রাশেদ ও আসিফ একই স্কুলে পড়ত। আসিফ বয়সে সিনিয়র হওয়ায় পরামর্শ নিত এর বেশি কিছু নয়। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে পড়ালেখার জন্য আসিফ ঢাকায় ও রাশেদ রাজশাহীতে চলে যায়। হঠাৎ আসিফের সাথে তেজগাঁও কলেজ ঢাকায় দেখা। রাশেদের মোবাইল নম্বর নেয়। এরপর সম্পর্কের গভীরতা বাড়তে থাকে। কথা হতো বিভিন্ন বিষয়ে। পরামর্শ দিত ব্যাংকের দরখাস্তগুলো করতে। কিন্তু রাশেদের পছন্দ সরকারি চাকরি।
শখ হলো কম্পিউটার কেনার। পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় আসিফের কাছে বারো হাজার টাকা ধার নেয়। সুবিধাজনক সময়ে পরিশোধ করে দিল। প্রায়ই দেখা হতো এবং রাশেদকে বাসায় যাওয়ার আমন্ত্রণ জানাত। যাওয়া হয় না তাই দুই ভাইকে দাওয়াত দেয়ার কথা জানায়। আসিফের ফোন। রক্ত লাগবে ও পজিটিভ নানি অসুস্থ। তোমার রক্তের গ্রুপ কী? পারিবারিকভাবে সবাই ও পজিটিভ। অসুস্থ থাকায় ছোট ভাইকে পাঠালো রক্ত দিতে। শুক্রবার সকালে আসিফের কল, রাজশাহীতে যেতে হবে। সেদিন আবার রাশেদ অন্যের চাকরির প্রক্সি পরীক্ষা দিয়ে দেবে। পরীক্ষা স্থগিত রেখে তার বাসায় গেল। আসিফ ছাড়া বাসায় কেউ ছিল না, সবাই গ্রামের বাড়িতে। দুজনে বিয়ের দাওয়াত খেতে গেল।
আসিফের ইচ্ছা আগে বোনের বিয়ে দিয়ে তারপর সে করবে। আন্টির অসুস্থতার জন্য রাশেদ মা খালাসহ আসিফের বাসায় গেল। গেস্ট রুমে বসে এ সময় দরজা দিয়ে বোরকা পরা ছিপছিপে গড়নের মেয়ে প্রবেশ করে জিজ্ঞেস করল ভাইয়া আপনার নাম কী? রাশেদ আগে থেকেই জানত নাম তার রাবেয়া। তুমি কোথায় গিয়েছিলে? কোচিং করতে। কোন কোচিং-এ পড়। এ প্লাস। পাশেই ছিল রাবেয়ার বোন ফারহানার বাসা। রান্নার জন্য ডাকা হলো। মাত্রই রাত্রি ৯টায় বাসায় ফিরল। রাশেদের মা জানাল হালিমা বুবুর মেয়ে খুব সুন্দর ও লক্ষ্মী। তার পছন্দ। খালাও সুর মিলালো মেয়েটা আসলেই ভালো। মানুষ হিসেবেও তারা চমৎকার। রাবেয়াকে প্রথম দেখাতেই মনে লেগে যায়। মায়ের পছন্দ হওয়াতে অগ্রসর হওয়ার কথা চিন্তা করে। তারপর থেকে আসিফের বাসায় নিয়মিত যাতায়াত শুরু। বড় ভাই প্লাস বন্ধুর সম্পর্ক অতিক্রম করে রাবেয়া মুখ্য হয়ে ওঠে।
আসিফের ফোন। ক্লিনিকে! অ্যাপেনডিক্স আপারেশন। রাশেদ তড়িঘড়ি করে দেখতে গেল। কথা হলো কিছুক্ষণ পরেই তাকে অপারেশন থিয়েটারে নেয়া হবে। দেখা আসিফের বন্ধু মিনহাজের সঙ্গে। পরদিন আবার ক্লিনিকে গেল। রাবেয়া ভাইকে দেখতে নিশ্চয়ই আসবে। আন্টি এসেছে, তার মেয়ে আসেনি। হতাশ দেখাল রাবেয়ার সাথে দেখা হলো না বলে। কারণে অকারণে এমনিতেই আসিফের বাসায় যেত রাবেয়াকে দেখার উদ্দেশ্যে।
রাশেদ যখন দশম শ্রেণীতে পড়ে, অষ্টম শ্রেণীতে পড়ুয়া মেয়ের কাছে প্রেমপত্র লেখে। ঘটনাক্রমে বাবা-মা ওই মেয়েটির কল্যাণে জানতে পারে। এতে লেখাপড়া বন্ধের উপক্রম হয়। প্রতিজ্ঞা করে কোনো দিন মেয়েলি ফাংশনে জড়াবে না বা কাউকে পছন্দ করবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ বর্ষে নওগাঁর নূপুর নামে একটি মেয়ে প্রেমের প্রস্তাব দেয় এবং অজান্তে ফাইলের মধ্যে শুভেচ্ছা উপহার ফুল দেয়। হোস্টেলে ফিরে তা দেখতে পায়। মেয়েটির সঙ্গে পরিচয় ইংরেজি ফাউন্ডেশন কোর্স করার সময়। এক বাক্যে বলে দেয় সম্পর্কে জড়ানো সম্ভব নয়। তবুও মেয়েটা পেছনে লেগে থাকে যদি মন গলে। রাশেদ অবস্থানে অটল থাকায় হতাশ হয়ে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
কোন বয়সে কখন কাকে ভালো লাগবে বলা মুশকিল। রাবেয়াকে দেখার পর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। এতই পছন্দ হয়েছে কবে প্রথম দেখা হয়েছিল সেই তারিখসহ আর কবে গিয়েছে তার সময়ও মনে রেখেছে। রাবেয়াকে দর্শন করলেই ভালো লাগে। পছন্দের মানুষের বকাও বেশ মিষ্টি। রাশেদ সাধারণত বিকেল বেলায় যায় আর ফিরে আসে রাত ৯টা কি ১০টায়। আন্টি বলে মেয়েকে বিয়ে দিতে হবে। বড় দুশ্চিন্তায় আছি। রাশেদ মুগ্ধ শ্রোতার মতো কথাগুলো শুনত এবং মনে মনে বলত এখনই বিয়ে দেয়ার কী দরকার? আরো লেখাপড়া করুক না। রাবেয়া মানুষ না পরী। শুনেছে পরীরা নাকি খুব সুন্দরী হয়। রাবেয়া মানুষ নয়। মানুষ নামের পরী। তার বিরাট গুণ ভালো রান্না করতে পারে। রান্না খাওয়ার সুযোগ বেশ কয়েক দিন হয়েছে।
রাশেদ শহরে গিয়েছে আড্ডা দিতে। পোস্ট অফিসের সামনে সোহেল ও মিনহাজের সঙ্গে দেখা। জিজ্ঞেস করল হাসানের সঙ্গে দেখা হয়েছে কি না? অপেক্ষার পালা শেষ। হাসান এলো এবং তাকে রাবেয়ার সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব দিল। এ কথা শুনে রাশেদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। হাসান ছিল রাশেদের পূর্ব পরিচিত। রাবেয়াকে পছন্দ করবে না এমন ছেলে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। যে কেউ তাকে পছন্দ করবে, হতভাগা ছাড়া। হাসান পেশায় একজন ব্যাংকার। মেয়েটি কেমন? অপরূপা সুন্দরী! কিন্তু রাশেদ মনে মনে বড়ই ব্যথিত হলো। তার হৃদয় ভেঙে খান খান হয়ে গেল। পার্থিব জগতে এ ধরনের মানসিক ধাক্কায় পড়েনি। প্রাইভেট কারের সঙ্গে ট্রাকের আঘাত লাগলে সবকিছু ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। তেমনি হৃদয় দুমড়ে-মুচড়ে গেল। হাসান ও রাশেদ একই সিএনজিতে বাসায় ফিরল। পাশাপাশি বসেছিল কিন্তু কোনো কথা হলো না। ঘরে প্রবেশ করে ওই পোশাকেই বিছানার ওপর শুয়ে পড়ল। মা ডেকে রাতের খাবার খাওয়ালেন। অনেক চেষ্টা করল ঘুমানোর। একটি বারের জন্যও দুটি চোখে ঘুম এলো না। বারবার রাবেয়ার কথা মনে পড়ল। আগে কোথায় কীভাবে কথা হয়েছে সেসব কথা একের পর এক মনে হতে লাগল। এসব কথা ভাবতে ভাবতে ও চিন্তা করতে ফজরের আজান কানে ভেসে এলো। বিছানা থেকে উঠে ওজু করে মসজিদে গেল নামাজ আদায় করতে। বিধাতার কাছে প্রার্থনা জানাল রাবেয়া যেন তার হয়। অন্যথায় জীবন ব্যর্থ। নামাজ শেষে বাড়ি ফিরে তবুও অস্থিরতা দূর হলো না। দুনিয়ার জীবন বিরক্তিকর থেকে বেদনাদায়ক মনে হলো।
প্রতি ঈদে একজন বন্ধুকে নিয়ে রাবেয়ার বাসায় যায়। উদ্দেশ্য একটাই দেখা ও কথা বলা। ভালো লাগে কথা বলতে। এ অনুভূতি অন্য রকম এক সুখের। রাশেদ অনুরোধ করত তার বাসায় যাওয়ার। বিয়ে করেন তাহলে যাব। কী করে বোঝাবে তাকেই পছন্দ। ভবিষ্যতে যদি বিয়ে করে তাকেই করবে। আন্টি বলে ফ্রিজে অনেক কিছু আছে তবুও খায় না। ডিম খুব পছন্দ। ডিম রাশেদেরও পছন্দ। সোনার প্রতি মেয়েদের লোভ আছে। গহনা তার আরো একটি পছন্দের জিনিস।
আসিফ মাঝে মাঝে ফোন করে। তোমার খবর কী? চাকরির খোঁজ নেয়। রাশেদের শুভাকাঙ্ক্ষী। মঙ্গল চায়। আসিফের বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্য বাসায় যায়। রেডি হয়নি। পাঞ্জাবি পরিয়ে তাকে রেডি করে। মিনহাজ এলো। এই ফাঁকে রাবেয়ার সঙ্গে দেখা। তাকে আজ অন্য রকম লাগছে। কখনো এভাবে দেখা হয়নি। খুব সুশ্রী দেখাচ্ছে। এক অপরূপ রূপসী সুন্দরী! যেমন অন্ধকার রাতে চাঁদের আলো সুন্দর ও ঝলমলে দেখায়। আকাশের ওই চাঁদ থাকে দূরে। এই চাঁদ মায়ার আবেশে কাছে ডাকে। শীতের সকালে শিশির ভেজা ঘাসে রোদ পড়লে চকচকে মনে হয় সে রকম চিকচিক করছে। রাশেদ তার সৌন্দর্য উপভোগ করছে। আগে এরকম লক্ষ করেনি। রাবেয়া তার ভাবীর পাশে বসে। সুযোগ পেয়ে রাশেদ মুঠোফোন ক্যামেরায় কয়েকটি ছবি উঠাল। সবার দৃষ্টি ছিল রাবেয়ার দিকে। ভাবীকে ম্লান দেখাচ্ছিল। খাওয়া-দাওয়ার পালা। বর-বউসহ সবাই এক টেবিলে। এখানে ছবি তুলল। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে তাড়াতাড়ি ফিরে। ওই রাতে ঢাকায় যেতে হবে। ২৪ সেপ্টেম্বর শুক্রবার সকালে পরীক্ষা।
ঢাকা থেকে ফিরে সন্ধ্যার আগে কমিউনিটি সেন্টারে গেল বিয়ের দ্বিতীয় দিনে যোগ দিতে। মা এবং বোন নাফিজাও অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিল। এখানে সে গত দিনের রাবেয়াকে পেল না। শাড়ি পরিহিত ভিন্ন আবহে গড়া এক নারী। বহু শাড়ি পরা মহিলাকে রাশেদ দেখেছে। এরকম সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ নারী চোখে পড়েনি। ওখান থেকে ফিরে রাতে শুয়ে রাবেয়ার কথা ভাবছে। নাফিজা ঘরে প্রবেশ করে আপনার পছন্দের তারিফ করতে হয়। ফোনে তোলা শাড়ি পরা ছবি দেখাল। সে কী হবে তার না অন্যের ভাবতে ভাবতে একসময় ঘুরিয়ে পড়ে। পছন্দের মানুষকে নিয়ে অনেকগুলো ছোটগল্প ও কবিতা লিখে ফেলেছে। ছাত্রজীবনে বিভিন্ন দৈনিক ও একটি মাসিক পত্রিকাতে লিখত। পণ করেছিল ত্রিশ বছর পর্যন্ত আর লিখবে না। শুধু পড়বে আর পড়বে এবং অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করবে। পরে পুরোপুরি লেখালেখিতে মনোনিবেশ করবে। রাবেয়ার সংসপর্শে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। মাঝে মধ্যে দুএকটি বিষয়ে সময় দেবে। তাকে নিয়ে একটি উপন্যাস লিখবে।
নতুন ভাবীর সাথে বিয়ের দিন ছাড়া মুখোমুখি কথা হয়নি। ২৩ ডিসেম্বর রাবেয়ার বাসায় গেল। ভাবীর দেখা পেল না। রাবেয়া জিজ্ঞেস করে আপনার রেজাল্ট কী? কোন সাবজেক্ট নিয়ে পড়ছেন? মাস্টার্স হয়েছে কি না? অন্তর্মুখী ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হওয়ায় রাশেদ কথা কম বলে। অনেক কিছুই বোঝে, শুধু চোখের ভাষা ও মনের অবস্থার খোঁজ নাও না। লাজুক দৃষ্টি দিয়ে একটু আধটু তার দিকে মুচকি হেসে তাকায়। পছন্দের মানুষের সাথে গল্প করে চলে আসবে। আসার সময় আন্টি আবার যেন যাই বলতেন। মনে মনে বলল আমি তো আসতেই চাই আপনার মেয়েকে দেখতে।
২৮ জানুয়ারি রাশেদ হকারদের কাছে পেপার দেখছে। এমন সময় মিনহাজের দেখা। তুমি একা নাকি? ওখানে সোহেল আছে যাও। আস্তে আস্তে সবাই জড়ো হলো। চা খেতে খেতে জানতে পারল রাবেয়াকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে মাহমুদ। কিন্তু আসিফ রাজি হয়নি। বিষয়টি নিয়ে আসিফ ও মাহমুদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়েছে। বকা খেয়েছে বেশ হয়েছে। মাহমুদ এখন মনস্তাত্ত্বিক শত্রু। রাশেদ এ কথা শোনামাত্র চলে আসে। মেসে না গিয়ে সরাসরি বাসায় চলে যায়। বিষণ্ন মনে ভাবে কেন এমন হচ্ছে? এবার রাবেয়াকে পছন্দের কথা জানানো দরকার। বেডে শুয়ে ভাবে আর ভাবে কী করা যায়? চলতে ফিরতে কত যে মেয়ে দেখেছে। রাবেয়ার মতো একটি মেয়েও মনে ধরেনি। সে এক সরলতার প্রতিমা। দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়, ক্লান্তি দূর হয়। কোনো মতেই অন্যের হতে দেয়া উচিত নয়। নিদ্রাহীন রাত্রি কত কষ্টের তা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কেউ বলতে পারবে না। কষ্টের সময় যেন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর। অসুস্থ হয়ে যায়। কোনো কিছু খেতে মন সাড়া দেয় না। ভালো লাগে না, ঝিমুনি দেখা দেয়। অনিদ্রাসহ অন্যান্য সমস্যা তাকে গ্রাস করে।
অনার্স ১ম বর্ষে পড়ছে বাঁশির মতো নাক, মুখ, চোখ, চুলসহ সবকিছুই তাকে আকর্ষণ করে। কথা বলার স্টাইলটা আলাদা। ভিন্ন রকম মাদকতা। নীল টিপে আরো সুন্দর দেখায়। যথেষ্ঠ সামাজিক ও অতিথি পরায়ণ। বুক পাঁজরে স্তিথি, তোমায় পাব এমন আশা করি। বারে বারে আমি এত দেখি তবু সাধ মেটে না। এমন অনুভব হয়নি কখনো তোমায় চেনার আগে। প্রতি মুহূর্ত হাসিমাখা মুখচ্ছবি মনের জানালায় উঁকি দেয়। সব দিয়ে উজাড় হতে চায়। রাশেদের পছন্দের বিষয়টি যখন সে জানবে, তার প্রতিক্রিয়া কী হবে? সৃষ্টিকর্তার কাছে দুটি জিনিস চায় রাবেয়া ও সরকারি চাকরি। এ স্বপ্ন বা আশা পূরণ হবে কি? একমাত্র রাবেয়াই পারবে প্রশ্নের উত্তর দিতে। রাবেয়াকে তিনটি বই দিয়েছি প্রথমটি আসিফের বিয়ের সময় ও বাকি ২টি ফেব্রুয়ারি বই মেলা ২০১১ ঢাকা থেকে নিয়ে আসা। এগুলো পড়েছে কি না তা কে জানে? শেষ দেখা হয়েছে ফেব্রুয়ারি মাসের ২৭ তারিখ।
লেখকঃ গল্পকার
e-mail : tuhinabedin@gmail.com



