Skip to main content

কুসংস্কারের আদ্যোপান্ত

অধ্যাপক ডাঃ এ এইচ মোহামমদ ফিরোজ

এফসিপিএসএমআরসিপি এফআরসিপি

সীগাল (Seagull) গাঙচিল
সাধারণত পাখিটাকে অশুভ পাখি বলে বিবেচনা করা হয়। সীগাল পাখি ব্যাপকভাবে সমুদ্র তীরবর্তী মানুষের মৃত্যুর সাথে জড়িত। কুসংস্কারে আছে যে সীগাল হচ্ছে মৃত জেলেদের অথবা নাবিকের প্রেতাত্মা, বিশেষ করে যারা জলডুবিতে মারা গিয়েছে। সুতরাং অনেক অঞ্চলেই সিগাল পাখিকে হত্যা করা অশুভ মনে করা হয়। অন্যান্য যেসব কুসংস্কার এইসব মৃত্যুর সাথে জড়িত তার মধ্যে এই ধারণা রয়েছে যে, যে সিগাল পাখিটি একটি সরল রেখায় উড়ে যাচ্ছে সে সমুদ্র তলদেশের মৃত ব্যক্তিটির পথ অনুসারণ করছে। তারা ভয় পেত একটি সীগাল কারো ঘরের জানালায় এসে ধাক্কা দিলে সে ঘরে একটি লোক মারা যাবে অথবা সেই ঘরের কোনো সদস্যের সমুদ্রে থাকা অবস্থায় কোনো বিপদ ঘটবে। একইভাবে যদি তিনটি সীগাল কোনো একটি লোকের ওপর দিয়ে উড়ে যায় তবে তাকে মৃত্যুর আলামত বলে ধরে নেয়া যেতে পারে। মাছ ধরার জালে একটা সীগাল পাখি ধরা এবং তাদের চিৎকার শোনাও দুর্ভাগ্যের (কারণ বলা হয়ে থাকে যে, কোনো দুর্ঘটনা ঘটার পূর্বেই তারা চিৎকার করে)। পশ্চিমা দেশে ইত্যবসরে কুসংস্কারে সতর্ক করা হয় যে সীগাল পাখিকে খাওয়ানো এবং বিশেষ করে তার চোখের দিকে তাকানো নিষেধ।

শ্যাডো (Shadow) ছায়া
পৃধিবীতে রেকর্ডকৃত বহুসংখ্যক কুসংস্কারে একজন মানুষের ছায়া তার নিজের সাথে দুর্বোধ্যভাবে জড়িত থাকে। ছায়া যদি কোনো প্রকার আহত হয় তা তার মালিকের ওপর কঠিন প্রতিক্রিয়া ফেলতে পারে। বিগত দিনে দাবি করা হতো যে ছায়া প্রতিবিম্বের মতো প্রকৃতপক্ষে একজন মানুষের আত্মাকে ধারণ করে (এই কারণে একটি অতি পরিচিত প্রথা অনুযায়ী যে লোকটি তার আত্মাকে শয়তানের কাছে বিক্রয় করেছে তার কোনো ছায়া থাকে না)। এভাবে একটি ছায়ার যে ক্ষতি হবে সেই ক্ষতি প্রকৃত লোকটিরও হবে। বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে জাদুকরী ডাইনী অথবা অশরীরী শক্তি একজনের ছায়া চুরি করে নিতে না পারে। এই ধারণাটার মূলে রয়েছে সুনিশ্চিত সেই উপকথা যেখানে অতি পুরাতন গাঁথার বীর যোদ্ধাগণ তাদের শত্রুদের হত্যা করত তাদের ছায়ার ওপর ছুরির আঘাত করে। আজকাল পর্যন্ত এই বিশ্বাস চলে এসেছে যে কারো ছায়া মাড়িয়ে যেতে দেয়াটা খুবই দুর্ভাগ্যের ব্যাপার। এটাকে একটা শত্রুতামূলক কাজ বলে মনে করা হয়। কোনো কোনো দেশে এটাকে একটা চরম অপমানকর কাজ বলে গণ্য করা হয়। চীনদেশে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় শোকজ্ঞাপনকারীগণ এ ভয়ে কফিনের কাছ থেকে একটু দূরে সরে থাকে যে তাদের ছায়া যদি কফিনের ওপর পড়ে তবে মৃতের সাথে সেই ছায়ারও কবর হয়ে যেতে পারে।

ছায়াকে নিয়ে সর্বশেষ একটি কুসংস্কার হচ্ছে ছায়ার গঠনকে মেপে দেখা যখন একদল মানুষ ক্রিসমাস অথবা নববর্ষের দিনে একসাথে মিলে বসে। যদি দেখা যায় যে, একজনের ছায়ার সাথে তার মাথা দেখা যাচ্ছে না, তবে সেই ব্যক্তিটি আগামী বারো মাসের মধ্যে মারা যাবে।

শীপ (Ship) জাহাজ
কুসংস্কারের পথে চলতে গিয়ে ইতিহাসে বর্ণিত সকল প্রকার নাবিক, জেলে এবং অন্যান্য সমুদ্র অভিযাত্রিকেরা এবং জাহাজগুলো তাদের নিজস্ব নিয়ম-কানুন ও বিশ্বাস পালন করে এসেছে। বিশেষ করে নতুন জাহাজ নামানোর সময় যে ধর্মীয় আচরণবিধি মানা হতো তা ছিল যাত্রাকারী নাবিকদের জন্য খুবই জরুরি। প্রাচীনকালে বিশ্বাস করা হতো যদি কোনো নৌকা নামানোর সময় যথাযথভাবে কোনো রক্ত বলিদান না করা হয়ে থাকে তবে তার ওপরে বিপদ আসবে। অনেক সময় মানুষ বলি দেয়া হতো একটা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। মনে করা হতো এর দ্বারা নৌকাটি একটি নতুন জীবন পাবে এবং গভীর সমুদ্রের দেবতা তুষ্ট হবে। এই ধারণাকে পূর্ণ করতে গিয়ে তারা বর্বর ভাইকিংয়ের মতো আচরণ করত এবং জাহাজ নামানোর সময় তার তলে কয়েদীদের রেখে দিয়ে মারা হতো।

এক সময় রক্তপাত বন্ধ হয়ে তার স্থানে এলো মদ। তারপর ধারাবাহিকভাবে এলো স্যাম্পেইন। যার বোতলগুলোকে জাহাজের সমমুখভাগের সাথে পিটিয়ে ভাঙা হতো। এই অনুষ্ঠানটি আজ পর্যন্ত চালু আছে (যদি দুর্ভাগ্যক্রমে প্রথম পিটোনিতেই বোতল না ভাঙে তবে সেটা হতো খুবই খারাপ লক্ষণ)। একইভাবে আজকালও জাহাজ নামানোর সময় পতাকা দিয়ে সাজানো হয়। এটা হচ্ছে আগের দিনের প্রথায় নৌকাগুলোকে নামানোর সময় ফুল দিয়ে সাজানোর যে নিয়ম ছিল তারই ধারবাহিকতার প্রচলন। এটা করা হতো সমুদ্রের  দেবদবীদের সন্তুষ্ট করার জন্য।

শার্ট (Shirt) জামা
যেহেতু গায়ের চামড়ার ওপরেই শার্ট বা জামা পরা হয় সে কারণে মনে করা হয় যে এর দ্বারা পরিধানকারীর ভাগ্য নানাভাবে প্রভাবিত হয়ে থাকে। একটি ছোট শিশুর স্বাস্থ্য সম্বন্ধে কিছু ভবিষ্যদ্বাণী করতে হলে তার পিতামাতা তার শার্টটিকে একটা ঝর্ণার মধ্যে ছুড়ে ফেলে দেবেন, যদি শার্টটি ডুবে যায় তবে শিশুটির স্বাস্থ্যের জন্য বিপদ আছে কিন্তু সেটি যদি ভেসে থাকে তবে সবকিছু ঠিক আছে। এই ধারণাটা বাড়তে থেকে একজন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত পিতা তার শিশুকে নিজের গায়ের জামা পরতে দেয়-এর দ্বারা তারা তাদের কিছুটা শক্তি শিশুটির মধ্যে দিতে সক্ষম হয় বলে ধারণা করা হয়। একইভাবে অন্য কারো গায়ের জামা ধার করে পরতে হলে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে কারণ এর দ্বারা তার পাপগুলোও একসাথে ধার করে আনা হয়।

স্যু (Shoe) জুতা
সমস্ত জামা-কাপড়ের মধ্যে জুতা নিয়ে কুসংস্কার খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং টাকা-পয়সার দিক দিয়ে মূল্যবান কুসংস্কারগুলো এর সাথে জড়িত রয়েছে। পুরাতন জুতাকে ব্যাপকভাবে সৌভাগ্যের বিবেচনা করা হয়। আগেকার দিনে বিদায় নেয়া জাহাজের পেছনে পুরাতন বুট ছুড়ে মেরে জাহাজের নাবিকদের সৌভাগ্য নিশ্চিত করা হতো। সেই গাড়ির পেছনের বাম্পারে পুরানো জুতা রাখা হতো যে গাড়িতে সদ্য বিবাহিত দম্পতি তাদের বিবাহের দিনে ড্রাইভ করত। গাড়ির পেছনে জুতা দেয়ার প্রচলন চলে এসেছে বাইবেলীয় সময়কাল থেকেই। এর শুরু খুবই অসপষ্ট। যদিও পরামর্শ দেয়া হয়ে থাকে যে বরের পেছনে জুতা ফিকে মারার অর্থ হচ্ছে যে সে কনের পরিবারের নিকট থেকে সমস্ত দায়দায়িত্ব বুঝে নিয়েছে এবং তাকে তাই জুতা ফিকে দিয়ে স্মরণ করে দেয়া হলো।

যাইহোক ধর্মীয় প্রথাটির সর্বাধুনিক ব্যাখ্যা হচ্ছে যে ধরুন সেই জুতা বা বুটগুলো (আদর্শগতভাবে যা বাম পায়ের হতে হবে) সাধারণত দম্পতির সৌভাগ্য নিশ্চিত করবে অথবা বিশেষভাবে তাদের উর্বরতা বৃদ্ধি করবে। জুতা নিয়ে অত্যল্প কুসংস্কারগুলোর মধ্যে রয়েছে বর্তমানের অপ্রচলিত ধারণা যে, ঘরের মধ্যে একজোড়া পুরানো জুতো পুড়িয়ে ফেলা হলে ঘরের মধ্যে থেকে ছোঁয়াচে রোগ দূর হয়ে যাবে এবং কোথাও যাত্রার প্রাক্কালে এভাবে জুতা পোড়ানো ও একটা বুদ্ধিমত্তার কাজ ও সতর্কতা।

শুটিং (Shooting) গুলি ছোঁড়া
জেলেদের মতো যারা বন্দুক দ্বারা শিকার করে তাদেরও এক সময়ে অনেকগুলো কুসংস্কারী প্রথা প্রচলিত ছিল। এর মধ্যে রয়েছে একটা খারাপ দিনের শুটিং খারাপ ফলদায়ক হবে যদি সে প্রথম ছোঁড়া গুলিটি মিস করে। আর যদি একটি কুমারী মেয়ে বন্দুকের নলের ওপর দিয়ে লাফিয়ে যায় তাহলে তার শিকারে সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। নববর্ষের মধ্য রাত্রিতে আকাশের দিকে গুলি ছুঁড়ে মারলে এটা নিশ্চিত যে আগামী বারো মাসে শিকারীর লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে না। পথে একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীর একজন ধর্মযাজকে সাক্ষাৎ পাওয়া গেলে তা শিকারীর জন্য অশুভ এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকি পর্যন্ত আসতে পারে এবং দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কোনো শিকারকে শূকরের চর্বির সাথে মিশিয়ে কাউকে খেতে দিলে সে যদি পেটের গন্ডগোলে ভোগে তা ভালো হয়ে যাবে এবং বমি বমি ভাব থাকলে তা ভালো হয়ে যাবে।

সোপ (Soap) সাবান
সাধারণভাবে গৃহের অন্যান্য জিনিসের মতো সাবানের রয়েছে নিজস্ব পৌরানিক ইতিহাস। সাবান ও অন্যান্য প্রসাধনী সামগ্রী উপহার প্যাকেজ করার আধুনিক পদ্ধতির কিছুটা বিপরীতে প্রথাগতভাবে কাউকে একটা সাবান উপহার বা এমনি দেয়া দুর্ভাগ্যের। কারণ এর দ্বারা বন্ধুত্ব ধূয়ে নষ্ট হয়ে যাবে। যদি কারো হাতে একটা বারসোপ ভেঙে যায় একটা বন্ধুত্ব ভেঙে যাওয়ার আর একটি চিহ্ন। ইত্যবসরে স্কটিশদের কুসংস্কারে বলা হয় একজন যখন হাত ধোয় তখন তার হাত থেকে একটি বারসোপ পিছলে পড়ে যাওয়ার মানে হচ্ছে দুর্ভাগ্য আসা এমনকি এটাকে মৃত্যুর অমঙ্গল বার্তা বলেও ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। সবশেষে থিয়েটারের নায়ক নায়িকারা সব সময়েই তাদের নিজেদের সাবান নিজেরা সঙ্গে রাখে এবং থিয়েটার বা স্টেজ ত্যাগ করার সময় তা সাথে করে নিয়ে যায়। যদি পেছনে ফেলে যায় তার অর্থ হবে তারা আর কোনোদিনও সেখানে কাজ করতে পারবে না।

স্টার (Star) তারা
কুসংস্কারে সব সময়েই নক্ষত্রের জন্য একটা বিশেষ স্থান দেয়া হয়েছে। আজ পর্যন্ত সেই প্রাচীন বিশ্বাসগুলোর কতকটা এখনো পালিত হচ্ছে কোনো না কোনোভাবে। আসমানের ঘটনাগুলোকে পৃথিবীর আকস্মিক দুর্ঘনাগুলোর জন্য সতর্কবাণী হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। জ্যোতির্বিজ্ঞানে গ্রহগুলোর এক সারিতে আসার বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। তারা পৃথিবীর ওপর বসবাসকারী মানুষের দৈনন্দিন ভাগ্যের জন্য যেসব অমঙ্গলচিহ্ন বহন করে তার সব খুঁটিনাটি নিয়ে গবেষণা করে। স্বভাবত আদিমকালে তারাগুলোকে মনে করা হতো বিদেহী আত্মা বা ঈশ্বরের বাড়ি। কিন্তু খ্রিষ্টয়দের শুরুতেই তারা এটাকে পুণরায় ব্যাখ্যা দিয়ে এই বিশ্বাসে উপণীত হলো যে ওগুলো হচ্ছে সাধারণ পর্বত, যা মানুষের কৃত্রিম উপায়ে স্বর্গে আরোহনকে বাঁধা দেয়ার জন্য চেক পোস্ট হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। নক্ষত্র নিয়ে বিবিধ কুসংস্কারে যা আজ পর্যন্ত বর্তমান আছে তার মধ্যে রয়েছে এই ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা যে তাদের দিকে আঙুলি নির্দেশ করা যাবে না। কারণ এর দ্বারা ঈশ্বরকে রুষ্ট করা হয়, যার ফলে দোষী ব্যক্তিটির আঙুলি চির দিনের জন্য নির্দেশিত হয়ে থাকবে।