হার্টের চিকিৎসার পূর্বশর্ত হলো সঠিকভাবে রোগ নির্ণয়। হার্টের ব্লকেজজনিত সমস্যা নির্ভুলভাবে নির্ণয়ের একটি অত্যাধুনিক পদ্ধতি হলো ইটিটি। বুকে ব্যথার কারণ খুঁজে পেতে চিকিৎসকরা প্রায় সময়ই এ পরীক্ষাটি করে থাকেন।
ইটিটি কী
এক্সারসাইজ টলারেন্স টেস্টের সংক্ষিপ্ত রূপ হলো ইটিটি। ইসিজির মতোই একটি পরীক্ষা এটি। ইসিজি করা হয় বিশ্রামরত বা শোয়া অবস্থায়। আর ইটিটি করা হয় ব্যায়াম করা অবস্থায়। হার্টের রক্তনালিতে ব্লক থাকা সত্ত্বেও স্বাভাবিক অবস্থায় ইসিজি করে কোনো কিছু ধরা নাও পড়তে পারে। কিন্তু ব্যায়ামরত অবস্থায় ইসিজি করলে সামান্য ব্লক থাকলেও তা ধরা পড়ে। কখন করা হয়
কেউ হয়তো অনেক দিন ধরে বুকের ব্যথায় ভুগছেন। অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেও কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সে অবস্থায় চিকিৎসকরা ইটিটি করতে বলেন। ইটিটি করে যদি হার্টের রক্তনালিতে ব্লক থাকার প্রমাণ পাওয়া যায় তখন পরামর্শ দেয়া হয় এনজিওগ্রাম করার জন্য। এনজিওগ্রামের মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে ব্লকের পরিমাণ, স্থান নির্ণয় করা যায়। কারো যদি ইটিটি নেগেটিভ অর্থাৎ ব্লকের প্রমাণ না থাকে, তবে অনেক ক্ষেত্রে আর এনজিওগ্রাম করার প্রয়োজন পড়ে না। সোজা কথা, ইটিটি করার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি রোগীর এনজিওগ্রামের মতো বড় পরীক্ষার আদৌ প্রয়োজন আছে কি না।
কীভাবে করা হয়
ইটিটি পরীক্ষাটি করার আগে রোগীর ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাম পরীক্ষাগুলো অবশ্যই করতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ে রোগীকে একটি ট্রেডমিল বা ওয়াকারের (হাঁটার যন্ত্র) ওপর দাঁড় করানো হয়। দাঁড়ানো অবস্থায় ইসিজি লিড রোগীর গায়ে লাগিয়ে দেয়া হয়। একই সঙ্গে ব্লাড প্রেসার মাপা হয়। আস্তে আস্তে ট্রেডমিল চালু করা হয়। রোগী হাঁটতে থাকেন। ট্রেডমিলের সঙ্গে হাঁটার গতিও বাড়তে থাকে। সাধারণত প্রতি তিন মিনিট অন্তর ট্রেডমিলের গতি বাড়িয়ে দেয়া হয়। চিকিৎসক কম্পিউটারে তাকিয়ে থাকেন ইসিজিতে কোনো পরিবর্তন আসে কি না। খারাপ কোনো পরিবর্তন পাওয়া গেলে কিংবা রোগী বুকে ব্যথা অনুভব করলে সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষাটি বন্ধ করে দেয়া হয়। অন্যথায় টানা ৯ মিনিট ধরে হাঁটা অবস্থায় রোগীর ইসিজির পরিবর্তন মনিটরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। ৯ মিনিট পর রোগীকে বসিয়ে দেয়া হয় এবং বিশ্রামরত অবস্থায়ও ইসিজির পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হয়।
সুবিধা-অসুবিধা
খুব দ্রুত সময়ে এবং মোটামুটি নির্ভুলভাবে হার্টের ব্লকেজ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এর মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় এনজিওগ্রাম এড়ানো যায়। হার্টের রোগের উন্নতির জানার জন্য এটি একটি উত্তম পরীক্ষা, বিশেষ করে বাইপাস অপারেশন করার পর। ইটিটির প্রধান অসুবিধা হলো শতভাগ ক্ষেত্রে ব্লকেজ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় না। খুবই অল্প কিছু ক্ষেত্রে রিপোর্টে হেরফের হতে পারে।
পরীক্ষার খরচ
খরচ সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালভেদে এক হাজার ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ তিন হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
যাদের ক্ষেত্রে ইটিটি করা যাবে না
- সমপ্রতি যার হার্টঅ্যাটাক হয়েছে
- বিশ্রামে থাকা অবস্থায় যার বুকে তীব্র ব্যথা হয়
- অনিয়ন্ত্রিত উচ্চরক্তচাপ
- অনিয়ন্ত্রিত হার্ট ফেইলিওর
- মহাধমনির ভালভ সরু হয়ে গেলে
- মহাধমনিতে যার সমপ্রতি অপারেশন করা হয়েছে
- ডিপ ভেইন থ্রম্বসিস রোগ থাকলে।
পরীক্ষার ঝুঁকি
অপারেশনটি প্রায় ঝুঁকিমুক্ত। যদি ইটিটি করার আগে রোগীকে সঠিকভাবে চেক-আপ করা না হয়, তবে কিছুটা ঝুঁকি থাকতে পারে। মাত্র ০.০১% ক্ষেত্রে রোগী পরীক্ষা চলাকালীন সমস্যা বোধ করতে পারেন। পরীক্ষাটি তাই অবশ্যই একজন চিকিৎসকের উপস্থিতিতে করা উচিত।
লেখকঃ রেসিডেন্ট, কার্ডিয়াক সার্জারি
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
রোগনিরূপণে
আলট্রাসাউন্ড
ডা. মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ
আলট্রাসনোগ্রাফি রোগ নির্ণয়ে এক বিস্ময়কর চমক। শুধু একটি পরীক্ষার মাধ্যমে অনেকগুলো অরগানের বেশ কিছু তথ্য পাওয়া যায়, সেগুলো হলো-
অরগানের উপস্থিতি
মানুষের শরীরে নির্দিষ্ট স্থানে নির্দিষ্ট অঙ্গটি নাও থাকতে পারে। যেমন- মানব শরীরে দুটি কিডনি থাকার কথা কিন্তু কখনো কখনো শুধু একটি কিডনি নিয়ে মানুষ জন্মাতে পারে। আবার কারো বেলায় একটি কিডনি নির্দিষ্ট স্থানে না থেকে অন্য কোথাও থাকতে পারে। তদ্রূপ পিত্তথলি, জরায়ু, ডিম্বাশয়সহ অন্যান্য অরগান জন্মগতভাবেই অনুপস্থিত থাকতে পারে। আলট্রাসনোগ্রাফির মাধ্যমে নির্ভুলভাবে এ তথ্য পাওয়া সম্ভব।
অরগানের গঠন
কখনো কখনো অরগানটি নির্দিষ্ট জায়গায় থাকলেও আকারে ছোট থাকতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা তেমন থাকে না, যেমন এট্রোপিক কিডনি, ইনফেনটাইল জরায়ু। এ তথ্যটি নির্ভুলভাবে পাওয়া সম্ভব। মাঝেমধ্যে একটি অরগান প্রাচীর দ্বারা দুভাগে বিভক্ত হতে পারে। এ তথ্যটিও আলট্রাসনোগ্রাফিতে পাওয়া যায়।
অরগানের কার্যকারিতা
অরগানটি যথাস্থানে যথাযথভাবে থাকার পরও কাজে অক্ষম হতে পারে যেমন- ননফাংশনাল পিত্তথলি। এ তথ্যটিও আলট্রাসনোগ্রাফির মাধ্যমে সংগ্রহ করা সম্ভব।
অরগানের অসুখ-বিসুখ
অরগানটি যদি রোগাক্রান্ত হয় তবে কোন রোগ দ্বারা আক্রান্ত তা সহজেই জানা যায় আলট্রাসনোগ্রাফির মাধ্যমে। উদাহরণস্বরূপ
- লিভারের অ্যাবসেস, ক্যান্সার, জন্ডিস।
- পিত্তথলির পাথর, ক্যান্সারসহ বহু রোগ।
- ছোট বাচ্চাদের (যাদের বয়স ১৮ মাসের কম) ব্রেইনের ভেতরে সমস্যা থাকলে জানা যাবে।
- গর্ভাবস্থায় : বাচ্চার অবস্থান, সংখ্যা, জন্মগত কিছু ত্রুটি, গর্ভফুলের অবস্থান ইত্যাদি বিষয়ে জানা যাবে।
- শরীরের মাংসপেশি ও হাড়ের ত্রুটি-বিচ্যুতি জানা যাবে।
- স্তনের অসুখ-বিসুখ নির্ণয় করা যাবে।
- টেসটিসের কিছু অসুখ নির্ণয় করা যাবে।
- থাইরয়েড গ্ল্যান্ডের অসুখসহ আরও বেশ কিছু অরগানের অসুখ নির্ণয় করা যাবে।
মনে রাখতে হবে
আলট্রাসনোগ্রামে ভালো ফল পেতে হলে তিন দিক থেকে সহযোগিতা এবং দক্ষতার প্রয়োজন। এ তিন শক্তি হলো-
১. ক্লিনিসিয়ান
২. রোগী
৩. সনোলজিস্ট
ক্লিনিসিয়ানের দায়িত্ব
ক্লিনিসিয়ানের ডায়াগনোসিস যদি সনোলজিস্ট জানতে পারেন, তবে সনোলজিস্টের কাজ অনেকটা সহজতর হয়। সনোলজিস্ট তখন নির্দিষ্ট রোগটি আছে কি নেই এবং কাছাকাছি অন্যান্য রোগের ব্যাপারে মনোনিবেশ করতে পারেন। অন্যথায় সনোলজিস্টকে ম্যাজিক বক্সে হাতড়াতে হয়।
রোগ ডায়াগনোসিসে রোগীর সহযোগিতা একান্তভাবে প্রয়োজন। যেমন- পিত্তথলি, লিভার দেখতে হলে রোগীকে জোরে শ্বাস টেনে কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ রাখতে হয়। কিছু রোগী আছেন এ কাজটি সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে পারেন না। অজ্ঞান এবং সেমি-কনসাস রোগীদের ডায়াগনোসিস কষ্টকর।
সনোলজিস্টের দায়িত্ব
যেহেতু রোগটি সম্পর্কে মতামত দেবেন সনোলজিস্ট সেহেতু সনোলজিস্টের ভূমিকাই এক্ষেত্রে প্রধান। আর দায়িত্ব হলো রোগীকে ভালোভাবে বুঝানো এবং ভালো ছবি তৈরি করা, যাতে একটি বিশ্বাসযোগ্য মতামত দিতে পারেন।
এছাড়া আরও একটি বস্তুর বিরাট ভূমিকা আছে এ রোগ নির্ণয়প্রক্রিয়ায়। আর তা হলো আলট্রাসনোগ্রাফির মেশিনটি। অনেক ক্ষেত্রেই কম দামি মেশিনে এ পরীক্ষাকাজটি সম্পন্ন করতে হয়। মেশিন কম দামি বা ত্রুটিপূর্ণ হলে মনিটরে পাওয়া ছবিটিও ত্রুটিপূর্ণ হতে বাধ্য আর ত্রুটিপূর্ণ ছবি দেখে রোগ নির্ণয় খুব কষ্টকর ব্যাপার।
আলট্রাসনোগ্রাফির ক্ষতিকর দিক!
আলট্রাসনোগ্রাফি যেহেতু শব্দনির্ভর একটি পরীক্ষা, যেহেতু এখানে কোনো ধরনের তেজস্ক্রিয় রশ্মি শরীরে প্রবেশ করানো হয় না, তাই এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই বললেই চলে। এমনকি গর্ভাবস্থায়ও যদি প্রয়োজনে বেশ কয়েকবার এ পরীক্ষা করানো হয় তবু কোনো বিরূপ প্রভাব মা বা বাচ্চার ওপর পড়ে না। রোগীর প্রস্তুতি আলট্রাসনোগ্রামে সঠিক তথ্য দিতে হলে কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়। আলট্রাসনোগ্রামে ভালো তথ্য পেতে হলে রোগীর কিছু প্রস্তুতির প্রয়োজন পড়ে। রোগীর প্রস্তুতি ভালো না হলে মনিটরে বিকৃত ছবি দেখা যায়। ফলে কাঙ্ক্ষিত তথ্যের পরিবর্তে ভুল তথ্য আসতে পারে। রোগীকে কমপক্ষে ৬ ঘণ্টা অনাহারে থাকতে হবে। পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করতে হবে, যেন ইউরিনারি ব্লাডারে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ প্রস্রাব জমা থাকে। রোগীর ইড়বিষ মধং যত কম থাকবে তত ভালো ছবি তৈরি হবে মনিটরে। আর ভালো ছবি মানে সঠিক তথ্য।
রোগীর প্রস্তুতি ভালো না হলে
আলট্রাসনোগ্রাফির মাধ্যমে সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় করতে হলে রোগীকে পরীক্ষা উপযোগী হতে হবে। এ জন্য নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আহার করা যাবে না। পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করতে হবে, যাতে পাকস্থলীতে প্রয়োজনমতো পানি থাকে এবং মূত্রথলিতে প্রয়োজনমতো প্রস্রাব জমা থাকে। তা না হলে তথ্যবিভ্রাট ঘটতে পারে যেমন-
পিত্তথলির সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে না অর্থাৎ
ক. পিত্তথলি নাও পাওয়া যেতে পারে।
খ. গ্যাসের জন্য পাথর না থাকলেও পাথর আছে বলে মনে হতে পারে।
লিভার সম্পর্কে ভুল তথ্য পাওয়া যাবে যেমন-
নীরোগ লিভারে এমন কিছু ছাপ দেখা যেতে পারে, যা দেখে মনে হতে পারে সেকেন্ডারি মেটাটটেসিস (ক্যান্সার) হয়েছে।
কিডনির তথ্যবিভ্রাট ঘটতে পারে যেমন-
ক. যথাস্থানে থাকা সত্ত্বেও অনুপস্থিত মনে হতে পারে।
খ. পাথর না থাকলেও মনে হতে পারে পাথর আছে।
অগ্ন্যাশয় সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে না
ক. অগ্ন্যাশয় খুঁজে পাওয়া যাবে না।
খ. রোগ সম্পর্কে ভুল তথ্য পাওয়া যাবে।
জরায়ুর রোগ নির্ণয় কষ্টকর হবে
জরায়ু ভালোভাবে দেখা যাবে না
খ. অ্যাবসেস/টিউমার সম্পর্কে ভুল তথ্য পাওয়া যাবে।
ডিম্বাশয় খুঁজে পাওয়া যাবে না, আরো নানা সমস্যা হতে পারে।
যেসব তথ্য
নিখুঁতভাবে পাওয়া যায় না
- পাকস্থলীর কোনো অসুখ যেমন- আলসার, ক্যান্সার
- ক্ষুদ্রান্ত্রের অসুখ
- ফুসফুসের অসুখ। তবে ফুসফুসকে ঘিরে থাকা ঝিল্লিতে পানি জমা হলে তা ভালোভাবে নির্ণয় করা যাবে
- অনেক অরগানের ইনফেকশন
- এপেন্ডিসাইটিস
- বিশেষ করে ৩.৫ মেগাহার্টজের প্রোব দ্বারা। তবে ৭.৫ মেগাহার্টজের প্রোব দ্বারা ডায়াগনোসিস সম্ভব হতে পারে
- নাক-মুখ দিয়ে রক্ত যাওয়ার কারণ
- পায়ুপথে রক্ত যাওয়ার কারণ
- কখনো কখনো গর্ভাবস্থায় রক্ত যাওয়ার কারণ
- হার্নিয়া নির্ণয়, তবে বিশেষ প্রক্রিয়ায় হার্নিয়া অবস্ট্রাকটেড হলে নির্ণয় করা যাবে
- পারফুরেশন বা ফুটো হওয়া অঙ্গের প্রকৃত অবস্থা নিরূপণ
- গর্ভকালীন সময়ে যে থলিতে বাচ্চা এবং পানি থাকে তা ফুটা হলে
- কৃমি যখন স্বাভাবিক অবস্থানে থাকে। তবে কৃমি জটলা বেঁধে অবস্ট্রাকশন করলে তথ্য পাওয়া সম্ভব।
- এছাড়া অন্যান্য অঙ্গের সব তথ্যই আলট্রাসনোগ্রামের মাধ্যমে নির্ণয় করা সম্ভব।
লেখকঃ সহকারী অধ্যাপক
ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজ, কুমিল্লা



