ড. এ ব্যানেট বলেছেন যে, দীর্ঘদিন যাবৎ যারা ডায়াবেটিসে ভুগছেন তাদের মাঝে ডিপ্রেশন নামক গুরুতর মানসিক রোগ হওয়ার ঝুঁকি অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি। ড. এডওয়ার্ড গ্রিগ ও তার সহকর্মীরা একটি গবেষণাতে দেখান যে, যারা ১৫ বছর বা তার চেয়ে বেশি সময়ব্যাপী টাইপ-২ ডায়াবেটিসে ভুগছে তাদের-
- মনোযোগে ঘাটতি
- স্মরণশক্তি কমে যাওয়া
- ভাষার প্রায়োগিক দক্ষতা হ্রাস
চোখ ও হাতের নানা সাইকোমটর ক্রিয়ার সমস্যা ইত্যাদি দেখা দিয়ে থাকে। তারা উল্লেখ করেছেন যে, ডায়াবেটিস টাইপ-২ শারীরিক রোগ হলেও এতে যেহেতু নানা ধরনের মানসিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয় সেহেতু এটির সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে-
- ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবনে
- পারিবারিক জীবনে
- পেশাগত জীবনে
- চলমান জীবনের নানা পর্যায়ে
সেহেতু ক্লিনিসিয়ানদের যারা দীর্ঘদিনব্যাপী বয়স্ক ডায়াবেটিস রোগীর চিকিৎসা করে আসছেন তাদের উচিত বিভিন্ন সাক্ষাতে রোগীর জ্ঞানীয় প্রক্রিয়ার দক্ষতা নিরীক্ষা করা। জ্ঞানীয় প্রক্রিয়া বা কগনিশন বা অন্য কোনো মানসিক প্রক্রিয়াতে অসামঞ্জস্যতা পরিলক্ষিত হলে রোগীকে অবশ্যই মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া উচিত।
যারা ডায়াবেটিস টাইপ-২ অর্থাৎ ইনসুলিন অনির্ভর ডায়াবেটিস মেলাইটিস রোগটিতে ভুগছেন তাদের বেলায় মন ও মানসিক নানা প্রক্রিয়ায় গণ্ডগোল দেখা দিতে পারে। বিশেষত যেসব মানসিক প্রক্রিয়া এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেগুলো হলো-
- স্মৃতি-বিস্মৃতির প্রক্রিয়া
- মনোযোগ দেয়ার দক্ষতা
- জ্ঞানীয় বা কগনিটিভ প্রক্রিয়াতে অসামঞ্জস্যতাবোধ ও
- অন্যান্য সাধারণ উচ্চতর মেন্টাল বা সাইকিক ফাংশন বা উচ্চতর মানসবৃত্তি ইত্যাদি।
বোস্টনে গত ছয় বছরব্যাপী ৯৫০০ জন নারী যাদের বয়স ৬৫-এর উপরে ছিল এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন তাদের ওপর মেন্টাল বা মানসিক ক্রিয়ার পরীক্ষায় দেখা গেছে যে, তাদের জ্ঞানীয় স্কোর অন্যান্য সুস্থ নারীদের চেয়ে অনেক কমে গিয়েছিল। পরবর্তী ৩-৬ বছরে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে ভোগা নারীদের মেন্টাল ফাংশনে আরো ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়েছে।
তবে ডায়াবেটিস রোগ দীর্ঘ অনেক বছর পরিবাহিত হওয়ার পর তা কীভাবে মানসিক প্রক্রিয়াকে আক্রান্ত করে তা আজো মনোচিকিৎসক ও ক্লিনিশিয়ানদের কাছে রহস্যের বিষয়। তাই টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর অবশ্যই ডাক্তারের উপদেশমতো চলতে হবে। সতর্কতার সাথে ব্লাড সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। সাথে খাবার-দাবার নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, ব্যায়াম এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ডাক্তারের নির্দেশমতো ইনসুলিন নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা ডায়াবেটিস রোগীদের নিয়ে যে স্টাডি পরিচালনা করেছিলেন তার মূল উদ্দেশ্য ব্রেন বা মস্তিষক বা মন বা আচরণে অস্বাভাবিকতা ইত্যাদি ছিল না। তথাপি বেরিয়ে এসেছে অনেক তথ্য। ডায়াবেটিস রোগটিতে রক্তনালির ভেতরের দিকের গাত্রে দিনের পর দিন চর্বি জমে ভেতরের গহ্বর বা লুমেনকে অনেক ছোট করে দেয়, ফলে মস্তিষেক রক্তপ্রবাহ ও রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক ব্যাহত হতে পারে। কেননা উচ্চ রক্তচাপ বা হাই ব্লাডপ্রেসার ডায়াবেটিসের একটি অতি প্রচলিত ঘটনা।
যারা ১৫ বছর বা তার অধিককালব্যাপী ডায়াবেটিসে ভোগে তাদের অনেকের স্ট্রোক বা মস্তিষেক রক্তক্ষরণ হতে পারে। অনেকেই স্ট্রোক পরবর্তী নানা মানসিক রোগ যেমন-
- কাউকে চিনতে না পারা
- স্মরণশক্তি হ্রাস
- বিষণ্নতা
- মনোযোগের ঘাটতি
- অল্পতেই বিরক্তভাব ইত্যাদিতে ভুগে থাকে। এদের জরুরি ভিত্তিতে মনোচিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত। ডায়াবেটিস রোগটিকে কেন মন ও মানসিক প্রক্রিয়া আক্রান্ত হয় তা সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা বলেন যে, এটির সাথে ইনসুলিন নামক হরমোনের বিপাকীয় জটিলতাই মূল কারণ। মস্তিষক ইনসুলিনের প্রভাবে কীভাবে আচরণ করে, প্রতিক্রিয়ান্বিত হয় সেটিও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকে। এ তথ্য প্রকাশ করেছেন ড. ব্যানেট, এমডি, পিএইডি।
আজকের দিনে ডায়াবেটিসের সাথে সমন্বিত হয়ে কেন মানসিক অসুখ হয় তার ব্যাখ্যা হলো ডায়াবেটিস-২তে যারা ভুগছেন তাদের কোষসমূহ গ্লুকোজকে প্রক্রিয়াজাত করার জন্য ইনসুলিনকে ব্যবহার করতে পারে না। এ অসুখটিতে ব্রেনের স্নায়ুকোষ বা নার্ভ সেলগুলো তাদের সুষ্ঠুভাবে মানসিক কাজ চালানোর মতো পর্যাপ্ত গ্লুকোজ সঞ্চিত করে রাখতে পারে না এবং প্রয়োজনমতো তা ব্যবহারও করতে পারে না। তাই মস্তিষক গবেষকরা বলেছেন যে, আলঝিমারস অসুখ বা স্মৃতিভ্রংশতা রোগ ও গ্লুকোজ বিপাক মস্তিষেকর অক্ষমতার কারণে হতে পারে।
সবচেয়ে মূল্যবান কথা হলো শারীরিক বা মনোগত যে কারণেই মানসিক রোগ হোক তার জন্য চাই সুষ্ঠু মনোচিকিৎসা। একটি মানসিক রোগকে বাড়তে দিলে তার যেমন তীব্রতা বাড়তে পারে ঠিক তেমনি এ থেকে অন্য মানসিক বৈকল্যের আবির্ভাব হয়ে ব্যক্তির-
- কর্মজীবন
- ব্যক্তিগত
- পারিবারিক জীবনে সর্বনাশ নিয়ে আসতে পারে। মানসিক রোগ আজকের বিশ্বে গোপনীয় বা লজ্জার কোনো বিষয় নয়। মানসিক রোগ যে কারোর যে কোনো সময় হতে পারে। দেহ রোগের যেমন চিকিৎসা আছে, তেমনি মানসিক রোগেরও চিকিৎসা রয়েছে। মানসিক রোগ মানুষেরই হয় অন্য কোনো প্রাণীর নয়।



