মানসিক রোগ শিক্ষা, গবেষণা, চিকিৎসা ও জনসচেতনতায় পথিকৃৎ
বাঁচতে হলে ঘুমাতেই হবে। কিন্তু জানেন কি, ঘুম মানেই অনন্ত যৌবন? কোন বয়সে কতক্ষণ ঘুমাতে হবে? গড়পড়তা প্রাপ্তবয়স্করা এখন মাত্র ৬ ঘণ্টা ঘুমান। এত কম ঘুমিয়ে বাঁচা যায়? মাত্র ৪ ঘণ্টা করে ঘুমিয়ে নেপোলিয়ান কীভাবে বেঁচে ছিলেন তা হলে?
ইনসমনিয়ায় ভুগছেন! কিংবা স্লিপ অ্যাপনিয়ায়? ঘুমের মধ্যে নাক ডাকে বা হঠাৎ শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়? ঘুম আসতে নিয়মিত সেক্স জরুরি, নাকি রাগসঙ্গীত শোনা? যোগব্যায়াম, হোমিওপ্যাথি কিংবা আয়ুর্বেদে অনিদ্রার নাকি দাওয়াই আছে! মদ্যপানে সুখনিদ্রা হয়, নাকি পেট ভরে ভাত খেলে? গন্ধও নাকি ঘুম পাড়াতে পারে? অবশেষে তা হলে ওষুধ খেয়েই ঘুমাবেন?
আপনি কি ঘুমের মধ্যে হাঁটেন, বকবক করেন, হাসেন বা কাঁদেন? যখন-তখন, যেখানে-সেখানে ঘুমিয়ে পড়েন নাকি? ঘুম নিয়ে এমন হাজার প্রশ্নের সহজ সরল সমাধান মিলবে এই লেখায়...।
ঘুম
গালিয়ার্দই। বিশ্বখ্যাত বীর। সারা পৃথিবীকে পদানত করার স্বপ্ন যে দেখতে শিখেছিল খুব ছোটবেলা থেকেই। নিজেকে তৈরিও করেছিল সেভাবেই। দেশের পর দেশ জয় করে, ধ্বংসলীলা চালিয়ে, মানুষ হত্যা করে গালিয়ার্দই ভীষণ মজা পেত, রক্তে ছিল তার খুনের নেশা। কিন্তু রাতে দু চোখের পাতা সে এক করতে পারত না। গালিয়ার্দইর মাকে সবাই বলত খুনির মা, বেঈমানের মা। রণক্লান্ত সেই বীর বহুদিন পরে একদিন এলো মায়ের সঙ্গে দেখা করতে। বলল, ‘মা, আমি তোমার কাছে একটু ঘুমাতে এসেছি, তোমার কোলে মাথা রেখে একটু শোব আমি!’ মায়ের কোলে মাথা গুঁজে দিল গালিয়ার্দই। মা তার চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে শোনাতে লাগল সেই ছোটবেলার মতো ঘুমপাড়ানি গান। গভীর ঘুমের দেশে পাড়ি দিল গালিয়ার্দই। তার মা এবার কাপড়ের ভাঁজে লুকিয়ে রাখা একটি ছুরি বের করে হত্যা করল তার সেই খুনি পুত্রকে। চিরদিনের জন্য ঘুম পাড়িয়ে দিল গালিয়ার্দইকে। কিন্তু তারপর থেকে সেই মা তার দু চোখের পাতা আর কোনো দিনই বন্ধ করতে পারেনি। বিনিদ্র রজনী তাকে কাটাতে হয়েছে আমৃত্যু। ম্যাক্সিম গর্কি তার বিখ্যাত গল্প ‘মাদার অফ অ্যা ট্রেটার’-এ ঘুমকে এভাবেই করুণ ব্যঞ্জনাময় করে তুলেছেন। ঘুমের কথা বলতে গিয়ে মনে পড়ে গেল বাদলের কথা। সমপ্রতি চাকরি জীবন থেকে অবসর নিয়েছেন। স্ত্রী গত হয়েছেন অনেক দিন। শিফটিং ডিউটি করতেন খবরের কাগজের অফিসে। ঘুমের কোনো বাঁধাধরা সময় ছিল না, জাগতে হয়েছে রাতের পর রাত। ভেবেছিলেন অবসর জীবনে সুদে-আসলে পুষিয়ে নেবেন। তা আর হয়ে উঠল কই? নিজের বায়োলজিক্যাল ক্লকটাই যে বিগড়ে গিয়েছে এত দিনে। ঘুম আর আসে না। বৈকালিক ভ্রমণসঙ্গীদের পরামর্শে এটা-ওটা অনেক কিছুই করলেন, ঘুমের বড়িও খেলেন অনেক দিন। নিট রেজাল্ট শূন্য। বিরক্ত হয়ে মাঝরাতে একদিন রেডিও খুলে বসলেন। এফ এম চ্যানেলে ভেসে এল জগন্ময় মিত্রর গান-
‘তুমি কি এখন দেখিছ স্বপন-
আমারে-আমারে...।’ গানের পর গান। ফিরিয়ে নিয়ে এলো প্রায় ৪৫ বছর আগের যৌবনের দিনগুলো। অদ্ভুত নস্টালজিয়া। গান শুনতে শুনতে আবেশে আবেগে হারিয়ে গেলেন বাদল। ঘুমিয়েও পড়লেন এক সময়।
কাকে বলে ঘুম
ঘুম। দু অক্ষরের এই ছোট শব্দটিকে দু কথায় ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। ঘুম যে ঠিক কী, কেন পায়, কেন পায় না, কখন পায়-এ নিয়ে পৃথিবীজুড়েই কাজ করছেন বিজ্ঞানীরা। কেউ বলেন, ঘুম হলো চেতন এবং অচেতন স্তরের মধ্যবর্তী অবস্থা যখন মানসিক ক্রিয়া কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ থাকে কিন্তু শারীরিক ক্রিয়া ঢিলেতালে হলেও চলতে থাকে। কেউ বলেন, জেগে থাকার ঠিক বিপরীত অবস্থাই হলো ঘুম। বিজ্ঞানীরা বলেন, ‘স্লিপ ইজ অ্যা রেকারেন্ট রিভারসিবল কন্ডিশন অব মাসকিউলার ইনারশিয়া অ্যান্ড রিডিউসড সেন্সরি রিঅ্যাক্টিভিটি টু এনভায়রনমেন্টাল স্টিমুলাই’। তত্ত্বকথা থাক। আমাদের কাছে ঘুম ঘুমই। নিরবচ্ছিন্ন এক প্রশান্তি, বেঁচে থাকার রসদ।
কেন ঘুম পায়
ঘুম হলো মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রিত এক প্রতিবর্ত ক্রিয়া। আমাদের মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস অঞ্চলে রয়েছে স্লিপ সুইচ। এই সুইচই নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের ঘুম। এটা আসলে মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসের সামনের অংশের একগুচ্ছ বিশেষ ধরনের কোষ, যে অঞ্চলটাকে ‘ব্রেন অফ দ্য ব্রেন’-ও বলা হয়ে থাকে। এই স্নায়ুকোষগুলো থেকে এক ধরনের রাসায়নিক সংকেত হাইপোথ্যালামাসের পেছনে বিশেষ আরেকটি অঞ্চলে পৌঁছলেই আমাদের ঘুম পায়। আবার পেছন থেকে উল্টোপথে এই সংকেত হাইপোথ্যালামাসের সামনে পৌঁছলে আমরা জেগে উঠি। এই স্লিপ সুইচ আবার দেহের বায়োলজিক্যাল ক্লকের সঙ্গে তাল রেখে চলে। দিনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঠিক কতক্ষণ আমরা ঘুমাব, কতক্ষণই বা জেগে থাকব তার একটা ছন্দ বেঁধে দিয়েছে দেহের জৈব ঘড়ি, যে ছন্দকে বলে সার্কেডিয়ান রিদম।
এসব ঘুম তত্ত্ব জানা গেছে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ক্লিফোর্ড সাপারের নেতৃত্বাধীন একদল গবেষকের গবেষণা থেকে। প্রতিটি মানুষেরই ঘুমের একটা নিজস্ব ছন্দ অর্থাৎ সার্কেডিয়ান রিদম আছে। আবেগ, উত্তেজনা, অবসাদ-সহ নানা ধরনের অনুভূতি এই ছন্দকে সাময়িকভাবে বা স্থায়ীভাবে পাল্টে দিতে পারে। ২০০২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকায় ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধ্বংস হওয়ার পর বহু আমেরিকাবাসীর বায়োলজিক্যাল ক্লকের সার্কেডিয়ান রিদম পাল্টে গেছে। আমাদের সমাজেও এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটতে দেখি। একমাত্র সন্তানের অকালমৃত্যু বহু মা-বাবার রাতের ঘুম চিরতরে কেড়ে নিয়েছে। পরীক্ষার ঠিক আগে বহু ছাত্র-ছাত্রীই রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে না।
মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসের স্লিপ সুইচ কখন ‘অন’ আর ‘অফ’ হবে এ ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা কোনো স্থির সিদ্ধান্তে এখনো আসতে পারেনি। প্রচলিত ধারণা, শারীরিক পরিশ্রম বেশি হলে ঘুম পায়। বেশি খাওয়া-দাওয়া করলেও ঘুম পায় অনেকের। আবার খাটাখাটনি না করেও অনেকে ফুরফুরে মিষ্টি হাওয়ায় চট করে ঘুমিয়ে পড়তে পারে। তবে একটি ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা মোটামুটি একমত, কোনো কারণে মস্তিষ্কের রক্ত সরবরাহে ঘাটতি পড়লে আমাদের ঘুম পায়।
ঘুম পাড়ায় যারা
হাইপোথ্যালামাসের স্লিপ সেন্টারকে ঠিকঠাক কাজ করতে সাহায্য করে মস্তিষ্কের আরও কয়েকটি অংশ।
চোখ
চোখের রেটিনা থেকে মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসের অপটিক নার্ভের সাহায্যে খবর পৌঁছায় দিন-রাতের আলোর তারতম্যের। হাইপোথ্যালামাসের সুপ্রাকায়াজম্যাটিক নিউক্লিয়াস (ঝঈঘ) জেগে থাকা এবং ঘুমিয়ে পড়ার সংকেত পায় চোখ থেকেই।
পিনিয়াল গ্রন্থি
মস্তিষ্কের এই গ্রন্থিটি মেলাটনিন নামে একটি হরমোনের নিঃসরণ করে, যেটি ঝিমোতে এবং ঘুমোতে সাহায্য করে। সুপ্রাকায়াজম্যাটিক নিউক্লিয়াস এই নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে।
পিটুইটারি গ্রন্থি
ঘুমের মধ্যে এই গ্রন্থিটি গ্রোথ হরমোন নিঃসরণ করে যা প্রোটিন সংশ্লেষ এবং ক্ষতিগ্রস্ত কলার মেরামতিতে সাহায্য করে।
পন্স
পশ্চাৎ মস্তিষ্কের এই গুরুত্বপূর্ণ অংশটি সংকেত পাঠায় সুষুম্নাকাণ্ডকে, তার কাজকর্মের হারকে ঘুমের সময় কমিয়ে আনতে। এর ফলেই ঘুমের জঊগ পর্ব শুরু হয়ে যায়।
কীভাবে ঘুম আসে
নিদ্রাদেবী কীভাবে তার কোলে আপনাকে ঠাঁই দেবেন, তা নিয়েও গবেষণা করেছেন আমেরিকান একাডেমি অব স্লিপ মেডিসিনের বিজ্ঞানীরা। অনেকে যেমন চাইলেই ঘুমের কোলে ঢলে পড়তে পারেন, অনেকে তা পারেন না। অনেক সাধ্যসাধনা করে তাকে ঘুম আনতে হয়। নরম বিছানায় শুয়ে, আলো নিভিয়ে, ফুল স্পিডে ফ্যান চালিয়ে, অন্য সবাইকে জোরে কথা বলতে বারণ করে অনেককে নিদ্রাদেবীর সাধনায় বসতে হয়। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ থাকতে হয়, নানা উল্টাপাল্টা চিন্তা মাথায় এসে জোটে, কিছুক্ষণ থেকে আবার চলেও যায়। ধীরে ধীরে বাইরের জগতের সঙ্গে মানসিক সম্পর্ক ছিন্ন হতে থাকে, শিথিল হতে থাকে দেহের নানা মাংসপেশি। ঘাড়, পিঠ, পা এবং হাতের উপরের দিকের পেশি প্রথমে শিথিল হয়, তারপর হয় হাত-পায়ের আঙুল, পায়ের পাতা, হাতের নিচের দিকের পেশি। এরপর দেহের ছোট পেশিগুলো শিথিল হতে থাকে।
- ঘুম গভীর হলে কমে যায় হার্ট রেট, পালস রেট, ব্লাডপ্রেসার এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি।
- ফুসফুসের কাজকর্ম এক-চতুর্থাংশ কমে যায়।
- শিথিল পেশিগুলোর রক্তনালি প্রসারিত হওয়ার ফলে বেশি পরিমাণ রক্ত সেগুলোতে জমে থাকে। তাই ঘুম থেকে ওঠার পর অনেকের চোখ-মুখ লালচে এবং ফোলা ফোলা লাগে।
- দেহের বিপাকক্রিয়ার হার ঘুমের মধ্যে ১৫-২০ শতাংশ কমে যায়। যে জন্য ঘুমের আগে পেট ঠেসে খেতে নেই। খেলে হজম হয় না।
- স্পর্শ, গন্ধ, দৃষ্টি অনুভূতি ঘুমালে পুরোটাই প্রায় চলে যায়। শ্রবণ অনুভূতি বরং সক্রিয় থাকে।
- মুখের পেশি শ্লথ হয়ে যাওয়ার ফলে ঘুমালে অনেকের মুখ দিয়ে লালা গড়ায়।
- কিডনির কাজও কমে আসে এ সময়। যেটুকু ইউরিন তৈরি হয় তা ব্লাডারে গিয়ে জমতে থাকে ধীরে ধীরে। তাই ঘুম ভাঙলেই মূত্রের বেগ হয়।
ঘুম ভাঙার কিছুক্ষণ আগে থেকে আবার সবকিছু স্বাভাবিক হতে শুরু করে। ঘুম থেকে ওঠার কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে যায়। আমরা যখন ঘুমাই তখন কিন্তু আমাদের পুরো মস্তিষ্কটাই ঘুমায় না, কিছু অংশ ঘুমায়, কিছু অংশ জেগে থাকে।
যদি ঘুম গভীর হয়, তাহলে দেখবেন সকালে ঘুম থেকে উঠে শরীরটা বেশ ঝরঝরে লাগছে, কাজকর্মে এনার্জি পাওয়া যাচ্ছে। ঘুমের মধ্যে আচমকা চিৎকার করে কাউকে ডাকবেন না, যদি ডাকতেই হয় খুব মৃদুস্বরে ডাকবেন, আলতো করে দেহে ধাক্কা দেবেন। ভোরবেলা যদি উঠতে হয় ঘড়িতে অ্যালার্ম দিতেই পারেন, তবে ক্লকটা কান থেকে বেশ কিছুটা দূরে রাখবেন।
ঘুমের নানা পর্যায়
১৯৫০ সালে আমেরিকার স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি স্লিপ রিসার্চ সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা ডা. উইলিয়াম ডিমেন্ট তার সহযোগীদের নিয়ে দীর্ঘ গবেষণার পর ঘুমের নানা পর্যায়ের কথা ঘোষণা করেন। প্রধানত দুটো পর্যায়ে ঘুমকে ভাগ করেছেন এই গবেষকরা। প্রথম পর্যায়টি হলো র্যাপিড আই মুভমেন্ট স্লিপ বা জঊগ স্লিপ। এই সময়ে চোখ দ্রুত নড়াচড়া করে অর্থাৎ কম্পিত হয়, তাই এর আরেক নাম ‘কম্পাক্ষি নিদ্রা’। পরের পর্যায়টি হলো নন র্যাপিড আই মুভমেন্ট স্লিপ বা ঘজঊগ স্লিপ। এই সময় চোখের নড়াচড়া হয় না বলে একে বলে ‘স্থিরাক্ষি নিদ্রা’।
ঘুম শুরু হওয়ার পর ৮০-৯০ মিনিট চোখ স্থির থাকে অর্থাৎ এই সময়টা ঘজঊগ স্লিপ, তারপর ২০ মিনিট দ্রুত নড়াচড়া করতে থাকে অর্থাৎ জঊগ স্লিপ। পর্যায়ক্রমে ঘুমের পুরো সময়টুকু জুড়ে একবার ঘজঊগ (৮০-৯০ মিনিট), তারপরেই জঊগ (১০-৩০ মিনিট)-এভাবেই চলতে থাকে। এমন করে ৪ থেকে ৬টি চক্রে পুরো ঘুমটা শেষ হয়।
ঘঊজগ বা স্থিরাক্ষি নিদ্রার আবার চারটি পর্যায় আছে। তৃতীয় এবং চতুর্থ পর্যায়ে ঘুমটা হয় খুব গভীর, যাকে বলে গাঢ় নিদ্রা। জঊগ বা কম্পাক্ষি নিদ্রা পর্বে আমরা স্বপ্ন দেখি। ইলেকট্রো অ্যানসেফালোগ্রাম (ঊঊএ) করে বৈদ্যুতিক তরঙ্গের সাহায্যে ঘুমের মধ্যে মস্তিষ্কের অবস্থা পর্যালোচনা করেছেন বিজ্ঞানীরা। মাংসপেশির টান, হার্ট রেট, পালস প্রেসারসহ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করেছেন।
ঘজঊগ-এর বিভিন্ন পর্যায়ের ঊঊএ-তে স্লো ওয়েভ অর্থাৎ ধীর তরঙ্গ দেখা যায়। শরীরের পেশির দৃঢ়তা বা টান কিছুটা কমলেও পুরোপুরি শিথিল হয় না, হার্ট রেট এবং পালস রেট কমে যায়। শ্বাস-প্রশ্বাসের হার কমে, দেহের তাপমাত্রাও কমে। মস্তিষ্কের কাজকর্ম এবং বাইরের জগতের সঙ্গে স্নায়ু সংযোগও ভীষণ রকম কমে আসে।
জঊগ পর্বে দেহ অচেতন থাকলেও চোখ পিটপিট করে, হার্ট রেট, পালস, প্রেসার কিছুটা করে বেড়ে যায়। মাংসপেশি পুরোপুরি শিথিল হয়ে পড়ে অথচ মস্তিষ্ক জেগে থাকে। ঊঊএ-তে স্পিড ওয়েভ বা দ্রুত তরঙ্গ দেখা যায়। এই সময়ই স্বপ্ন দেখি আমরা।
স্বপ্ন ঘুম
স্বপ্ন দেখেন সবাই। তিন-চার মাসের শিশু থেকে অশীতিপর বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা। জেগে কিন্তু স্বপ্ন দেখা যায় না, স্বপ্ন দেখতে হলে ঘুমাতেই হবে। ঘুমের জঊগ পর্বকে স্বপ্ন পর্বও বলা যেতে পারে। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, প্রতিটি মানুষ প্রতিদিন ঘুমালেই স্বপ্ন দেখেন, অন্তত ৩ থেকে ৯টা স্বপ্ন। স্বপ্ন দেখা অবস্থায় ঘুম ভেঙে গেলে অনেকেই সেই স্বপ্নের হুবহু বর্ণনা দিতে পারেন, কিন্তু ঘুম না ভাঙলে সকালবেলা সেই স্বপ্নের কথা তার কিছুই মনে থাকে না। স্বপ্ন নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করে যাচ্ছেন শিকাগো ইউনিভার্সিটি, ওয়াল্টার রিড ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব পিটবার্গ, স্ট্যানফোর্ড স্লিপ রিসার্চ সেন্টারসহ নানা প্রতিষ্ঠান। তাদের মতে ঘুমের জঊগ পর্বে মস্তিষ্কের লিম্বিক সিস্টেম, যাকে ইমোশনাল ব্রেইনও বলা হয়, সেই অংশ ভীষণ রকম সক্রিয় থাকে, ঘুমিয়ে থাকে বুদ্ধি এবং যুক্তি বিশ্লেষণকারী অংশ প্রি কন্ট্রোল কর্টেক্স।
তবে স্বপ্নদর্শন নিয়ে সারা পৃথিবীতে প্রথম হইচই ফেলেছিলেন যে বিজ্ঞানী, তার নাম সিগমন্ড ফ্রয়েড। ১৯৩৩ সালে নিজস্ব মতবাদে অবিচল থেকে স্বপ্ন ব্যাখ্যা করেছেন তিনি, যার মধ্যে যৌনতার ছড়াছড়িই বেশি। ফ্রয়েডের মতে, অধিকাংশ স্বপ্নই অবদমিত যৌনস্পৃহার পূরণ এবং স্বপ্নে দেখা বিভিন্ন বস্তু আসলে যৌনাঙ্গের প্রতীক। যেমন সাপ, লাঠি, মাছ, ছাতা, ছুরি, পেরেক প্রভৃতি পুরুষ যৌনাঙ্গের প্রতীক। বাক্স, স্টোভ, দরজা, শিশি, বোতল, পকেট-এসব নারী যৌনাঙ্গের প্রতীক। স্বপ্নে সিঁড়ি বা মই বেয়ে ওঠা আসলে যৌনক্রিয়ার নানা পর্যায়। ফ্রয়েডের মতে অপূর্ণ, অবদমিত বাসনাকে নিদ্রার মাধ্যমে মুক্তি দিতে পারে শুধু স্বপ্নই। স্বপ্ন মানেই তাই উইশ ফুলফিলমেন্ট।
আরেক মনোবিজ্ঞানী ইয়ুং কিন্তু ফ্রয়েডের এমন সরলীকৃত স্বপ্ন ব্যাখ্যার সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন। তার মতে স্বপ্ন উৎসারিত হয় সামগ্রিক জাতিগত অবচেতন ভাব সেরিয়াল আনকনসাস থেকে, যা সমগ্র মানবজাতির ক্ষেত্রেই এক। স্বপ্নে দেখা বিষয়গুলো মানুষেরই নানা ভাবনা, অভিজ্ঞতা, বোধ-বুদ্ধির প্রতীক বা আর্কিটাইপ। স্বপ্নে আমরা প্রায়ই আমাদের বিপরীত সত্তাকে দেখি। নারী দেখে পুরুষকে, পুরুষ দেখে নারীকে।
অপর এক বিজ্ঞানী অ্যাডলার বলেছেন, স্বপ্ন মানেই যৌনভাবনা নয়, বহু অসাধ্য ইচ্ছার পূরণ ঘটে স্বপ্নের মাধ্যমেই। স্বপ্নে অপছন্দের মানুষকে বেদম পেটানো যায়, ফিল্ম স্টারের সঙ্গে প্রেম করা যায়, ফাইভস্টার হোটেলে রাত কাটানো যায়, সব পেয়েছির দেশে বিচরণ করা যায়।
স্বপ্ন নিয়ে মনোবিজ্ঞানীদের মতের যতই অমিল থাকুক, একটা ব্যাপারে সবাই একমত যে, মানসিক সুস্থতার জন্য সকলেরই স্বপ্ন দেখা ভীষণ প্রয়োজন। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, বারে বারে কারও স্বপ্ন দেখায় বাধা দান করলে তার মধ্যে ‘ড্রিম উইথড্রয়াল সিনড্রম’ দেখা দেবে। মন হয়ে উঠবে অশান্ত, বিক্ষিপ্ত, ভারসাম্যহীন। কারণ স্বপ্নের মাধ্যমেই আমাদের মন স্নিগ্ধ ও নিরাপদ পাগলামিতে অর্থাৎ সেফ ইনস্যানিটিতে মুক্তি পেতে পারে। মানসিক বিপর্যয় এড়াতে যা অবশ্যই দরকার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধবন্দিদের রাতের পর রাত ঘুমাতে না দিয়ে তাদের মানসিক রোগীতে পরিণত করা হতো। পরবর্তীকালে গবেষণায় জানা গেছে, ঘুমাতে না পারা নয়, স্বপ্ন দেখতে না পারাই ছিল তাদের মানসিক বিকলনের কারণ।
স্বপ্ন দর্শন থেকে সৃষ্টির অনুপ্রেরণা পেয়েছেন বহু মানুষ। প্রখ্যাত রসায়নবিদ কেকুলে একবার স্বপ্নে দেখলেন একটি সাপকে, যে তার শরীরটাকে রিংয়ের মতো বাঁকিয়ে নিয়ে নিজের লেজে নিজেই চুমু খাচ্ছে। এই স্বপ্ন থেকেই কেকুলে নাকি খুঁজে পেয়েছিলেন কার্বনের গঠন সংকেত।
দুঃস্বপ্ন অনেক সময় সত্যি হয়েছে অনেক বিখ্যাত লোকের জীবনে। আমেরিকার প্রয়াত প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন একদিন স্বপ্ন দেখলেন, ফুলে সাজানো একটি কফিনকে ঘিরে কালো পোশাক পরা বহু মানুষের ভিড়। ভিড় সরিয়ে উঁকি দিয়ে লিঙ্কন দেখলেন যে সেই কফিনে তিনি নিজেই শুয়ে আছেন। এই স্বপ্ন দেখার ঠিক পরের দিনই আততায়ীর গুলিতে প্রাণ হারান লিঙ্কন। মৃত্যুর আগে তার এই স্বপ্নদর্শনের বিষয়টি তিনি লিখে রেখে গিয়েছেন ডায়েরির পাতায়।
স্বপ্ন যখন ভয়ের
নাইটমেয়ার বা ভয়ের স্বপ্ন দেখে থাকেন অনেকেই। প্রথম রাতে অর্থাৎ ঘুমাবার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা ভয়ের স্বপ্ন দেখি বেশি। তার কারণ হলো সারাদিনের যত উদ্বেগ, উত্তেজনা, হতাশা প্রথম রাতেই আমাদের মনে বেশি করে ছাপ ফেলে। ভোরের দিকে ঘুম ভাঙার আগে অধিকাংশ স্বপ্নই বেশ সুখকর এবং মজার হয়। স্বপ্নে যেহেতু মানসিক এবং শারীরিক অবস্থার প্রতিফলন হয়, সেহেতু বারে বারে ভয়ের স্বপ্ন দেখলে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া ভালো। প্রয়োজনে মনোবিদ বা সাইকোঅ্যানালিস্টের সঙ্গেও কথা বলতে পারেন। নিজেও চেষ্টা করে দেখতে পারেন। ধরুন আপনি পরপর কয়েক দিন দেখলেন, একদল লোক আপনাকে তাড়া করছে, আপনি প্রাণভয়ে ছুটছেন। আপনি একদিন ভাবুন যে আপনি ওদের তাড়া খেয়ে না পালিয়ে পাল্টা ওদেরই তাড়া করছেন। প্রতিদিন রাতে শোয়ার আগে এমন পজিটিভ থিংকিং নিয়ে শুতে যান, দেখবেন স্বপ্ন ঘুরে গিয়েছে, খারাপ স্বপ্নেরও হ্যাপি এন্ডিং হচ্ছে।
ঘুমের মধ্যে হাঁটা
ইংরেজিতে বলে সমনামবিউলিজম, বাংলায় বলে স্বপ্নচারিতা। ঘুমের ঘজঊগ পর্যায়ে অনেকের মধ্যেই এটা দেখা যায়। ঘুমের মধ্যে নিজের অজান্তেই অনেকে উঠে বসেন, বিছানা ছেড়ে নামেন, দরজা খুলে রাস্তায় বেরিয়েও পড়েন। কেউ আবার ফ্রিজ খুলে কোনো খাবার খেয়ে নেন, পানি পান করেন, তারপর বিছানায় এসে শুয়ে পড়েন। এমন ঘটনাও শোনা গিয়েছে, স্বপ্নচারী কোনো শিল্পী তার আর্টরুমে গিয়ে অসমাপ্ত ছবিতে তুলি চালিয়েছেন! না, স্বপ্নচারিতা রোগ নয়। স্বপ্নচারীদের মন ঘুমিয়ে থাকলেও দেহ অতিমাত্রায় সক্রিয় থাকে, তার সমস্ত আচার-আচরণ নিয়ন্ত্রিত হয় স্বপ্ন দ্বারাই।
বেশি মাত্রায় না হলেও অল্পমাত্রায় স্বপ্নচারী আমরা অনেকটাই। ঘুমের মধ্যে অনেকেই উঠে বসেন, হাত-পা ছোড়েন, কবিতা বলেন, দাঁত কিড়মিড় করেন, হাসেন, কাঁদেন, গালাগাল দেন, নাটকের সংলাপও বলেন। এও এক ধরনের সমনামবিউলিজম। তবে কোনো রোগ নয়।
অনিদ্রাঃ এক নিঃশব্দ ঘাতক
শুনে আশ্চর্য হবেন, আমাদের দেশের মোট প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশই ঘুমবিভ্রাটের শিকার এবং এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জাতীয় অর্থনীতি। এরা ঠিকমতো কোনো কাজে মনঃসংযোগ করতে পারছেন না, ঠিক সময়ে ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না, নানা অসুখ-বিসুখে ভুগছেন। ঘুমবিভ্রাটের কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় অনিদ্রা বা নিদ্রাহীনতার কথা। অনিদ্রা মানে না ঘুমিয়ে থাকা। কিন্তু পুরোপুরি না ঘুমিয়ে তো বাঁচা সম্ভব নয়। আসলে ঘুম ঠিকমতো না হলে বা কম হলে তাকেই আমরা বলি অনিদ্রা রোগ। অথচ অনেককেই বলতে শুনবেন, কাল দু চোখের পাতা এক করতেই পারিনি। এরা কিন্তু ঠিক কথা বলেন না। ঘুম কম হওয়া যেমন একটা অসুখ, তেমনি বেশি ঘুমানোও কিন্তু অসুখ, যাকে বলে নার্কোলেপসি। আবার স্লিপ অ্যাপনিয়া নামে আরেক ধরনের ঘুমবিভ্রাটও দেখা যায় অনেকের মধ্যে। এবার এদের নিয়েই আলোচনা করি।
ইনসমনিয়া
ল্যাটিন শব্দ ‘সমনাস’-এর অর্থ ‘স্লিপ’ বা ঘুম, আর ‘ইন’-এর অর্থ ‘নট’ বা না। দুয়ে মিলে ওঘঝঙগঘওঅ বা অনিদ্রা। নানা ধরনের শ্রেণীবিভাগ রয়েছে ইনসমনিয়ার। বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্রেণীবিভাগ করেছেন। যেমন প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি ইনসমনিয়া। প্রাইমারি হয় বংশগত কারণে আর সেকেন্ডারি হয় নানা মানসিক ও শারীরিক কারণে। আবার এক্সোজেনাস ও এন্ডোজেনাস, এই দুভাবেও ইনসমনিয়াকে ভাগ করা হয়ে থাকে। অনেকে অ্যাকিউট এবং ক্রনিক এভাবেও বলেন। তবে ঘুমবিভ্রাটের ধরন অনুযায়ী তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে একে।
(১) ইনিশিয়াল ইনসমনিয়াঃ ঘুম আসি আসি করেও আসতে চায় না। কেউ বারে বারে উঠে পানি পান করে, ছোট বাথরুমে যায়, কোল বালিশ নিয়ে এপাশ-ওপাশ করে, বিছানার চাদর-বালিশ ঠিকঠাক করে। এমন করতে করতেই হঠাৎ করেই তারা ঘুমিয়ে পড়ে।
(২) মিডল বা ইন্টারমিটেন্টঃ বারে বারে ঘুম ভাঙে। ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুম হয়। স্নায়বিক উত্তেজনাই এর কারণ।
(৩) টার্মিনাল ইনসমনিয়াঃ শেষ রাতে ঘুম ভেঙে যায়। একবার ভেঙে গেলে আর আসতে চায় না। বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদেরই এই সমস্যা বেশি।
নার্কোলেপসি
কম ঘুমানোর মতো বেশি ঘুমানো এবং যেখানে সেখানে যখন তখন ঘুমিয়ে পড়াটা এক ভয়ঙ্কর অসুখ। ৫৮ বছর বয়সী আমেরিকান আইনজীবী বব ক্লাউড কোর্টে সওয়াল করতে করতেই ঘুমিয়ে পড়তেন। এই রোগীদের ক্যাটাপ্লেক্সি নামে একটি অবস্থার সৃষ্টি হয়। অতিরিক্ত আবেগ, উত্তেজনা, পরিশ্রমে এরা সাময়িক পক্ষাঘাতগ্রস্ত হন, জ্ঞান হারান না, কিন্তু আচ্ছন্ন ভাব নিয়ে পড়ে থাকেন। নার্কোলেপসি জিনের ত্রুটিজনিত রোগ এবং এখনো পর্যন্ত দুরারোগ্য। তবে লাইফস্টাইল পালটে এবং কিছু স্নায়ু উত্তেজক ওষুধ দিয়ে রোগীকে দীর্ঘদিন ভালো রাখা যায়।
প্যারাসমনিয়া
ঘুমের দুটো পর্বের কথা আগেই বলেছি। এই ধরনের রোগীদের বেলায় এক পর্ব থেকে আরেক পর্বে যাওয়ার যে সহজ গতিছন্দ তাতে ব্যাঘাত ঘটে। ঘুম থেকে ওঠার পরে তারা মোটেও চনমনে, স্বাভাবিক থাকেন না। ঘুমের মধ্যে হাঁটা, কথা বলা, দাঁত কিড়মিড় করা, কেঁদে ওঠা, দুঃস্বপ্ন দেখা, মূত্রত্যাগ করা, নাক ডাকা, শ্বাসকষ্টসহ নানা উপসর্গ দেখা যায় এই ধরনের রোগীদের মধ্যে।
স্লিপ অ্যাপনিয়া
ঘুমের মধ্যে রোগীর শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে, মনে হয় কেউ যেন গলা টিপে ধরেছে, হঠাৎ করে রোগী ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে। এই রোগীরা প্রচণ্ড নাক ডাকে। বারে বারে স্লিপ অ্যাপনিয়া হলে রোগীর ব্রেইন ও হার্ট কম অক্সিজেন পায়, এর ফলে মৃত্যুও হতে পারে। এই ধরনের রোগীরা যেহেতু রাতে একটানা ঘুমাতে পারে না, সে জন্য সারা দিন এরা ঝিমায়, হাই তোলে, ক্লান্তি-অবসাদে ডুবে থাকে, মাথাব্যথায় ভোগে। পরবর্তীকালে এদের হৃদরোগ এবং উচ্চরক্তচাপ দেখা দিতে পারে। এসব উপসর্গকে একসঙ্গে বলে অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া সিনড্রম বা ঙঝঅঝও ছয় ঘণ্টার ঘুমে ত্রিশবার অ্যাপনিয়া হলে এবং অ্যাপনিয়াগুলো দশ সেকেন্ডের বেশি স্থায়ী হলে, আমরা বলি অমুকজন স্লিপ অ্যাপনিয়ার রোগী।
এই অসুখের দুটো পর্যায় আছে। প্রথমটি হলো অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া এবং দ্বিতীয় সেন্ট্রাল স্লিপ অ্যাপনিয়া। প্রথমটির বেলায় শ্বাসপথের কোথায় অবস্ট্রাকশন বা অবরোধ আছে, সেটি নির্ণয় করে সেই মতো চিকিৎসা করাতে হয়। সেন্ট্রাল স্লিপ অ্যাপনিয়ায় ত্রুটি থাকে মস্তিষ্কে, চিকিৎসা না করালে রোগী মারা যেতে পারে।
অ্যাপনিয়া রোগীদের পলসমনোগ্রাফি করে ঘুমন্ত অবস্থায় নাড়ির গতি, রক্তচাপ, শ্বাসপ্রশ্বাস, ফুসফুসের বায়ু ধারণ ও বর্জন ক্ষমতা, ইসিজি, ইইজি ইত্যাদি পরীক্ষা করে নিয়ে তারপর চিকিৎসার প্ল্যানিং করা হয়। এ জন্য রোগীকে স্লিপ ল্যাবে এক রাতের জন্য ভর্তি থাকতে হয়। অ্যাপনিক রোগীদের ওজন কমাতে হবে, মদ্যপানসহ সব ধরনের নেশা ছেড়ে দিতে হবে।
রেস্টলেস লেগ সিনড্রম
এটাও এক ধরনের ঘুমবিভ্রাট। ঘুমের মধ্যে রোগীর পায়ে পিন ফোটানোর মতো যন্ত্রণা হওয়ার জন্য রোগী পা ছোড়ে, এপাশ-ওপাশ করে।
নাক ডাকায় ঘুমের বারোটা
নাক ডাকা। এ এক গ্লোবাল প্রবলেম। এ নিয়ে দাম্পত্য কলহ কোনো নতুন ব্যাপারও নয়। বিদেশে নাক ডাকা নিয়ে বহু বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে, হচ্ছে, ভবিষ্যতেও হবে। আমাদের সমাজে ব্যাপারটা এত দূর না গড়ালেও নাক ডাকা নিয়ে খুচরো অশান্তি লেগে থাকে বহু পরিবারেই। পুরুষরাই নাক ডাকেন বেশি। নাক ডাকায় নাক কিন্তু ডাকে না। এই ডাক বা শব্দ তৈরি হয় টাগরা বা তালু বা প্যালেটের নরম অংশের কম্পন থেকে।
কীভাবে ডাকে
নাক ঠিক কীভাবে ডাকে জানার আগে আমাদের শ্বাসপথ সম্বন্ধে একটু ধারণা করে নেয়া যাক। নাক বা মুখ দিয়ে আমরা যে বাতাস গ্রহণ করি তা ফ্যারিংস বা গলবিল হয়ে, ল্যারিংস বা স্বরযন্ত্র হয়ে প্রবেশ করে ট্রাকিয়া বা শ্বাসনালিতে। সেখান থেকে ব্রনকাস বা ক্লোমনালি হয়ে ব্রনকিওল বা ক্লোমনালিকা হয়ে পৌঁছায় অ্যালভিওলাস বা ফুসফুসের বায়ুথলিতে। নিঃশ্বাসের সময় বাতাস আবার এই পথেই ফেরে। আমাদের এই শ্বাসপথের সব থেকে কোমল অংশ হলো ফ্যারিংস বা গলবিল, যার পুরোটাই তন্তু ও মাংসপেশি দিয়ে তৈরি। এই ফ্যারিংসের যে অংশটি নাকের পেছনে অর্থাৎ গলার উপরাংশে, তার নাম নাসা গলবিল, বিষম খেলে মুখের পানি নাকে উঠে আসে এই পথেই।
স্বাভাবিক অবস্থায় ফ্যারিংসের আকার বেশ সুঢৌল থাকে অনেকটা জায়গা জুড়ে। কিন্তু ঘুমানোর সময় এর আবার আয়তন বেশ ছোট হয়ে যায়। চিত হয়ে শুয়ে ঘুমালে জিভ ঝুলে পড়ে ফ্যারিংসের দিকে। তালু, ফ্যারিংস, জিভের মাংসপেশি শিথিল হয়ে পড়ে, ফলে বাতাস চলাচলে বাধা পায়, ধাক্কা খায়। এই বাধা বা ধাক্কার ফলে নরম তালু বা সফট প্যালেটে কম্পন হয়, ডাকতে থাকে নাক। মোটা মানুষ এবং বয়স্ক মানুষদের পেশির শিথিলতা বেশি হয় বলে তাদের নাক ডাকে বেশি।
কেন ডাকে
নাক ডাকে নাকের অসুখে। আবার নাক ছাড়া অন্য অসুখেও
(১) নাকের অসুখঃ নাকের পার্টিশনের হাড় বাঁকা থাকলে (ডেভিয়েটেড ন্যাজাল সেপ্টাম), নাকে পলিপ বা কোনো টিউমার থাকলে, নাকে অ্যালার্জি, নাক বন্ধ থাকলে।
(২) গলার অসুখঃ বড় টনসিল, বড় অ্যাডিনয়েড গ্ল্যান্ড যা শিশুদের নাকের পেছনটা বন্ধ করে দেয়, বড় জিভ, লম্বা মাংসল আলজিভ, লম্বাটে প্যালেট, ছোট চোয়ালের হাড়, হাঁটুতে প্যারালাইসিস, ফ্যারিনজাইটিস, ল্যারিংস, সিস্ট, পলিপ, প্যারালাইসিস ইত্যাদি।
(৩) অন্যান্যঃ অতিরিক্ত মেদবৃদ্ধি, মদ্যপান ও ধূমপান, পানমসলা, খইনি-গুড়াকুর নেশা, উচ্চরক্তচাপ, ড্রাগে আসক্তি, থাইরয়েডের অসুখ, মস্তিষ্কের অসুখ, স্নায়ুঘটিত রোগ, হার্টের অসুখ, ফুসফুসের অসুখ ইত্যাদি।
কী করবেন
যারা নাক ডাকেন, তারা কিন্তু ব্যাপারটা নিয়ে একেবারেই উদ্বিগ্ন হন না। ডাক্তারের কাছে যেতেও চান না। কেন চান না। কারণ যারা নাক ডাকেন, তারা যে আশপাশের লোকজনের ঘুমের বারোটা বাজিয়ে ছাড়েন, সেটা তারা বুঝতে চান না, জানতেও চান না। কাজেই ঘুমের বারোটা যাদের বাজে, তাদেরই দায়িত্ব এসে পড়ে সেই ঘুম-ভাঙানিয়াকে নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাওয়ার। ডাক্তার ভালো করে পরীক্ষা করে দেখেন নাক-কান-গলায় কোনো গন্ডগোল আছে কি না। থাকলে ওষুধপত্র দিয়ে চিকিৎসা করে, প্রয়োজনে অপারেশন করে সেই সমস্যার সমাধান করে দেন। যেমন নাকের পার্টিশনের হাড় বাঁকা থাকলে সেপ্টোপ্লাস্টি অপারেশন করা হয়, ক্রনিক সাইনোসাইটিস থাকলে সাইনাস ওয়াশ করা হয়। বড় টনসিল বা বড় অ্যাডিনয়েড গ্ল্যান্ডের জন্য বাতাস যাতায়াতে বাধা পেয়ে যদি নাক ডাকে, তবে অপারেশন করে সেগুলোকে বাদ দিতে হবে। এছাড়া শ্বাসপথ, মুখগহ্বর এবং ফুসফুসে বা অন্য কোথাও কোনো অসুখবিসুখ থাকলে সেটারও চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। আসল কথা হলো, ছোটখাটো ব্যাপারে নাসিকা গর্জন করলে সেই গর্জনকে বর্জন করার রাস্তা ডাক্তার সহজেই বের করে ফেলেন। মুশকিল হয় অন্যদের নিয়ে।
এড়াতে হলে
নাক ডাকা থেকে মুক্তি পেতে গেলে ওজনটা কমাতেই হবে। মোটা লোকেরাই নাক ডাকেন বেশি। ছাড়তে হবে মদ্যপানসহ অন্যান্য নেশা। মাথায় বালিশ ব্যবহার না করে কয়েক দিন শুয়ে দেখুন। খাটের পায়ের দিকে দুটি ইট দিয়ে উঁচু করে শুয়ে দেখুন। নাক ডাকার নেপথ্যে কোনো অসুখ থাকলে তার চিকিৎসা করাতে হবে। থাইরয়েডের অসুখ বা রক্তচাপজনিত সমস্যা থাকলে দীর্ঘদিন চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
ভেবে দেখুন তো?
আপনি কি স্লিপ অ্যাপনিয়াতে ভুগছেন?
- সবাই বলে আমি নাকি ঘুমের মধ্যে দারুণ নাক ডাকি।
- ঘুমের মধ্যে হঠাৎ করে আমার শ্বাস নাকি আটকে যায়।
- হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসি।
- ভোরবেলার দিকে আমার মাথা ধরে।
- আমার ওজনটা বড্ড বেশি।
- দিনের বেলায় বড্ড ঝিমুনি আসে। জোর করে জেগে থাকি।
- প্রায়ই ঘুম থেকে উঠে দেখি গলা শুকিয়ে কাঠ।
- আমার এনার্জি দিন দিন কমে যাচ্ছে
- বন্ধুরা বলে আমি নাকি অমনোযোগী এবং খিটখিটে হয়ে যাচ্ছি।
- আমার রক্তচাপও বেশি থাকছে।
উপরের ১০টির মধ্যে ৩টি উপসর্গ থাকলে অবশ্যই ডাক্তার দেখাবেন।
বায়োলজিক্যাল ক্লক
প্রকৃতির যেমন ছন্দ আছে, তেমনই ছন্দ আছে দেহেরও। দেহ তার কাজকর্ম কতকগুলো নিয়ম এবং সময় মেনেই করে। এই ছন্দ গড়ে ওঠে শিশুর জন্মলগ্ন থেকেই, ধীরে ধীরে তা পরিণতি পায়। ইচ্ছা করলেই এই ছন্দ বা অভ্যাস পাল্টানো যায় না, সময় লাগে ধীরে ধীরে সইয়ে নিতে। আমাদের প্রতি রাতে ঘুমানোর অভ্যাস। ইচ্ছা করলেই আপনি এই অভ্যাস পাল্টাতে পারবেন না। কারণ রাতে ঘুমানোর সময় আপনার শারীরিক কিছু পরিবর্তন দেখা যায়, যেগুলোর বিস্তারিত উল্লেখ আগেই করেছি। এই পরিবর্তনগুলো মস্তিষ্কের নির্দেশেই ঘটে, অনেকটা ঘড়ির কাঁটার মতো সময় ধরে এবং এই পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে শরীর নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। ভাবা হয়, দেহের মধ্যে কোনো ঘড়ির সময় মেনেই এসব কাণ্ডকারখানা ঘটে। এটাই বায়োলজিক্যাল ক্লক। এই ক্লকের সময় পাল্টাতে গেলে অন্তত দেড়-দু মাস সময় দিতে হবে আপনাকে। তবেই রাতের বদলে দিনে ঘুমানো অভ্যাস করতে পারবেন। যাদের একবার নাইট ডিউটি, আরেকবার ডে ডিউটি করতে হয়, তাদের এই বায়োলজিক্যাল ক্লক বিগড়েই থাকে। ভালো ঘুম হয় না, হজম হয় না, পায়খানা পরিষ্কার হয় না, মনঃসংযোগের অভাব ঘটে। প্লেনে যদি বিদেশ যান তা হলেও এই অসুবিধা দেখা দিতে পারে। ধরুন, আপনি সন্ধ্যা ৭টায় প্লেনে উঠলেন। এ দেশে তখন সবে সন্ধ্যা। বারো ঘণ্টা বাদে পরের দিন ৭টায় সকাল হওয়া উচিত। কিন্তু বিদেশে গিয়ে দেখলেন ওই সময়টা রাত দুটো, তখন আমাদের দেশে এটা হতো সকাল ৭টা। দেহ সেভাবেই অভ্যস্ত ছিল। বিগড়ে গেল আপনার বায়োলজিক্যাল ক্লক। শরীরে শুরু হলো অস্বস্তি। একেই বলে জেট ল্যাগ। কয়েক দিন পর সব ঠিক হয়ে আসে। শরীর পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেয়, পাল্টে যায় আপনার বায়োলজিক্যাল ক্লক।
শিশু এবং বয়স্কের ঘুম
সদ্যোজাত শিশু দিনে প্রায় কুড়ি-বাইশ ঘণ্টা ঘুমায়, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমের সময় কমতে থাকে। শিশুর মস্তিষ্কে মেলাটনিন হরমোনের অতিরিক্ত ক্ষরণই এ জন্য দায়ী। বয়স হলে মেলাটনিন নিঃসরণ কমতে কমতে প্রায় তলানিতে এসে ঠেকে। ফলে ঘুমের সময়ও কমে যায়। বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা পরিশ্রমসাধ্য কাজ করতে পারেন না, দেহে সঞ্চিত ক্যালরির অল্প পরিমাণই খরচ হয়, সারাদিনই বিশ্রামের সুযোগ, অনেকে দিনের বেলা একটু গড়িয়েও নেন। রাতে তাই তাদের ৪-৫ ঘণ্টা ঘুমালেই চলে। এতে তারা সুস্থ থাকেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের অভ্যাসের ফলে বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা রাত ৯-৩০টার মধ্যেই শুয়ে পড়েন, মধ্যরাতে তাই ঘুম ভেঙে যায়। বিছানায় শুয়ে ছটফট করেন ভোরের আলো ফোটার। একটু বেশি রাত করে শুলে (রাত ১২টা) আর এই সমস্যা থাকে না। সুযোগ থাকলে অর্থাৎ ছেলে-বউমা-নাতি-নাতনিরা সুযোগ দিলে বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা প্রতি রাতেই বেশ কিছুক্ষণ করে টিভি দেখতে পারেন। বেশি রাতে শুতে অসুবিধা হলে ভোরে উঠে পায়চারি করবেন, ফুল তুলবেন, পড়ার অভ্যাস থাকলে পড়বেন, সুযোগ পেলে টিভিতে ভক্তিমূলক অনুষ্ঠান দেখবেন।
ভাতঘুম
ভাত খেয়ে ওঠার পরপরই অনেকের শরীরটা কেমন ম্যাজম্যাজ করে, ঘুম পায়। অনেকে ভাত খেয়ে ছোট করে একটা ঘুম দিয়ে নেন। যাকে বলে ভাতঘুম। ভাত আসলে কার্বোহাইড্রেট প্রধান খাদ্য, শতকরা যার পরিমাণ প্রায় ৭৮ ভাগ। ভাত খেলে পেটটা যেন অল্পতেই ভরে যায়, কারণ পাকস্থলী হয়ে অন্ত্রনালিতে পৌঁছতে ভাতের রুটির তুলনায় একটু বেশিই সময় লাগে। ভাতের কার্বোহা্ইড্রেটের কিছুটা অংশ হজমের সময় ফারমেন্টেড হয়, বাংলায় যাকে বলে গেঁজে ওঠা। এর ফলে সামান্য পরিমাণে ইথাইল অ্যালকোহল এবং কার্বনডাই অক্সাইড তৈরি হয় এবং ঘুম পায়। পান্তা ভাত খেলে এই ফারমেন্টেশন বেশি পরিমাণে হয় বলে ঘুমের নেশা লাগে। যাদের রাতে ঘুম আসতে দেরি হয়, তারা রুটির বদলে বরং রাতে ভাত খাবেন, দুপুরে রুটি খাবেন।
ভাতঘুম দিলে কি শরীরে এনার্জি কমে যায়, কাজকর্মে উৎসাহ লাগে না? অথচ জাপানে সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে দুপুরে এক ঘণ্টা বাধ্যতামূলকভাবে বরাদ্দ আছে ভাতঘুমের জন্য। ওখানে অফিস আওয়ার মোট ১০ ঘণ্টা। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কাজ, তারপর ১২টা থেকে ১টা লাঞ্চ টাইম অবশ্যই ভাত সহযোগে, ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত ভাতঘুমের সময়, আবার ২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কাজের জন্য বরাদ্দ। চীন, ফিলিপাইন, জাপানসহ বহু দেশের মানুষ দিনে দুবেলা ভরপেট ভাত খেয়েও দিব্যি খাটাখাটুনি করেন, রাতে সুখনিদ্রা যান। এ দেশে নিয়মটা চালু করলে কেমন হয়!
মদ্যপানে সুখনিদ্রা
মদ না খেলে অনেকেরই নাকি ঘুম আসে না, এলেও সুখনিদ্রা হয় না। বহু মদ্যপায়ীই মদ খাওয়ার সমর্থনে এ রকম একটা যুক্তি খাড়া করেন। ঘুমের ওষুধ খাওয়ার চেয়ে বরং এক পেগ মদ খাওয়াই নাকি ভালো। এক পেগ মদ মানে ৯ গ্রাম অ্যালকোহল, যার থেকে শক্তি মেলে ৬৩ কিলোক্যালরি। মদ্যপানের মাত্র ৫ মিনিটের মধ্যে মদ পাকস্থলী হয়ে অবিকৃতভাবে ক্ষুদ্রান্ত্রে চলে আসে এবং সেখান থেকে সরাসরি শোষিত হয়ে রক্তে সর্বাধিক মাত্রায় অ্যালকোহলের উপস্থিতি লক্ষ করা যায় এবং এই সময়েই চোখে ঘুম নেমে আসে। এক থেকে দেড় পেগের মধ্যে মাত্রা থাকলে এই ঘুম কমবেশি ৫ ঘণ্টা স্থায়ী হয় এবং নিরবচ্ছিন্ন হয়। মাত্রা ছাড়ালেই মুশকিল। ঘুম হবে ছেঁড়া ছেঁড়া, ভোর রাতে ভেঙে যেতে পারে, সকালে হ্যাঙওভার থাকবে। কাজেই ঘুম না হওয়ার অজুহাতে মদ্যপানের বিলাসিতার প্রয়োজন নেই। যদি খেতে ইচ্ছা হয়, মাত্রা ঠিক রাখতে পারেন, খাবেন তবে এমনি এমনি খাবেন, ঘুম আনতে খাবেন না।
কতক্ষণ ঘুম
লিখিত বা বিজ্ঞাপিত এমন কোনো নিয়মকানুন নেই যে, এত ঘণ্টা বাধ্যতামূলকভাবে ঘুমাতেই হবে। ঘুমের বেলায় কত ঘণ্টা ঘুমাচ্ছি সেটা বড় কথা নয়, ঘুমটা ঠিকঠাক হচ্ছে কি না, সেটাই বড় কথা। অর্থাৎ কোয়ান্টিটি নয়, কোয়ালিটি অব স্লিপটাই বিবেচ্য। এটা একেক জনের একক রকম হতেই পারে। শিশুরা বেশিক্ষণ ঘুমায় আগেই বলেছি। তবে সুস্থ একজন পূর্ণবয়স্কের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমালেই যথেষ্ট, অর্থাৎ গড়ে ৮ ঘণ্টা। এই ৮ ঘণ্টা রাতে একটানা না হয়ে রাতে ৬ ঘণ্টা, দুপুরে ১ থেকে ২ ঘণ্টা, এমনও হতে পারে। আবার ৪-৫ ঘণ্টা ঘুমিয়েও অনেকে দিব্যি ফিট আছেন। মোদ্দা কথা হলো, ঠিক যে পরিমাণ ঘুমালে আপনি সারাদিন চনমনে থাকতে পারেন, সেটাই আপনার ঘুমের পরিমাণ। ১০ ঘণ্টা বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করার চেয়ে ৪-৫ ঘণ্টা টানা ঘুমানো যে শরীরের পক্ষে অনেক বেশি উপকারী তা বলাই বাহুল্য।
ঘুম আসে না কেন
অসংখ্য কারণ আছে ঘুম না আসার অর্থাৎ অনিদ্রার। কিছু কারণ অল্পস্থায়ী, কিছু আবার দীর্ঘকালীন। নানা ধরনের জটিল অসুখ এবং মানসিক রোগে ক্রনিক ইনসমনিয়া বা দীর্ঘস্থায়ী অনিদ্রা দেখা দিতে পারে।
শারীরিক কারণঃ বাত, হাঁপানি, উচ্চরক্তচাপ, থাইরয়েডের অসুখ, ডায়াবেটিস, প্রস্টেটের সমস্যা, যক্ষ্মা, ঋতুর গোলযোগ, গর্ভাবস্থা, রেনাল ফেইলিওর, হার্ট ফেইলিওর, পেপটিক আলসার, ক্যান্সারের বাড়াবাড়ি পর্যায়, মেনোপজ বা ঋতু বন্ধের পর, পেটের অসুখ, এমনকি সামান্য জ্বরজারিতেও অনেকের ঘুম আসতে চায় না।
মানসিকঃ এই জটিল জীবনযাত্রায় অধিকাংশ নিদ্রাহীনতার কারণই হলো মানসিক। ডিপ্রেশন, ম্যানিয়া, সিজোফ্রেনিয়া, অ্যাংজাইটি নিউরোসিস, পরীক্ষা বা চাকরির ইন্টারভিউ দেয়ার আগের টেনশন, অপারেশনের ভয়, প্রিয়জনের মৃত্যুসংবাদ অনেকেরই চোখের ঘুম কেড়ে নেয়।
ওষুধ থেকেঃ উচ্চরক্তচাপের ওষুধ, স্টেরয়েড গ্রুপের ওষুধ, মানসিক অবসাদের ওষুধ, থাইরয়েড হরমোন, মিথাইল ডোপা, বিশেষ ধরনের কিছু অ্যান্টিবায়োটিক, ক্যান্সারের কেমোথেরাপিসহ নানা ধরনের ওষুধ থেকে ঘুমবিভ্রাট হতে পারে।
অন্যান্যঃ শোয়ার স্থানের পরিবর্তন, মদ্যপান, চা-কফি পানসহ নানা নেশা, রাত জেগে আড্ডা, অত্যধিক আলো, তীব্র শব্দ, মশার কামড়, বিছানায় পোকামাকড়, নাসিকা গর্জন, শিফটিং ডিউটি, জেট ল্যাগ, পাহাড়ে ভ্রমণ, অতিরিক্ত পরিশ্রম, একেক রাতে একক সময় ঘুমাতে যাওয়া, রাত জেগে লেখাপড়া বা ইন্টারনেট সার্ফিং করাসহ নানা কারণে ঘুমবিভ্রাট দেখা দিতে পারে।
অনিদ্রার দাওয়াই
ইনসমনিয়ার রোগীরা ‘আয় ঘুম আয় রে’ করেই সারা রাত কাটান। মাঝেমধ্যে স্লিপিং পিল খান, ভালো ঘুমোন, আবার যে সেই। অনিদ্রার বহু রকম দাওয়াই এই প্রতিবেদনে সবিস্তার জানিয়েছি।
হোমিওপ্যাথি, আয়ুর্বেদ, যোগ, অ্যালোপ্যাথি, অ্যারোমাথেরাপি, মিউজিক থেরাপি-কিছুই বাদ দিইনি। এই লেখার নিশাচর পাঠকেরা চেষ্টা করে দেখতে পারেন, যদি কোনো পদ্ধতি তাদের কাজে লেগে যায়। তার আগে একটা প্রয়োজনীয় কথা বলে দিই। সেটা হলো, যার ঘুম ঠিকমতো হয় না, তাকেই প্রথমে অনুসন্ধান করে দেখতে হবে, কী কারণে তার ঘুম ঠিকঠাক হচ্ছে না। তিনি নিজে বুঝতে না পারলে, তার সঙ্গে যে বা যারা থাকেন বা ঘুমান, তাদের সাহায্য নিন। নিজের লাইফস্টাইল একটু পাল্টে দেখুন, ঘুম আসবেই। মনে রাখবেন, একজন মানুষকে যদি একটানা তিন দিন-তিন রাত অর্থাৎ প্রায় ৭২ ঘণ্টা জাগিয়ে রাখা যায়, তাহলে তার শারীরিক এবং মানসিক সমস্যা হবে, তিনি সংজ্ঞাও হারাতে পারেন।
নিদ্রাদেবীর সঙ্গে সহবাস করার জন্য কয়েকটি টিপস দিচ্ছি, চেষ্টা করে দেখবেন অবশ্যই
- রাতের খাওয়াটা দশটার মধ্যেই সেরে নিন। খেয়েই শোবেন না। ঘণ্টাখানেক হাঁটাহাঁটি করে, গল্পগুজব করে, টিভি দেখে, গান শুনে কাটিয়ে দিন। রাতের খাওয়াটা যেন হাল্কা এবং সহজপাচ্য হয়। ইংরেজিতে একটা কথা আছে ‘ইট ব্রেকফাস্ট লাইক এ কিং, লাঞ্চ লাইক এ প্রিন্স এন্ড ডিনার লাইক এ পপার’। শোয়ার ঠিক আগে এক গ্লাস গরম দুধ খেতে পারেন। দুধের ক্যালসিয়াম ও মেলাটোনিন ঘুম আনতে সাহায্য করে।
- শোয়ার আগে ফোনে বেশিক্ষণ বকবক করবেন না। শুয়ে শুয়ে টিভি দেখবেন না, বই পড়বেন না। ঘর অন্ধকার করে শুতে পারেন, পছন্দসই হাল্কা আলোও ঘরে রাখতে পারেন। খুব লো ভলিউমে গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তে পারেন।
- শোয়ার আগে বিছানা ঠিক আছে কি না দেখে নেবেন। পোকামাকড় বা পিঁপড়ে নেই তো! মশারির মধ্যে মশা ঢুকে নেই তো! বালিশটা যেন বেশ আরামদায়ক হয়। বিছানাটাও ঠিকঠাক হওয়া চাই। কেমন খাট বিছানা-বালিশ চাই সুখনিদ্রার জন্য পরে বিস্তারিত জানাচ্ছি।
- শোয়ার আগে চা-কফি-মদ-সিগারেট কিছুই খাবেন না। হাত-পা ঘাড় পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে পারেন। চোখে মুখে পানির ঝাঁপটা দিয়ে নেবেন। যদি কারও এক চাপ চা কফি খেলে বা একটা সিগারেট খেলে ঘুম ভালো হয় খেতে পারেন।
- প্রতি রাতে একটি নির্দিষ্ট সময়ে শুতে যাবেন, ১২টার আগে অবশ্যই। বিছানায় কিছুক্ষণ শুয়ে থাকার পরও যদি ঘুম না আসে, বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ুন। পায়চারি করুন ঘরের মধ্যেই, রেডিও শুনুন লো ভলিউমে, হাল্কা গল্পের বই পড়ুন। তন্দ্রা এলে আবার বিছানায় ফিরে যান।
- বিছানায় শুয়ে সারাদিনের নানা কাজ, ঝুটঝামেলা সব ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করুন। যা ভাবলে মন ভালো লাগে, তাই ভাবুন। ফ্যান বা সিলিংয়ের দিকে কয়েক মিনিট তাকিয়ে থেকে মনকে শান্ত করুন। রাতে শোয়ার আগে একদম ঝগড়াঝাঁটি নয়।
- রাতে হাল্কা ঢিলেঢালা পোশাক পরে শোবেন। মহিলারা একটু ত্বক পরিচর্যা করে নেবেন, এতে মনটাও ভালো লাগবে; যার সঙ্গে শোবেন তাদেরও ভালো লাগবে। চিরুনি দিয়ে বেশ কয়েকবার চুল আঁচড়ালে মস্তিষ্কের ত্বকে রক্ত সঞ্চালন বাড়বে, ঘুম আসবে।
- অল্প গরম পানিতে শোয়ার আগে স্নান করে অনেকে উপকার পেয়ে থাকেন।
ওষুধ খেয়ে ঘুম
ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ খেয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করবেন না। কারণ ঘুমপাড়ানি ওষুধগুলোর নানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। নানা ধরনের ঘুমের ওষুধের মধ্যে রয়েছে ট্র্যাঙ্কুইলাইজার ও হিপনোটিক গ্রুপের ড্রাগ। এছাড়া অ্যান্টিডিপ্রেশান্ট ও অ্যান্টিহিস্টামিনিক খেলেও ঘুম আসে।
ভেষজ ওষুধ ভ্যালেরিয়ান ঘুম আনতে সাহায্য করে। মেলাটোনিন হরমোন, যা মস্তিষ্কের পিনিয়াল গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হয় এবং ঘুম পাড়াতে সাহায্য করে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার নিঃসরণ কমতে থাকে। বাজারে মেলাটোনিন ট্যাবলেট পাওয়া যায়। খেলে ঘুম আসে। আমেরিকাতে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ওষুধের দোকানে মেলাটোনিন বিক্রি হয়।
সুনিদ্রার জন্য খাট-বিছানা-বালিশ
জীবনের তিন ভাগের এক ভাগ আমরা শুয়েই কাটাই। অথচ ঠিকভাবে শুই কজন। আর ঠিকভাবে শুই না বলেই তো ঘুমও ঠিকঠাক হয় না। আমরা অনেকেই জানি না, কেমন বিছানায়, ঠিক কেমনভাবে শোয়া উচিত আমাদের। সারাদিন পরিশ্রমের পর নরম ফোমের বিছানায় শুতে কে না পছন্দ করেন। অথচ সকালে বিছানা ছাড়ার পরেই অনেকের ঘাড় টনটন, কোমর কনকন শুরু হয়ে যায়
।
আমাদের খাট-বিছানা
সাবেকি চৌকির জায়গায় এখন ইংলিশ খাট ও বক্স খাটের ছড়াছড়ি এবং তাতে যথারীতি নরম গদি। আগে চৌকির শক্ত পাটাতনের ওপর একটা তোশক, আর চাদর পেতে আমরা শুতাম এবং সেটাই ছিল আদর্শ বিছানা। কারণ তাতে শোওয়ার সময় আমাদের শিরদাঁড়া সঠিক অবস্থানেই থাকত। রাতে ঘাম গলে সেই ঘাম শুষে নিত চাদর ও তোশক, মাঝে মাঝে সেগুলো ঝেড়েঝুড়ে রোদে দিলেই ঝামেলা চুকে যেত। আমাদের বাপ-দাদারা সেগুলোতেই সুখে নিদ্রা গেছেন। এখন আমরা খাট ব্যবহার করছি বেশি। ইংলিশ খাট, যেগুলোতে খাটের পাটাতনের কাঠগুলোর মধ্যে বেশি ফাঁক থাকে, সেগুলো বক্স খাটের চেয়ে ভালো। কারণ তোশক ও গদিতে শোষিত ঘাম ও বাষ্প বের হওয়ার একটা পথ থাকে, যেটা বক্স খাটের পাটাতনে থাকে না। যে জন্য এর তোশক ও গদিগুলো সব সময় স্যাঁতসেঁতে থাকে, জীবাণু সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে।
খাটের পর এবার আসি গদির আলোচনায়। তিন ধরনের গদির ব্যবহার আমরা করে থাকি। স্পঞ্জের গদি, সিপ্রংয়ের গদি এবং নারকেলের ছোবড়ার সঙ্গে রাবার মিশিয়ে রাবারাইজড কয়ারের গদি।
- স্পঞ্জ বা ফোমের গদি তৈরি হয় ল্যাটেক্স রাবার বা পলি-ইউরোথেন দিয়ে। শুলে দারুণ আরাম লাগে। কিন্তু বেশিদিন শুলেই গদির মাঝের দিকটা দেবে যায়, শিরদাঁড়ার স্বাভাবিক বক্রতা বজায় থাকে না বলে ঘাড়-পিঠ-কোমরে ব্যথা হয়। বারে বারে ঘুম ভেঙে যায়।
- সিপ্রংয়ের গদি আবার দু রকমের। কম দামি সিপ্রংগুলো দেবে যায়, দেহটা ‘ৎ’-র মতো হয়ে যায়। নিট ফল শিরদাঁড়ার ব্যথা এবং ঘুমের দফারফা। দামি সিপ্রংগুলো দেখতে ছোট, সংখ্যায় অনেক, কাপড়ে মুড়ে পাশাপাশি থাকে, শুলে খুব বেশি দেবে যায় না, ফলে শিরদাঁড়া স্বাভাবিক থাকে, দেহে ব্যথা হয় না। তবে সিপ্রং শক্ত না হলে রোগাদের অসুবিধা না হলেও মোটা ব্যক্তিদের সমস্যা হবেই। কাজেই সিপ্রংয়ের গদি কিনলে এমন গদি কিনবেন, যাতে সিপ্রংগুলো ভালো হয়। গদির ওপর দেড় থেকে দুই ইঞ্চি উঁচু তোশক পেতে শোবেন। দারুণ ঘুম হবে।
- রাবারাইজড গদি এগুলোর মধ্যে অপেক্ষাকৃত ভালো। নারকেল ছোবড়ার সঙ্গে রাবার মিশিয়ে তৈরি এই গদি ‘না শক্ত না নরম’ গোছের। এতে শুলে শিরদাঁড়ার স্বাভাবিক বক্রতা বজায় থাকে, ব্যথা-বেদনা হয় না, ফলে ঘুমেরও ব্যাঘাত হয় না।
- পুরনো দিনের মানুষেরা এখনো নারকেল ছোবড়ার গদিই পছন্দ করেন। শিরদাঁড়ার পক্ষে এগুলো নিঃসন্দেহে ভালো। তবে বড্ড ভারী, ঝাড়পোঁচ করা মুশকিল, রোদে দেয়াও ঝামেলা। তাছাড়া সহজেই ধুলো জমে বলে অ্যালার্জির রোগীদের শ্বাসকষ্টের কারণ হতে পারে, বিশেষ করে যাদের গদিতে অ্যালার্জি আছে। সারারাত হেঁচে মরলে ঘুমাবেন আর কখন?
- কাজেই খুব নরমও নয় আবার খুব শক্তও নয়-এমন গদিই শিরদাঁড়ার পক্ষে আদর্শ। গদির ওপর এক থেকে দেড় ইঞ্চি পুরু তোশক পেতে নেবেন। আরও ভালো হয় যদি গদি আর তোশকের মাঝখানে আধ ইঞ্চি পুরু, ৪ ফুট লম্বা ও ২ ফুট চওড়ার একটি ম্যাসনাইট বোর্ড বা প্লাইউড বোর্ড পেতে নেন।
কীভাবে শোবেন
বিছানার ব্যবস্থা তো হলো, এবার শোবেন কীভাবে? অর্থাৎ শোওয়ার সঠিক পদ্ধতিটি কী? শক্ত বিছানায় চিত হয়ে শোওয়াই ভালো, দুই হাঁটুর নিচে একটা কোল বালিশ রেখে শুলে শিরদাঁড়া ঠিকঠাক থাকে। পাশ ফিরে শুলে কোল বালিশটাকে রাখতে হবে হাঁটু দুটোর মাঝখানে। এতে আরাম হবে, ঘুমও হবে।
কেমন বালিশ
নরম বালিশে শোবেন। বালিশ যেন খুব উঁচু না হয়, দুটো বালিশে কক্ষনো শোবেন না। ইঞ্চি চারেক পুরু বালিশ প্রাপ্তবয়স্কদের পক্ষে ভালো, বালিশটা লম্বায় ২০ ইঞ্চি, আর চওড়ায় ১৬ ইঞ্চি হলে ভালো হয়। বালিশটা শুধু আপনার ঘাড়ের নিচে নয়, পিঠের উপরাংশের নিচ পর্যন্ত রাখুন, শুয়ে আরাম পাবেন, ঘুমও দ্রুত আসবে। বুকের নিচে বালিশ রেখে ঘাড়টাকে নিচু করে বই পড়বেন না। আপনার কাঁধ থেকে ঘাড়ের দূরত্ব যতটা, ততটাই হওয়া উচিত আপনার বালিশের উচ্চতা।
অনিদ্রা থেকে অসুখ
মাথাভার, ঝিমুনি, কাজকর্মে উৎসাহের অভাব, মনঃসংযোগে অসুবিধা, খিটখিটে মেজাজ, অসংলগ্ন কথাবার্তার মতো মামুলি সমস্যা ছাড়াও নিদ্রাহীনতা ডেকে আনতে পারে ভয়ঙ্কর কিছু রোগ। যেমন হাইপারটেনশন, ইস্কিমিক হার্ট ডিজিজ, সেরিব্রাল অ্যাটাক, শ্বাসকষ্ট, মানসিক অবসাদ ইত্যাদি। কাজেই এসব বিপত্তি এড়াতে ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম চাই-ই।
ঘুম ও সেক্স
ঘুমের সঙ্গে সেক্সের বেশ একটা মাখেমাখো সম্পর্ক রয়েছে। ঘুমের পর সেক্স না সেক্সের পর ঘুম, এই নিয়ে দ্বিমত আছে যৌনবিজ্ঞানীদের মধ্যেও। যৌন উত্তেজনার ফলে পুরুষ এবং নারীর উভয়ের মধ্যেই শারীরিক এবং মানসিক নানা পরিবর্তন ঘটে এবং এই পরিবর্তনগুলোর পেছনে রয়েছে বিভিন্ন রকম হরমোনের ভূমিকা। ডোপামাইন, সেরোটনিন, অক্সিটোসিন, আলফা মেলানোসাইট পিলপেপটাইড, ইস্ট্রোজেন, টেস্টোস্টেরনসহ এই হরমোনগুলোর নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস অংশ।
এগুলোর কর্মকাণ্ডের ফলে যৌনমিলনকালে রক্তচাপ বাড়ে, হৃদস্পন্দন বাড়ে, বেড়ে যায় নাড়ির গতি, শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুততর হয়, রক্তনালিতে রক্তপ্রবাহের মাত্রা বেড়ে যায়। নানা ধরনের মাংসপেশি ও স্নায়ু উত্তেজিত হওয়ার ফলে ঘাম হয়, মুখে প্রচুর লালারস ঝরে, যৌনাঙ্গ রসসিক্ত হয়, ঘ্রাণ-দৃষ্টি এবং স্পর্শেন্দ্রিয় সংবেদনশীল হয়ে পড়ে, চোখের তারা বিস্ফোরিত হয়। যৌনবিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, যৌনমিলনে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ ক্যালরির মতো শক্তি খরচ হয়।
যৌনঝড়ের চূড়ান্ত মুহূর্তেই হয় স্খলন এবং তারপরেই নেমে আসে শৈথিল্য এবং অবসাদ। শরীর এবং মন আবার ফিরে যেতে চায় তার আগের অবস্থানে। পুরুষের বেলায় এই অবসাদ এবং ক্লান্তি যত দ্রুত নেমে আসে, মহিলাদের বেলায় কিন্তু তা হয় না। সঙ্গমসুখের উত্তেজনার রেশটুকু স্তিমিত বহ্নির মতো অন্তত মিনিট দশেক জেগে থাকে নারীর দেহ এবং মনে এবং তারপরেই তার দু চোখ জুড়ে নেমে আসে স্বপ্নময় ঘুম। পুরুষকে অন্তত এই মিনিট দশেক ঘুমকে পাশে ঠেলে রেখে প্রিয়তমার সঙ্গসুখের অংশীদার হতে হবে। তারপর দুজনে একসঙ্গে যাবেন সুখনিদ্রায়।
যৌনবিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন যৌনমিলন নিতান্ত দায়সারা কিংবা পাশবিক না হয়ে যদি প্রেমযুক্ত হয় তা হলে পুরুষ-নারী দুজনেই চরমতৃপ্তি লাভ করেন এক সঙ্গেই, দুজনেই ভীষণ রকম ক্লান্তি এবং অবসাদগ্রস্ত হয়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে যান। সফল সেক্সের সঙ্গে তাই গভীর ঘুমের একটা সম্পর্ক আছে, যদি সেই সেক্সে প্রেমের পাঁচফোড়ন থাকে, তবে তো কথাই নেই।
অবশ্য সারারাত ঘুমিয়ে ভোরের দিকে তরতাজা অবস্থায় সেক্সও অনেকে পছন্দ করেন। এতে অনেকে সারা দিনের কাজকর্মের টনিক পেয়ে থাকেন। মধ্যরাতে আধো ঘুম আধো জাগরণেও অনেকে সেক্স পছন্দ করেন এবং তারপর আবার ফিরে যান গভীর ঘুমের জগতে।
আসলে যার যেমন পছন্দ সেভাবেই উপভোগ করবেন যৌনজীবনকে। তবে ঘুমকে বাদ দিয়ে নয়। আগে ঘুম পরে সেক্স, নাকি পরে ঘুম, আগে সেক্স-প্রণয়-প্রণয়ীরা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন।
ঘুম এবং রাগসঙ্গীত
আপনার ছেলেবেলা বা ছাত্রজীবনের কথা ভাবুন তো। আসুন আপনাদের ফণিভূষণের কাছে নিয়ে যাই। রবীন্দ্রনাথের মণিহারা গল্পের সেই ফণিভূষণ। কবি গল্পের শেষাংশে লিখেছেন ‘জলস্পর্শ করিবামাত্র ফণিভূষণের তন্দ্রা ছুটিয়া গেল’।-না, পরিণতির বাকি অংশ আমাদের প্রয়োজন নেই। স্কুলে পড়ার সময় সুরেলা গলায়, সুনির্বাচিত শব্দ বিন্যাসে কণ্ঠস্বরের নিরন্তর নমনীয়তা ও উচ্চগ্রামের শিখর সীমায় যিনি পাঠ্য বিষয়কে নিয়ে যেতেন অনুপম দক্ষতায়, পাঠ শেষে তিনি বিস্মিত বেদনায় লক্ষ করতেন যে প্রথম বেঞ্চের মাঝের দিকের এবং শেষের দিকের অনেক ছাত্র অতল গহন ঘুমে আচ্ছন্ন। এও এক ধরনের সুর থেকে গানে অভিযাত্রা। গানের সঙ্গে সুপ্তি বা ঘুমের আছে নিবিড় ও গভীর সম্পর্ক। সুপ্তি হলো প্রশান্তি। দিনের শেষে ঘুমের দেশে প্রশান্তির নিবিড়তার মধ্যে যে মানুষ ডুবে যায় তার সারা দেহ মনে প্রশান্তির ছায়া সঞ্চারিত হয়।
ধ্রুপদি সঙ্গীতে আছে নানা রাগ। আর এই প্রশান্তিই তো ঘুমের সহায়ক। প্রশান্তির নিবিড়তা অবগাহন করলেই তো ঘুমের সান্নিধ্য লাভ করা যায়। প্রশান্তি আর ঘুম যেন দুই সাথী। এই ঘুম সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদের মতো। অথবা ইমনের শান্ত সুর বা মালকোষের সৌন্দর্য মনকে এক দিব্য প্রশান্তির মধ্যে দিয়ে ঘুমের জগতে নিয়ে যায়। ইমন সন্ধ্যাকালীন রাগ। আর ভৈরোঁ ঘুমভাঙানিয়া রাগ। ভোরের বেলা মৃদু ভৈরোঁর সুর লহরীতে ঘুম হতে অকস্মাৎ জেগে ওঠে মানুষ। প্লেটো বলেছেন সঙ্গীত হলো আত্মার জন্য। আত্মার শান্তির জন্য চাই গান। আত্মার শান্তির জন্য চাই ঘুম। তাই গান ও ঘুম আত্মাকে নিয়ে যায় শান্তির এক অলৌকিক জগতে।
ত্বক ও ঘুম
সুন্দর ত্বকের জন্য চাই সুন্দর ঘুম। ঠিকমতো ঘুম না হলে চোখের তলায় কালি পড়ে। অনেক কারণেই ঘুম কম হতে পারে। কারণ যদি হয় স্ট্রেস অ্যান্ড স্ট্রেন, তা হলে কালি পড়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। ত্বকের প্রধান স্তর দুটি। এপিডারমিস ও ডারমিস। এপিডারমিসের বেসাল লেয়ার থেকে মেলানিন পিগমেন্ট তৈরি হয়, যা ত্বকের স্বাভাবিক রঙের জন্য দায়ী। ডারমিসে আমাদের অনুস্তরে থাকে রেটিকুলিন, ইলাস্টিক ফাইবার ও কোলাজেন ফাইবার। এরা সবাই মিলে ত্বককে টানটান রাখে, বুড়িয়ে যেতে দেয় না। ঘুম ঠিকমতো না হলে ত্বকে এই কোলাজেন সংশ্লেষণের পরিমাণ কমে যায় দুটি কারণে। ত্বকে রক্ত সরবরাহ তথা অক্সিজেনের জোগান কমে যায় বলে এবং কিছু হরমোনের অভাবে কোলাজেন সংশ্লেষণ বাধাপ্রাপ্ত হয় বলে। কোলাজেন ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা বা ইলাস্টিসিটি ধরে রাখে। ঘুম ঠিকমতো না হলে এই ইলাস্টিসিটি কমে যায়, ত্বক শিথিল হয়ে পড়ে, বুড়িয়ে যায়। দেহের বয়স না বাড়লেও ত্বকের বয়স তাই বেড়ে যায়। কাজেই সুন্দর টানটান ত্বকের জন্য চাই সুন্দর ঘুম।
গর্ভাবস্থায় ঘুম
বহু সংখ্যক গর্ভবতী মহিলা অনিদ্রায় কষ্ট পান। এই অনিদ্রা বহু কারণে হতে পারে। যেমন ভবিষ্যৎ মাতৃত্বের দায়দায়িত্ব সম্বন্ধে কোনো ধ্যানধারণা না থাকার জন্য, গর্ভাবস্থায় সাময়িক শারীরিক প্রতিবন্ধকতার জন্য, গর্ভাবস্থায় রক্তের উচ্চচাপজনিত কারণে, গর্ভধারণের আগে থেকেই যদি খারাপভাবে নিদ্রা যাওয়ার অভ্যাস থাকে ইত্যাদি। গর্ভাবস্থায় ৭-৮ ঘণ্টা নিদ্রা গর্ভবতী মহিলার পক্ষে অত্যন্ত জরুরি। অনিদ্রা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য যা করা উচিত-
(১) কেফিনযুক্ত খাবার যেমন চা, কফি, সোডা, চকোলেট কম খাওয়া উচিত, বিশেষ করে দিনের শেষের দিকে।
(২) জলীয় পদার্থ সন্ধ্যা কিংবা রাতের বেলা কম খাওয়ার অভ্যাস করা।
(৩) ঠিক শোবার আগে রাতের খাবার খাওয়া উচিত নয়। কম ঝালমসলাযুক্ত সহজপাচ্য খাবার নিদ্রা যাওয়ার ২-৩ ঘণ্টা আগে খাওয়া উচিত। নিদ্রা যাবার আগে যদি প্রয়োজন হয়, তবে এক কাপ দুধ বা অন্য কোনো পানীয় খেয়ে শুয়ে পড়ার অভ্যাস করা উচিত।
(৪) দুপুরবেলা অল্প সময়ের জন্য নিদ্রার অভ্যাস থাকা দরকার।
(৫) যোগ ব্যায়ামের সাহায্যে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে নিজেকে শিথিল রাখার উপায় জেনে নিলে খুব ভালো হয়। এর সাহায্যে শরীরে রক্ত চলাচল বেড়ে যায় এবং রাতে ঘুমিয়ে পড়ার পর পায়ের পেশি সংকোচনের সম্ভাবনা কমে যায়।
(৬) নিদ্রা যাবার সময় ঠিক রাখা জরুরি।
(৭) যেসব দুশ্চিন্তা বা সমস্যার কারণে নিদ্রার ব্যাঘাত ঘটছে নিদ্রা যাবার আগে সেসব কারণ একটা নোট খাতায় লিখে রাখার অভ্যাস করা উচিত যাতে ওই সমস্যাগুলো ভুলে না গিয়ে পরের দিন সমাধান করা যায়।
(৮) শুয়ে পড়ার ২০-৩০ মিনিটের মধ্যে যদি ঘুম না আসে তবে বিছানা থেকে উঠে পড়ে হালকা বিষয়ে পড়াশোনা বা গান শোনার অভ্যাস করা প্রয়োজন। আবার ঘুম পেলে বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়া উচিত।
(৯) গর্ভাবস্থার কারণে রক্তের উচ্চচাপের দ্রুত চিকিৎসা করা উচিত।
শেষ কথা
এত কিছু পড়ার পর একটা বিষয় নিশ্চয়ই বুঝেছেন, ঘুমের কোনো বিকল্প নেই। ঘুমাতে আপনাকে হবেই। মাত্র একটা রাত জেগে থাকার পর আপনার শারীরবৃত্তীয় কার্যকলাপ বিপজ্জনক মাত্রায় মদ্যপায়ীদের শারীরবৃত্তীয় কার্যকলাপের মতোই হবে, এটা কিন্তু পরীক্ষিত সত্য। ঠিক কতক্ষণ ঘুমালে আপনার শরীর ঝরঝরে লাগে, কাজকর্মে উৎসাহ আসে, সেটা আপনাকেই ঠিক করে নিতে হবে।



