বয়স বাড়া মানেই ভাঁজ পড়া কুঁচকে যাওয়া চামড়া, স্মৃতি লোপ, হৃদরোগের ঝুঁকি, হাড় ক্ষয়ে যাওয়া কিংবা ক্যান্সারের মতো বিশ্রী সব অনিবার্য পরিণতি। অথচ এ জন্য প্রাকৃতিক পরিবর্তন যতটা না দায়ী তার চেয়ে অনেক বেশি দায়ী আমাদের জীবনযাপনের ধারা। আর সানস্ক্রিন, ব্যায়াম বা অন্যান্য বয়সজনিত পরিবর্তন ঠেকানোর কৌশলের মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হলো যথাযথ খাদ্যাভ্যাস। বয়সের সাথে যুদ্ধ করার কিছু পুষ্টি-কৌশল এখানে আলোচনা করা হলো।
বয়স বাড়ছে? কী করবেন?
যতই আমাদের বয়স বাড়ছে, শরীরের পুষ্টি ব্যবহারের ক্ষমতা ততই কমে যাচ্ছে। এ সময়ে দরকার বাড়তি পুষ্টি। যেমন ধরুন হাড়ের ক্ষয়রোধে তখন বেশি বেশি ভিটামিন-ডি দরকার। সূর্যালোকের সহায়তায় আমাদের ত্বক শরীরে ভিটামিন-ডি তৈরি করে। কিন্তু-বিশের কোঠায় শরীর যে পরিমাণ ভিটামিন তৈরি করতে পারে সত্তরের কোঠায় তার অর্ধেকেরও কম ভিটামিন তৈরি হয়। বিশের কোঠায় বয়স হলে দৈনিক ২০০ আইইউ ভিটামিন-ডি দরকার হয়। এটুকু ভিটামিন তাদের শরীরে যে পরিমাণ কাজ দেবে, সেই পরিমাণ ফল পেতে একজন প্রবীণের দরকার হবে ৪০০ থেকে ৬০০ আইইউ ভিটামিন-ডি। বয়স যতই বাড়বে আকর্ষণীয় শরীরের জন্য তত বেশি ভিটামিন দরকার হবে।
বয়স বাড়লে ভিটামিন-বি-এর চাহিদাও বাড়বে। তিনটি বিশেষ ভিটামিন বি যথা ফলিক অ্যাসিড, ভিটামিন বি৬, ভিটামিন বি১২ রক্তের হোমোসিস্টিন নামক একটি পদার্থকে কমিয়ে রাখে। হোমোসিস্টিন বেড়ে গেলে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে, স্মৃতি লোপ পায়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে ভিটামিন বি৬-এর চাহিদা ২ মিলিগ্রাম থেকে ৫ মিলিগ্রাম পর্যন্ত, ভিটামিন বি১২-এর চাহিদা ২ মাইক্রোগ্রাম থেকে ১০ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত বাড়ে। মহিলাদের দৈনিক ৪০০ মাইক্রোগ্রাম ফলিক অ্যাসিড খাওয়া দরকার। গর্ভবতীদের দরকার ৮০০ মাইক্রোগ্রাম, নইলে সন্তানের স্নায়ুরজ্জু মারাত্মক অপূর্ণ থেকে যায়।
বয়সের কারণে হাড়ের ক্ষয়রোধ প্রতিরোধ করতে মহিলাদের ক্যালসিয়াম গ্রহণের মাত্রা বাড়াতে হয়। মধ্য বয়সের মহিলাদের ১০০০ মিলিগ্রাম যথেষ্ট। মাসিকোর্ধ্ব মহিলারা হরমোন থেরাপি নিলে ১২০০ মিলিগ্রাম নিতে হবে আর হরমোন থেরাপি না নিলে নিতে হবে ১৫০০ মিলিগ্রাম। বয়ঃসন্ধিকালীন মেয়েদের নিতে হয় প্রতিদিন ১২০০ থেকে ১৩০০ মিলিগ্রাম। বয়ঃবিরোধী খাবার খান গবেষণায় দেখা গেছে, যারা তাজা সবজি ও ফলমূল বেশি খান তাদের রোগবালাই কম হয়, শক্তিময় থাকে এবং ওজন বাড়ার ঝুঁকি কম থাকে। তাহলে তাজা খাবারের কি কোনো জাদুমন্ত্র আছে? হ্যাঁ আছে, অনেক জাদু আছে।
- জলপাই, নারকেল ইত্যাদি সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া সব ধরনের তাজা ফলমূল ও শাকসবজি জাতীয় খাবার চর্বি তথা কোলেস্টেরল ও সোডিয়ামমুক্ত।
- ফলমূল ও শাকসবজি তথা আঁশযুক্ত খাবার। আঁশযুক্ত খাবার হৃদরোগ, ক্যান্সার, উচ্চরক্তচাপ ও ডায়াবেটিস জাতীয় বয়সজনিত ঝুঁকিগুলো হ্রাস করে। অপরদিকে এগুলো বেশ তৃপ্তিকর, তাই বেশি খেলেও মুটিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে না।
- তাজা ফলমূল ও শাকসবজি পুষ্টিতে ঠাসা। এতে আছে ক্যালসিয়াম, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, ভিটামিন-সি, বিটাক্যারোটিন, ফলিক অ্যাসিড প্রভৃতি। অথচ এর ক্যালরি মান একদমই নগণ্য। (বড় এক বাটি সবুজ সবজিতে আছে মাত্র ৩০ ক্যালরি)।
প্রতিদিন কমপক্ষে পাঁচ পদ ফল বা শাকসবজি খাওয়া দরকার। যত বেশি খাওয়া যায় ততই ভালো। সময় বাঁচাতে আপনি প্রতি বেলায় দুই পদ করে দৈনিক ছয় পদ এবং হালকা খাবারে দুই পদ, মোট আট পদ সবজি বা ফল খেতে পারেন। বয়সকে হার মানায় অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট।
অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট নিয়ে অনেক বিতর্ক থাকলেও এখন পর্যন্ত এটাকে বলা হয় দীর্ঘায়ুর স্বর্ণখনি। অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের মধ্যে রয়েছে ভিটামিন-সি, ভিটামিন-ই আর প্রাকৃতিক বিটাক্যারোটিন। ফ্রি রেডিক্যাল ও কোষের অক্সিজেনের কণা মিলে কোষের পর্দা, জীবন রক্ষাকারী প্রোটিন এমনকি কোষের জেনেটিক কোডকে পর্যন্ত ধ্বংস করে আর এ কারণে রোগ কিংবা বার্ধক্য আসে। অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এসবের বিপক্ষে যুদ্ধ করে বুড়িয়ে যাওয়া প্রতিরোধ করে।
অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে উদ্দীপ্ত করে এবং বয়সজনিত স্মৃতি লোপের হাত থেকে মস্তিষক ও স্নায়ুতন্ত্রকে রক্ষা করে। গবেষণায় জানা যায়, পূর্ণবয়সী মানুষ মাত্র দুবার দৈনিক ১০০ আইইউ ভিটামিন-ই খেলে হৃদরোগের ঝুঁকি অর্ধেক কমে যায়। অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের এই রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা পুরুষের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যারা ভিটামিন-সি ও ভিটামিন-ই নিয়মিত খান, তাদের শরীরে প্রোস্টেট ক্যান্সারের আশঙ্কা খুবই কম থাকে।



