ঘটনা-১
আলভির বয়স ১০ বছর। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। তৃতীয় শ্রেণীতে লেখাপড়া করে। হঠাৎ তার বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, বুকে চাপ, ব্যথার চোটে বাঁকা হয়ে যায়, মাঝে মাঝে দাঁত কপাটি লাগে। এই রকম অবস্থা দেখে কন্যাসন্তান আলভিকে নিয়ে প্রথমে ফার্মেসিতে গিয়ে ডাক্তার দেখায়, কাজ হয় না, পরে হার্টের ডাক্তার, মেডিসিন ডাক্তার দেখায় কাজ হয় না, হুজুর কবিরাজ কিছুই বাদ যায় না তার পরও সন্তোষজনক ফল না পেয়ে অবশেষে এক চিকিৎসকের পরামর্শে আলভিকে মনোজগত সেন্টারে প্রফেসর ডা. এ এইচ মোহামমদ ফিরোজ স্যারের নিকট উন্নত চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসে। রোগিনীর রোগের বিস্তারিত তথ্যাদি জানার পর ফিরোজ স্যার আলভিকে উন্নত চিকিৎসা গ্রহণের জন্য হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন। ভর্তির পর রাউন্ডে এসে স্যার অন্যান্য চিকিৎসার সাথে অ্যাব্রিয়েকশন থেরাপি সাজেস্ট করেন। অ্যাব্রিয়েকশন থেরাপি চলাকালীন রোগিনী তার মনের অব্যক্ত অনুভূতির কথা অকপটে বলে যেতে লাগল। ‘দশ বছর বয়স হলো বাপের আদর কী জিনিস জানি না, বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে বাবা-মায়ের ঝগড়া, মারামারি দেখে আসছি, বাপ একদিনও স্কুলে নেয়নি। কত দিন বলেছি, অন্যান্য বাচ্চার বাপ দিয়ে যায় নিয়ে আসে অথচ আমার বাপ আমার ছোট এই আব্দারটুকুও কোনো দিন রাখেনি। সারাদিন নেশা খেত, নেশার টাকা না পেলে সবাইকে মারধর করত, আমাকেও মারত। মাঝে মাঝে মনে হতো আমি এদের সন্তান নই, কোথাও থেকে আমাকে এরা কুড়িয়ে এনেছে। নিজের বাড়িতে থাকতে সব সময় ভয় লাগত। সেই জন্য আমি নানির বাড়ি থাকতে চাইতাম এবং থাকতামও। এরই মাঝে দাদি নেশা ছাড়ানোর জন্য বাবাকে জেলে পাঠিয়ে দেয়, যেটা আমার ভালো লাগেনি। বাবার জন্য কান্নাকাটি করলে আমাকে একেবারে নানির বাড়িতে পাঠিয়ে দেয় সেখানে পাশের বাড়ির এক আন্টি আমাকে খুব ভালোবেসে খেতে দেয়।
এরই মাঝে আন্টির ছেলে আমাকে চোখ মারে আর আন্টি আমাকে ভাতের মধ্যে ভালোবাসার কী যেন খাওয়ায়। এখন রোবিন ছাড়া আমার কিছু ভালো লাগে না, সব সময় তাকে দেখতে ইচ্ছা করে, তার কাছে থাকতে ইচ্ছা করে। এক নজর না দেখলে ভেতরটা যেন কেমন করে। কিছুই ভালো লাগে না, কিছু খেতে ইচ্ছা করে না, ঘুম হয় না, পড়তে ভালো লাগে না, স্কুলে যেতে ইচ্ছা করে না, কারো সাথে কথা বলতে ভালো লাগে না, কারো কথা সহ্য হয় না শুধু রোবিনের কথা শোনার জন্য তাকে এক নজর দেখার জন্য সারাক্ষণ অপেক্ষায় থাকি। যে জানালা দিয়ে রোবিনের বাসা দেখা যায় সারাক্ষণ শুধু সেই জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করে। রোবিনকে যদি দেখতে না পাই তখন খুব কষ্ট হয়। আবার দূর থেকে দেখলেও আমার কষ্ট হয় একটু কথা বলতে পারলাম না বলে। কষ্টের মাত্রা দিনকে দিন বাড়তে থাকলে একদিন আমি আমার এই কষ্টের কথা মাকে বলে রোবিনের সাথে আমার এনগেজমেন্ট করানোর কথা বলি। আমার এই কথা শুনে সেদিন মা আমাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে যে মারা মেরেছে এমন মার কোনো দিন কোনো সন্তান খায়নি কোনো দিন কোনো মাও সন্তানকে মারেনি। যখন মা আমাকে মারে তখন কেউ আমাকে রক্ষা করতে আসেনি, সেই মুহূর্তে রোবিনের প্রতি আমার ভালো লাগা আরো বাড়তে থাকে কিন্তু রোবিনকে বলা যায়নি সে কথাগুলো। রোবিনের জন্য এত মার খেলাম রোবিন কি সে কথা জানে? এরপরই শুরু আমার অসুখের উপসর্গ।’ দশ বছরের মেয়ে যার মধ্যে প্রাপ্তবয়স্কের কোনো লক্ষণ নেই তার মধ্যে যে প্রেমের অনুভূতি এটা কি আসলেই প্রেম? না এটা প্রেম নয় মৃদু মাত্রার মানসিক রোগ। পারিবারিক শান্তি বিঘ্ন ঘটলে আর সেই পরিবেশে সন্তান বড় হতে থাকলে তাদের মধ্যে এই ধরনের মানসিক রোগের লক্ষণ দেখা যায়। মনোজগত সেন্টারের উন্নত বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা গ্রহণ শেষে আলভি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে এক সপ্তাহের মধ্যেই বাড়ি ফিরে গেছে। সন্তানকে মারবেন না, একটু আদর দিন। উপসর্গের অবনতি হলে মনোজগত সেন্টারে আনুন। সন্তান আপনাদের, সুস্থ করার দায়িত্ব আমাদের।
ঘটনা-২
বিজলী আক্তারের বয়স ২৪ বছর। বাড়ি যশোর জেলার প্রত্যন্ত এক গ্রামে। এক বছর দুই মাস হলো বিয়ে হয়েছে। স্বামী বিদেশ থাকে। বিয়ে করে টানা দুই মাস দেশেই ছিল, এরপর আরো তিনবার দেশে এসে স্বামী-স্ত্রী এক সাথে বসবাস করে গেছে। শেষবার স্বামী বিদেশ যাওয়ার দেড় মাস পর বিজলী ঘুম থেকে উঠে আর বিছানা ছাড়তে পারছে না। মেয়ের চিৎকারে মা ছুটে এসে লক্ষ করলেন মেয়ের ডান হাত এবং ডান পায়ে শক্তি নেই, ব্যথা নেই, অনুভূতি নেই সম্পূর্ণ অবশ হয়ে গেছে। সম্পূর্ণ সুস্থ স্বাভাবিক মেয়ে রাতে খেয়ে ঘুমিয়েছে, আগে কোনো অসুখেরও লক্ষণ ছিল না। হঠাৎ কী হলো-দিশেহারা আত্মীয়-স্বজন, জামাই বাড়িতে খবর দিলে সেখান থেকে তেমন কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। মেয়ের বাবাও বাড়িতে নেই। খারাপ বাতাস লেগেছে মনে করে ঝাড় ফুঁক করা হলো কিন্তু লাভ হলো না। অদ্ভুত এই অসুখের কথা দ্রুত গ্রামে ছড়িয়ে গেলে মেয়ের স্বামীকে খবর দেয়া হলো। জামাই বাবাজি অসুখের কথা শুনেই শহরের বড় ডাক্তার দেখানোর জন্য অনুরোধ করল। জামাই বাবাজির অনুমতি নিয়ে মেয়েকে যশোর শহরের এক প্রাইভেট ক্লিনিকে ভর্তি করানো হলো কিন্তু রোগের কোনো উন্নতি হলো না। কেননা ডান সাইড সম্পূর্ণ প্যারালাইসিস রোগীর যে ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ফল পাওয়ার কথা সে ধরনের কোনো রেজাল্ট পাওয়া যাচ্ছে না। অবশেষে মানসিক সমস্যা বলে মানসিক রোগের ডাক্তার দেখানোর পরামর্শসহ রোগী ডিসচার্জ করে দেয়।
রোগী ও তার স্বজনরা অথৈ সাগরে পড়ে গেল, কোনো কূলকিনারা খুঁজে পেল না। প্যারালাইসিসের রোগী আর ডাক্তার বলে মানসিক! বিষয়টা অনেকেই মানতে পারল না। নানা জন নানা কথা বলতে লাগল, নানা ধরনের সাজেশন আসতে লাগল কিন্তু মেয়ের আত্মীয়-স্বজনরা মানসিক রোগের ডাক্তার দেখাবে না কারণ এটা অবশ্যই মানসিক সমস্যা নয়, ডাক্তাররা রোগ ধরতে পারেনি বলে মানসিক রোগ বলছে। অবশেষে রোগীকে ঢাকা এনে নিউরোমেডিসিন ডাক্তার দেখানো হলো। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তিনিও মত দিলেন একজন ভালো মানসিক রোগের ডাক্তার দেখান। বিদেশ থেকে স্বামী ফোনে উপদেশ দিলেন এই বলে যে, এ ঢাকা শহরের সব থেকে বড় মানসিক রোগের ডাক্তারের নিকট বিজলীকে নিয়ে যান টাকার চিন্তা করবেন না। খোঁজখবর করে তারা মনোজগত সেন্টারে প্রফেসর ডা. এ এইচ মোহামমদ ফিরোজ স্যারের নিকট রোগীকে নিয়ে এলে স্যার উন্নত চিকিৎসা এবং দ্রুত রোগ নিরাময়ের জন্য তাকে হাসপাতালে ভর্তিসহ অ্যাব্রিয়েকশন থেরাপি সাজেস্ট করেন। অন্যান্য জায়গায় চিকিৎসাধীন পনেরো দিনে রোগীর যে উন্নতি হয়নি ফিরোজ স্যারের চিকিৎসাতে ভর্তির পর দুই দিনে রোগী যখন দাঁড়িয়ে হেঁটে বেড়াল বিস্ময়ে রোগীসহ তার আত্মীয়-স্বজন হতবাক। তারা রীতিমতো স্বপ্ন মনে করছিল। কেননা সবাই যখন একেবারে নিশ্চিত যে বিজলী সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেল ঠিক তখনই বিজলী হাঁটছে! এতো সিনেমাকেও হার মানায়। আত্মীয়-স্বজন আল্লাহর নিকট শোকরানা আদায় করে সুস্থ বিজলীকে নিয়ে ঘরে ফিরে গেলেন আর আমরা বিজলীর পাহাড়সমান দুঃখের নীরব সাক্ষী হয়ে আল্লাহর নিকট দোয়া চাইলাম তার গর্ভে যেন দ্রুত একটি সন্তান দেন। নইলে সে ইহজীবনে কাউকে বলে যেতে পারবে না সন্তান না হওয়ার জন্য দায়ী কে? সারা জীবন শুধু মিথ্যা অপবাদ সইবে আর নীরবে চোখের জল ফেলবে।



