Skip to main content

হেপাটাইটিস-বি রোগের কথা

ডা. মাহবুব এইচ খান

১৯৬৩ সালে ব্লুমবার্গ নামের এক আমেরিকান চিকিৎসাবিজ্ঞানী একজন অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসীর মধ্যে লিভার প্রদাহ (হেপাটাইটিস) সৃষ্টিকারী একটি জীবাণুর সন্ধান পান। অসুখ সৃষ্টিকারী এই জীবাণুটি হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস নামে পরিচিত।
হেপাটাইটিস-বি রোগে আক্রান্ত হওয়ার ছয় মাস পরও যদি ভাইরাসটি শরীরে অবস্থান করে তাহলে তাকে ক্রনিক হেপাটাইটিস-বি বলে। এটা একটা মারাত্মক অসুখ।
হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসযুক্ত রক্ত অথবা রক্তের কোনো উপাদান রোগীর শরীরে দেয়া, শিরাপথে নেশাগ্রস্ত ওষুধ ব্যবহার করা ও যৌন মিলনের মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায়। গর্ভবতী মা যদি হেপাটাইটিস-বি রোগে আক্রান্ত হন, তাহলে তার নবজাতকের ক্রনিক হেপাটাইটিস-বি হওয়ার ঝুঁকি ৪০-৯০ শতাংশ। ঠিকমতো জীবাণুমুক্ত না করে ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ, দাঁতের চিকিৎসা এবং অপারেশনের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করার জন্য হেপটাইটিস-বি রোগ শরীরে ছড়ানোর সমূহ আশঙ্কা থাকে। ক্রনিক হেপাটাইটিস-বি রোগীর অনেকের মধ্যে কোনো রকম লক্ষণ এবং উপসর্গ নাও থাকতে পারে। কোনো কারণে রক্ত পরীক্ষার সময় এসব রোগীর অনেকের মধ্যে বি ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া যেতে পারে। তাই রোগের লক্ষণহীন রোগীরা নিজের স্বাস্থ্য এবং সমাজের অন্যের স্বাস্থ্যের প্রতি হুমকির কারণ। শারীরিক দুর্বলতা, অল্প কাজ করার পর মাত্রাতিরিক্ত ক্লান্ত হয়ে পড়া, ওপরের পেটের ডান পাশে ব্যথা অথবা অস্বস্তিবোধ করা, মাঝে মাঝে জন্ডিস এবং ক্ষুধামন্দায় আক্রান্ত হওয়া, শরীরের ওজন কমে যাওয়া, দাঁত ও নাক থেকে রক্তপাত হওয়া, লিভার ও প্লীহা বেড়ে যাওয়ার উপসর্গ ও লক্ষণ নিয়েও অনেকে চিকিৎসকের কাছে আসেন। তবে অনেকেই লিভার সিরোসিস অথবা তার ক্ষতিকারক উপসর্গ ও লক্ষণ নিয়েও চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে পারেন।
ক্রনিক হেপাটাইটিস-বি লিভারের একটি মারাত্মক অসুখ। বাংলাদেশে আনুমানিক ৮০ লাখ লোক এই রোগে আক্রান্ত। আক্রান্ত রোগীদের লিভার ধীরে ধীরে নষ্ট হতে থাকে। শতকরা ২০-৩০ ভাগ লোকের লিভার ২০ বছরের মধ্যে সিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় লিভারের কার্যক্ষমতা আস্তে আস্তে স্বাভাবিকের চেয়ে কমতে থাকে। এর ফলে লিভার ফেইলিউর, রক্তবমি, লিভার ক্যান্সার, পেটে পানি জমা এবং জন্ডিস সমস্যার কারণে রোগীর মৃত্যু ঘটে। উল্লেখ্য, মদ্যপান এবং লিভারে হেপাটাইটিস-ডি ও সি ভাইরাসের উপস্থিতি হেপাটাইটিস-বি রোগে আক্রান্তদের জটিলতাকে ব্যাপকভাবে ত্বরান্বিত করতে পারে।
যেহেতু এসব রোগীর মধ্যে অনেকের কোনো রকম রোগ লক্ষণও দেখা দেয় না, সে জন্য ক্রনিক হেপাটাইটিস বি-এর রোগের উপসর্গ ও লক্ষণ না থাকলেও রক্ত পরীক্ষা করে নেয়া যেতে পারে। পরীক্ষার পর ব্যক্তির রক্ত বি-হেপাটাইটিস হলে অবশ্যই লিভার বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে। যাদের রক্তে এই ভাইরাসের উপস্থিতি খুঁজে পাওয়া যাবে না অর্থাৎ বি-হেপাটাইটিস পজিটিভ হবে তাদের এই ভাইরাসের টিকা নেয়া উচিত। কারণ সে ক্ষেত্রে তাদের ভবিষ্যতে বি-হেপাটাইটিস হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় সম্পূর্ণভাবে দূর হয়ে যাবে।

ক্রনিক হেপাটাইটিস-বি রোগের চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি (ক্রনিক) হেপাটাইটিস বি-এর কোনো চিকিৎসা নেই বলে অনেকের ধারণা। এই ধারণা অনেকে পাস করা আধুনিক ডাক্তারের কাছ থেকেও পেয়ে থাকেন। তাই অনেক রোগীকে বলতে শুনেছি, ডাক্তার সাহেব বলেছেন, বি-হেপাটাইটিস এটা তেমন কিছু নয় এবং কিছু করার নেই বা দরকার নেই। উপরিউক্ত উপদেশগুলো আদৌ সঠিক নয়। হেপাটাইটিস-বি থেকে সৃষ্ট জটিলতায় লিভার ক্যান্সার, লিভার ফেইলিউর, পেটে পানি জমা এবং রক্তবমির মাধ্যমে অনেকেই মৃত্যুমুখে পতিত হন। তাই এই অসুখটিকে হাল্কাভাবে নেয়া উচিত নয়। উপযুক্ত সময়ে চিকিৎসা করলে ২০-৪০ শতাংশ (বিশেষ ক্ষেত্রে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত) লোক এই অসুখ থেকে মুক্তি পেতে পারে।
ক্রনিক হেপাটাইটিস-বি-এর চিকিৎসার মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছেন্ধ রোগের ক্রমবিকাশকে বাধাগ্রস্ত করা এবং এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকারক দিকগুলোকে বন্ধ অথবা মন্থর করে দেয়া। অর্থাৎ বি ভাইরাসকে অকার্যকর অবস্থায় ফিরিয়ে আনা, লিভারের ক্ষতকে সম্পূর্ণ ভালো করা বা কমিয়ে আনা, লিভারে ফাইব্রাস টিস্যু জমাকে প্রতিহত করে লিভারের ক্ষতিকারক রোগগুলোকে ঠেকানো।
বর্তমানে উন্নত বিশ্বে বেশ কয়েকটা ওষুধ হেপাটাইটিস-বি-এর চিকিৎসায় ব্যবহার করা হচ্ছে। এগুলো হচ্ছে-ইন্টারফেরন, ল্যামিভুডিন, ফ্যামসাইক্লোবির, এডিফেভির ডিপোভাক্সিল, থাইমোসিন আলফা ইত্যাদি। তবে ইন্টারফেরন এবং ল্যামিভুডিন এই দুটি ওষুধই দুনিয়াজুড়ে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ইন্টারফেরন ইঞ্জেকশন হিসেবে রোগীকে দেয়া হয়। রোগীর রোগ পুনর্বিশ্লেষণের পর চার মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত ঠিকমতো ওষুধ প্রয়োগে ২০-৪০ শতাংশ রোগী রোগমুক্ত হতে পারেন। ইন্টারফেরন ইঞ্জেকশনের ফলে বেশ কিছু রোগী সাধারণ থেকে ব্যাপকভাবে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ভুগতে পারেন। অল্পসংখ্যক রোগী এটা সহ্য নাও করতে পারেন। ইন্টারফেরন ইঞ্জেকশনটি রোগীর কখন এবং কোন ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে হবে তার বিশদ বিশ্লেষণ করে রোগীকে না দিলে হিতে বিপরীত হতে পারে, বিশেষ করে যাদের লিভারের কার্যক্ষমতা অনেক কমে এসেছে।
চার-পাঁচ বছর ধরে ল্যামিভুডিন নামের বড়িটি বিশ্ববাজারে হেপাটাইটিস-বি-এর চিকিৎসায় ব্যবহার হয়ে আসছে। এই ওষুধটির অনেক সুবিধা আছে। এটা মুখে খাওয়ার একটি ওষুধ এবং ইন্টারফেরনের চেয়ে দাম অনেক কম। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও ইন্টারফেরনের চেয়ে অনেক কম, তবে সম্পূর্ণ সমস্যামুক্ত নয়। ঠিকভাবে প্রয়োগ করলে এক বছরের চিকিৎসায় ১৫-২১ শতাংশ রোগী রোগমুক্ত হতে পারেন। একটি সুনির্দিষ্ট শ্রেণীর রোগীদের জন্য এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ফলে (দুই-তিন বছর) ২৭-৬৫ শতাংশ রোগীর রোগমুক্তির সম্ভাবনা আছে। সবচেয়ে সুবিধাজনক বিষয় হলো, যে ক্ষেত্রে ক্রনিক হেপাটাইটিস-বি-এর চিকিৎসায় ইন্টারফেরন ব্যবহার ঝুঁকিপূর্ণ, সেসব ক্ষেত্রে ল্যামিভুডিন ব্যবহার করা যেতে পারে। দীর্ঘদিন ওষুধ ব্যবহারের ফলে ১৫-৫০ শতাংশ রোগীর শরীরে ভাইরাসের কাঠামোগত পরিবর্তন হয়, ফলে ওষুধের কার্যক্ষমতা লোপ পায়। তা ছাড়া ওষুধ বন্ধের পরও কিছু রোগীর লিভার ফেইলিউরের ঝুঁকি দেখা দেয়।
উপরোক্ত ওষুধ দুটি আলাদা প্রয়োগ না করে একত্রে প্রয়োগ করা যেতে পারে। ইদানীং গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, যে দুটি ওষুধ একত্রে ব্যবহার করলে ৩০ শতাংশ রোগী রোগমুক্ত হতে পারে, সেটা দুটি ওষুধের পৃথক কার্যক্ষমতার চেয়ে বেশি। মনে রাখতে হবে, ক্রনিক হেপাটাইটিস-বি-এর চিকিৎসার জন্য ওষুধগুলোর অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও আছে। তা ছাড়া চিকিৎসা যাতে কার্যকরী হয় সে জন্য পূর্ণ প্রয়োগবিধি জানতে হবে।

লেখকঃ লিভার বিশেষজ্ঞ, ট্রমা হাসপাতাল,
শ্যামলী, ঢাকা।
মোবাইলঃ ০১৭১১৮৫৪৮৩৮