Skip to main content

দৈনন্দিন জীবনে দ্বন্দ্ব

জয়নুল আবেদীন তুহিন

কমবেশি সবাই দ্বন্দ্বের সম্মুখীন হই। দ্বন্দ্ব মানুষের জীবনকে জটিলতা দান করে। দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলা অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে। রাস্তায় বের হয়ে যদি আমরা দুজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুর দেখা পাই তবে কার সাথে আগে বলব এ নিয়ে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। এই দ্বন্দ্ব বেশিক্ষণ স্থায়ী হলে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে দ্বন্দ্ব হতাশায় রূপ নেয়।
প্রথমেই জেনে নেয়া যাক দ্বন্দ্ব আসলে কী? দ্বন্দ্ব সম্পর্কে জানতে হলে প্রেষণা ও আবেগের ধারণা থাকতে হবে। প্রেষণা মানুষের আচরণে গতিদান করে। উদ্দেশ্যের দ্বারা তাড়িত হলে যে সক্রিয় অবস্থার সৃষ্টি হয় তাই প্রেষণা। অর্থাৎ যা মানুষকে কর্মে উদ্বুদ্ধ করে তাকে প্রেষণা বলে। যেমন- ক্ষুধার্থের জন্য খাবার হলো প্রেষণা। এটি গ্রহণ করার তাড়না অস্থিরতার সৃষ্টি করে। আবেগ হলো একটি আলোড়িত বা উত্তেজিত অবস্থা। আবেগতাড়িত হলে মানুষ বা প্রাণীর মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং বিভিন্ন আচরণের মধ্য দিয়ে তা প্রকাশ পায়। আবেগহীন মানুষ যন্ত্রের মতো। হাসি, কান্না, রাগ, ভয়, ভালোবাসা, অভিমান ইত্যাদি আবেগ।
সবকিছুকে আমরা সমানভাবে মূল্যায়ন করি না। চাওয়া-পাওয়া, পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপার থেকে দ্বন্দ্ব উৎপত্তি লাভ করে। দুই বা ততোধিক বিষয় বা জিনিসের মধ্য থেকে একটি বেছে নিতে গিয়ে আমরা দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হই। যখন আমাদের সামনে দুটি বিষয় এসে উপসি'ত হয় তখন আমাদের পক্ষে একই সাথে দুটি জিনিস গ্রহণ বা তৃপ্তি দেয়া সম্ভব নয়। যার কারণে তার মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তিকর ভাব দেখা যায়। যতক্ষণ না এটিকে বর্জন করে। সমান শক্তিশালী ও পরস্পরবিরোধী দুটি চাহিদা বা প্রেষণা উপসি'ত হয়ে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। কোনো প্রেষণার অতৃপ্তির ফলে ব্যক্তির মধ্যে ব্যর্থতার বোধ জাগ্রত হয় তখন তা থেকে আবেগমূলক অস্থিরতা দেখা দেয়।
প্রাত্যহিক জীবনে আমরা বিভিন্ন ধরনের দ্বন্দ্বের সম্মুখীন হই। আজ এ রকম কিছু দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোচনা করব-

আকর্ষণ-আকর্ষণ দ্বন্দ্ব
এখানে মানুষ বা প্রাণীর সামনে দুটি লক্ষ্যবস্তু থাকে। দুটি বস্তুই তাকে আকর্ষণ করে। অর্থাৎ ধনাত্মক গুণ রয়েছে। অথচ তা থেকে একটি জিনিস বেছে নিতে হবে। উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি পরিষ্কার করা যাক। রোকেয়া মেডিকেল ও বুয়েটে চান্স পেয়েছে। যে কোনো এক জায়গায় তাকে ভর্তি হতে হবে। মায়ের পছন্দ তার মেয়ে ডাক্তার হবে আর বাবার পছন্দ মেয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুক। এমতাবস্থায় সে কোন বিষয়ে পড়বে তা নিয়ে তার মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। মা না বাবা কার আবদার রক্ষা করবে। দুজনই তার নিকট সমান প্রিয় ব্যক্তি। এ পরিস্থি'তি তাকে এক অস্বস্তির মধ্যে ফেলে দেয়।
আবার আসিফ বাজারে গেছে বোয়াল মাছ কিনতে। এখানে সে দুজন পরিচিত ব্যক্তির সাক্ষাৎ পেল। সে কার থেকে মাছ কিনবে এ নিয়ে তার মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। ওই মাছ দুজনের কাছেই আছে। সে মনে মনে ভাবে একজনের থেকে কিনলে অন্যজন রাগ করবে কি না, যদিও সে চায় না তাদের কেউ তার ওপর ক্ষুব্ধ হোক।

বিকর্ষণ-বিকর্ষণ দ্বন্দ্ব
দুটি লক্ষ্যবস্তু থেকে একটি গ্রহণ করতে হয়। প্রতিটিরই ঋণাত্মক গুণ আছে। অর্থাৎ উভয় সংকট। ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও একটি গ্রহণ করতে হয়। রাশেদের কিছু টাকার দরকার। বাড়ির পাশে এমন দুজন ব্যক্তি আছে একজনের সাথে রাশেদার ঝগড়া হয়েছে। আর অন্যজনের কথা বা মতামত সহ্য করতে পারে না। তারা দুচোখের বিষ, একেবারেই দেখতে পারে না। ফলে সে এড়িয়ে চলে। সে কি তাদের কাছে সাহায্যের আশায় যাবে? এ নিয়ে ভাবতে থাকে। কোনো উপায় না থাকায় একজনের কাছে যেতেই হবে। এ পরিস্থি'তি থেকে যে দ্বন্দ্বের উদ্ভব হয় তাকে বিকর্ষণ-বিকর্ষণ দ্বন্দ্ব বলে। আবার মিনহাজ স্কুলের পড়া না করাতে শাস্তি এড়ানোর জন্য স্কুল থেকে পালানোর কথা চিন্তা করে। কিন্তু তার এ কথা যদি বাড়িতে জানতে পারে তবে বাবা-মা তাকে খারাপ ভাববে। ফলে তার প্রতি অভিভাবকের মন্দ ধারণা তৈরি হতে পারে। সে কারণে স্কুল পালানো থেকে নিজেকে দূরে রাখে।
বিকর্ষণ-বিকর্ষণ দ্বন্দ্বে আচরণ ও চিন্তার দোদুল্যমানতা দেখা দেয়। একটি লক্ষ্যবস্তু যতই কাছাকাছি আসে ততই ব্যক্তির বিতৃষ্ণা বাড়তে থাকে এবং অন্য একটি লক্ষ্যবস্তুর দিকে ধাবিত হওয়ার ফলে বিরক্তির সীমা অতিক্রান্ত হয়ে যায়। ফলে সে পালিয়ে তা থেকে পরিত্রাণ পেতে চায়। কিন' অন্য একটি ঋণাত্মক শক্তি তাকে পালাতে বাধা দেয়।

আকর্ষণ-বিকর্ষণ দ্বন্দ্ব
এখানে মাত্র একটি লক্ষবস্তু থাকে। একটি জিনিসের একই সাথে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক গুণ আছে। ধনাত্মক গুণের কারণে ব্যক্তি ওই জিনিসের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে আবার ঋণাত্মক গুণ বেশি শক্তিশালী হওয়ায় তা গ্রহণ বা অর্জন থেকে দূরে সরে আসে। কবিরের বিবাহের জন্য একটি পাত্রী পাওয়া গেছে। সে দেখতে খুব সুন্দর। কিন্তু তার শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই বললেই চলে বা স্বল্প শিক্ষিত। পারিবারিক পটভূমি তেমন সুবিধাজনক নয়। এখানে সে সুন্দরের জন্য আকর্ষণবোধ করে আবার শিক্ষাগত যোগ্যতার কথা ভেবে অগ্রসর হওয়া থেকে দূরে থাকে। কারণ নেপোলিয়ান বলেছেন, ‘আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেব’। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে মেয়েদের সৌন্দর্যকে বিশেষভাবে মূল্যায়ন করা হয়। অন্য কোনো বৈশিষ্ট্য এখানে গৌণ। একমাত্র সুন্দর চেহারা দ্বারা সে বাজিমাত করতে পারে।
ইমতিয়াজ গরুর মাংস খেতে ভালোবাসে। কিন' তার ব্লাডপ্রেশার রয়েছে। ফলে মাংস গ্রহণ না বর্জন করবে তা নিয়ে দ্বন্দ্বে ভোগে।

দ্বিগুণ আকর্ষণ-বিকর্ষণ দ্বন্দ্ব
এক্ষেত্রে ব্যক্তির সামনে দুটি লক্ষ্যবস্তু রয়েছে। দুটি বিষয়ের প্রত্যেকটির একই সাথে ঋণাত্মক ও ধনাত্মক গুণ রয়েছে। অর্থাৎ ভালো ও মন্দ উভয় দিক রয়েছে। ভালো গুণটি তাকে কাছে টানে আর মন্দটি দূরে সরিয়ে রাখে। কিন' একটি জিনিস তাকে অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে।
উদাহরণস্বরূপ নাফিসার নামনে দুটি লক্ষ্যবস্তু আছে। একটি ভ্রমণের আর অন্যটি গ্রীষ্মের ছুটির পর পরীক্ষা। ভ্রমণ আসলে আনন্দের কিন্তু ভ্রমণে গেলে পড়ালেখার অবস্থা নাজুক হবে। বাসায় বসে পড়ালেখা করলে ভালো ফলাফলের নিশ্চয়তা রয়েছে। আবার বেড়াতে না গেলে আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতে হবে। উল্লিখিত পরিস্থি'তিতে দ্বিগুণ আকর্ষণ-বিকর্ষণ দ্বন্দ্বের আবির্ভাব হয়।
ইন্ডিয়ায় একটি সাইকোলজিক্যাল সেমিনার হবে। এতে রাহেলাকে আমন্ত্রণ জানানো হলো। এ জন্য তাকে ইন্ডিয়ান ভিসা ও পাসপোর্ট করতে হবে। সেমিনারে যোগ দিলে সে অনেক কিছু শিখতে পারবে। ভ্রমণের সুযোগও রয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে পারবে। কিন্তু তাকে পাসপোর্ট করার জন্য টাকা খরচ করতে হবে। ফলে সে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যায়। সেমিনারে অংশগ্রহণ করবে কি না।
রাবেয়ার চাকরির বয়স শেষের পথে এমন সময় একটি চাকরিতে যোগদানের জন্য নিয়োগপত্র পেল। চাকরিস্থ'ল সেই খাগড়াছড়ির দুর্গম অঞ্চলে। তার চাকরিটা দরকার আবার সে খাগড়াছড়িতে যেতে চায় না। সে কী করবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
আসলে যে চালাক, বুদ্ধিমান ও সাহসী সে দ্বন্দ্ব থেকে পরিত্রাণ পেতে পারে। তুলনামূলক বিচারে যেটা তার কাছে বেশি আকর্ষণীয় বা গুরুত্বপূর্ণ তা গ্রহণ করে এ অবস্থার অবসান করা যায়। আবার একটি জিনিস আগে গ্রহণ করে অন্যটি পরবর্তী সময়ের জন্য রাখা যেতে পারে।

লেখক : গল্পকার
e-mail : tuhinabedin@gmail.com