ঘটনা-১
রোগিণীর নাম লাবণী। বয়স বারো বছর। হালকা-পাতলা গড়নের মেয়ে লাবণী সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী। বাড়ি সিলেটের জকিগঞ্জে। তিন ভাইবোনের মধ্যে লাবণী সবার ছোট বড় আদরের। সবার আদরে আদরে বাড়ন্ত লাবণী ছাত্রী হিসেবে খুব মেধাবী না হলেও রেজাল্ট মোটামুটি ভালোই ছিল। কোনো ক্লাসে ফেল করেনি কোনো দিন এবং স্বভাব চরিত্র খুবই ভালো। ঠান্ডা মেজাজের। একদিন স্কুল থেকে বাড়ি এলো চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ নিয়ে এবং ডান হাত ঘাড়ের নিচ থেকে সম্পূর্ণ অবশ, কোনো শক্তি নেই। মেয়ের এই অবস্থা দেখে বাপ-মা দিশেহারা হয়ে গেল। কোথায় যাবে কার কাছে যাবে কোনো কূলকিনারা করতে পারল না। বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন উপদেশে কবিরাজের দ্বারস্থ হলে কবিরাজ মালিশ দেয়। সাত দিনে উপকার না হলে লাবণীকে নিয়ে তার বাবা অর্থোপেডিক্স ডাক্তার দেখান। রোগের ধরনের সঙ্গে লক্ষণের মিল না পাওয়ায় উন্নততর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয় লাবণীকে। ঢাকায় যত ধরনের আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা আছে তার সবই করানো হলো। সিটিস্ক্যান, এমআরআই, কালার ডপলার, নার্ভ কন্ডাকশন টেস্ট, নিউরোমাস্কুলার ট্রান্সমিশন টেস্ট আরো অনেক। কোথাও কোনো দোষ ধরা পড়ল না, মেয়ের বাবা হতাশ হয়ে গেলেন। লন্ডনে এক আত্মীয়ের সাথে ইতিমধ্যেই আলাপ হয়েছে মেয়েকে দরকার হলে সেখানে নিয়ে যাবেন। মেয়ের হাতের যে অবস্থা সেটা যে কেউ দেখলেই বুঝবে এটা তার জন্মগত সমস্যা কেননা লাবণী তার বাম হাত দিয়ে ডান হাতকে যেভাবে নাড়াচাড়া করছে তা শুধু জন্মগত প্যারালাইসিসের রোগীই এত অভিজ্ঞতার সঙ্গে করে থাকে। যে ল্যাবে তার এসব টেস্ট করানো হচ্ছিল সেখানে দেশী এক টেকনিশিয়ানের সঙ্গে পরিচয় হয় এবং তার সাজেশন মতো তাকে ওই ল্যাবেই বসেন এ রকম একজন বড় মাপের নার্ভের ডাক্তার দেখানো হয়। ডাক্তার সাহেব রোগের বিবরণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট পর্যালোচনা করে ভালো একজন মানসিক রোগের ডাক্তার দেখানোর পরামর্শ দেন। রোগের বিবরণ- কোএডুকেশনের বিদ্যালয়গুলোতে মেয়েরা কমন রুমে থাকে, টিচারের সঙ্গে শ্রেণীকক্ষে যায় আবার ক্লাস শেষে টিচারের সঙ্গে কমন রুমে ফিরে আসে।
প্রতিদিনের মতো অসুখের দিনও লাবণী টিচারের সঙ্গে শ্রেণীকক্ষে গেছে আবার তার সঙ্গেই কমন রুমে এসে অন্য মেয়েদের সঙ্গে মাঠের কোণে চাপকলে পানি খেতে গেছে। এই অপরাধে হেডমাস্টার তার রুম থেকে বের হয়ে এসে লাবণীর ডান হাতে অনেক আঘাত করেছে বেত দিয়ে। মার খাওয়া অবস্থাতেও লাবণী তার হাত মাস্টার মশায়ের সামনে প্রসারিত করে ছিল, মার শেষে মাস্টার সাহেব যখন জিজ্ঞাসা করল ‘কী লাগে?’ তখন লাবণী জবাব দেয় ‘জি না স্যার’ ওমনি সবার সামনেই তার হাত ঝুলে যায়। আর হাতে শক্তি এলো না কিছুতেই। শুধু পানি খেতে গিয়ে একটু হইচই করার অপরাধে প্রধান শিক্ষক এত বড় শাস্তি দিলেন! ঘটনার বর্ণনা মেয়ের বান্ধবীদের নিকট থেকে মেয়ের বাবা শুনে চিকিৎসকের নিকট বর্ণনা করেছিলেন। এরই মধ্যে আরো যে ঘটনা না বললেই নয় তা হলো হেডমাস্টারকে তিরস্কার করা হয়েছে। চিকিৎসার যাবতীয় খরচ বহন করবেন বলে ওয়াদাবদ্ধ হয়েছেন। অবশেষে লাবণীর বাবা বড় মাপের মানসিক রোগের ডাক্তার খুঁজতে গিয়ে মনোজগত সেন্টারের প্রফেসর ডা. এ এইচ মোহামমদ ফিরোজ স্যারের নিকট তার মেয়েকে নিয়ে আসেন। সমস্ত ইতিহাস শুনে দ্রুত আরোগ্য লাভ ও উন্নততর চিকিৎসার জন্য রোগিণীকে হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দিলেন। ভর্তির পর সেবনের জন্য ওষুধসহ রোগিণীর জন্য অ্যাব্রিয়েকশন থেরাপি সাজেস্ট করলেন। কেননা এই ধরনের রোগের সঙ্গে অনেক বড় ধরনের কনফ্লিক্ট লুকানো থাকে, যা পেশেন্ট কারো সঙ্গে শেয়ার করতে চায় না। এই জন্য পেশেন্টের আতঙ্কের মাত্রা বাড়তে থাকে এবং এক সময় তা শারীরিক উপসর্গে রূপ নেয়। লাবণীর বেলাতেও সে রকমই হয়েছিল। সবাই যেটা জানল আসলে ঘটনা তা নয়। লাবণী স্কুলের এক ছেলেকে ভালোবাসে, দেখা করে অত্যন্ত গোপনে। চিঠি আদান-প্রদান করে বইয়ের মধ্যে লুকিয়ে লুকিয়ে। যেদিন লাবণী মার খায় সেদিনও সে তার প্রেমিকের সঙ্গে স্কুলের পেছনে লুকিয়ে দেখা করে প্রেমপত্র দিচ্ছিল। যেটা প্রধান শিক্ষক দেখে ফেলে। মার দেয়া শেষে হেডমাস্টার যখন বলে কি ব্যথা লাগে তখন তার চোখের দিকে তাকিয়ে লাবণীর মনে হয়েছে এই মারই শেষ নয় এই প্রেমের অতি গোপন খবর হেড স্যার ঠিকই তার বাবা-মাকে বলে দেবেন তখন কী হবে? ছোট এই মেয়েটির নিকট পুরো পৃথিবী অন্য রকম মনে হয়েছে, বাড়িতে গেলে কী ধরনের শাস্তি হবে তা ভেবে আতঙ্কিত লাবণী ভয়ে যখন দিশেহারা তখন হঠাৎ সে দেখল তার ডান হাত অবশ, প্যারালাইসিস, হাতে একদম শক্তি নেই এবং আশ্চর্যের বিষয় এর জন্য যতটা দুশ্চিন্তা হওয়ার কথা ছিল ততটা হয়নি কিন্তু আতঙ্ক ছিল বেশি। যতদূর জানি লাবণীর মাস্টার সেই গোপন খবর আজও গোপন রেখেছেন, প্রফেসর ফিরোজ স্যারের আধুনিক চিকিৎসায় লাবণীও এখন সুস্থ হয়ে লেখাপড়া করছে, লাবণীর সঙ্গে মার দেয়ার সম্পর্ক থাকলেও লাবণীর হাতের প্যারালাইসিস মার খাওয়ার ব্যথায় হয়নি, মানসিক সমস্যার কারণে হয়েছিল।
ঘটনা-২
পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী রুনা আকতার। বয়স ১১ বছর ৬ মাস। কিছুদিন ধরে হাল্কা মাথাব্যথা হয়েছে এবং এ জন্য চোখের ডাক্তার দেখানো হয়েছে। কোনো রোগ ধরা পড়েনি। এরই মধ্যে হঠাৎ একদিন রুনার বুক ব্যথা, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট, দম বন্ধ হয়ে মারা যাওয়ার মতো অবস্থা, বুকের ওপর কে যেন ভারী বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে, চোখ উল্টিয়ে যাচ্ছে, সাদা মণি বের হয়ে যাচ্ছে, মাঝে মাঝে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে ইত্যাদি নানা উপসর্গ দেখা দিলে রুনার বাবা-মা আত্মীয়-স্বজন দিশেহারা হয়ে যায় এবং কার কাছে নেবে, কোন ডাক্তার দেখাবে ভেবে কোনো কূলকিনারা পায় না। অবশেষে হার্টের ডাক্তারের নিকট রুনাকে নিয়ে যায়। অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ডাক্তার হার্ট ভালো আছে বলে জানিয়ে দেয়। হতাশ হয়ে রোগীর আত্মীয়-স্বজন রুনাকে বাড়ি নিয়ে যায়। নানা মানুষের বিভিন্ন পরামর্শে জিন-ভূতের আছর, বদ বাতাস, খারাপ নজর, সন্ধ্যা বেলায় চুল খোলা রেখে ছাদে ঘুরে বেড়ানোর ফল ইত্যাদি নানা বিষয়ের সুচিকিৎসার জন্য হুজুর, কবিরাজ, পীর ফকির, দরগাহ মানত সবই করা হলো কিন্তু রোগীর অবস্থা দিন দিন খারাপই হতে থাকল। মাথার সমস্যা মনে করে নার্ভের ডাক্তারের নিকট গেলে সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারল এটা শারীরিক রোগ নয়, মানসিক রোগ। ভালো কোনো মানসিক রোগের ডাক্তার দেখালে এই রোগ ভালো হয়ে যেতে পারে। বড় মাপের মানসিক রোগের ডাক্তার কে? খোঁজ করতেই মনোজগত সেন্টারের প্রফেসর ডা. এ এইচ মোহামমদ ফিরোজ স্যারের খোঁজ পেয়ে রোগী রুনাকে নিয়ে সরাসরি মনোজগত সেন্টারে তারা হাজির হয়। মানসিক রোগের উন্নত ও আধুনিক চিকিৎসা কেন্দ্র হিসেবে খ্যাত মনোজগত সেন্টারে রোগী এলে প্রফেসর ফিরোজ স্যার রোগের বর্ণনা শুনে ও ধরন দেখে উন্নত চিকিৎসা গ্রহণের জন্য ভর্তি ও ওষুধ সেবনের নির্দেশনাসহ অ্যাব্রিয়েকশন থেরাপি সাজেস্ট করেন। অ্যাব্রিয়েকশন থেরাপি মানসিক রোগের উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতি, যেখানে কোনো ব্যথা বেদনা নেই, শুধু রোগী তার মনের জমাট বাঁধা দুঃখ, না বলা কথা, অব্যক্ত অনুভূতি ও আবেগের আবেগঘন বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।
রোগী যদি তার মনের কথা, বেদনার কথা, চাওয়া-পাওয়ার কথা, হতাশার কথা, কোনো অভিযোগের কথা, প্রেমের কথা, ব্যর্থতার কথা, কোনো দুর্ঘটনার কথা, আবেগ ও উচ্ছ্বাসের সাথে বের করে দিতে পারে বা অ্যাব্রিয়েকশনিস্ট যদি না বলা কথাগুলো বের করে আনতে পারেন আর গোপনীয়তা রক্ষা করতে পারে আর যদি স্যারের প্রেসক্রিপশন মোতাবেক প্যাশেন্ট নিয়মিত ওষুধ সেবন করে তবে এই রোগ দ্রুত সেরে যায়। রুনার ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনটি হয়েছে যেমনটি স্যার চেয়েছিলেন, রুনা দ্রুত আরোগ্য লাভ করে বাড়ি ফিরে গিয়েছিল। রুনা অতি অল্প বয়সের একটি মেয়ে কিন্তু এই বয়সেই তার মনের মধ্যে এক ধরনের শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল এবং সে খেয়াল করেছিল তার ক্লাসের কম্পিউটার টিচারকে দেখলে ভালো লাগত এবং এই ভালো লাগাটা যেন কেমন! এক নজর না দেখলে ভেতরটা হাহাকার করত, শুধু তাকে কখন কীভাবে দেখা যাবে এই ধ্যানেই মগ্ন থাকত রুনা। যেদিন কম্পিউটার স্যার স্কুলে আসত না সেদিন কিছু ভালো লাগত না, পড়া হতো না। নীরবে লুকিয়ে লুকিয়ে শুধু চোখের জল ফেলত আর যন্ত্রণার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য জ্বলন্ত কয়েল দিয়ে নিজের হাতে ছ্যাঁকা দিত। এভাবে যখন হাতের ক্ষতস্থান বাড়তে লাগল তখন সেটা লুকানোর জন্য বোরকা পরা শুরু করল। বাবা-মা যত খুশি হলো তার থেকে বেশি দুঃখ রুনার বুকে আঘাত করতে লাগল। কম্পিউটার স্যারকে কীভাবে তার অন্তরের কথাগুলো বলবে, বললে শিক্ষক মানুষ কীভাবে নেবে, জানাজানি হলে কতটুকু লজ্জা বা ক্ষতি হবে ভেবে ভেবে কোনো কূলকিনারা না পেয়ে দিশেহারা রুনা অন্তর জ্বালায় জ্বলতে লাগল। ভেতরের না বলা অনুভূতিগুলো যখন পাহাড়সমান, অন্তর জ্বালা যখন আরো তীব্র থেকে তীব্রতর, তারপরই তার অসুখের উপসর্গ শুরু হলো। ওয়ান সাইড লাভ। তাও অতি অল্প বয়সে! এত জ্বালা সহ্য করার ক্ষমতা এ পৃথিবীতে কয়জন মানুষের আছে? ভেতরের না বলা কথাগুলো অকপটে অ্যাব্রিয়েকশনিস্টের নিকট বলতে পেরে রুনাও খুশি, রোগীর উন্নতি দেখে স্বজনরাও খুশি। এই ধরনের উপসর্গ কারো মধ্যে দেখলে অবহেলা না করে দ্রুত মনোজগত সেন্টারে আধুনিক ও উন্নত চিকিৎসার জন্য আসুন।
ভেবে দেখুন
প্রায় পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয় কিছু মর্মান্তিক ও দুঃখজনক খবর, যা পড়লে মনটা খুবই খারাপ হয়ে যায়। যেমন-গ্রামে গঞ্জে পুরানো কূপ খনন করতে গিয়ে তিনজনের মৃত্যু, রাজধানীতে অমুক মহল্লায় পানির ট্যাংক পরিষকার করতে গিয়ে ৫ জনের মৃত্যু। সবক্ষেত্রে মৃত্যুর ধরন একই রকম-প্রথমে একজন নামে সে আর ফিরে না এলে, কোনো ডাকে সাড়া না দিলে আরো একজন নামে, সেও আর ফিরে না এলে সাহসী একজনকে নামানো হয় কিন্তু সেও যখন আর ফিরে না আসে তখন রীতিমতো হইচই পড়ে যায়। পরে যখন বিশেষ বাহিনীর সহযোগিতায় দেখা যায় যে সবাই মৃত তখন চারদিকে শোকের মাতমের সঙ্গে আতঙ্ক দেখা দেয় মৃত্যুর রহস্য নিয়ে। নানা জনে নানা কথা বলে কিন্তু এই সমস্ত মৃত্যুর কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আজও কেউ কোনো মাধ্যমে প্রচার করেছেন কিনা জানি না বিধায় আমি এই সমস্ত অপমৃত্যুর কারণ ও মৃত্যু রোধের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করছি মাত্র। ভূপৃষ্ঠ থেকে গভীরে যে কোনো ফাঁকা জায়গায় (যেখানে বাতাস চলাচল করে না) কিছু বিষাক্ত গ্যাস জমে যেগুলো বাতাস অপেক্ষা ভারী, যেমন কার্বন ডাই অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড। এই গ্যাসগুলোর সঙ্গে মানুষের রক্তে উপস্থিত লোহিত কণিকার রয়েছে গভীর টান। এই গ্যাসগুলো জীবনের জন্য মারাত্মক হুমকি এবং এদের প্রতি লোহিত কণিকার এই গভীর টানের কারণে মানুষের জীবন প্রদীপ দ্রুত নিভে যায়। লোহিত কণিকার অভ্যন্তরে একটি মূল্যবান উপাদান আছে যার নাম হিমোগ্লোবিন যার দায়িত্ব শুধু জীবন রক্ষাকারী অক্সিজেনের সঙ্গে বন্ধনে আবদ্ধ হবে এবং মানুষের জীবন বাঁচাবে। অথচ এই হিমোগ্লোবিনের জীবন রক্ষাকারী অক্সিজেনের পরিবর্তে জীবন ধ্বংসকারী কার্বন ডাই অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইডের সঙ্গে মিলনের প্রতি রয়েছে মারাত্মক আকর্ষণ। লোহিত কণিকার হিমোগ্লোবিনের সঙ্গে জীবন রক্ষাকারী অক্সিজেনের ১ঃ১ অনুপাত আকর্ষণে মিলন হয় অথচ কার্বন ডাই অক্সাইডের সঙ্গে মিলন হয় ১ঃ১০০ অনুপাত আকর্ষণে এবং কার্বন মনোক্সাইডের সঙ্গে মিলন হয় ১ঃ২০০ অনুপাত আকর্ষণে অর্থাৎ জীবন ধ্বংসকারী বায়বীয় বস্তুর প্রতি হিমোগ্লোবিনের এই তীব্র আকর্ষণের কারণে মৃত্যু অতি দ্রুত সংঘটিত হয়।
বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে মিলনের এই তীব্র আকর্ষণের কারণে মানুষ একবার শ্বাস নিলেই পাঁচ গ্রাম হিমোগ্লোবিন রিডুসড বা অকার্যকর হয়ে যায়। মানুষের শরীরে যতটুকু হিমোগ্লোবিন থাকে (কারো শরীরে যদি হিমোগ্লোবিন ১৩ গ্রাম/১০০ মিলিগ্রাম থাকে) এবং রক্তের পরিমাণ যদি ৫ লিটার হয় তাহলে ওই মানুষ ৪-৭ মিনিটের মধ্যেই মারা যেতে পারে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কারণে মাটির নিচে কুয়া/জলাধার, বিভিন্ন মাপের ট্যাংক তৈরি করা হয়ে থাকে এবং তা প্রয়োজনের তাগিদে সময়মতো পরিষকার-পরিচ্ছন্ন করা লাগে। যেহেতু এগুলো নিয়মমাফিক কাজ এবং সাথে মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে সেহেতু কিছু সাবধানতা অবলম্বন করা যেতে পারে যেমন খোলা মুখ যে কূপগুলো আছে তার ভেতরে নামার পূর্বে একটি জ্বলন্ত কুপি বাতি একটু দূর থেকে সাবধানতার সাথে কূপের অভ্যন্তরে প্রবেশ করানো যেতে পারে। কূপের গভীরে প্রবেশের সময় যদি কুপি বাতি নিভে যায় তাহলে সে কূপে নামা নিরাপদ নয়। সে ক্ষেত্রে কূপে নামার পূর্বে কূপের ভেতরে ব্লোয়ারের সাহায্যে বাইরের বাতাস প্রবেশ করানো যেতে পারে। এতে জীবনের ঝুঁকি কমবে আর যেগুলো মুখ বন্ধ কূপ আছে সে সমস্ত কূপে নামার পূর্বে রুটিনমাফিক ভেতরে ব্লোয়ারের সাহায্যে বাইরের বাতাস ঢুকানোর পরই কেবল কূপের অভ্যন্তরে প্রবেশ করা উচিত।
জেনে রাখুন
অনেক মানুষ জানেন যে শরীরের সবচেয়ে বড় অর্গান লিভার অথবা কলিজা, ব্রেন অথবা হার্ট ইত্যাদি। আসলে শরীরের সবচেয়ে বড় অর্গান হলো চামড়া যা মানুষের সমস্ত শরীর মুড়িয়ে রাখে। একজন পরিণত বয়সের মানুষের চামড়ার ওজন ৪ কেজির মতো। বিশাল এই শারীরিক অঙ্গের কাজও খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও বিচিত্র। পৃথিবীর জলে স্থলে অনেক প্রাণী আছে যারা জীবন, যৌবন ও আহারের জন্য শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের রঙ বদল করে যা সংঘটিত হয় চামড়া বা স্কিনের মাধ্যমে। স্কিনের এই রঙ বদলের নাম কেমোফ্লেজ। ইঙ্গিতবহ এই কেমোফ্লেজ এক ধরনের ভাষা যাকে শারীরিক ভাষা বলে, যা মানুষেরও আছে! স্কিনের রূপ, রঙ, গন্ধ, লাবণ্যতা, বিভিন্ন রেখা ও ক্রিয়া অনেক ভাষার জন্ম দেয় যা পড়ে অনেক বিষয় যেমন-বয়স, জীবন-যৌবন, আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখ, হতাশা, বিষণ্নতা অনুধাবন করা যায়। কথায় আছে face is the mirror of mind.
আমাদের শরীরের ভেতরে এমন সব কর্মকাণ্ড প্রতিনিয়ত ঘটে যাচ্ছে যা রীতিমতো ভয়ঙ্কর। সবাই জানে মানুষের হার্ট অটোমেটিক চলে কিন্তু তা নয়, সত্যি হলো হার্টকে খুবই যুদ্ধ করে চলতে হয় কেননা ভ্যাগাচ নামে একটি নার্ভ আছে যা সারাক্ষণ হার্টকে বন্ধ করে দিতে চায় এবং সুযোগের সন্ধানে থাকে, পক্ষান্তরে সিমপেথেটিক নার্ভ হার্টকে সচল রাখার জন্য প্রাণান্তকর পরিশ্রম করে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে যদি এক মুহূর্তের জন্য সিমপেথেটিক নার্ভ পরাজিত হয় তাহলে ভ্যাগাচ নার্ভ হার্টকে চিরতরে বন্ধ করে দেবে। আরো খবর হলো অনেকে মনে করেন হার্ট খুব কর্মঠ কিন্তু গোপন তথ্য হলো হার্ট খুব ফাঁকিবাজ এবং আরামপ্রিয়। প্রতি .৮ সেকেন্ড সাইকেলে .২ সেকেন্ড আরাম করে অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টায় ৬ ঘণ্টা আরাম করে এবং নিজের জন্য যে রক্ত প্রয়োজন সেটুকু নেয়ার জন্যও সে পরিশ্রম করে না, সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ রক্ত সরবরাহ শেষে যতটুকু তলানি এওর্টাতে (হার্ট থেকে যে মোটা ধমনীর সাহায্যে সমস্ত শরীরে রক্ত সরবরাহ হয় তাকে এওর্টা বলে) থাকে সেখান থেকে একটু রক্ত এওর্টার দরজা বন্ধ হলে পায়। শরীরে এমন কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নেই যে কিনা হার্টের মতো করে নিজের খাবার সংগ্রহ করে। এই জন্য অনেকেই হার্টকে বেকুব বলে কেননা সে জানে না সে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ। শরীরের সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ রক্ত সরবরাহ পাওয়ার জন্য হার্টের পানে চেয়ে থাকে অথচ সে নিজের সরবরাহ পাওয়ার জন্য অন্যের ওপর পুরো নির্ভরশীল হয়ে থাকে।
রক্তনালির (ধমনী) মধ্যে রক্ত চলাচল করে এটা স্বাভাবিক সবাই জানে কিন্তু আপনারা জেনে আশ্চর্য হবেন যে এই চলাচলের মধ্যে কত যুদ্ধ ধমনীর অভ্যন্তরে নীরবে হয়ে যাচ্ছে তার অন্ত নেই। রক্ত চলাচলে দুইটা প্রেসার নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করে সারাক্ষণ, তার একটি হলো হাইড্রোস্ট্যাটিক প্রেসার তার সারাক্ষণ কাজ হলো রক্তকে কখন ধমনী থেকে বের করে দেবে সেই সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। পক্ষান্তরে অন্য একটি প্রেসার আছে যার নাম অসমোটিক প্রেসার সে সব সময় চেষ্টা করে যাচ্ছে রক্তনালি থেকে যেন কোনোভাবেই রক্ত বের হয়ে না যায় তাহলে মানুষের জীবন প্রদীপ নিভে যাবে।
রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখা বা থাকা নির্ভর করে আরো একটি যুদ্ধ জয়ের ওপর আর সেটি হলো রক্তের মধ্যে প্রোস্টাসাইক্লিন নামে একটি উপাদান আছে যার ধর্মকর্ম হলো রক্তনালি থেকে রক্ত ঝরানো এবং ঝরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করা কিন্তু রক্তে অন্য একটি উপাদান আছে যার নাম থ্রোমবক্সেন এ-২, সে কোনোমতেই রক্ত ঝরতে দেয় না। থ্রোমবক্সেন এ-২ জয়ের কারণেই সারাক্ষণ আমাদের শরীরে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকে।
আমাদের শরীরে দুটি ফুসফুস আছে সবাই জানে। শ্বাস-প্রশ্বাস চালিয়ে আমাদের বাঁচিয়ে রাখে বা রাখাই ফুসফুসের কাজ। ২৪ ঘণ্টায় এই ফুসফুসের মধ্যে ১০,০০০ লিটার বাতাস প্রবেশ করে। এত বিশাল এই জীবন রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠা যে কিনা দৈনিক দশ হাজার লিটার বাতাস নিয়ে কারবার করে সেও অলস প্রকৃতির। আপনারা জেনে আশ্চর্য হবেন যে এই ফুসফুসই ৩০-১০০ বার শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়ার সময় অন্তত একবার বন্ধ হয়ে যেতে চায় সেই জন্য শ্বাই বা হাই এসে এই ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে ফুসফুসকে বিরত রাখে, বিশেষ করে ঘুমের সময় শরীর যখন নরম হতে থাকে তখন ফুসফুস কলাপস (বন্ধ) করার জন্য বেশি বেশি সুযোগ নিতে চায়, ঠিক তখন শ্বাই বা হামিও ঘন ঘন আসতে থাকে এবং ফুসফুসকে বন্ধের হাত থেকে রক্ষা করে। এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় সেটা হলো অনেকেই মনে করে থাকেন যে হাই বা হামির পর ঘুম আসে, আসলে প্রকৃত সত্য হলো ঘুমের ভাব আসার পরই হাই বা হামি আসে, হামি এমন এক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ফুসফুসের মধ্যে স্বাভাবিকের চেয়ে তিনগুণ বেশি বাতাস প্রবেশ করে আর এই অধিক পরিমাণ বাতাসের জন্যই ফুসফুস ফুলে উঠতে বাধ্য হয় বিধায় আর বন্ধ হতে পারে না।
শরীরের অভ্যন্তরে স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডের অন্তরালে প্রতিনিয়ত যে যুদ্ধ সংঘটিত হচ্ছে এবং যুদ্ধ জয়ের মধ্যে যে আমাদের বেঁচে থাকা নির্ভর করছে, পাঠকগণ নিশ্চয় বুঝতে পারছেন আমাদের বেঁচে থাকা সত্যি আশ্চর্যজনক।



