Skip to main content

উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ

অধ্যাপক ডা. তোফায়েল আহমেদ

মানবদেহে স্বাভাবিকভাবে রক্তচাপ বিদ্যমান। সেই রক্তচাপ যদি উচ্চচাপে পরিণত হয় তবে তা কিছুটা হলেও ভাবনার বিষয়। আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়াটাই তখন সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। রক্তচাপ যেন স্বাভাবিকের মধ্যে থাকে সেজন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দৈনন্দিন জীবনধারা পরিবর্তন করে প্রয়োজনে নিয়মিত ওষুধ সেবন করা আবশ্যক।
বয়স ও লিঙ্গভেদে রক্তচাপ স্বাভাবিক মাত্রার বেশি হলে তাকে উচ্চরক্তচাপ এবং কম হলে তাকে নিম্নরক্তচাপ বলে। তবে বর্তমানে নিম্নরক্তচাপ বলে কোনো কথা নেই। হঠাৎ করে সাধারণ নিয়মের অতিরিক্ত রক্তচাপ বাড়লেই তাকে আমরা উচ্চরক্তচাপ হিসাবে ধরব না। রাতে ভালো ঘুমের পর ভোরে বিছানায় শোয়া অবস্থায় পরপর তিনদিন রক্তচাপ স্বাভাবিক মাত্রার বেশি পাওয়া গেলে তাকে আমরা উচ্চরক্তচাপ বলব। কারণ অতিমাত্রায় চিন্তা, পরিশ্রম, মানসিক অশান্তিতে ক্ষণিকের জন্য সিস্টোলিক রক্তচাপ বাড়তে পারে। কিন্তু ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ স্বাভাবিক মাত্রার অতিরিক্ত হলে ধরে নিতে হবে রোগীর উচ্চরক্তচাপ রয়েছে। শতকরা ৯০-৯৫ ভাগ উচ্চরক্তচাপের রোগীদের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। একে প্রাইমারি অথবা এসেনশিয়াল হাইপারটেনশন (Essential hypertension) বলে। এই প্রাইমারি হাইপারটেনশনের জন্য কতগুলো নিয়ামকের ভূমিকা রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এগুলো হলো জেনেটিক অথবা পারিবারিক উচ্চরক্তচাপের ইতিহাস, স্থূলতা, মেদবহুল শরীর, ধূমপান, বেশি লবণ খাওয়া, বেশি অ্যালকোহল সেবন, কতগুলো বিশেষ হরমোন অথবা নিউরোট্রান্সমিটারের ভূমিকা। বাকি ৫-১০ ভাগ উচ্চরক্তচাপের রোগীদের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কারণ পাওয়া যায়। উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হলো কিডনিজনিত রোগ, হরমোনগ্রন্থিজনিত রোগ, রক্তনালির জম্নগত ত্রুটি, গর্ভধারণজনিত জটিলতা এবং দীর্ঘদিন বিশেষ কোনো ওষুধ সেবন যেমন-জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি, স্টেরয়েড, লবণযুক্ত কোনো ওষুধ প্রভৃতি।
উচ্চরক্তচাপজনিত রোগের লক্ষণ
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগী লক্ষণবিহীন অবস্থায় থাকে। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে উচ্চরক্তচাপ দৈবাৎ নির্ণিত হয়। যেমন-বার্ষিক বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় বা কোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সময় অথবা বিদেশ গমনের জন্য স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময়। এই রোগীদের সাধারণত উচ্চরক্তচাপের কোনো লক্ষণ থাকে না। দ্বিতীয়ত, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী মাথাধরা, মাথা ঝিমঝিম করা, ঘাড়ে ব্যথা, নিদ্রাহীনতা, অস্থিরতা, বেশি প্রস্রাব হওয়া প্রভৃতি সাধারণ উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসকের কাছে উপস্থিত হন এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় তাদের উচ্চরক্তচাপ ধরা পড়ে। তবে উচ্চরক্তচাপের কারণে নিম্নোক্ত লক্ষণ প্রায়ই দেখা যায়-

  • মাথার পশ্চাৎদেশে ব্যথা বিশেষ করে সকাল বেলায়।
  • বুক ধড়ফড় করা, মাথা ঘোরানো।
  • অবসাদগ্রস্ততা/সর্বদা ঘুম ঘুম ভাব/বিষণ্নতায় ভোগা।
  • প্রায়ই ঘাড়সহ শিরদাঁড়ায় ব্যথা অনুভব করা।
  • অজানা কারণে শরীরে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া।
  • অতিরিক্ত পিপাসা, অতিমাত্রায় প্রস্রাব হওয়া (এগুলো সাধারণত কিডনি রোগের কারণে দেখা যায়)।
  • মাংসপেশীতে দুর্বলতা অনুভব করা-এটি সাধারণত রক্তে পটাশিয়ামের স্বল্পতার জন্য দেখা যায়-যা একটি হরমোনজনিত রোগের কারণ হিসেবে উল্লেখযোগ্য।
  • ওজন বৃদ্ধি পাওয়া।
  • পেটে অস্বস্তিবোধ করা। এটি সাধারণত কুসিং সিন্ড্রোম নামক এক ধরনের হরমোনজনিত রোগের কারণে সৃষ্টি হয়।
  • শেষোক্ত ভাগের রোগীর উচ্চ রক্তচাপজনিত বিভিন্ন জটিলতা যেমন- মস্তিষেক রক্তক্ষরণ, হৃদরোগ, কিডনিজনিত জটিলতা, রেটিনাজনিত জটিলতা, চোখে কম দেখা প্রভৃতি সমস্যা পরিলড়্গিত হয়। এই রোগীদের পরিণতি সাধারণত মারাত্মক হয়ে থাকে।

উচ্চ রক্তচাপের জটিলতা
কিছু ভ্রান্ত ধারণা ও অসচেতনতার কারণে রোগী প্রায়ই এ রোগের জটিলতায় ভোগেন। অনেক ক্ষেত্রে জীবন হয় বিপন্ন। ভ্রান্ত ধারণার মধ্যে রয়েছে-

  • অনিয়মিতভাবে ওষুধ সেবন
  • পরিমাণমতো ওষুধ সেবন না করা
  • খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন না করা
  • হঠাৎ করে উত্তেজিত হয়ে যাওয়া
  • শরীরের ওজন না কমানো
  • ডায়াবেটিসের চিকিৎসা না করানো
  • হালকা ব্যায়ামের অভ্যাস না করা।

উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না রাখলে নিম্নলিখিত জটিলতা দেখা দিতে পারে-

  • হৃৎপিণ্ডে জটিলতা- হৃৎপিণ্ড বড় হয়ে যাওয়া, হার্ট ফেইলুর, করোনারি হার্ট ডিজিজ প্রভৃতি।
  • কিডনিতে জটিলতা- প্রস্রাবের সঙ্গে প্রোটিন বেরিয়ে যাওয়া, রেনাল ফেইলুর ইত্যাদি।
  • চোখে জটিলতা-রেটিনোপ্যাথি, চোখে কম দেখা।
  • মস্তিষেক জটিলতা-স্ট্রোক, মস্তিষেকর রক্তড়্গরণ ইত্যাদি।

রোগ নির্ণয়

  • রোগীর জীবনযাত্রার সার্বিক ইতিহাস জানা।
  • রোগী অতিমাত্রায় লবণযুক্ত খাবার খান কিনা। যেমন-ভাত খাওয়ার সময় আলাদা লবণ গ্রহণ অথবা তরিতরকারিতে অতিরিক্ত মাত্রায় লবণ খাওয়া।
  • ধূমপায়ী কিনা।
  • রোগী কোনো ধরনের ব্যথানাশক ওষুধ বা স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ সেবন করেন বা করেছিলেন কিনা।
  • রোগী অতিশয় স্থূল কিনা।
  • রোগীর শরীরে চর্বির পরিমাণ বেশি কিনা। এটি রোগীর বিভিন্ন স্থানের চিহ্ন থেকে বোঝা যায়। যেমন-চোখের ওপরের অংশে বা হাতে চর্বির পুঞ্জিভূত অংশ বেড়ে বড় হয়, যাকে জ্যানথোমা (Xanthoma) বলে অথবা আর্কাস লিপিডাসও থাকতে পারে।
  • কিছু মেডিকেল সম্বন্ধীয় পরীড়্গা-নিরীক্ষা করে।
  • মূত্রের পরীক্ষা-এখানে প্রোটিন (অ্যালবুমিন), গ্লুকোজ, লোহিত কণিকা বা পাসসেল পাওয়া যেতে পারে।
  • রক্তে ইউরিয়া, ক্রিয়েটিনিন এবং অন্যান্য যৌগসমূহের (S. Electrolytes) পরিমাপ-অনেক সময় ইউরিয়ার মাত্রা বেড়ে যায় বা রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রাও কমে যেতে পারে।
  • রক্তে সব ধরনের চর্বির পরিমাপ এইচডিএল, এলডিএল, ট্রাইগ্লিন্ধসারাইড, টোটাল কোলস্টেরল এগুলো বেড়ে যেতে পারে।
  • বুকের এক্সরে-এখানে হার্টের বৃদ্ধির ছবি অথবা হার্ট ফেইলিউর অথবা কোয়ার্কটেশন অব এওর্টার ছবি পাওয়া যেতে পারে।
  • ইসিজি-হার্টের মাংসপেশির পরিবর্তনের চিত্র বা বাম হার্ট ফেইলরের চিত্র প্রকাশ পায়।

কিছু নির্দিষ্ট ধরনের পরীক্ষা রয়েছে যেমন-

  • ইকোকার্ডিওগ্রাম
  • কিডনির আলট্রাসনোগ্রাম
  • ড্রপলার স্টাডি

উচ্চরক্তচাপজনিত রোগের চিকিৎসা
উচ্চরক্তচাপ যে কারণেই হোক না কেন, শিগগিরই তা নির্ণয় এবং এর উপযুক্ত চিকিৎসা একান্ত প্রয়োজন। এতে করে রোগী নিজে লক্ষণবিহীন থেকে সুস্থ-সবল জীবনযাপন করতে পারে এবং ভবিষ্যতে উচ্চরক্তচাপজনিত জটিলতার সম্ভাবনা কমে আসে। যেসব উচ্চরক্তচাপের রোগীদের (৫-১০%) ক্ষেত্রে উপযুক্ত কারণ থাকে, সেগুলোর যথাযথ চিকিৎসা করলে উচ্চরক্তচাপ ভালো হয়ে যায়। যেমন-থাইরয়েড বা অ্যাড্রেনাল গ্রন্থির উপযুক্ত চিকিৎসা অথবা টিউমার হলে তা শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে অপসারণ, রেনাল আর্টেরিয়াল স্টেনোসিস কোআরকটেশন অব এওর্টা-এর শল্যচিকিৎসা অথবা নেফ্রাইটিস, কুশিং সিনড্রোম প্রভৃতির উপযুক্ত চিকিৎসা। বাকি ৯০-৯৫ ভাগ উচ্চরক্তচাপের রোগীদের ক্ষেত্রে প্রতিকার করা যায় না বরং তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়।
প্রাথমিক অবস্থায় অধিকাংশ রোগীরই ওষুধ দেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। পরিমিত আহার, ব্যায়াম ও নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের মাধ্যমে এ রোগের প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়।

খাদ্য

  • শরীর স্থূল হলে অবশ্যই তা কমিয়ে ফেলতে হবে। সে জন্য নির্ধারিত ক্যালরি চার্ট দেখে খাদ্য তালিকা নির্বাচন করতে হবে।
  • চর্বি ও চর্বিজাতীয় খাবার/ফাস্টফুড পরিহার করতে হবে।
  • লবণ গ্রহণের ব্যাপারে পূর্ণ সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে (স্বাভাবিক মাত্রায় নেয়া যায় ৭০-৮০ মিলিমোল/লিটার)। এ জন্য খাবারের সময় পাত্রে আলাদা লবণ গ্রহণ অথবা লবণজাতীয় খাদ্য পরিহার করতে হবে।
  • অ্যালকোহল খেলে তা পরিহার করতে হবে।

লেখকঃ সাবেক ডিন, মেডিসিন ফ্যাকাল্টি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়