Skip to main content

বাড়তি ওজন কমান

ড. গৌতম দাশগুপ্ত

মোটা হওয়ার কারণ
অতিরিক্ত খাওয়ার জন্যই ওজন বেশি বাড়ে। খিদে পেলে তবেই খান, একটু হিসাব করে খান। অনেকে মনে করেন তিনি খাওয়ার জন্য মুটিয়ে যাচ্ছেন না; কিন্তু বাস্তবতা হলো, মোটা হওয়ার পেছনে বেশি খাওয়াই প্রধান কারণ।

  • খুব তাড়াতাড়ি খাবার খেলে অল্প সময়েই বেশি খাওয়া হয়ে যায়। খাওয়ার প্রয়োজন নেই, অথচ ভালো খাবার দেখে খেতে ইচ্ছা করে বলে অনেকেই সারা দিনে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি খেয়ে ফেলেন, যা শরীরে জমা বাড়তি মেদের কারণ।
  • যথেষ্ট পরিমাণ শারীরিক পরিশ্রমের অভাবে ওজন বাড়তে পারে। এক্ষেত্রে কতটুকু খেলেন তার চেয়ে জরুরি কতটুকু পরিশ্রম করলেন সেটা।
  • বংশগত কারণে অনেকের মোটা হওয়ার প্রবণতা থাকে। এদের জিন শরীরে চর্বি জমার হার বাড়িয়ে দেয়। তারা খাবার বেশি খেলে এবং শক্তি ক্ষয় কম হলে স্বাভাবিকভাবেই ওজন বেড়ে যায়।
  • বিভিন্ন রোগের কারণে (বিশেষত হরমোনজনিত) মোটা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্বাভাবিক উপায়ে ওজন কমানো
সবচেয়ে ভালো উপায় হলো এমন খাদ্য তালিকা বা ডায়েট চার্ট মেনে চলা, যাতে বেশি পরিমাণে কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট বা জটিল শর্করা ও ফাইবার (আঁশযুক্ত খাবার) আছে, মাঝারি পরিমাণে প্রোটিন আছে এবং স্বল্প পরিমাণে ফ্যাট আছে। যারা অফিসে যান, তারা দুপুরের খাবার অফিসে যাওয়ার সময় খেয়ে নাশতাটা অফিসে লাঞ্চ হিসেবে নিয়ে যান।
 
ডায়েট টিপস

  • আলু-কুমড়া-কাঁচকলা খাবেন না।
  • তেলে ভাজা কিছু খাবেন না তা বেগুন, পটল ভাজা কিংবা ভুজিয়া যাই হোক।
  • অ্যালকোহল, অ্যানার্জি ড্রিংক এবং কোমল পানীয় এড়িয়ে চলবেন।
  • চিনি একেবারেই খাবেন না। সুইটনার বা কৃত্রিম মিষ্টি উৎপাদক খাওয়া চলতে পারে।
  • খাসির মাংস ও চিংড়ি একেবারেই খাবেন না।
  • খাবারে ফাইবার, ভিটামিন, মিনারেল এবং অ্যান্টি অক্সিডেন্ট যথেষ্ট পরিমাণে থাকে, সেদিকে লক্ষ রাখুন।
  • বয়ঃসন্ধি এবং ঋতুস্রাব বন্ধ হওয়ার কাছাকাছি বা পরে মহিলাদের ক্যালসিয়ামের প্রয়োজনীয়তা বেশি পড়ে। তাই অন্যান্য সময়ের চেয়ে এই সময় দই, দুধ বা ছানা খাওয়া প্রয়োজন।
  • ত্বক ও চুল ভালো রাখার জন্য কিছু নির্দিষ্ট খাবার প্রতিদিন ডায়েটে রাখা জরুরি।
  • প্রতিদিনের ডায়েটে ঢেঁকিছাঁটা চাল বা আটা এবং বিভিন্ন ধরনের শস্য রাখুন। কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট, যেমন-লাল আটার পাউরুটি, আলু, ভাত, ওট, বার্লি এবং ব্রাউন রাইস বা ঢেঁকিছাঁটা চাল খাবেন প্রয়োজনমতো।
  • মুটিয়ে যাওয়া কমিয়ে সুস্থ থাকার জন্য প্রতিদিন যথেষ্ট পরিমাণে ফল এবং শাকসবজি খান। সব ধরনের শাকসবজি বা ফল আপনার পছন্দ না হলে খেতে খুব খারাপ লাগে না এমন কোনো একটি ফল রাখুন প্রতিদিন ডায়েটে। মৌসুমি ফল খেতে পারলে সবচেয়ে ভালো হয়।

অসময়ে ক্ষুধা পেলে কী করবেন
অসময়ে ক্ষুধা পেলে না খেয়ে থাকার দরকার নেই। হালকা কিছু খান। দুপুর ও রাতের খাবারের মাঝে তিন-চার ঘণ্টা পরপর তেল ছাড়া ভাজা ছোলা-মুড়ি খান। ফলও খেতে পারেন। লাউ বা অন্যান্য সবজি বা সিদ্ধ শাকসবজিও খেতে পারেন। রাতে বিশেষ করে ঘুমাতে যাওয়ার ঠিক আগে কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার কম খান।
 
বাড়িতে ব্যায়াম
বাড়িতে কিছু ব্যায়াম করুন। সময় একেবারেই কম লাগবে। এতে আপনি ফিট থাকবেন এবং অতিরিক্ত মেদও শরীরে জমবে না।

  • বাড়ির মধ্যে হাঁটাচলা করাটাও এক ধরনের ব্যায়াম। আপনার বাড়িতে যদি সিঁড়ি থাকে তাহলে কয়েকবার ওই সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করুন।
  • বিভিন্ন ধরনের স্ট্রেচিং এক্সারসাইজ যেমন-আর্ম স্ট্রেচিং বা লেগ লিফটিং করতে পারেন। এতে শরীরে রক্ত চলাচল ভালো হবে এবং বিভিন্ন অংশের অতিরিক্ত চর্বিও ঝরে পড়বে।
  • হার্ট সুস্থ রাখার জন্য জগিং খুব ভালো ব্যায়াম। যেকোনো জায়গায় আপনি সপট জগিং বা দাঁড়িয়ে ব্যায়াম করতে পারেন। এমনকি টিভি দেখতে দেখতে বা গান শুনতে শুনতেও জগিং করা সম্ভব। শুধু উপযুক্ত জুতা পরতে ভুলবেন না, যাতে আপনার পায়ের ওপর কোনো রকম বাড়তি চাপ না পড়ে।
  • হাত দুটি সোজা করে ওপরের দিকে রাখুন। পায়ের পাতার ওপর ভর দিয়ে যতটা পারেন জোরে লাফান। মাটিতে নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গে আবার লাফান। কোনো বিরতি দেবেন না। এভাবে টানা এক মিনিট লাফান। এরপর এক মিনিটের বিরতি দিয়ে আবার শুরু করুন। দুই-তিনবার এভাবে ব্যায়াম করুন।
  • পুশ-আপ বা কোনো কিছু দুই হাতে নিয়ে ওঠানো-নামানো করতে পারেন। এই ব্যায়াম আপনার বুক ও হাতের মাংসপেশির শক্তি বাড়ায়। মাটির ওপর উল্টো হয়ে শুয়ে পড়ুন। এরপর দুই হাতের সাহায্যে মাটি থেকে ওঠার চেষ্টা করুন। খেয়াল রাখবেন, যেন আপনার হাঁটুতে কোনো রকম ভাঁজ না পড়ে। শুরুতে মোটামুটি পাঁচ থেকে ১০ বার এভাবে চেষ্টা করুন। সকালে একবার এবং বিকেলে একবার পুশ-আপ করতে পারেন।
  • পেটের মাংসপেশির শক্তি বাড়ানোর জন্য সিট-আপ জাতীয় ব্যায়াম করতে পারেন। মাটিতে সোজা হয়ে শুয়ে পড়ুন। হাঁটু দুটি ভাঁজ করুন। ডান হাতটা বাম কাঁধের ওপর এবং বাম হাতটা ডান কাঁধের ওপর রাখুন। এরপর আস্তে আস্তে ঊর্ধ্বাঙ্গ মাটি থেকে তোলার চেষ্টা করুন। এ রকম পজিশনে দুই-তিন সেকেন্ড থাকুন। তারপর আস্তে আস্তে আবার স্বাভাবিক অবস্থানে ফিরে আসুন। শুরুতে তিন থেকে পাঁচটি সিট-আপ যথেষ্ট হবে।
  • স্কিপিং করলেও ভালো ফল পাবেন। তবে নিয়মিত করতে হবে।

পরোক্ষ উপায়ে ওজন কমানো
ব্যায়াম করা বা ডায়েট প্ল্যান মেনে চলা সম্ভব না হলে পরোক্ষ উপায় ভেবে করতে পারেন। বডি টোনিং এবং বডি শেপিংয়ের জন্য রয়েছে তেমনি কিছু বিশেষ থেরাপি। তবে সে ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। কারণ সব থেরাপি সবার জন্য নয়।
 
বডি থেরাপি বা বডি টাকিং
মাসল টোন-আপ করতে সাহায্য করে এই থেরাপি। শরীরের বিভিন্ন প্রেশার পয়েন্টে অ্যান্টি সেলুলয়েড প্রোডাক্ট ব্যবহার করে ম্যাসাজ দেয়া হয় এই থেরাপিতে। এর ফলে যোজক কলা শক্ত হয়, চর্বিগুলো নির্দিষ্ট আকৃতিতে আসে এবং জমে থাকা ক্ষতিকারক পদার্থ বেরিয়ে যায়।
 
বডি ফার্মিং বা বডি কনটোরিং
ওজন কমানোর সময় ত্বক এবং মাসলের মধ্যে জমে থাকা মেদ ঝরে গিয়ে একটি ফাঁকা অংশ তৈরি হয়। এর ফলে চামড়া ঝুলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। সে জন্য বডি ফার্মিংয়ের সাহায্যে ত্বক টানটান এবং সুন্দর করে নিতে পারেন।
 
যা করবেন, যা করবেন না

  • কোমল পানীয় একেবারেই খাবেন না। একটা কোমল পানীয় মোটা হওয়ার ঝুঁকি ৬০ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়। তাই তেষ্টা পেলে পানি খান। বাইরে কোথাও গেলে পানি সঙ্গে নিয়ে যান। প্রয়োজনে কিনে নিন। কিন্তু কোমল পানীয় বা সফট ড্রিংক এড়িয়ে চলুন। কোনো পানীয় খাওয়ার আগেও ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শ নিন।
  • কখনো না খেয়ে ডায়েট করবেন না। কারণ এ পদ্ধতিতে ওজন কমলেও শরীরে কিছু স্থায়ী ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
  • রাতে ভালোভাবে ঘুমান। কারণ ঘুম ভালো না হলে ক্লান্তি কমবে না। আর শরীর ক্লান্ত থাকলে মুড ভালো থাকে না। ফলে পরদিন মুড ভালো রাখার জন্য বেশি খাওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যায় এবং ওজন বেড়ে যায়।
  • বারবার অল্প করে খান। কারণ সারা দিনে একবার-দুইবার খেলে বেশি খাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু বারবার খেলে পেট ভর্তি থাকে। তাই দুপুর বা রাতের খাবারের সময় অবশ্যম্ভাবীরূপে কম খাওয়া হয়।
  • আপনি যদি মাছ খেতে পছন্দ না করেন কিংবা নিরামিষ খাবার খান, তাহলে ডায়েটিশিয়ানের সঙ্গে পরামর্শ করে মাছের পরিবর্তে মুরগি বা কোনো নিরামিষ খাবার খেতে পারেন।