মানসিক রোগ শিক্ষা, গবেষণা, চিকিৎসা ও জনসচেতনতায় পথিকৃৎ
পূর্ব প্রকাশের পর
শুরুতে প্রায় সব রোগীদের ক্ষেত্রে (১৯ শতকের শুর" থেকে ১৯৩০ দশক পর্যন্ত) যৌন নির্যাতনের কোনো সরাসরি উল্লেখ ছিল না। বেশির পক্ষে সেখানে ১৯২৬ সালের ইতিহাসে সংক্ষিপ্ত আকারে Goddard-এর ল্যাটিন ভাষায় একটি বিভ্রান্তির ঘটনা দেখা যায়। মনে হয় Goddard বিশ্বাস করতেন যে তার ১৯ বছরের রোগিনী তার পিতার দ্বারা নির্যাতীতা হয়েছিল তথাপি তিনি (মেয়েটির পিতা) তার সময়ে এতটা আদর্শিক মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মধ্যে ছিলেন যে, তিনি লিখেছিলেন এটা যেন মেয়েটির স্মৃতিতে একটা বিভ্রান্তি ছিল। এসব ঐতিহাসিক ঘটনাবলী সম্বন্ধে পরিষ্কারভাবে জানার কোনো উপায় নেই। সুতরাং আমরা সঠিকভাবে এই সিদ্ধান্ত দিতে পারি না যে, তখন শারীরিক না যৌন নির্যাতনের প্রকৃতপক্ষে প্রয়োজন ছিল কার্যকারণবশত অথবা আমরা বলতে পারি না যে এসব ঘটনাগুলো বিভিন্ন প্রকার রোগের কারণতত্ত্ব বিজ্ঞানের সোর্স থেকে এসেছিল কিনা। প্রাপ্ত একটা শিশুকালীন নির্যাতনের ঘটনা শুধুমাত্র MPD-র এবং বর্ডার লাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারের পূর্ব লক্ষণ বলেই প্রতীয়মান হতে পারে না বরং আরো হতে পারে ‘পোস্টট্রম্যাটিক স্টেস ডিসঅর্ডার’ এবং অন্যান্য বিশেষ মানসিক বৃত্তির অপসারণের অগ্রদূত হিসেবেও। সুতরাং আমরা এই মন্তব্য করতে পারি যে, শিশুকালীন আঘাত বা নির্যাতন জীবনের ওপর একটা অত্যন্ত জরুরি প্রভাব রাখে। কিন্তু যেসব লক্ষণ যৌবনকালীন জীবনে দেখা যায় অনেকগুলো host ফ্যাক্টরের ওপর নির্ভর করে। যেমন- দৈহিক কাঠামোগত, কতিপয় অবস্থার মধ্যে সুপ্ত রোগ প্রবণতা, যা সক্রিয় করা যায় বিশেষ মানসিক বৃত্তির অপসারণ এবং লক্ষণের পছন্দের ওপরে লিঙ্গের প্রভাব দ্বারা।
MPD এবং BPD-র মধ্যে তুলনা করে Marmer (1991) এবং Fink (1991) প্রত্যক্ষ করেছিলেন যে, BPD-র মধ্যে রয়েছে আদর্শিক বিভাজন আর যেখানে MPD রয়েছে বিভিন্ন অংশ ও টুকরার মধ্যের আক্ষরিক বিভাজন তার প্রত্যেকটিই আবার আলাদা আলাদা উপব্যক্তিত্ব প্রদর্শন করে। সাধারণত তারা একটি প্রধান প্রভাবিত অবস্থা প্রদর্শন করে। সব লেখক ও গবেষকগণ একমত হয়েছেন যে, বিশেষ মানসিক বৃত্তির অপসারনের প্রবণতা আরো খারাপ হয়ে যায় শিশুকালীন আক্রমণাত্মক নির্যাতন দ্বারা। যৌন নির্যাতনের প্রচন্ডতা যদি ঘটে থাকে পিতা বা বৈপিতার অজাচারজনিত প্রবেশ দ্বারা এবং তা যদি হয়ে থাকে দীর্ঘস্থায়ী/উঁচু তরঙ্গের নির্যাতন। একই স্তরের আর একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে MPD-র সত্যিকার বিশ্বাসী এবং সন্দেহ পোষণকারী উভয় পক্ষের মধ্যে যে, চিকিৎসকদের এটা দাবি করার পূর্বেই যে তারা একটা MPD-র Valid কেস নিয়ে Deal করছেন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে অবশ্যই রোগীর পূর্ব ইতিহাস লিখে নিতে হবে। তার জন্য এমন কৌশল অবলম্বন করতে হবে এবং যতটা সম্ভব এমন মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে অগ্রসর হতে হবে যে, কোনো প্রকার প্রশ্নের উদ্ভব না হয়।
১৯৯০ দশকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খবরের কাগজ ও জার্নালগুলো false memary Syndrome-এর গল্প দিয়ে ছিল পরিপূর্ণ। একজন রোগী পিতা অথবা অন্য পুরুষ আত্মীয়কে যৌন নিপীড়নের জন্য দোষী করার পর দেখা গেছে যে তিনি তা শুধুই তার স্মরণ থেকে উদ্ভাবন করেছেন অথবা মনের অজান্তে মিথ্যা অভিযোগ এনেছেন। এলিজাবেথ লফটাস এই মিথ্যা অভিযোগ সংশোধনকারীদের অগ্রাগামী ছিলেন। মিথ্যা অভিযোগে অনেক সময় একটা পরিবারকে ধ্বংস করে দিত। একটা অভিযোগ যে সত্যি সত্যিই মিথ্যা তা ১০০% প্রমাণ করা অতি সহজ কাজ নয়। ঠিক যেমন এটা নিশ্চিত হওয়াও খুব কঠিন যে একটা অজাচার বা যৌন নির্যাতনের স্মৃতি সঠিক।
আঘাতজনিত চাপে মানসিক গোলযোগ
বিগত ১৫ বছর ধরে আঘাতোত্তর চাপজনিত গোলযোগের আবর্তনের প্রচণ্ড আবেগ লক্ষ করা গেছে। এটাতে পিএমডির চেয়ে কঠিন চাপের প্রতি অনেক বেশি সাধারণ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। শুরুতে প্রথম মহাযুদ্ধের সময়ে এর পরিচয় ছিল ‘গোলার আঘাতের জন্য রিজার্ভ।’ ইদানীংকালে কিছু সংখ্যক সৈন্যের জন্য পিটিএসডিকে প্রায় আলাদাভাবে যুদ্ধকালীন সময়ের অভিজ্ঞতার ফলাফলের প্রতি দোষারোপ করা হতো। তারা কমপ্লেন করতেন-প্যানিক অ্যাটাক, দুঃস্বপ্ন, ফ্ল্যাশ ব্যাকের এবং অনেক সময় দৃষ্টিবিভ্রম ও শ্রুতি বিভ্রমজনিত সমস্যার। পরিণামে বিস্ফোরণ থেকে বেঁচে থাকার স্মৃতি, তাদের শিশুদের প্রিয়জনদের আলাদাভাবে উড়ে যেতে দেখে অথবা অন্যান্য ভয়াবহ আঘাতজনিত দৃশ্য যা যুদ্ধের সময়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ঘটে থাকে।
যেসব দেশে নাগরিকদের ওপর আক্রমণের ভয়ভীতি ও আঘাত আসতে পারে সেখানে অনেক বেশি শিশু, অনেক বেশি যুবকদের মধ্যে এরূপ লক্ষণ দেখা দেয়। যেভাবে সৈন্যদের মধ্যে গোলার আঘাতের শক দেখা দিয়ে থাকে। Putnam এবং Trickett একটা বাৎসরিক যৌনজনিত আঘাতের দুর্ঘটনার উদাহরণ তুলে ধরেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পিটিএসডির অতিসাধারণ পূর্ববর্তিতার স্তর ছিল এক লক্ষ ষাট হাজার কেসের জন্য। এতে এটা প্রমাণ হয় যে, এই দেশটি এই ধরনের মানসিক বৈকল্যের উন্নত প্রসূতিগারে পরিণত হয়েছে। যেহেতু বর্ডার লাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার বিশিষ্ট রোগী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হচ্ছে একজন অজাচারে আক্রান্ত স্ত্রী রোগ, তিনি প্রায়ই পিটিএসডির প্রবণতাও দেখিয়ে থাকেন। এই ধরনের একজন নারী যার পিতা পায়ুপথে তার সাথে যৌনতা শুরু করেছিলেন যখন তিনি ছিলেন পাঁচ কি ছয় বছরের শিশু। ওই সমস্ত ঘটনার সবকিছুই তার মননে পীড়া দেয়। এমন একটা মুহূর্ত আসে যখন তিনি তার স্বামীর সাথে সহবাসে উদগত হন তিনি তার লিঙ্গকে তার পেছনের দরজায় অনুভব করেন। তিনি ভয়ে ভীত হয়ে বেডরুম থেকে দৌড়ে বাইরে চলে যান। এটা বারবার ঘটে থাকে এবং তিনি উলঙ্গ অবস্থায় দৌড়ে আসেন, সাহায্যের জন্য চিৎকার করেন। হঠাৎ করে বাল্যকালের উজ্জ্বল স্মৃতিতে গাঁথা সেই ভয়াবহ দৃশ্য মনে জেগে ওঠে।
এই ধরনের বিপিডি এবং পিটিএসডির একত্র মিলিত ঘটনা আজকালের দিনে অতি সাধারণ, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এবং অস্ট্রেলিয়ায় এত বেশি যে, অসংখ্য গবেষক দাবি করেন যে বিপিডিকে নতুন নামকরণ করে পিটিএসডি রাখা উচিত অথবা ওটাকে পিটিএসডির বিবিধ সংস্করণ বলা উচিত। এটা একটা সংকীর্ণ মতামত যা দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যপূর্ণ ও বিবর্তনীয় সংজ্ঞাকে প্রত্যাখ্যান করে। তথাপি বোঝার মতো একটা মতামত। তৎসত্ত্বেও এই সব চিকিৎসককে বিশেষ ধরনের রোগীদের সম্মুখীন হতে হয়। Roger Pitman একজন ভিয়েতনামের ভ্যাটারান সম্বন্ধে বর্ণনা করেন যে তার ছিল উচ্চ ধরনের যুদ্ধের সম্মুখীনতার সাথে জড়িত প্রশ্নাতীত পিটিএসডি। তিনি ক্রমান্বয়ে অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার বাড়িয়েই চলছিলেন কিন্তু কোনো বিপিডি তার মধ্যে তৈরি হয়নি। এটা সত্ত্বেও সত্যি যে আজকালকের দিনে যাদের বেশির ভাগকেই বলা হয় পিটিএসডি তা শিশুকালীন আঘাতজনিত কারণের সাথে সম্পৃক্ত। প্রধানত যৌন নিপীড়ন খুব অল্প বয়সে যা ঘটেছে তাতে হোক না কেন যে পরিণত বয়সে তার পিটিএসডির লক্ষণের সাথে বিপিডি, এমপিডি, ওসিডি অথবা অন্য কোনো ধরনের মানসিক গোলযোগ থাক বা না থাক।
অসংখ্য গবেষক পিটিএসডির স্নায়ুতন্ত্রের শরীরবিজ্ঞান সম্বন্ধীয় আন্তঃসম্পর্ক খুঁজে বের করার জন্য চেষ্টা শুরু করেছেন। কীভাবে অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি একটি অ্যামপ্লিফায়ার হিসেবে মস্তিষ্কের মধ্যে কাজ করে আঘাতজনিত উত্তেজনাকে রেকর্ড করে রাখার কাজে সাহায্য করে, এসব নিয়ে Gary Aston-Jones গবেষণা করেন। তিনি ছিলেন ফিলাডেলফিয়ার হ্যানিম্যান মেডিকেল স্কুলে কর্মরত। Schiffer, Teicher Ges Parani colau হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে দেখাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, যেসব লোক বাল্যকালে কোনো মানসিক আঘাত পেয়েছে তারা বাম মস্তিষ্কের অপ্রতিসম প্রাধান্য প্রদর্শন করে যখন কোনো নিরপেক্ষ বিষয় নিয়ে চিন্তা করে। আবার যখন তারা কোনো ব্যথাভরা আবেগপূর্ণ ঘটনার কথা চিন্তা করে তখন ডান মস্তিষ্কের প্রাধান্য প্রদর্শন করে। যে মস্তিষ্ক গোলার্ধের মধ্যে কোনো প্রাধান্য বা কর্তৃত্ব থাকে না, সেই অংশ প্রাধান্য বিস্তারকারী অংশের চেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ করে আবেগ ও মেজাজকে। মানসিক আঘাতপ্রাপ্ত লোকদের মধ্যে কষ্টকর স্মৃতিগুলো মাথার ডানপাশের মগজে সংরক্ষিত হয় বলে প্রতীয়মান হয়েছে। যেগুলো কেমন করে স্মরণ রাখা হয়েছে তার ব্যাখ্যা দিতে সাহায্য করে একটি অকথিত পন্থায় এবং কেন এই ধরনের লোকগুলো প্রায়ই মানসিক আঘাতজনিত স্মৃতির জন্য ক্ষমার্হ হয়ে থাকে তারও ব্যাখ্যা প্রদান করে। একটি কনফারেন্সে Arther Green দেখিয়েছিলেন একটি ভিডিও টেপ, যাতে একজন যুবক আফ্রিকান-আমেরিকানের সাক্ষাৎকার দেখিয়েছিলেন। যুবকটি একটি আইনের সমস্যার মধ্যে পড়েছিল যাতে সে অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে তার শিক্ষককে হত্যা করার হুমকি দিয়েছিল। এই ঘটনার হুবহু মিল ছিল তার মায়ের রাগ প্রকাশ এবং তাকে দুই এবং তিন বছরের অবস্থায় প্রহার করার সাথে। সেই ঘটনার সজ্ঞান স্মরণ তার ছিল না। তার মাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করার পর ডা. গ্রীনের কাছে প্রকাশ করা হয়েছিল। তিনি জানতে পেরেছিলেন যে কীভাবে ২০ বছর পূর্বে তার মা তার সাথে ঘৃণার সাথে দুর্ব্যবহার করেছিলেন।
বর্ডার লাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার
১৯৮০-র দশকে হাসপাতালে ভর্তি অবস্থায় অসংখ্য দীর্ঘস্থায়ী বর্ডার লাইন রোগীদের ফলোআপ চিকিৎসা সমাপ্ত করা হয়েছিল। ১০ থেকে ৩০ বছর পূর্বের সন্ধানকৃত রোগীদের তাদের চিকিৎসা করা হাসপাতালে এনে পরীক্ষার পর বর্ডার লাইন রোগীদের জীবনবৃত্তান্ত যতটা বেশি সঠিকভাবে গঠন করা গিয়েছিল তা অন্যভাবে পাওয়া সম্ভব হয়নি। এর আগের গবেষণায় মাত্র ২ থেকে ৫ বছরের ঘটনাকে নেয়া হয়েছিল। দীর্ঘসূত্রিতার ফলাফল থেকে এটা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, বেশির ভাগ বর্ডার লাইন রোগীই পরবর্তীতে যথেষ্ট ভালো করেছে। তা সত্ত্বেও আত্মহত্যার গড় ছিল সিজোফ্রেনিয়া অথবা ম্যানিক ডিপ্রেসিভ রোগীদের মতো অনেক বেশি। প্রায় সবগুলো গবেষণায় ৮-১০%-এর মধ্যে পাওয়া গিয়েছে। যদিও অনেক বেশি বয়সী রোগীদের ক্ষেত্রে ওই গড় ছিল আরো অনেক কম, যারা বিশের কোঠায় ছিল তাদের আত্মহত্যার সম্ভাবনা বেশি ছিল। এই অনুপ্রেরণাকারী ফলাফল ছিল কোনো বিশেষ সামাজিক শ্রেণী এবং থেরাপির টাইপ ছাড়াই। বিশেষ কতগুলো কারণ টেনে বের করা যায় যা দীর্ঘস্থায়ী ফলাফলের জন্য পূর্বাভাস দেয়। উচ্চতর বুদ্ধিমত্তা, শিল্পীসুলভ প্রতিভা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা, শারীরিক বা দৈহিক আকর্ষণীয়তা এবং বেনামী মদ্যপায়ীদের সাথে অধ্যবসায়ী হওয়ার সামর্থ্য। অন্যান্য কারণ যা আগাম রোগের দুর্বল পূর্বাভাস দেয় সমাজবিরোধী প্রবণতা এবং একটা পৈতৃক অত্যাচারজনিত অথবা অজাচার ও প্রবেশজনিত ইতিহাস।
চলবে



