Skip to main content

মানসিক রোগ চিকিৎসা

অধ্যাপক ডা. এএইচ মোহামমদ ফিরোজ

এমবিবিএস এফসিপিএস এমআরসিপি এফআরসিপি

পূর্ব প্রকাশের পর
এই অর্থে ফ্রয়েড তৎকালীন ইউরোপ ও আমেরিকার সমীক্ষকদের চেয়ে অনেক বেশি আধুনিক ছিলেন, যারা এখনো এই ধারণার সাথে লেগে আছে যে, সমকামিতা হচ্ছে একটা অজাচারী উন্নত অবস্থার প্রকাশ। যা হচ্ছে জননেন্দ্রিয় ও পায়ুর মধ্যস্থিত একটা স্তর বিশেষ। অতএব এটার কঠিন রৈখিক কারণ হচ্ছে সমকামী লোকেরা যেভাবেই হোক পরিপক্ক ভালবাসা দিতে অক্ষম কারণ তাদের প্রেম সঙ্গী হচ্ছে তাদের সাথে চলার প্রতীকচিহ্ন মাত্র। তাদের অজাচারী আত্মপ্রেম বহির্বিশ্বের আয়নার কল্পনার কাঁধে জড়িত হয়ে আছে। এই ধরনের বিগত হওয়া ধারণা আধুনিক জীববিজ্ঞানের গবেষণাকে অবজ্ঞা করা ছাড়াও যেসব সমকামী সাহায্যপ্রার্থী তাদের কাছে অনিষ্ঠকর। কারণ এটা ধারণা করে যে, যেকোনো কারণেই হোক তাদের সম্বন্ধটা অসহ্য। সম্ভবত এই পুরনো ফ্যাশনের ধারণাগুলো সম্পূর্ণ শেষ হতে আরো এক প্রজন্মের প্রয়োজন হবে এবং সম্ভবত তাদের একগুয়েমি সবচেয়ে ভালভাবে ব্যাখ্যা করেছেন Elainl Pagels (1988) তার থিওলজিক্যাল প্রবন্ধে। যাতে তিনি আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, আমাদের বিবর্তনের ইতিহাসে যেসব আচরণ এসব জিনিসের সমর্থন দেয় না যেমন-ব্যভিচার, বেশ্যাবৃত্তি, হস্তমৈথুন এবং সমকামিতা অনেক বৃত্ত থেকে সমালোচনা ও অবজ্ঞার সমমুখীন হয়েছিল।

একটি সম্প্রতি পূর্বের ঘটনার যে পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে তাতে জীবনের স্তরসমূহের অনেক সমর্থন মেলে যা তথাকথিত গঠনমূলক প্রথম ছয় বছরের চেয়েও অনেক অনেক ঊর্ধ্বে চলে গেছে। Erik Erikson এই বুঝ ব্যবস্থার প্রতি অনেক অবদান রেখেছেন এবং এইরূপ স্তর সনাক্ত করেছেন। যেমন ঘনিষ্ঠতার বিপরীতে বিচ্ছিন্ন অবস্থা এবং প্রজনন সম্বন্ধীয়ের বিপরীতে আত্মশোষণ। কিন্তু এই নির্দিষ্ট সীমারেখা তখনো সেই কষ্টকর অবস্থাটা অধিকার করেনি, যাকে মধ্যবয়সের সঙ্কটকাল বলে অভিহিত করেছেন। এটা ৪০ বছর বয়সের সময় অনেক লোকেই অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন। এটাই এমন একটা সময় যখন বিশেষ করে পুরুষরা আর পেছনের দিকে তাকাতে চায় না এবং জীবনের গতি নিয়ে পুনঃচিন্তা করেন যে জীবনের বাকি দিনগুলো কী করে ভালভাবে সম্পন্ন করা যায়। তারা যুবক পুরুষ যা কদাচিত করে না সেই মৃত্যুকে স্মরণ করে। এই সময়ে স্ত্রী পরিত্যাগ এবং কর্ম পরিবর্তন অনেকটা সাধারণ হয়ে ওঠে।

আজকাল সমীক্ষক এবং জনসাধারণ অনেক বেশি বিচ্ছিন্ন করণকে গ্রহণ করছেন যা প্রায়ই জীবনের স্তরে স্তরে সংগঠিত হয় এবং তারা নারী ও পুরুষেরা যে পরিবর্তন এই সময়ে করতে পারে, তার প্রতি অনেক বেশি সহানুভূতিশীল। মধ্য জীবনের আগের দিনের পরিবর্তন সম্বন্ধে মনোভাব ছিল প্রতিরূপী অবজ্ঞাসূচক যেমন সেটা শুধুমাত্র একটা নাবালকত্বের চিহ্ন, আশানুরূপভাবে অন্যকে যা প্রভাবান্বিত করে। যেভাবে পৃথিবীর সর্বত্র নারীরা অনেক কম সন্তান এবং বেশি কাজের সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করতে শুরু করেছেন। বর্ষীয়সী নারীদের প্রথাগত ভূমিকা তাদের বহুসংখ্যক নাতি-পুতির দেখাশোনার ভূমিকা অনেক কম গুরুত্বের হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারীদের জন্যও জীবনকে বাঁচিয়ে রাখার প্রশ্নের সমমুখীন হতে হচ্ছে যে তারা বাকি জীবনটা কীভাবে অর্থবহ করে তুলবে এবং সুখী হয়ে জীবন-যাপন করবে। যেভাবে তারা নিজেদের জীবনকে মধ্যজীবনের সঙ্কট দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হতে দেখেন তা কম নয় অথবা মানুষ যা অভিজ্ঞতায় লাভ করে তার চেয়েও বেশি মোচড়ানো। অধূনাকালে এসব সমস্যা জড়িত নারী ও পুরুষদের সাহায্যের জন্য যেসব সমীক্ষক ও সমাজ বিজ্ঞানী মননশীল হয়েছেন তাদের লেখা পুস্তক ও প্রবন্ধ নিয়ে এই বিষয়ের ওপর একটা বড় পাঠাগারের সৃষ্টি হয়েছে।

নতুন মানসিক বৈকল্যসমূহ
সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডারস, বিশেষ করে নিয়মিতভাবে শীতের মাসগুলোতে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়াকে ১৯৮০-র দশকের পূর্বে খুব কমই স্বীকৃতি দেয়া হতো। রকফেলার ইনস্টিটিউটের Pittendrigh বহু বছর ধরে প্রাণীদের মধ্যে উইচিংড়ের এবং অন্যদের সমতানিক ক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করেছেন। সম্প্রতি এটা অত্যন্ত পরিষকার হয়ে উঠেছে যে, মানুষের শরীরের অনেকগুলো রাসায়নিক উপাদানের স্তর ও আলোক চক্রের সাথে পরিবর্তিত হয়। শীর্ষক গ্রন্থি যাকে Descartes আত্মার অবস্থান বলে মনে করেছেন তা পরে একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় শারীরিক Zeitgeber-এর অর্থাৎ যুগধর্মের ভূমিকায় পাওয়া গেছে-এর অন্তস্থিত ঘড়ি যার মধ্যে দিয়ে melationin ক্ষরণ হয়, এটা হচ্ছে একটা কম্পাউন্ড যা সাংগঠনিক দিক দিয়ে সেরোটনিনের সাথে সম্পৃক্ত। অনেক লোক বিশেষ করে যাদের রয়েছে ম্যানিক ডিপ্রেসিভ টেন্ডেন্সি তারা শীতকালে আলো কমে যাওয়ার সাথে সামঞ্জস্য রেখে ডিপ্রেশনের প্রবণতা দেখায়। এটা টেম্পারেট জোনস অর্থাৎ নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে বেশি হয়ে থাকে। নিউইয়র্কের Termans এরা দেখতে পেয়েছিলেন যে, প্রচন্ড আলোর মধ্যে স্বল্পকালীন অবস্থান ডিপ্রেশনের অবসান ঘটাতে পারে। অন্য যারা এই গবেষণায় অবদান রেখেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন Faedda, Teicher, Baldessarini, Gelbard and Floris এবং Wehr যিনি মৌসুমী আক্রান্ত মনোবৈকল্য এবং লাইট থেরাপি নিয়ে একটা ইতিহাস রচনা করেন। ওরিগণ রাষ্ট্রে ১৯৯০ সালে Robert Sack এবং তার দল লক্ষ্য করেছিলেন যে, সকালের দিকে লাইট থেরাপি দিয়ে চিকিৎসা বিকেলের চেয়ে বেশি কার্যকরী হয়ে থাকে। শীতকালীন বিষণ্নতাগ্রস্ত রোগীরা অস্বাভাবিকভাবে ধীরগতিতে Circa dian Rhythms ঘটিয়ে থাকে। যাকে সকালিক লাইট থেরাপি দ্বারা ভালোভাবে সুস্থ করে তোলা যায়।

মনোযোগের অভাবজনিত বৈকল্য বা Attention deficit disorder নিয়ে অধূনাকালে ব্যাপক গবেষণা হয়েছে। সাধারণ জনগণের জন্য অজস্র পুস্তক সরবরাহ করা হয়েছে যা এক সময়ে শিশুদের মধ্যে অস্থিরতার চিহ্নকে যারা কোনো কাজে মন বসাতে পারত না, তাদের জন্য একটা সমমানজনক পাঠ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছিল Paul Wender (Utah) ইউনিভার্সিটি অব মেডিক্যাল স্কুল ডিপার্টমেন্ট অব সাইকিয়াট্রির চেয়ারম্যান। অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন এই মানসিক বৈকল্য বিষয়ে জ্ঞানগর্ব সনাক্তকরণ পদ্ধতি ও চিকিৎসার দ্বারা। যুব জীবনের মধ্যে এই রোগের লক্ষণ অতি সাধারণ যেখানে এর প্রকাশ ঘটে থাকে, চিত্ত বিক্ষেপ, চঞ্চলতা, বকবকানি, মনোযোগের অভাব এবং মেজাজ ও আবেগ বিচলিত। ইদানীং Biederman এবং তার সহকর্মীগণ মনোযোগের অভাবী বৈকল্যের ও মেজর অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডারের বিষয় নিয়ে গবেষণা করেছেন। ADD মেজাজের সাথে জড়িত রোগ লক্ষণের চিকিৎসার উন্নতির মধ্যে প্রধাণত জড়িত হচ্ছে প্রত্যেক রোগীর জন্য আলাদাভাবে বিশেষ প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রয়োগের কৌশল। আর যেখানে মানসিক চালনাক্রিয়ার বৃদ্ধি উৎপন্নকারক যেমন-মেজর ডিপ্রেশনের ক্ষেত্রে সরল ADD দ্বারা পরিবর্তিত হতে পারে। ADD-র ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অ্যান্টিডিপ্রেশান্ট প্রয়োজন হতে পারে।

পুরাতন মানসিক বৈকল্যের জন্য নতুন ধারণা
পুনরাবর্তক বিষণ্নতা রোগীদের চিকিৎসায় বিগত দশকে বাড়তি প্রমাণাদিতে দেখা গেছে যে, দীর্ঘসূত্রী রক্ষণাবেক্ষণের চিকিৎসায় পূর্বের খারাপ অবস্থায় ফিরে যাওয়ার ঘটনা কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রকৃত উপকার সাধিত হয়েছে। এটা বিশেষ করে সত্য সেসব রোগীদের ক্ষেত্রে যাদের জীবনে তিন অথবা তারও বেশিবার প্রাসঙ্গিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। উদ্ভুত চিকিৎসালয়ের সনান্তরাল থেকে প্রমাণ Jules Angst এবং তার সহকর্মীদের গবেষণা কর্মে। তাতে দেখানো হয়েছে জীবন চক্র বা জীবন রেখা দ্বারা যেসব রোগীদের পুনঃপুনঃ ডিপ্রেশন ঘটে যেভাবে এক দশকের মধ্যে আত্মহত্যা দ্বারা চিহ্নিত হয়। তাতে অন্য যেকোনো দশকের মতো তাদের বয়সের সাথে সাথে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যায় না। এর অর্থ হচ্ছে এই রোগীদের চিকিৎসা করার অভিজ্ঞতা রোগ নিবারক পদ্ধতির ক্ষেত্রে অনির্দিষ্ট। যেভাবে Maria Asberg স্টকহোমের কারোলিনসকা ইন্সটিটিউটে ব্যাখ্যা দিয়েছেন একজন বিষণ্নতাগ্রস্ত রোগী যিনি একবারও আত্মহত্যার চেষ্টা শেষ করেনি সেখানে চূড়ান্ত কর্মের প্রচন্ডতার সাথে একটা গভীর পাসপরিক সম্পর্ক রয়েছে। পরবর্তীতে অনেক গবেষক দেখিয়েছেন ভায়োলেন্স ও সুইসাইডের মধ্যস্থিত পারসপরিক সম্বন্ধ Inamdar, Siomopoulis, Shanok and Lamela (1982) প্রত্যক্ষ করেছেন যে, বয়োসন্ধিকালে হাসপাতালে চিকিৎসারত মানসিক রোগগ্রস্ত রোগীদের (২৭.৫% প্রায়ই আত্মহত্যা ও আক্রমণাত্মক প্রচন্ডতার দুটোই প্রদর্শন করেছে। Plutshik, Van Praag Ges Conte (1985) দেখতে পেয়েছেন যে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পূর্বে আসা মানসিক রোগীদের মধ্যে দুই-পঞ্চমাংস রোগীই ছিল হয়তো ভীষণ আক্রমণাত্মক অথবা আত্মহত্যাপ্রবণ এবং অনেকের মধ্যে ছিল দুটোরই প্রবণতা। এই সকল উপাত্ত পুরানো মনোসমীক্ষণের দল বিশেষের সংকেত বাক্যকে সমর্থন করে যে, বিষণ্নতা হচ্ছে আক্রমণ যা অন্তর্মুখীন depression is aggression turned inwards যদিও এই বিষয়ে আরো সত্য থাকতে পারে এই মর্মে পুস্তকের সংশোধন দ্বারা যে আত্মহত্যা হচ্ছে আক্রমণাত্মক অন্তমুখীনতা ঝঁরফব রং ধমমৎবংংরড়হ ঃঁৎহবফ রহধিৎফং বিষণ্নতা সব সময়ে আক্রমণাত্মক অনুভূতি দ্বারা জড়িত থাকে না, আত্মহত্যা থাকে নিয়মিতভাবে।

Hoyer এবং lund ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে নরওয়েতে একটি মনকাড়া পার্শ্বদৃষ্টি নিক্ষেপ করেছিলেন শিশুদের তুলনায় মায়েদের মধ্যে আত্মহত্যাপ্রবণতা। প্রায় দশ লক্ষ নারীর রেকর্ড পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তারা দেখতে পেয়েছেন, যে মা যত বেশি শিশুর জন্ম দিয়েছেন তার মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা ততোটাই কম। তাদের উপাত্তসমূহ যা HoyerEmil Dwrkheim প্রদত্ত (১৮৯০) বিশ্বাসকে সমর্থন করে যে, মাতৃত্ব-পিতৃত্ব আত্মহত্যার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কম করে, আরো এক পা বাড়িয়ে পরামর্শ দেন যে, কার্যত যত বেশি ততোই উৎফুল্লতা যেসব নারীদের ছয় বা ততোধিক শিশু আছে তাদের বন্ধ্যা স্ত্রীদের তুলনায় মাত্র এক পঞ্চমাংশ আত্মহত্যার ঝুঁকি আছে। Low Serotonin স্তরের সাথে সপন্দন আঘাতের সংযোগের উপস্থিতিকে সমর্থন দিয়েছিলেন Mark Linnoila ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব মেন্টাল হেলথে তার গবেষণাকর্মে। Linnoila দেখিয়েছিলেন যে, ইম্পালসিভ, অ্যালকোহলিক ও ভায়োলেন্ট প্রকৃতির দোষী ব্যক্তিদের ছিল Lower5-HIAA Level যার স্তর ছিল প্যারানয়েড, অ্যালকোহল অ্যাবিউজ, ভায়োলেন্ট কিন্তু নন-ইম্পালসিভ দোষীদের মধ্যে বেশি। সর্বোপরি পূর্বোক্তদের যদি আত্মহত্যা করার প্রবণতার ইতিহাস থেকে থাকে। আর একটি পদার্থ জড়িত রয়েছে ভায়োলেন্স ও অতি জোরালোভাবে সেরোটনিনের কমতি হওয়ার সাথে যা হচ্ছে কোকেইন। যেভাবে Yuclofsky Silver and Hales (1993) প্রত্যক্ষ করেছেন, কোকেইন, উত্তেজনা রোগের হঠাৎ আক্রমন ঘটাতে পারে এর দীর্ঘকাল স্থায়ী ব্যবহার এমন উত্তেজনা বাড়াতে পারে যে, স্নায়ুতন্ত্রের শরীর বিজ্ঞানের দিক দিয়ে ক্রোধপ্রবণতা ও আক্রমণাত্মতা সাধারণভাবে ঘটে থাকে। কোকেইন ব্যবহার করার সময়ে ও ছেড়ে দেয়ার পরে। সন্দেহবাতিক ও বিভ্রান্তিজনিত মানসিক বৈকল্যের উদ্ভব হতে পারে কোকেইন সেবীদের। তাদের ভয়াবহতা প্রকাশ হওয়ার বেশি ঝুঁকি থাকে যদি তাদের পুর্ববর্তীতে CNS অবস্থায় থাকার ঘটনা ঘটে থাকে।

- চলবে