মালিশ করলে সেই মারের ব্যথা অনুভব হয় না।
সিজার্স (Scissors) কাঁচি
ধাতু দ্বারা তৈরি হওয়ার ও কাটার শক্তি থাকার কারণে কাঁচিকে কুসংস্কারে শক্তিশালী জিনিস হিসেবে গণ্য করা হয়। তাদের অত্যন্ত যত্নের সাথে ব্যবহার করতে হবে কারণ তাদের অব্যবহার ভাগ্যের জন্য বিপজ্জনক, অতি সহজেই ভাগ্য বিপর্যয় ঘটতে পারে। অতএব হাত থেকে একটা কাঁচি পড়ে যাওয়া অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয়, সেটা আরো খারাপ হবে যদি কাঁচিটা মেঝেতে পড়ে গেঁথে যায়, কারণ এর দ্বারা একটা মৃত্যুর আলামত বোঝা যায় (যদিও বিভিন্ন অঞ্চলে বিকল্প মনে করা হয়, যদি কাঁচির দুই মাথা মেঝেতে গেঁথে যায় তবে অতিশিগগিরই কারো বিয়ে হবে, আর যদি একমাথা গেঁথে যায় তবে একটা মরা লাশ ঘর থেকে বের হবে)।
সী (Sea) সমুদ্র
সব সময়েই সমুদ্র মানুষের ভয়ভীতিকে প্রভাবিত করেছে এবং আগের দিনে এটাকে সকল দোষের উৎপত্তিস্থল বলে বিবেচনা করা হতো। পূর্বের দৈনবানীর গ্রন্থে বর্ণনা করা হয়েছে যে সর্ববৃহৎ প্রাণীটি সমুদ্রের মধ্যে থেকে জেগে উঠেছে। পৃথিবীর মহা সমুদ্রগুলোকে আশ্রয় করে মানুষের চলাচল নিয়ে ভয়ভীতি ও সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে, যেগুলো অসংখ্য নিয়মনীতি ও কুসংস্কারের মাধ্যমে সমুদ্রের ওপরে চলাচল সম্বন্ধে প্রচলিত হয়েছে। যে সকল প্রাণী সমুদ্রে বাস করে এবং পাখি সমুদ্রের ওপর দিয়ে উড়ে চলে তাদের প্রায়ই সন্দেহের চোখে দেখা হয়, যদিও আলবাট্রাস ও হাঙরের মতো অশুভ প্রাণীদের সাথে সাক্ষাৎ লাভ করা, যেসব ক্ষেত্রে অমঙ্গলের হবে এমন কোনো কথা নেই। সমুদ্রের নিজস্ব কতগুলো উপকারী দিকও রয়েছে উদাহরণস্বরূপ প্রতিদিন সকালে এক চামচ করে লবণ পানি পান করলে ওয়েলসবাসীদের মতানুসারে সেই লোক দীর্ঘজীবন লাভ করতে পারে।



