Skip to main content

অ্যান্টিবায়োটিক বনাম প্রোবায়োটিক

গোলাপ মুনীর

মানব সভ্যতা এগিয়ে চলেছে। মানুষের জানার দুনিয়া সমপ্রসারিত হচ্ছে। আমরা আয়ত্ত করছি নতুন নতুন কৌশল। অন্যসব ক্ষেত্রের মতো চিকিৎসার ক্ষেত্রেও আবিষ্কার উদ্ভাবনের শেষ নেই। তারপরও মানুষ রোগবালাই থেকে রেহাই পাচ্ছে না। যতই দিন যাচ্ছে, ততই কঠিন থেকে আরও কঠিন রোগ এসে হামলে পড়ছে মানুষের ওপর। চিকিৎসকরা মুখোমুখি হচ্ছেন আরও বেশি জটিলতার। যতই মানুষ চেষ্টা করছে রোগবালাই জয়ের, সেখানে মানুষের পরাজয় যেন আরও বড় করে দেখা দিচ্ছে। এর দায় অনেক কিছুর ওপর চাপানো যায়। বলতে পারি, পরিবেশ পরিস্থিতির অবনতি এর জন্য দায়ী, মানুষের শারীরিক অক্ষমতা এবং মানুষের ক্রমেই বেড়ে চলা মানসিক চাপের জন্য দায়ী। মানুষের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা এখন আর এসব সইতে পারছে না। একই সাথে এটাও বলা যায়, এর জন্য সেসব ওষুধ দায়ী, একসময় যেসব ওষুধকে সহায়ক ও জীবনদায়ী মনে করা হতো, এখন এগুলোকে মানবশত্রু ঘোষণা করা হয়েছে। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের পাকস্থলীতে থাকা ৫০ কোটি মাইক্রো-অরগানিজম বা অণুজীব শরীরের সব রোগবালাই দূর করার জন্য আছে সদাপ্রস্তুত। সোজা কথা, আমাদের যত রোগ আছে, সব রোগই সারানোর ওষুধ আমরা পেতে পারি আমাদের পাকস্থলী থেকে।

চিকিৎসার রাজ্যে অ্যান্টিবায়োটিক বা জীবাণু
প্রতিরোধী একটি বহুল প্রচলিত শব্দ। এই অ্যান্টিবায়োটিকের যুগের শুরু পেনিসিলিন আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে। অণুজীব বিজ্ঞানী আলেক্সান্ডার ফ্লেমিং আবিষ্কার করেন এই পেনিসিলিন। পেনিসিলিন আবিষ্কারের পর মনে হয়েছিল, সব রোগের ওষুধের নাগাল আমরা পেয়ে গেছি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপ যখন যুদ্ধের ক্ষত সারিয়ে তোলার কাজে ব্যস্ত, ঠিক তখনই পেনিসিলিনের উৎপাদন শুরু হয়। এর ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ল সবখানে। পেনিসিলিন আবিষ্কারের ফলে শতভাগ হন্তক তথা ১০০% পার্সেন্ট কিলার গ্যাংগ্রিন বা দেহের অংশবিশেষের পচন দমন করা সম্ভব হয়েছে। জীবনসংহারী সংক্রামক রোগ নিবৃত্ত করা গেছে। ‘আজকের দিনে কার্যত প্রতিটি সংক্রামক রোগের জন্যই রয়েছে এর অ্যান্টিবায়োটিক। তারপরও অ্যান্টিবায়োটিক দূর হওয়া প্রয়োজন। আমাদের আইবল তথা চোখের পুতলিগুলোতে রয়েছে প্রচুর অ্যান্টিবায়োটিক। আমরা জানি না এবং বুঝি না, চোখের পুতলিতে প্রচুর পরিমাণে থাকা একটি জীবকোষ বা অণুজীব ওষুধ ও রোগের প্রতি সাড়া দেয়। অ্যান্টিবায়োটিক রোগ সৃষ্টিকর ফ্লোরাসহ উপকারী ফ্লোরাও ধ্বংস করে। আর এর ফলে অ্যান্টিবায়োটিক আমাদের শরীরে ভয়াবহ ক্ষতি করে।’ বললেন প্রফেসর ইভান ইউরিউপিন এমডি। তা ছাড়া প্রতিটি নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবির্ভাবের ফলে ইনফেকশন তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয় নতুন পরিবর্তিত আকার নিয়ে। এটি একটি ভিসিয়াস সার্কেল বা আবর্ত চক্র। তা সত্ত্বেও পরিস্থিতি নৈরাশ্যজনক নয়। প্রকৃতি ওষুধ সরাসরি আমাদের পেটে ফেলে দিয়ে যত্ন নেয় সবকিছুর। আমাদের প্রয়োজন শুধু এর ব্যবহার করা।

প্রোবায়োটিকগুলো হচ্ছে লিভিং মাইক্রো
অরগানিজম, ল্যাকটিক অ্যাসিড ব্যাকটেরিয়া, সাধারণত বাইফিডোব্যাকটেরিয়া বা ল্যাকটোব্যাসিলি কোনো কোনো সময় ইয়েস্ট। এগুলো সাধারণত আন্ত্রিক গ্রন্থিতে থাকে।
প্রথমবারের মতো প্রোবায়োটিক‘ অর্থাৎ ‘লাইফ’ শব্দটির প্রস্তাব আসে ১৯৫৪ সালে, সে সময়ে ইনটেস্টিনাল মাইক্রোফ্লোরার ওপর বিভিন্ন যৌগের প্রভাবসমপর্কিত একটি গবেষণার সূত্রে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, বাইফিডোব্যাকটেরিয়ার বংশ মানুষের জন্য নিরাপদ। এ ছাড়া এগুলোর রয়েছে বেশ কিছু উপকারী গুণ। এগুলো সংক্রমণরোধী, শরীরে রোগজীবাণু রোধের শক্তি বাড়ায়, অ্যালার্জি রোধ করে এবং মনমরা ভাব কমায়। তার পরও এখন পর্যন্ত এসব অণুজীবকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। খুব বেশি হলে এগুলোর ব্যবহার হয়েছে চিকিৎসা-পরবর্তী সময়ে। প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকের সাথে, অথবা প্রফিল্যাকটিক তথা রোগনিবারক হিসেবে। এখন বিশ্বে একটি বায়োটেকনোলজিক্যাল রিভোলিউশন অর্থাৎ জৈবপ্রাযুক্তিক বিপ্লব চলছে। মনে করা হয়, তথাকথিত জেন্টল ট্রিটমেন্টের এখন সব প্রজন্মে উত্তরণ ঘটেছে। এখন এ ধরনের নতুন নতুন অনেক ওষুধ বাজারে আসছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর হচ্ছে প্রোবায়োটিক ওষুধগুলো। প্রোবায়োটিক হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিকের ঠিক উল্টোটা। পাশ্চাত্যে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসকেরা চেষ্টা করে আসছেন পারতপক্ষে অ্যান্টিবায়োটিক না ব্যবহার করার জন্য। অবশ্য অতি প্রয়োজনের সময় তারা তা ব্যবহার এখনো করছেন। রাশিয়ায় প্রোবায়োটিকের অবস্থান অনেকটা এলোমেলো। সেখানে প্রোবায়োটিক বিবেচিত হয় খাবার হিসেবে অথবা বায়ো-অ্যাডিটিভ হিসেবে। খুব বেশি হলে সেখানে এগুলো ব্যবহার হয় প্রিভেনটিভ ও রেস্টোরেটিভ ট্রিটমেন্টের উপাদান হিসেবে। অনেক ডাক্তার এই প্রোবায়োটিক ওষুধ সম্পর্কে কিছুই জানেন না। তাদের কাছে প্রোবায়োটিক ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ দেয়ার আহ্বান কোনো কাজেই আসে না। তবে রাশিয়ার চিকিৎসকসমাজ ক্রমবর্ধমান হারে তাদের উপলব্ধিকে এ মর্মে আরও পরিপক্ব করে তুলছেন যে, প্রোবায়োটিক হচ্ছে প্রচলিত ওষুধের চেয়ে সস্তা ও কার্যকর। প্রেসিডেন্ট ইউরিউপিন বলেছেন-‘ধরুন, আপনি কিংবা আপনার কোনো প্রিয়জনের পিঠে ব্যথা হয়েছে এবং একটা সময় দেখা গেল আপনি আর সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারছেন না। এ অবস্থায় শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকের কাছে গেলেন। পরীক্ষায় আপনার হার্নিয়া ধরা পড়ল। আপনি তা সারাতে পারেন সার্জারির মাধ্যমে। তা সত্ত্বেও আপনাকে সার্জারির খরচ থেকে বাঁচাতে পারেন। তিনি আপনাকে পরামর্শ দিতে পারেন গাভীর দুধের গাঁজন থেকে তৈরি পানীয় কেফির পান করার জন্য। আপনাকে বলা হলো দু-তিন দিন পর আপনার ব্যথা সেরে যাবে। আপনি কি এ পরামর্শকে অবাস্তব ভাববেন? না তেমনটি হবে না। কারণ টক দুধে আছে প্রোবায়োটিকস। এই প্রোবায়োটিক সার্জনের তুলনায় আরও বেশি ভালো উপায়ে নষ্ট কার্টিলেজ ঠিক করে দিতে পারে। প্রোবায়োটিক ঠিক করে দেয় ভেঙে যাওয়া সংযোগ আর এর ফলে রোগী সেরে ওঠে।
বহু উদাহরণ রয়েছে। রাশিয়ার অনেক ডাক্তারের কাছে প্রোবায়োটিক শুধু অপরিচিতই নয়, এরা আমদানি করা ওষুধটিই প্রেসক্রাইব করতে পারেন। যেখানে রাশিয়ার তৈরি প্রোবায়োটিকে রয়েছে এমন সব মাইক্রো-অরগানিজম, যেগুলোর ব্যাপারে সেখানকার মা, দাদি-নানিরা এবং সেই সাথে শিশুরাও অভ্যস্ত। আমদানি করা প্রোবায়োটিকে থাকে অ-স্বদেশী উদ্ভিদ বা ফ্লোরা। এগুলোর বিজ্ঞাপন প্রচুর এবং খরচবহুল। সেখানকার ডাক্তাররা মনে করেন আমদানি করা প্রোবায়োটিকই বুঝি ভালো বিকল্প। বিশেষজ্ঞরা ভবিষ্যদ্বাণী করছেন, আগামী ২০ বছরের মধ্যে প্রোবায়োটিক পণ্য ও তথাকথিত ফাংশনাল ফুডের অনুপাত ৩০ শতাংশে গিয়ে পৌঁছবে, যে অনুপাত বর্তমানে মাত্র ৩ শতাংশ।
উল্লেখ্য, এই ফাংশনাল ফুডের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আছে জীবন্ত মাইক্রো অরগানিজম। তখন মানুষ ওষুধ কেনার জন্য ফার্মেসিতে যাওয়ার পরিবর্তে কেফির, দই ও খাদ্যশস্য গুঁড়ো করে তৈরি সেরিয়েল কেনার জন্য যাবে সাধারণ দোকানগুলোতে। প্রোবায়োটিকগুলো ৫০ শতাংশ প্রচলিত খাবারের জায়গা দখল করে নেবে। আজকের দিনে প্রায় ১০০টি নিবন্ধিত প্রোবায়োটিক রয়েছে।
উন্নত দেশগুলোর খাদ্যশিল্প বিভিন্ন ধরনের দুধজাত পণ্য তৈরি করে। আর এগুলোতে আছে জীবন্ত মাইক্রো-অরগানিজম। দুধ প্রক্রিয়াজাত করে ব্যবহারের মধ্যে একটি পণ্য হচ্ছে ‘মিল্ক প্রোটিন’। এই মিল্ক প্রোটিন খাদ্যশিস্ফেপ এখন একটি আধুনিক প্রবণতা। এমনকি বিখ্যাত খাবার উৎপাদক কোম্পানি ম্যাকডোনাল্ডস খাবার দিয়ে লড়ে যাচ্ছে মুটিয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে। অথচ ম্যাকডোনাল্ডের খাবারকেই মানুষ মোটা হয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী করে থাকে। কারণ এই ম্যাকডোনাল্ডস সূচনা করেছিল ইয়েস্ট প্রোবায়োটিক, যা খেলে মানুষের ওজন বেড়ে যেত। এখন প্রচুর অর্থ খরচ করা হচ্ছে হারানো ওজন ফিরে পাওয়ার জন্য।
এখানেই শেষ নয়। দুধ থেকে পাওয়া যায় মূল্যবান কিছু হজমকারক পেপটাইড। পরিস্থিতি বিবেচনা করে এসবের কিছু পেপটাইড রক্তচাপের মৃদু নিয়ন্ত্রক। কিছু পেপটাইড মস্তিষ্কের জন্য উপকারী, যা কার্যকর ভূমিকা রাখে পীড়ন ও মনমরাভাব দূর করতে। আজকের দিনে বিশ্বে উৎপাদিত হচ্ছ ১৪৫ টন দুধ-প্রোটিন। আর এর উৎপাদন বছরে বাড়ছে ১০-১৫ শতাংশ হারে। দুর্ভাগ্য কাঁচা দুধ খুব বেশি সময় রাখা যায় না। দোকানে নিয়ে রেখে তা বিক্রি করা সম্ভব হয় না। কারণ এর সেলফ লাইফ কম। তবে এর সেলফ লাইফ বাড়ানো যায় নতুন প্রক্রিয়াজাত পদ্ধতি ব্যবহার করে। দুর্ভাগ্য রাশিয়ায় সে পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয় না। দুধের জীবন্ত অণুজীবের আয়ু কম হওয়ায় উৎপাদনে এর ব্যবহার কম হচ্ছে। এর বদলে ব্যবহার হচ্ছে শুষ্ক কোলি ব্যাকটেরিয়া, যার কার্যকারিতা খুবই কম।
প্রোবায়োটিকের বদলে ক্রমবর্ধমান হারে প্রিবায়োটিক ব্যবহার হচ্ছে শরীরের মাইক্রোইকোলজিক্যাল স্ট্যাটাস বাড়ানোর জন্য। প্রিবায়োটিকগুলো প্রধানত হারবাল যৌগ, যা উপকারী মাইক্রো-অরগানিজমের বিস্তারকে জোরাল করে তোলে এবং সেই সাথে তাদের নিজস্ব মাইক্রোফ্লোরার প্রবৃদ্ধিকেও জোরদার করে। এগুলো শরীরে প্রোবায়োটিকের বসবাসেও সাহায্য করে। সেই সাথে শরীরে সংক্রমণ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এ ছাড়া ম্যালিগন্যান্ট টিউমারের ঝুঁকি কমায়।