Skip to main content

বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তি

সাইকেল চালিয়ে বিশুদ্ধ পানি
রিদওয়ান আকরাম
‘পানি নিয়ে ভাবনা আর না আর না’-এ কথা যতই বলুন, শেষ পর্যন্ত পানযোগ্য পানি নিয়ে ভাবতেই হবে। আর আমাদের মতো দুর্যোগপূর্ণ অঞ্চলের জন্য তো সুপেয় পানির প্রয়োজনীয়তার কথা না বললেই নয়। শুধু কি বাংলাদেশে? এ কথা খাটে দুর্যোগকবলিত যেকোনো দেশের জন্যই। আর এ সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে এগিয়ে এসেছে জাপানের ‘নিপ্পন বেসিক কোম্পানি’। এরা পানি পরিশোধনের কাজ করে থাকে। এবার তারা তৈরি করেছে বহনযোগ্য পানি পরিশোধনযন্ত্র ‘সাইক্লোক্লিন’। এর মাধ্যমে সাইকেলের প্যাডেল চালিয়েই মিনিটে পরিশোধন করা যায় ৫ লিটার পানি।

দুর্যোগপূর্ণ অঞ্চলের কথা চিন্তা করেই এটা তৈরি করা হয়েছে। ধরুন, এক এলাকার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে বিরাট কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সেখানে বিদ্যুৎ কিংবা জ্বালানি তেলের অভাব দেখা দেবে। এ অবস্থায় ‘সাইক্লোক্লিন’ দারুণ কাজে আসবে। শুধু প্যাডেল চালিয়ে ১০ ঘণ্টায় প্রায় দেড় হাজার লোকের পানির চাহিদা পূরণ করতে পারবে এটি! আর এক মাসের মধ্যে ৯০ থেকে ১০০ টন পানি! পুরো যন্ত্রটা সাইকেলের মধ্যে থাকায় এবড়োথেবড়ো রাস্তায় সহজেই চালিয়ে নেয়া যাবে। চাকাগুলোও ‘পাংচার ফ্রি’। টিকবে বহু দিন।

৫৪ কেজির সাইক্লোক্লিনটিকে বলা যায় ‘একের ভেতরে তিন’। প্রথমত, কোনো ঝামেলা ছাড়াই টানা দুই বছর ব্যবহার করা যাবে এটা। দ্বিতীয়ত, কোনোভাবে যন্ত্রটি ঠিক না করা গেলে কেবল পাম্প হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে। যার সাহায্যে প্রায় ৫ মিটার দূর থেকে পানি টেনে আনা যাবে। আর পাম্প নষ্ট হলেও সাইকেল তো আছেই।

প্রাথমিকভাবে ‘সাইক্লোক্লিন’-এর দাম পড়ে যাচ্ছে প্রায় ৫ লাখ টাকার মতো। এখন শুধু জাপান সরকারের কাছে বিক্রি করছে নিপ্পন। বাইরের দেশে এখনো সেভাবে রপ্তানি করা শুরু হয়নি। তবে তারা ‘সাইক্লোক্লিন’-এর মূল্য আরো কমানোর চিন্তা করছে। এ জন্য বাংলাদেশেও এ সাইকেল বানানোর চিন্তা করছে তারা। এতে করে সাইক্লোক্লিনের মূল্য যেমন কমবে, তেমনি বাংলাদেশের মতো দুর্যোগপীড়িত দেশগুলোও কম মূল্যে এ প্রযুক্তি কেনার সুযোগ পাবে।

বল বাঁকানোর বিজ্ঞান
জুবায়ের হোসেন
পেস পোলারের আজব অস্ত্র ‘রিভার্স সুইং’ করা যত না কঠিন, ব্যাখ্যা আরো দুরূহ। পদার্থবিদ্যার কোন নীতি মেনে বল ঘুরে যাচ্ছে তা মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছে নাসার বিজ্ঞানীদেরও।

বোলারের বল ছোড়ার ভঙ্গির ওপর নির্ভর করে সুইংয়ের ধরন বদলে যায়। বাতাস কেটে দ্রুতগতিতে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বায়ুর এক পাতলা স্তর বলকে ঘিরে ধরে। বলের অপ্রতিসমতার কারণে এক পাশের তুলনায় অপর পাশের বায়ুস্তর আগে সরে যায়। যে পাশে বাতাসের ধাক্কা বেশি থাকে বল সেদিকেই বাঁক নেয়। প্রচলিত সুইংয়ের জন্য বোলার যখন বলের সেলাই অংশটি স্লিপের দিকে হেলিয়ে ছুড়ে মারেন তখন আউট সুইং আর যখন ফাইন লেগের দিকে হেলিয়ে রাখেন তখন ইন সুইং হয়।

সেই সঙ্গে বায়ুচাপের তারতম্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। বলের মসৃণ পাশ বাতাস কেটে দ্রুত ছুটে যায় আর খসখসে পাশ কাজ করে ব্রেক হিসেবে, সহজে সামনে যেতে চায় না। বলের দুই বিপরীত পাশে উচ্চ ও নিম্ন চাপের এলাকা সৃষ্টি করে বোলার বলকে বাঁক খাওয়াতে পারেন। প্রবাহী ধর্ম অনুযায়ী বাতাস বেশি চাপের এলাকা থেকে কম চাপের এলাকার দিকে ছুটে যায়। ফলে বলটিও বাতাসে ভেসে সোজা চলে যাওয়ার বদলে বেঁকে যায়। নতুন বলের জন্য সেলাইয়ের খসখসে ভাব ও বলের পিঠে মসৃণতা বৈপরীত্য হিসেবে কাজ করে।
নাসার বিজ্ঞানী রবীন্দ্র মেহতা পাকিস্তানি কিংবদন্তি ইমরান খানের সঙ্গে একই স্কুলে পড়েছেন। ক্রিকেট বলের আদ্যোপান্ত বুঝতে তিনি কাটিয়ে দিয়েছেন তিনটি দশক। ব্যাপক গবেষণার পর হাজির করেছেন সফল সুইংয়ের রেসিপি। পরামর্শ দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ান বোলিং কোচ ট্রয় কুলিকে। বল পুরনো হয়ে এলে সেলাইয়ের ধারালো ভাব চলে যায়, ফলে স্বাভাবিকভাবে বল সুইং করতে চায় না। আর তখনই চালাক বোলার বের করে তুরুসের তাস রিভার্স সুইং। ২০ ওভার পরই রিভার্স সুইংয়ের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায় বল।

তবে এখানে ফিল্ডিং দলের সবাই কিছু না কিছু অবদান রাখে। বলের দুই পাশে অসামঞ্জস্যতা ধরে রাখতে যেকোনো এক পাশ ক্রমাগত ঘষা হয় জামা বা রুমাল দিয়ে। বারবার ঘষার ফলে একটি পাশ মসৃণ থেকে যায়। অপর পাশটি ক্ষয়ে যায়। ঘষার সময় কোনো না কোনো তরল পদার্থ ব্যবহার করা হয়। ফিল্ডারের ঘাম, থুথু, সানস্ক্রিন, হেয়ারজেল মাঠের মধ্যে সহজেই চাইলে যা পাওয়া যায়। চামড়ার বলের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ছিদ্রের মধ্যে দিয়ে এগুলো ভেতরে চলে যায়। ধুমধাড়াক্কা মার আর মাঠে গড়ানোর ফলে এসব ফাঁক বেড়ে যেতে থাকে। একসময় গলফের মতো ক্রিকেট বলটির একপাশ ছেয়ে যায় ছোট ছোট ছিদ্রে। ওই পাশটি সহজে বাতাস ধরে রাখতে পারে। আর তাতেই উল্টোপাল্টা আচরণ করতে শুরু করে বল। তবে খেলার মাঠে কেউ কেউ আবার অসদুপায় অবলম্বন করতেও ছাড়েন না। তাড়াতাড়ি বলের চকচকে ভাব নষ্ট করতে বল ছোড়ার বদলে গড়িয়ে মারা, বোলিংয়ের সময় হাত মোছার ছলে বালিতে ঘষে সেই বালি বলে ঘষা, পকেটে বোতলের ছিপি রেখে তার ওপর ঘষা-এগুলো তো মামুলি কৌশল। নিউজিল্যান্ডের পেস বোলার ড্যানি মরিসন একবার শুনিয়েছিলেন প্রতিপক্ষের অভিনব এক কৌশলের কথা। খেলোয়াড়টির আঙুলে একটি ব্যান্ডেজ পরা ছিল, এর বাইরের দিকটা ছিল শিরিষ কাগজের মতো খসখসে! আর তা দিয়েই আরামসে ঘষেছিলেন বলের একপাশ।

ঠাণ্ডা ও স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় বল বাঁক নেয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। উষ্ণ বায়ুর তুলনায় ঠাণ্ডা বায়ুর ঘনত্ব বেশি বলে এমনটা হয়। বল ছোড়ার আগে বোলারের হাতের অবস্থান উঁচু হলে তিনি অপেক্ষাকৃত বেশি সুবিধা পেয়ে থাকেন। বলের সেলাই যথাসম্ভব খাড়াভাবে রেখে ছোড়া হলে পাশভেদে মসৃণ-অমসৃণ বল সবচেয়ে বেশি বাঁক নেবে। স্বাভাবিক সুইংয়ের জন্য উপযুক্ত গতিবেগ হলো ঘণ্টায় ৭০ মাইল। এর বেশি হলে বল স্বাভাবিকভাবে বাঁক খায় না। বেশি গতি বোলারদের রিভার্স সুইংয়ের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়।

জিন নিয়ে আজব গবেষণা
ফাহমিদা হক
জিনের ভেতরই লুকানো আছে জীবনের রহস্য। আর তাই সেই জিন নিয়ে চলেছে হাজারো গবেষণা। এর মধ্যে কিছু গবেষণা ভ্রূ কুঁচকে দিয়েছিল সবার। সেগুলোই এখানে আলোচনা করা হলো।

নাৎসি বিজ্ঞানীর যমজ জগৎ
জোসেফ সেনজেল নামের নাৎসি বিজ্ঞানীর কাজ ছিল কীভাবে যমজ শিশুর জন্ম হয়, গবেষণা করে তা বের করা। আর সেই ভিত্তিতে কৃত্রিমভাবে যমজ শিশুর জন্মগ্রহণ করাতেও সক্ষম হয়েছিল বলে মনে করেন অনেকে। ব্রাজিলের ক্যানডিডো গোডই অঞ্চলের অভিবাসীদের দাবি, ১৯৬০ সালের প্রাক্কালে জোসেফ যে ছোট শহরটিতে চিকিৎসা সেবা দেয়ার নাম করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আসছেন, সেখানকার প্রতি পাঁচজনে একজন নারী যমজ শিশুর জন্ম দিয়েছেন। জন্ম নেয়া শিশুদের অধিকাংশেরই চুল উজ্জ্বল ও চোখ নীল।

মাকড়সাগল
কমিক বইয়ের সপাইডারম্যান দেখে কানাডার কুইবেক প্রদেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান নেক্সো বায়োটেকনোলজিকের একদল বিজ্ঞানীর শখ হলো সপাইডার গোট তথা মাকড়সা-ছাগল বানানোর! আর তা করতে মাকড়সার ভ্রূণে বসিয়ে দিলেন ছাগলের ডিএনএ। এরপর ওই মাকড়সা থেকে যে জাল পাওয়া গেল তা কি না সোনার চেয়েও দামি। আবার মাকড়সার ডিএনএ ছাগলের ভ্রূণে প্রবেশ করানোর ফলে যে ছাগলটির জন্ম হলো তার দুধের আমিষ প্রক্রিয়াজাত করে পাওয়া গেল মূল্যবান রেশম!

অক্ষিগোলক
যে জিনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে ব্যাঙাচি তিনটি চোখ পায়, সেই বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানীরা এবার চেষ্টা করছেন মানুষের জন্যও ভবিষ্যতের অক্ষিগোলক তৈরি করার। আর এটি সম্ভব হলে রেটিনার ত্রুটির কারণে অন্ধত্ববরণ করা মানুষ হয়তোবা দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেতে সক্ষম হবে।

ম্যালেরিয়া প্রতিরোধী মশা
বিজ্ঞানীরা এমন এক ধরনের মশা তৈরি করেছেন, যেটি ম্যালেরিয়া প্রতিরোধের সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মশার তুলনায় দীর্ঘজীবীও হবে। এ ট্রান্সজেনিক মশার শরীরে এমন একটি জিন প্রবেশ করানো হয় যার কারণে এটি ম্যালেরিয়া বহনকারী পরজীবীর আক্রমণ পুরোপুরি প্রতিরোধে সক্ষম হবে। সেই সঙ্গে এদের শরীরে আরেকটি জিনের উপস্থিতির কারণে তাদের চোখ অন্ধকারেও জ্বলতে থাকবে। এটি দেখে সাধারণ মশা থেকে তাদের আলাদা করাও সম্ভব হবে। অবশ্য বিজ্ঞানীরা জানান, তারা এখনো গবেষণার প্রাথমিক অবস্থায় আছেন। আর এ ট্রান্সজেনিক মশা পরিবেশে ছাড়তে আরো ১০ বছর লেগে যাবে।

নারীর গোলাপিপ্রীতি
অধিকাংশ নারীর গোলাপি আর ছেলেদের নীল রঙ পছন্দ করতে দেখা গেলেও এর পেছনের কারণ এত দিন অজানা ছিল। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব নিউক্যাসলের বিজ্ঞানীদের গবেষণায় জানা গেল, কারণ ঐতিহ্যগত নয়, এর পেছনে রয়েছে জিনের হাত। ড. হালবার্ট এবং ইয়াজহু লিং চীনা ও একদল ব্রিটিশ শিক্ষার্থীর ওপর গবেষণা চালিয়ে দেখেন, ছেলেদের পছন্দ নীল রঙ আর মেয়েদের হালকা গোলাপি। আবার চীনা শিক্ষার্থীদের লাল রঙটাই বেশি টানে। কেননা চীনে সৌভাগ্য ও আনন্দের প্রতীক হলো লাল।

দ্রুত বাড়বে গাছ
ক্লিন্ট চ্যাপল এবং রিক মেইলান নামের দুই মার্কিন বিজ্ঞানী জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে এমন গাছ উৎপাদনের গবেষণা চালাচ্ছেন, যেটা কি না জ্বালানির জন্য অত্যাবশ্যকীয় ইথানলের জোগান দিতে সক্ষম হবে। এটি সম্ভব হলে সীমিত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর চাপও অনেক কমে আসবে। গবেষকরা নাকি সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছেন।

রোগ প্রতিরোধক গরুর দুধ
ফার্মিং নামের জৈবপ্রযুক্তির একটি প্রতিষ্ঠান মানুষের একটি জিন গরুর মধ্যে প্রবেশ করিয়েছিল। মানুষের অশ্রু ও লালায় থাকা ল্যাকটোফেরিন নামের এই প্রোটিন চোখ ও ফুসফুসে সংক্রমণকারী ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধে সক্ষম। আর ট্রান্সজেনিক এ গরুটি থেকে যে দুধ উৎপন্ন হবে, তা উচ্চ ল্যাকটোফেরিনযুক্ত প্রোটিনপূর্ণ থাকে।

মৃত ইঁদুরের ক্লোন
জাপানের বিজ্ঞানীরা এমন একটি ইঁদুরের ক্লোন করেছেন যেটা কিনা ১৬ বছর আগে মরে জমাট বেঁধেছিল। জমাট বাঁধা কোনো মৃত জীবন থেকে ক্লোন করার ঘটনা ওটাই প্রথম। জাপানি গবেষকরা জানান, তাদের এমন গবেষণায় মানবজাতি অনেক উপকৃত হবে। সেই সঙ্গে অনেক বিলুপ্ত প্রাণীকেও নতুন করে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। অবশ্য সমালোচকরা বলেন, নতুন এ পদ্ধতির কারণে মানুষ নিজেদের মৃত আত্মীয়দের মতো দেখতে সন্তান ফিরে পেতে চাইবে। সেই সঙ্গে নিজেরাও মৃত্যুর পর ডিএনএ বাঁচিয়ে রাখতে চাইবে। ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা ক্লোন করা ভেড়া ডলি আবিষকারের ১১ বছর পর নতুন এ ক্লোনিং পরীক্ষা শুরু হয়েছে।