আধুনিক ডাকপিয়ন ই-মেইল
নাজমুল হোসেন
সুকান্ত ভট্টাচার্যের এই কবিতা আজ অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। চিঠির যুগের সমাপ্তি না হলেও যেন পিছিয়ে পড়েছে অনেক গুণ। ১৭৭৪ সালে চালু হয় বিশ্বের প্রথম ডাক সার্ভিস। তখন এ সার্ভিস চালু ছিল শুধু নির্দিষ্ট এরিয়ার মধ্যে। এ সময় প্রথম চালু হয় সমুদ্র ডাক সার্ভিস। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে ১৮৩০ সালে শুরু হয় রেলওয়ে ডাক সার্ভিস। ডাক বিভাগের সর্বশেষ প্রযুক্তির বিমান ডাক সার্ভিস চালু হয় ১৯১১ সালে। তবে এ নিয়েও সন্তুষ্ট ছিল না মানুষ। সর্বশেষ ১৯৬৫ সালে চালু হয় অনলাইনে ডাক সার্ভিস বা ই-মেইল। এরপর ধীরে ধীরে এর প্রয়োজনীয়তা বাড়তে থাকে এবং বিস্তৃতি পায় ই-মেইলের। বর্তমানে প্রযুক্তিগত যোগাযোগের প্রধানতম চাহিদা ইন্টারনেট এবং ইন্টারনেট বিবর্তনের আধুনিকরূপ ইলেকট্রনিক মেইল বা ই-মেইল। বিশ্বের অসংখ্য মানুষ দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানে বর্তমান সময়ে ই-মেইলকে বেছে নিয়েছে। বিশ্বের প্রথম ই-মেইল সার্ভিস চিঠির মতোই মেইলবক্সে জমা হতো। ম্যাসাসুটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি প্রথম ১৯৬৫ সালে ই-মেইল সার্ভিসের প্রবর্তন করে। তখন ই-মেইলে নির্দিষ্ট বার্তা পাঠানো যেত। অনেকটা এখনকার মোবাইল ফোনে এসএমএস আদান-প্রদানের মতো। বর্তমান পোস্টাল সিস্টেমের মতো এটি পরিচালিত হতো প্রথমদিকের ই-মেইল সার্ভিস। প্রথমদিকে একটি নির্দিষ্ট এরিয়ার মাঝে এর যোগাযোগ সীমাবদ্ধ ছিল। আর এখন বিশ্বের অসংখ্য তথ্য মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পৌঁছে দেয়া সম্ভব হচ্ছে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে।
ই-মেইলের ইতিহাস
ই-মেইলের প্রথম দিকের কথা আমাদের অনেকেরই আজও অজানা। ইলেকট্রনিক মেইলকে সংক্ষেপে ই-মেইল বলা হয়। ই-মেইল হচ্ছে এমন এক ধরনের পদ্ধতি, যার মাধ্যমে কমিপউটার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বার্তা পাঠানো হয়। যখন ই-মেইলের প্রচলন শুরু হলো ঠিক সেই সময়ে প্রথম ই-মেইল পাঠানো হয়েছিল দুটি কমিপউটারের মধ্যে। আর দুটি কমিপউটারের মধ্যে ই-মেইল পাঠানোর সময় আরপানেট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হয়েছিল। আরও মজার ব্যাপার হলো ই-মেইলে প্রথম যে বার্তা ছিল তা হলো QWERTYUIOP। প্রথমদিকে অনেক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এতে প্রোগ্রাম লিখেছিল বার্তা আদান-প্রদান করার জন্য। সে সময় এতে বিভিন্ন টার্মিনালের সাহায্যে তাৎক্ষণিক চ্যাটও করা যেত। আবার এর কিছু জটিলতাও ছিল। কারণ এতে এক দল ব্যবহারকারী একটি কমিপউটার ব্যবহার করতে পারে। ১৯৬০ সালের শুরুর দিকে টাইম শেয়ারিং কমিপউটার কোনো নির্দিষ্ট প্রোগ্রামের ওপর বেশ সক্রিয় ছিল। অনেক গবেষণা প্রতিষ্ঠান টেক্সট মেসেজ রূপান্তরে তাদের প্রোগ্রামকে সেভাবে তৈরি করেছিল। ১৯৭২ সালে ই-মেইল স্থানান্তরের জন্য মেইল এবং এমএলএফএল সংযুক্ত করা হয় এফটিপি প্রোগ্রামের সাথে। উদ্দেশ্য আধুনিক মানের নেটওয়ার্ক চালু করা। গবেষক বেরি ওয়েসলার আরডি প্রোগ্রাম উন্নয়নে কাজ করেন, যার নামকরণ করা হয় এনআরডি প্রোগ্রাম। মার্টি ইয়ংক এনআরডি এবং এসএনডিএমএসজিকে একটি স্বাধীন প্রোগ্রামে উন্নয়ন ঘটান। ১৯৮০ সালে ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষকরা ই-মেইল প্রযুক্তিতে আরও অগ্রগতি পান। এরিক অলম্যানের তৈরি প্রোগ্রাম ডেলিভারি মেইল সংস্কার ঘটিয়ে নামকরণ করা হয় সেইন্ড মেইল। ১৯৮৮ সালে বাণিজ্যিক ই-মেইলের প্রবর্তন হয়। ১৯৯৩ সালে অনলাইনে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ই-মেইল।
ই-মেইলের ব্যবহার
বার্তা পাঠানো ও বার্তা পড়ার মাঝে ই-মেইল সেবা প্রথমে সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯৭০-এর প্রথম দিকে রে-টমলিনসন একটি ছোট দল নিয়ে ট্যানেক্স অপারেটিং সিস্টেমের উন্নয়নে কাজটি করেছিলেন। রে-টমলিনসন যেটা নিয়ে কাজ করছিলেন সেটা ছিল লোকাল ই-মেইল প্রোগ্রাম। ১৯৭১ সালের শেষের দিকে টমলিনসন প্রথম আরপানেট ই-মেইল অ্যাপ্লিকেশন উন্নয়ন করেছিলেন, যার মাধ্যমে এ পদ্ধতি হালনাগাদ করা হয়। ১৯৭৪ সালে সামরিক বাহিনীতে এর ব্যাপক প্রচলন বাড়ে। বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আদেশ পাঠাতে কর্মকর্তারা ব্যবহার করতেন ই-মেইল।
টমলিনসন ১৯৭২ সালে এক কমিপউটার থেকে অন্য কমিপউটারে তথ্য পাঠানোর জন্য @ চিহ্নটি ব্যবহার করেন। আর তখন থেকেই ই-মেইল অ্যাড্রেস হিসেবে ব্যবহারকারীর নাম @ হোস্ট ব্যবহার করা হয়। এরপর আস্তে আস্তে ই-মেইল পদ্ধতির উন্নয়ন সাধিত হতে থাকে। ল্যারি রবার্টস তৈরি করেন ই-মেইলের অন্যান্য সেবা। ১৯৭৬ সালে রবার্টের হাত ধরে যাত্রা শুরু করে কিছু ই-মেইল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে গ্রাহকেরা অনলাইন ছাড়াও অফলাইনে নির্দিষ্ট নেটওয়ার্কের ভেতর ই-মেইল আদান-প্রদান করতে পারে মাইক্রোসফট আউটলুকের মাধ্যমে। প্রথম দিকে ই-মেইলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারের মধ্যে ছিল এসএমটিপি অর্থাৎ সাধারণ তথ্য আদান-প্রদান সুবিধা। আর এখন ই-মেইলের মাধ্যমে আপনি আপনার যাবতীয় তথ্য প্রেরণ করতে পারবেন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে।
বিশ্বের ই-মেইল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান
বর্তমানে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান ই-মেইল সেবা দিচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো : জি-মেইল, জোহো মেইল, এআইএম মেইল, জিএমএক্স মেইল, ইয়াহু মেইল, গাওয়াব ডট কম, ইনবক্স ডট কম, ফাস্ট মেইল গেস্ট অ্যাকাউন্ট, উইন্ডোজ লাইভ হট মেইল, ইয়াহু মেইল ক্লাসিক, বিগস্ট্রিং ডট কম, লাভাবিট, জাপাক মেইল, মাইস্পেস মেইল, হটপপ, মাইওয়ে মেইল, কেয়ার টু ই-মেইল, মেইল ডট কম।
ই-মেইলের বর্তমান প্রেক্ষাপট
ইয়াহু এবং হটমেইল এবং জিমেইলের মতো অসংখ্য প্রতিষ্ঠান আমাদের যোগাযোগব্যবস্থাকে করেছে বন্ধুত্বপরায়ণ। শুরুর দিকে যখন অফলাইন পাঠকরা তাদের পার্সোনাল কমিপউটারে কিছুটা প্রসার ঘটিয়েছিল তখন অফলাইন পাঠকরা ই-মেইলকে গ্রহণ করেছিল তাদের মেইল সংরক্ষণের মাধ্যম হিসেবে। তারা তাদের মেইলকে পড়তে কিংবা পুনরাবৃত্তি করতে সক্ষম ছিল, যা বর্তমানে মাইক্রোসফট খুব সহজেই করে থাকে।
প্রতিনিয়ত উন্নয়নের ফলে বর্তমানে অনলাইনে ২৯০ কোটি ই-মেইল অ্যাকাউন্ট সৃষ্টি হয়েছে। গত বছর এসব অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ১০৭ ট্রিলিয়ন ই-মেইল পাঠানো হয়েছে। ওয়েভ মনিটরিং সংস্থা পিংডমের হিসাব মতে, প্রতিদিন গড়ে ২৯ হাজার ৪০০ কোটি ই-মেইল পাঠানো হয়।
রয়েছে শঙ্কা
বর্তমান সময়ে একটি ই-মেইল ঠিকানা প্রত্যেকটি মানুষের যেন সময়েরই দাবি। তবে আপনাকে অবশ্যই সচেতনতার সাথে এটিকে ব্যবহার করতে হবে। কারণ ই-মেইল তথ্য আদান-প্রদানের নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হওয়ায় বর্তমানে এটিকে বেছে নিয়েছে হ্যাকাররা। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ভাইরাস ছড়িয়ে দিচ্ছে ই-মেইলের মাধ্যমে। আর এ ভাইরাস বিপাকে ফেলছে মানুষকে। তবে একটু সচেতন হলেই রক্ষা পাওয়া সম্ভব।
দেশে অনুষ্ঠিত হলো ইমাজিন কাপ
আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে ইমাজিন কাপ শীর্ষক এক উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল শীর্ষ সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফট। বিশ্বে ইমাজিন কাপের প্রতিযোগিতা শুরু হয় ২০০৩ সালে। সারা বিশ্বের মেধাবী প্রযুক্তিবিদদের তৈরি করা নানা রকম প্রকল্প উপস্থাপন করা হয় প্রতিযোগিতায়। বাংলাদেশ দ্বিতীয়বারের মতো অংশ নিচ্ছে ইমাজিন কাপের চূড়ান্ত আসরে। দেশে আয়োজিত ইমাজিন কাপের বাংলাদেশ পর্বের মূল প্রতিযোগিতায় ১৩টি দল অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছিল। এদের মাঝ থেকে একটি দল নির্বাচিত হয়ে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ইমাজিন কাপের আন্তর্জাতিক আসরে অংশ নেবে। এ প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তরুণদের উদ্ভাবিত ১২১টি প্রকল্প জমা পড়েছিল। বিচারকদের বিবেচনায় এসবের মধ্য থেকে ১৩টি প্রকল্পকে বাছাই করা হয়। এ থেকে আবার সেরা তিনটি প্রকল্প নির্বাচন করা হয়। গত ১০ মে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে।
শীর্ষে যারা
আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের (এআইইউবি) প্রতিযোগিতায় শীর্ষস্থান অর্জন করেছে। এ দলের সদস্যরা হলেন নিয়াজ মোর্শেদ, অভিষেক আহমেদ, শহীদুল ইসলাম ও মুস্তাকিম আলী। সবাই কমিপউটার প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী। তারা একটি কঠিন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য সহায়ক মোবাইল ফোনে চালানোর উপযোগী একটি প্রযুক্তি তৈরি করেছিল এ দলটি। প্রকল্প সম্পর্কে নিয়াজ মোর্শেদ জানান, ‘আমাদের এ প্রকল্প একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীকে রাস্তা চেনাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এ ছাড়া এটি ই-বুক পড়া, ফোনকল করা বা এসএমএস পাঠানোর মতো সেবা দিতে সক্ষম।’
প্রথম রানার-আপ
হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিযোগাযোগ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী অলিউল ইসলাম এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী কাজী সাঈদ পাশা মিলে তৈরি করেছেন থার্ড আই নামের একটি প্রকল্প। এটি মনোনীত হয়েছে প্রথম রানার-আপ। প্রকল্প সম্পর্কে অলিউল ইসলাম জানান, দুই হাতই বিকল এমন মানুষ শুধু মাথা দিয়ে ইশারায় চালাতে পারবে কম্পিউটার। ফলে কম্পিউটার চালাতে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কোনো বাধা হিসেবে দেখা দেবে না। অলিউল ইসলাম জানান, এ প্রকল্পে একটি ওয়েবক্যামের মাধ্যমে কম্পিউটারের সামনে বসা ব্যবহারকারীকে পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং সে অনুসারে পরিচালিত হবে কম্পিউটার। এটি প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
দ্বিতীয় রানার-আপ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থী আদনান ইবনে খায়ের, সারাহ তাবাসসুম ও নাজির সালেহিন। তারা সবাই কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী। গত বছর ইমাজিন কাপ সম্পর্কে জানতে পারেন তারা। আর সেই থেকেই লিটল ব্রেইন দলটির যাত্রা শুরু। লিটল ব্রেইনের প্রকল্পের বিষয়ও ছিল প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন। তাদের উদ্ভাবিত প্রকল্প ব্যবহার করে একজন প্রতিবন্ধী ই-মেইল করা থেকে শুরু করে গান শোনা, ছবি দেখা ফেসবুক ব্যবহার করাসহ নানাভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে।
ইমাজিন কাপের চূড়ান্ত পর্বে বাংলাদেশকে নিয়ে যেতে এবারই প্রথমবারের মতো সারা দেশে প্রতিযোগিতার আয়োজন করে মাইক্রোসফট বাংলাদেশ। এখন থেকে প্রতি বছরই এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে বলে জানান ফিরোজ মাহমুদ। এবারের এ আয়োজন সম্পর্কে মাইক্রোসফট বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার ফিরোজ মাহমুদ জানান, ‘এ বছরের ইমাজিন কাপ প্রতিযোগিতায় জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য এমডিজির আটটি ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়কে বিবেচনা করা হয়েছে। এসব বিষয়কে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে কীভাবে জয় করা যায় প্রতিযোগীরা তাদের প্রকল্পে তা করে দেখাচ্ছেন।’ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী দল এবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ইমাজিন কাপের চূড়ান্ত পর্বে অংশ নেবে। এখন আমাদের প্রত্যাশা ইমাজিন কাপের চূড়ান্ত পর্বে বাংলাদেশের তরুণ দল তাদের মেধা, সৃজনশীলতা তুলে ধরবে সমগ্র বিশ্বের সামনে।
চারপাশে শুধু তেজস্ক্রিয় বিকিরণ!
গোলাপ মুনীর
পৃথিবী নামের এ গ্রহে নানা প্রাণীর বসবাস। প্রতিটি প্রাণীদেহেই পড়ে নানা মাত্রার তেজস্ক্রিয় বিকিরণ বা রেডিয়েশন। সে রেডিয়েশনের উৎস হতে পারে প্রাকৃতিক কিংবা মানবসৃষ্ট। প্রাণীদেহে এই বিকিরণ অতিমাত্রিক হলে প্রাণীর দেহকোষ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। অতিমাত্রার তেজস্ক্রিয় বিকিরণ সৃষ্টি করতে পারে ক্যানসার নামের মরণব্যাধির। কারণ হতে পারে মৃত্যুর।
তেজস্ক্রিয় বিকিরণ বা রেডিওয়েকটিভিটি হচ্ছে অণুগুলোর নিউক্লিয়াসগুলোর অসি'তিশীল অবস্থা। আর এ অস্থিতিশীল অবস্থা প্রকাশ পায় এর তাৎক্ষণিক ক্ষয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। সেই সাথে এর আয়নায়িত বিকিরণ বা আয়নাইজিং রেডিয়েশন রিলিজের মাধ্যমেও এর প্রকাশ ঘটে।
এই বিকিরণের শক্তি এতই জোরালো যে, এর প্রভাব বস্তু বা মেটারের ওপর পড়তে বাধ্য। আর বস্তুর ওপর এর প্রভাবের ফলে বিভিন্ন ধরনের আয়ন সৃষ্টি হয়। শরীরের ওপর রেডিয়েশন বা তেজস্ক্রিয় বিকিরণের ক্ষতিকর প্রভাব শুরু হয় তখন, যখন এসব আয়ন সৃষ্টি হয় জীবন্ত কোষে।
কোনো কিছুর ওপর বিকিরণ বর্ষণের নাম ইরেডিয়েশন। এই ইরেডিয়েশনের দুটি উপায় আছে। প্রথমত, যদি তেজস্ক্রিয় পদার্থ বা রেডিওয়েকটিভ মেটেরিয়েল দেহের বাইরে কোথাও থাকে এবং এর প্রভাব যদি শরীরের বাইরের দিকে পড়্লে তবে তাকে আমরা বলি এক্সটারনাল রেডিয়েশন বা বাহ্যিক বিকিরণ। দ্বিতীয়ত, বায়ুসেবন, পানিপান কিংবা খাবারের সময় রেডিওনিউক্লিয়াস শরীরে ঢুকে ভেতর থেকে বিকিরণ সৃষ্টি করা। আর এ রেডিয়েশনের উৎস হতে পারে দুই ধরনের্ল প্রাকৃতিক বা ন্যাচারাল এবং কৃত্রিম বা আর্টিফিশিয়াল। কৃত্রিম বিকিরণ উৎস বলতে আমরা বুঝি মানবসৃষ্ট উৎসগুলোকে। বিজ্ঞানীরা বলেন, পৃথিবীতে যেসব বিকিরণ উৎস রয়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগই মানুষের দুর্ভোগের কারণ।
ভূপৃষ্ঠের ওপর যে প্রাকৃতিক তেজস্ক্রিয় বিকিরণ পড়ে সেগুলো হয় আসে মহাকাশ থেকে কিংবা আসে কঠিন ভূত্বকে থাকা তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে। মহাকাশ থেকে আসা তেজস্ক্রিয় বিকিরণের মাত্রা পৃথিবীতে কতটুকু পড়বে, তা নির্ভর করে এর উৎসের উচ্চতা ও কৌণিক দূরত্ব অর্থাৎ অল্পিটচ্যুড ও লেটিচ্যুডের ওপর। সে কারণে যারা পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করেন এবং খুব ঘন ঘন বিমানে চড়েন, তাদের ওপর তেজস্ক্রিয় বিকিরণের প্রভাব বেশি পড়ার সম্ভাবনা থাকে। ভূপৃষ্ঠের তেজস্ক্রিয়তা বিপজ্জনক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যদি মানুষ বসবাস করে খোলা জমি বা মাঠ এলাকায়। হয়তো সেখানকার ভূত্বকে থাকতে পারে কোনো তেজস্ক্রিয় পদার্থ। তা ছাড়া ভূপৃষ্ঠের কোনো বস' থেকেও তেজস্ক্রিয় বিকিরণ আমাদের কাছে আসতে পারে। যেমন ফসফেট সার কিংবা কোনো খাবার, যাতে রয়েছে ক্ষতিকর কোনো তেজস্ক্রিয়তা। নির্মাণসামগ্রীর মধ্যে রেডনে রয়েছে ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয়তা। রেডন স্বাদহীন ও গন্ধহীন একটি নিষ্ক্রিয় গ্যাস। বিজ্ঞানের ভাষায় এটি একটি ইনার্ট গ্যাস। রেডন জমা হয় ভূপৃষ্ঠের নিচে। কঠিন ভূত্বকে ফাটল দেখা দিলে কিংবা খনি খননের সময় রেডন ভূপৃষ্ঠের ওপরে উঠে আসে।
রেডিওয়েকটিভিটি আবিষ্কার হওয়ার পর মানুষ ভাবতে শুরু করে কী করে এর প্রয়োগ মানব কল্যাণে করা যায়। এ ভাবনা থেকেই কৃত্রিম তেজস্ক্রিয় বিকিরণ উৎস সৃষ্টি করে তা কাজে লাগানো হলো ওষুধ তৈরিতে, পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনে, খনিজ পদার্থ সন্ধানে, আগুন চিহ্নিত করার কাজে। প্রয়োগ করা হলো কৃষি ও প্রত্নতত্ত্বে। পাশাপাশি এর ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ল পারমাণবিক মারণাস্ত্র তৈরিতে। পারমাণবিক চুল্লিতে দুর্ঘটনা ঘটার পর ‘নিষিদ্ধ’ ঘোষিত এলাকায় পাওয়া অনেক মূল্যবান পদার্থ থেকেও বিপজ্জনক তেজস্ক্রিয় বিকিরণের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
চিকিৎসার বেলায় এক্স-রে করার সময় মানুষের দেহে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ঘটে। বিভিন্ন রোগ চিহ্নিত করা ও চিকিৎসায় ব্যবহার হয় তেজস্ক্রিয় পদার্থ। অতি অপকারী ভয়াবহ সংক্রামক রোগের চিকিৎসায় আয়োনাইজিং রেডিয়েশন ব্যবহার হয়। চিকিৎসাকাজে ব্যবহূত রেডিয়েশন থেরাপির মাধ্যমে শরীরের ঝিল্লিকোষে তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব ফেলা হয় এগুলোর ভেঙে দেয়ার ক্ষমতা বিলোপ করার জন্য।
আজকের দিনে বায়ুমণ্ডলে যে পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালানো হয়, তাতে করে মানুষের শরীরে তেজস্ক্রিয় বিকিরণের উৎস সৃষ্টি হচ্ছে বায়ুমণ্ডল। অর্ধশত বছর ধরে পারমাণবিক ও হাইড্রোজেন বোমা বিস্ফোরণের ফলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ব্যাপকভাবে তেজস্ক্রিয় পদার্থ দিয়ে দূষিত হয়ে পড়েছে। পারমাণবিক চুল্লিগুলোও তেজস্ক্রিয় বিকিরণের আরেক উৎস। পারমাণবিক চুল্লিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ভিত্তি হচ্ছে ভারী নিউক্লিয়াসগুলোর চেইন ফিশন রিয়েকশন। পারমাণবিক দুর্ঘটনা হচ্ছে মানুষকে তেজস্ক্রিয় বিকিরণের মুখে ঠেলে দেয়ার মানবসৃষ্ট আরেক ক্ষেত্র। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্বাভাবিকভাবে চলার সময়ের চেয়ে দুর্ঘটনার সময়ে রেডিয়েশনের বিপদ বেশি। পারমাণবিক চুল্লির প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ কতটুকু ক্ষতিকর হবে বা না হবে। দুর্ঘটনা কেন্দ্র থেকে বায়ু কোনদিকে প্রবাহিত হচ্ছে, কত জোরে বইছ্লে তার ওপরও নির্ভর করে তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব চারপাশের কোথায় কেমন পড়বে। পারমাণবিক বিস্ফোরণ এলাকার সব প্রাণী ও উদ্ভিদকুল পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তার শিকারে পরিণত হয়। বৃষ্টিপাতের সময় রেডিওয়েকটিভ ক্লাউড বা তেজস্ক্রিয় পদার্থের মেঘ ভূপৃষ্ঠে এসে জমা হয়।
যেকোনো উপায়ে মানবদেহে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ঢুকতে পারে। আমরা এমন অনেক পদার্থের সংস্পর্শে প্রতিনিয়ত আসি, সেগুলো থেকে যে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ আমাদের দেহে প্রবেশ করছে তা-ও আমাদের জানা নেই। এ থেকে বেঁচে থাকার জন্য আপনার একটি উপায় হচ্ছে, রেডিয়েশন ডোসিমিটার ব্যবহার করা। ছোট্ট এ যন্ত্র দিয়ে আপনি নিজে নিজে মনিটর করতে পারবেন আপনার চারপাশে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ থেকে কতটুকু মুক্ত, চারপাশের পরিবেশ কতটুকু দূষণমুক্ত। তেজস্ক্রিয়তার দূষণমাত্রা যদি খুব বেশি ধরা পড়ে, তবে আপনার প্রথম করণীয় হবে তেজস্ক্রিতার উৎস থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেয়া। এরপর গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে কোনো পাকা ভবনে আশ্রয় নেয়া, যাতে শরীর ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে রক্ষা পায়। এ সময় ভবনের দরজা-জানালা বন্ধ রাখতে হবে। এমনকি ভেন্টিলেটরও বন্ধ করে দিতে হবে। চামড়ার ওপরের অংশকে তেজস্ক্রিয়তা থেকে বাঁচানোর জন্য পানি দিয়ে বারবার ধুয়ে দিতে হবে। চুল ও নখকে তেজস্ক্রিয়তার হাত থেকে বাঁচাতে বিশেষ ধরনের তরল ব্যবহার করতে হয়। গর্ভবতী মায়েদের এক্স-রে ও সিটি স্ক্যান করা থেকে বিরত রাখতে হবে। মোটকথা, আপনি যেখানেই থাকুন তেজস্ক্রিয় পদার্থ ও এর বিকিরণ আপনার পিছু নেবেই। অতএব, আপনাকে এ থেকে বেঁচে থাকার জন্য সতর্ক হতেই হবে। জানতে হবে তেজস্ক্রিয়তা থেকে বেঁচে থাকার উপায়গুলো।
২০০ বছরের বিবর্তনে ক্যামেরা প্রযুক্তি ইতিহাস
মোস্তাফিজুর রহমান
এখন যা বর্তমান পরক্ষণেই তা অতীত। আর অতীতের স্থান হয় স্মৃতিতে, যা অনেক সময় হয় সুখময়। যার কারণে মানুষ বারবার ফিরে যেতে চায় তার ফেলে আসা সুখময় স্মৃতিচারণে। কারণ এসব স্মৃতি জীবনের কাছে অনেক মূল্যবান। স্মৃতি কষ্টের হলে মানুষ ভুলে যেতে চায় সহজেই। কিন্তু সুখময় স্মৃতিগুলো মানুষ রাখতে চায় ফ্রেমবন্দি করে, যার অন্যতম মাধ্যম ক্যামেরা।
ক্যামেরার ইতিহাস
আমরা স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য চোখ বন্ধ করে ক্যামেরা ব্যতীত অন্য কিছু ভাবার কথা না ভাবলেও এক হাজার বছর আগে এ রকম কিছু ভাবাও ছিল কল্পনাতীত। যদিও নিশ্চিত করে বলা যাবে না কে কবে ক্যামেরা আবিষ্কার করেছিলেন। তবে এটা বলা যায়, ক্যামেরা আবিষ্কারের কৃতিত্ব নির্দিষ্ট কাউকে না দেয়া গেলেও বহুজনের পর্যায়ক্রমে শ্রম ও উন্নতির ফসল আজকের ক্যামেরা।
আবিষ্কারের নেপথ্যে যারা
ক্যামেরার আজকের অবস্থানের পর্যায়ক্রমের উন্নতির পেছনের গল্প খুব বেশি দিনের নয়। মাত্র ২০০ বছরের। কিন্তু ক্যামেরার ইতিহাস ঘাঁটতে চাইলে আমাদের ফিরে যেতে হবে এক হাজার বছর পেছনে। যতদূর জানা যায়, ১০২১ সালে ইরাকের বিজ্ঞানী ইবন-আল-হাইতাম আলোকবিজ্ঞানের ওপর সাত খণ্ডের একটি বই লিখেছিলেন আরবি ভাষায়, এর নাম ছিল কিতাব আল মানাজির। সেখান থেকে ক্যামেরার উদ্ভাবনের প্রথম সূত্রপাত। দৃশ্য ধারণের জন্য লেন্সের প্রয়োজনীয়তা এখানে পুনরুক্তি হয়েছিল। এরপর হাতে বহনযোগ্য ক্যামেরার নকশা প্রণয়ন করেন জোহান জন ১৬৮৫ সালে। পরে এই নকশার সফলতা প্রমাণ করতেও লেগে গিয়েছিল অনেক বছর। ১৮১৪ সাল ছিল ক্যামেরার ইতিহাসে একটি মাইলফলক। প্রথমবারের মতো আলোকচিত্র ধারণের কাজটি করেন জোসেপ নাইসপোর নিপস। তিনি পাতলা কাঠের বাক্সের মধ্যে বিটুমিন প্লেটে আলোর ব্যবহার করে ক্যামেরার কাজটি করেন। সে হিসেবে জোসেপ নাইসপোর নিপসকে প্রথম ক্যামেরা আবিষ্কারক ধরা যায়। তার ক্যামেরাসংক্রান্ত ধারণার ওপর নির্ভর করে ফ্রাঞ্চমেন চার্লেস এবং ভিনসেন্ট ক্যাভেলিয়ার প্রথম উৎপন্নক্ষম ক্যামেরা আবিষ্কার করতে সক্ষম হন। ১৮৩৬ সালে অলোকচিত্র সম্বন্ধীয় ব্যবহারিক তত্ত্ব আবিষ্কারে নিপসের সহযোগী হন লুইস জ্যাকাস ডাগুরি। নিপসের মৃত্যুর পর লুইস ডাগুরি একটি তত্ত্ব প্রকাশ করেন, সেখানে ডাগুরি সিলভার সংবলিত কপার প্লেটে স্পর্শকাতর আলোর ব্যবহার দেখান। ১৮৪০ সালে উইলিয়াম টালবোট স্থায়ী চিত্র ধারণের জন্য তিনি নেগেটিভ ইমেজ থেকে চিত্র পজিটিভ ইমেজে পরিবর্তন করেন। এরপরই বিশ্বব্যাপী ক্যামেরার প্রযুক্তিগত উন্নয়ন দ্রুতবেগে সমপ্রসারিত হতে থাকে। ১৮৮৮ সালটি ছিল ক্যামেরার প্রযুক্তিগত উন্নয়নের আরেকটি টার্নিং পয়েন্ট। ১৮৮৫ সালে জর্জ ইস্টম্যান তার প্রথম ক্যামেরা ‘কোডাক’-এর জন্য প্রথম পেপার ফিল্ম উৎপাদন করেন। বাণিজ্যিকভাবে এটাই ছিল বিক্রির জন্য প্রথম উৎপাদিত ক্যামেরা। এর ঠিক এক বছর পরে পেপার ফিল্মের পরিবর্তে সেলুলয়েড ফিল্মের ব্যবহার চালু হয়। ১৯৪৮ সালে বের হয় পোলারয়েড ক্যামেরা, যা এক মিনিটের মধ্যে চিত্র নেগেটিভ ইমেজ থেকে পজিটিভ ইমেজে প্রক্রিয়াকরণ সম্ভব হয়। দীর্ঘ ৭৫ বছর অ্যানালগ ক্যামেরা রাজত্ব করলেও ১৯৭৫ সালে কোডাকের স্টিভেন স্যাসোন ডিজিটাল ক্যামেরা নিয়ে আসেন।
আধুনিক ডিজিটাল ক্যামেরা
ইস্টম্যানের কোডাক কোমপানির ইঞ্জিনিয়ার সিটভেন জে স্যাসন সর্বপ্রথম ১৯৭৫ সালে ডিজিটাল ক্যামেরা আবিষ্কার করেন। স্যাসনের আবিষ্কৃত ডিজিটাল ক্যামেরার ওজন ছিল ৪ পাউন্ড (৩.৬ কিলোগ্রাম), এর রেজুলেশন ছিল .০১ মেগাপিক্সেল। সাদা-কালো ইমেজ-নির্ভর এই ক্যামেরার সাহায্যে একটি ক্যাসেটে প্রায় ২৩ সেকেন্ড রেকর্ড করে রাখা যেত এবং পরে ২৩ সেকেন্ড তা টেলিভিশনের মাধ্যমে প্লে-ব্যাক করার সুযোগ ছিল। ১৯৭৮ সালে স্যাসন ও লয়েড যুক্তরাষ্ট্রে মোট ৪১৩১৯১৯টি ডিজিটাল ক্যামেরা তৈরি করেন। ডিজিটাল ক্যামেরার আজকের বর্তমান যে প্রেক্ষাপট, তার শুরু হয়েছিল ইস্টম্যানের কোডাক কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার স্টিভেন জে স্যাসনের হাত ধরেই।



