চাকরিজনিত স্ট্রেসের কারণে প্রতি বছর আমেরিকাতে অন্তত ২০০-৩০০ বিলিয়ন অতিরিক্ত খরচ হয়ে থাকে। এই স্ট্রেসের বা মনোদৈহিক চাপের শিকার হয়ে কতক কর্মচারী-
- দীর্ঘদিন অফিসে যান না
- তাদের কর্মে বা পেশায় ফলপ্রসূতা অনেক পরিমাণে হ্রাস পায়
- চাকরিজীবীদের চাকরি পাল্টানোর দুর্ঘটনা ইত্যাদি ঘটে থাকে
সাম্প্রতিক এক গবেষণা সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, চাকরিজনিত বা পেশাগত স্ট্রেস বা মনোশারীরিক চাপ সইতে না পেরে প্রতি বছর শতকরা ৪০ ভাগ আমেরিকান চাকরিজীবী তাদের পেশা বদলে থাকে। আরেক সমীক্ষায় বেরিয়ে এসেছে যে, নতুন এক্সিকিউটিভ বা অফিস কর্মকর্তাকে গড়তে বা কাজের উপযোগী করতেই প্রায় ১-২.৫ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়ে থাকে ও অন্য কর্মচারীদের কাজ শেখাতে ২-১৩ হাজার ডলার খরচ হয়ে থাকে।
ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল ১৯৯৭ সালে স্ট্রেসের ওপরে দুটো গবেষণা চালিয়েছিল। সম্প্রতি তারা ঘোষণা করেছে যে, পেশাগত বা চাকরিজনিত স্ট্রেস বা মনোদৈহিক চাপ করোনারি হার্ট ডিজিজের অন্যতম কারণ।
জাপানে পরিচালিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, স্ট্রেসের কারণে-
- মস্তিষেক রক্তক্ষরণ
- মস্তিষেকর রক্তনালি আঘাতপ্রাপ্ত হওয়া
- রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া
- মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া ইত্যাদি সাধারণ ঘটনা
আমেরিকায় অবস্থিত পেশাগত নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক জাতীয় সংস্থা ঘোষণা দিয়েছে যে, নিকট ভবিষ্যতে মনোশারীরিক চাপ বা চাকরিজনিত স্ট্রেস ডিসঅর্ডারের কারণে অনেক কর্মকর্তা, কর্মচারী বা কর্মকাজের বা পেশার অযোগ্য হয়ে দাঁড়াবে।
ইন্টারন্যাশনাল সার্ভে রিসার্চ কর্পোরেশন বলেছে যে, শিকাগোতে পরিচালিত এক গবেষণা সমীক্ষায় তারা দেখতে পেয়েছেন আত্মবিশ্বাসের অভাব (স্ট্রেসের জন্য), নৈতিক অভাব ও চাকরিজনিত অস্থিরতা, দুর্ভাবনায় ইত্যাদিতে ভুগে ১৯৯৮ সালে শতকরা ২২ জন চাকরি হারিয়েছেন। বর্তমানে এ সংখ্যা নিঃসন্দেহে আরো অনেক বেশি। ১৯৯৬ সালে এ চাকরি হারানোর হার বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৪৬%।
ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বর্তমানে স্ট্রেস বা মনোদৈহিক চাপকে বিশ্বব্যাপী মহামারী বলে ঘোষণা করেছে।
আমেরিকার শ্রম পরিসংখ্যান সংস্থা বলেছে যে, কর্মস্থলে ইনজুরির চতুর্থ কারণ হলো স্ট্রেসের কারণে মনোদৈহিক প্রতিক্রিয়া বা নিউরোটিক রিঅ্যাকশন। ১৯৯৩ সালে দেখা গেছে যে, ঔড়ন ঝঃৎবংং বা পেশাগত মনোদৈহিক জটিলতার কারণে প্রতিবছর অনেকের অন্তত ২৫ দিন করে নষ্ট হয়েছিল।
পেশাগত নিরাপত্তা ও হেলথ ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ঘোষণা করেছে যে, শতকরা ২৫ ভাগ কর্মজীবী তাদের পেশাকে সবচেয়ে বড় স্ট্রেস হিসেবে বিবেচনা করে থাকে।
হাসির আছে অনেক গুণ-আমরা চলতে-ফিরতে প্রতিনিয়ত নানা লোকের মুখোমুখি হচ্ছি। মার্কেটিং, অফিস, ভ্রমণ, ঘোরাফেরা সব জায়গাতেই নানা লোকের সাথে মিথস্ক্রিয়ান্বিত হচ্ছি। এটি কিন্তু দ্বিমুখী। আপনার সামনের লোক আপনার মনে এক ধরনের অনুভূতি জাগায়। আমরা সে অনুভূতি প্রকাশ করি পরক্ষণেই আমাদের আচরণে। আমরা আশপাশের লোকদের কোনো অভিব্যক্তিকে সবচেয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়ে থাকি। কোনো অনুভূতি, অভিব্যক্তি প্রকাশ করলে আশপাশের লোকজন হতে সবচেয়ে বেশি ইতিবাচক সাড়া আর প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। মনোগবেষকদের কথা ‘হাসিমুখে থাকুন, দেখবেন আশপাশের সবাই হাসিভরা মুখে তাদের প্রতিক্রিয়া জানাবে।’ কিন্তু মুখ গোমড়া করে রাখবেন, কেবল একা আপনাকেই এর ভাগ নিতে হবে। কেউ আপনার এ অভিব্যক্তির অংশীদার হবে না।
১৯৯১ সালের ঘটনা, ভার্লিন আর জুডিথ নামের দুজন সাইকোলজিস্ট ঠিক এমনি এক ধরনের গবেষণা চালিয়েছেন। তারা দেখতে পান হাসিমুখে কথা বলা হলে বা মুখ গোমড়া করে রাখা হলে আপনার ঠিক সামনের জন কেমন অভিব্যক্তি দেখাবে? একদল কলেজছাত্রকে এতে ভলান্টিয়ার বানানো হয়, লাইব্রেরি, শপিং সেন্টার, হাঁটার রাস্তাকে সপট বানানো হয়। প্রতিটি ভলান্টিয়ারকে চলতে-ফিরতে তিন ধরনের অভিব্যক্তি দেখাতে বলা হয়।
- এটা হলো হাসিমাখা মুখ
- অপরটি হলো গোমড়া মুখ
- আরেকটি হলো নিরপেক্ষ অভিব্যক্তি
পেছনে একজন করে নিরীক্ষক দেয়া হয় যিনি ভলান্টিয়ারের অভিব্যক্তিতে ব্যক্তির প্রতিক্রিয়া নিরীক্ষণ করবেন। গবেষণার রিপোর্ট হলো- যখন হাসির অভিব্যক্তি প্রকাশ করা হয় সেখানে প্রায় সবখানেই সামনের জন হাসির অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছিল। যেখানে অভিব্যক্তি নিরপেক্ষ ছিল, সেখানে মাত্র ২০% ক্ষেত্রে সামনের জন হাসিমাখা মুখ নিয়ে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছিল। যেখানে একেবারে মুখ গোমড়ার চেয়ে অনেকটা ভ্রূকুটির অভিব্যক্তি দেখানো হয়েছিল সেখানে সামনের জন একেবারে নিরপেক্ষ নীরব দর্শকের ভূমিকা নিয়েছিল, কোনো প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেনি।
সুতরাং সর্বদা হাসিমুখে থাকার চেষ্টা করা প্রয়োজন। স্বতঃস্ফূর্ত হাসিভাব না এলেও অন্তত কতকটা হাসির ভান করুন। যখন দেখতে পাবেন আশপাশের লোকজন হাসিভরা মুখ নিয়ে আপনার সাথে প্রতিক্রিয়ান্বিত হচ্ছে তা আপনার মনে সত্যিকার হাসির অনুভূতি জাগাবে, মন অনেকটা চাঙ্গা হয়ে উঠবে। ব্যাপারটা অনেকটা ফিডব্যাক প্রক্রিয়ার মতো। হাসতে তো কোনো বাড়তি পয়সা খরচ করতে হয় না, তাই হাসিমুখে থাকাটাই তো সুন্দর। আর এতে স্ট্রেস বা মনোদৈহিক চাপ সব হ্রাস পাবে। আত্মবিশ্বাস বাড়বে বহুগুণে।



