মানসিক রোগ শিক্ষা, গবেষণা, চিকিৎসা ও জনসচেতনতায় পথিকৃৎ
সঙ্গদোষের প্রভাব যে কত ভয়ংকর তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। আজকাল ছেলেমেয়েদের অভিভাবকরা সঙ্গদোষকে মারাত্মক ঘাতক ক্যান্সারের চেয়ে কম ক্ষতিকর মনে করেন না। শরীরের মধ্যে ক্যান্সার আঘাত করলে যেমন- দ্রুতগতিতে মৃত্যুর পথে এগিয়ে যায়, ছেলেমেয়েদের সঙ্গদোষও তেমনি। সরল নিরীহ নিষ্পাপ কিশোর-তরুণকে চরম হতাশা ও পরিণতিতে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। ডাক্তারগণ বলেন, যদি প্রথম দিকেই ক্যান্সার ধরা পড়ে তাহলে তা সেরে যায়, সঙ্গদোষ সম্বন্ধে মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা একমত। যত তাড়াতাড়ি সঙ্গদোষ ধরা পড়ে ততই আরোগ্যের সম্ভাবনা থাকে। দেরি হলে চরম পরিণতি পর্যন্ত হতে পারে।
সঙ্গদোষের ফলে আমাদের সমাজে প্রতিদিন, প্রতিটা মুহূর্তে কত অজস্র বিচিত্র বিচিত্র অপরাধ ও পদস্খলন ঘটে। অনেক সময় সঙ্গদোষের পাল্লায় পড়ে অনেক ছেলেমেয়ে নিষিদ্ধ দ্রব্যের নেশায় জড়িয়ে পড়ছে। অনেক সময় ছেলেমেয়েদের মাঝে সঙ্গদোষের জন্য যে ব্যাপারগুলো উৎসাহ দেয় তা হলো-
- নৈরাশ্য
- হতাশা
- না পাওয়ার ব্যথা
- দারিদ্র্য
- জ্ঞানের কমতি
- বিনোদনের অভাব
- জীবনের গতি
- আর্থসামাজিক কারণ
- আশা-নিরাশা ইত্যাদি
সঙ্গদোষে জড়িয়ে আপনার সন্তান যদি মাদকাসক্ত হয়ে যায় তাহলে বুঝবেন যেভাবে-
- সামান্য ব্যাপারেই রাগ করা
- বিরক্ত হতে থাকা
- মিথ্যা কথা বলা
- সতর্ক থাকা
- একা একা থাকা
- রাত জেগে থাকা
- কথা দিয়ে কথা না রাখা
- স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া
- বিচার-বিবেচনা ক্ষমতা কমে যাওয়া
- ঘরের মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করা ও তা বিক্রি করে দেয়া
- প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বাড়ির বাইরে থাকা
- অদ্ভুত অদ্ভুত ধরনের বন্ধু-বান্ধবের আনাগোনা বেড়ে যাওয়া
- পোশাক-পরিচ্ছদের রুচির বড় রকমের পরিবর্তন হওয়া
- শুধু আসক্ত বন্ধুদের সাথে মেলামেশা করা বা বন্ধুত্ব করা
- পড়াশোনায় অমনোযোগী হওয়া
- স্কুল বা কলেজ পালানোর অভ্যাস তৈরি হওয়া
- নিজেকে সবার কাছ থেকে দূরে রাখা
- স্বান্থ্য নষ্ট হয়ে যাওয়া, চেহারা সুরতও নষ্ট হয়ে যাওয়া
- প্রতিদিনই হাত খরচ বেড়ে যাওয়া
- ক্ষুধা নষ্ট হয়ে যাওয়া ইত্যাদি
তাই এ সময় ছেলেমেয়েদের অভিভাবকদের উচিত তার সন্তানের দিকে দৃষ্টি দেয়া এবং তাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া এবং মাদকমুক্ত করার ব্যবস্থা করা।
সঙ্গদোষে আক্রান্ত বিপথগামী কিশোর-কিশোরীর সংখ্যা আজ আর কম নয়। দিনে দিনে এদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। অধিকাংশ বিপথগামী কিশোর বা কিশোরী পরিবেশ পরিস্থি'তির অসহায় শিকার। নানা পাকে চক্রে সঙ্গদোষে পড়ে একবার পিচ্ছিল পথে গড়াতে থাকলে নিজের সামর্থ্যে ঘুরে দাঁড়ানো বা ফিরে আসা তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। একটি ঘটনার বর্ণনা দেয়া যায়। ছেলেটির বয়স বিশ বছর। সচ্ছল পরিবার। নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি বলতে যা বোঝায় তা ওদের ছিল না। বরং দাদা-দাদি, বাবা-মা, ভাই-বোন মিলে পরিপূর্ণ সংসার। বাবা-মা কিছুদিন ধরেই লক্ষ করছেন তাদের ছেলে কেমন যেন পাল্টে যাচ্ছে। সব সময় টাকার চাহিদা। বাবা-মায়ের সঙ্গে ভালো করে কথা বলা দূরে থাক সব সময় শুধু রুক্ষ মেজাজ করে অকারণেই। বাড়িতে শাসন করা যায় না। দাদা-দাদি আগলে নেন। ইদানীং আবার বাড়তি উপসর্গ যোগ হয়েছে। রাত করে বাড়ি ফেরে। খায় না, পরদিন দুপুরে এগোরোটা-বারোটা পর্যন্ত ঘুমায়। বহুবার কারণ জিজ্ঞেস করেছেন বাবা-মা। হতাশ, ছেলের কাছ থেকে কোনো কথা আদায় করতে পারে না। শুরু হলো কাউন্সিলিং। ছেলেটি স্বীকার করল নানা রকমের নেশায় সে এখন আসক্ত। সিগারেটে পুরে গাঁজা-চরস এমনকি মারিজুয়ানা পর্যন্ত খায় সে। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মদ না হলে চলে না। কীভাবে শুরু হলো এই নেশার রাজ্যে যাতায়াত? শোনা গেল বিখ্যাত একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ে ছেলেটি। অকপটে বলল, বছর দুয়েক আগে এক বন্ধুর সঙ্গে এক বিখ্যাত হোটেলে ডিসকো দেখতে গিয়েছিলাম। সেই থেকে শুরু। কেমন একটা আকর্ষণ তৈরি হয়ে গেল। মাঝে মাঝে টাকার জোগাড় করে সে ডিসকোতে যেত। উদ্দাম নাচ আর বাজনা। সঙ্গে তরল পানীয়। অল্পদিনের মধ্যে দু-চারটে মেয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে যায় ওখানে। তারপর শুরু হয় শুকনো নেশা। আলাদা একা মজা। কিন্তু মুশকিল হয়েছে বাবা-মা কীভাবে যেন জানতে পেরেছে। তারপর থেকে টাকা-পয়সা বন্ধ। আর আজ তো আপনার কাছে নিয়ে এসেছে।
ঘটনার বিবরণ শুনে ছেলেটিকে আমি চিকিৎসা করি। আচরণগত অস্বাভাবিকতা কেটেছে অনেকখানি। এখন ভালোর দিকে। আমার কিন্তু মনে হয়েছে ছেলেটির ওই ব্যবহারিক পরিবর্তনের পেছনে অভিভাবকদের দায়িত্ব ছিল বেশি। তারা ছেলেটিকে সঙ্গ দিতে পারেনি। ফলে ছেলেটি মন্দ সঙ্গদোষে জড়িয়ে যায়।
সিজোফ্রেনিয়া এবং স্কুল পালানো
১৯৯০ সালের পর থেকে আত্মসম্বন্ধিতা বা অটিজমকে সিজোফ্রেনিয়া থেকে আলাদা করে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। যদিও অটিস্টিক শিশু ও সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের রোগলক্ষণ অনেকটা একই রকমের, তবুও এদের পার্থক্য থাকে।
১০০০ ছেলেমেয়ের মধ্যে ১-২ জনের সিজোফ্রেনিয়া দেখা যায়। সিজোফ্রেনিয়া ৫ বছর বয়সের আগে সাধারণত দেখা যায় না। সাধারণত কৈশোরে এ রোগ ধরা পড়ে, হঠাৎই রোগ লক্ষণ দেখা যায়। সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত বাবা-মায়ের সন্তানদের ক্ষেত্রে এই রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি এবং অনেক ক্ষেত্রেই রোগলক্ষণ ধীরে ধীরে প্রকাশিত হয়।
সিজোফ্রেনিয়ার মতো কঠিন মানসিক রোগ কৈশোরে ও মধ্য ত্রিশের সময় বেশি দেখা যায়। তবুও ৬-৭ বছর বয়সের ছেলেমেয়েদের মধ্যেও কখনো কখনো সিজোফ্রেনিয়ার প্রাদুর্ভাব ঘটে থাকে। যদিও রোগলক্ষণ বড়দের মতো হয় তবুও রোগ নির্ণয়ে অসুবিধা দেখা দেয়। শৈশবে সিজোফ্রেনিয়া কৈশোর বা পূর্ণবয়স্কদের মতোই হয় এবং দেখা দেয়-
- হ্যালুসিনেশন বা চিত্তবিভ্রম
- ডিলিউশন বা ভুল ভাবনা
- আচার-ব্যবহারে বিশৃঙ্খলা
- ভুল কথাবার্তা
সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত শিশু বা কিশোর প্রথম দিকে-
- অসংলগ্ন কথাবার্তা প্রকাশ করে
- অসংলগ্ন আচার-ব্যবহার করে
এক্ষেত্রে পুরোপুরি রোগলক্ষণ প্রকাশ পেতে ১ বছর সময় লাগে। সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত শিশুদের বয়সানুযায়ী পারদর্শিতা দেখা যায় না, তারা আশানুরূপ মেলামেশা করতে পারে না।
- নানা রকম অদ্ভুত শব্দ
- অডিটরি হ্যালুসিনেশন বা শ্রবণবিভ্রম
- ভিজুয়্যাল হ্যালুসিনেশন বা দর্শনবিভ্রমের জন্য তারা ভূত-প্রেত অথবা অচেনা মুখ ইত্যাদি দেখে থাকে। এদের মধ্যে যে ভ্রান্ত ধারণা আসতে পারে তা হলো-
- কেউ তার পেছনে লেগেছে
- কেউ তার ক্ষতি করবে
- নিজেকে বিরাট কিছু মনে করা
- নিজের মধ্যে অস্বাভাবিক ক্ষমতা অনুভব করা ও সেই মতো আচার-আচরণ করা ইত্যাদি বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ পায়।
- চুপ করে থাকা
- সংক্ষেপে প্রশ্নের উত্তর দেয়া
- অবিরত কথার প্রসঙ্গ পাল্টানো
- কথার মধ্যে অমিল
- অপ্রাসঙ্গিকতা
- ভয়
- উৎকণ্ঠা
- উদ্বিগ্নতা
- বিষণ্নতা
- নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকা ইত্যাদি লক্ষ করা যায়।
অত্যন- জটিল মনোরোগ সিজোফ্রেনিয়া। এ রোগ মানুষের জীবনকে এলোমেলো করে দেয়। সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগীর উপসর্গ দেখে পরিবারের অন্যান্য সদস্য ভীত হয়ে পড়ে। অনেক সময় রোগীর অদ্ভুত আচরণ পরিবারের পক্ষে বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সিজোফ্রেনিয়ার রোগীর মধ্যে কখনো কখনো ভায়োলেন্ট দেখা দেয়। সাধারণত হ্যালুসিনেশন ও ডিলিউশনের কারণে এ অবন্থা প্রকাশ পেতে পারে। সিজোফ্রেনিয়ার মধ্যে প্যারানয়েড সিজোফ্রেনিয়ার রোগীরা বেশি মাত্রায় ভায়োলেন্ট প্রকাশ করতে পারে। তবে তা সব সময় নয়।
কিশোর-কিশোরীর মানসিক সমস্যা
স্কুলজীবনের গুরুত্ব একটি ছেলে বা মেয়ের জীবনে অনেক। পরিবারের ছোট গণ্ডির বাইরে স্কুলই তার জীবনে এক বড় পরিবেশ ও সমাজ। এখানে সে তার মতো অন্যান্য সমবয়স্ক সঙ্গীকে কাছে পায়। কিছু ভয়, কিছু সংকোচ, লজ্জা বা জড়তা ছেলেমেয়েদের মনে থাকতে পারে। কিন্তু কিছুদিন পরেই তা কেটে যায় ও স্কুলের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে শিখে যায়। স্কুল পালানো বা স্কুলে না যেতে চাওয়ার ঘটনা এখন অনেক কমে এসেছে। তার কারণ অনেক কম বয়স থেকেই বাবা-মা স্কুলে পাঠানোর প্রস'তি নিয়ে থাকেন। তাছাড়া শিশুদের স্কুলে শেখানো বা বোঝানোর ব্যবন্থা আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত। শিশুমনকে বোঝার ও বোঝানোর জন্য খেলাধুলা, নানা রকম খেলনারও সাহায্য নেয়া হয়ে থাকে। তার জন্য ছেলেমেয়েরা স্কুলকে ভালোবাসতে শেখে। তবে এর ব্যতিক্রমও আছে। ছেলেমেয়েরা সাধারণত যেসব কারণে স্কুলে যেতে চায় না বা স্কুল পালায় তা হলো-
- ভয়-উৎকণ্ঠা
- শিক্ষক-শিক্ষিকা সম্বন্ধে ভয়
- কঠোর শাসন
- অতিরিক্ত নিয়ম-শৃঙ্খলা
- নিরাপত্তার অভাব
- উৎসাহহীনতা
- ভালোবাসার অভাব ইত্যাদি
স্কুল পালানো বা স্কুল সম্বন্ধে যে সমস্ত ছেলেমেয়ের অত্যধিক ভয় থাকে তাদের সমস্যা সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কেন সে স্কুলে যেতে চায় না, তার কী সমস্যা দেখা দরকার। এছাড়া মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর জন্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করা দরকার।



