জনপ্রিয় হচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিং
সময়ের সাথে বদলে যাচ্ছে আমাদের জীবনযাত্রা। এক সময়ে যা ছিল কল্পনা, এখন তা সত্যি হতে শুরু করেছে। আমাদের জীবন ক্রমেই প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। এখন কম সময়ে কত দ্রুত প্রয়োজনীয় কাজকর্ম সারা সম্ভব সেই প্রতিযোগিতা চলছে। প্রতিনিয়ত আসছে নিত্যনতুন প্রযুক্তিসেবা। মোবাইল ব্যাংকিং তেমনি একটি নতুন সেবা।
বর্তমানে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা দিতে শুরু করেছে কয়েকটি ব্যাংক। পূর্ণাঙ্গ মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করতে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন পর্যন্ত ১১টি বাণিজ্যিক ব্যাংককে অনুমতি দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে ডাচ-বাংলা ব্যাংক প্রথম এই কার্যক্রম শুরু করেছে। ডাচ-বাংলা ব্যাংক দেশের দুই মোবাইল ফোন প্রতিষ্ঠান বাংলালিংক ও সিটিসেলের সহযোগিতায় এই মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করেছে। এ বছরের ৩১ মার্চ নয়াপল্টনে বাংলালিংক পয়েন্ট থেকে টাকা জমা এবং পুরানা পল্টনে সিটিসেলের পয়েন্ট থেকে টাকা উঠিয়ে এই কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়।
মোবাইল ব্যাংকিং
এটি ব্যাংকিং সেবার বিশেষ পদ্ধতি, যেখানে নগদ অর্থ উত্তোলন ও জমাদান; বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও উপযোগ সেবার বিল পরিশোধ; বেতন উত্তোলন; প্রবাসী আয় প্রেরণ ও গ্রহণ; সরকারি ভাতা প্রদান ইত্যাদি কার্যক্রম সম্পন্ন করা যাবে। মোবাইল ব্যাংকিং হচ্ছে শাখাবিহীন ব্যাংকিং ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে স্বল্প খরচে দক্ষতার সাথে আর্থিক সেবা পৌঁছে যাবে ব্যাংকিং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে। এটি সুবিধাজনক, সহজলভ্য ও নিরাপদ। দেশব্যাপী যেকোনো সময় যেকোনো স্থানে সেবার নিশ্চয়তা রয়েছে। এর মাধ্যমে দ্রুত ও কম খরচে টাকা লেনদেন এবং আধুনিক ব্যাংকিং সেবায় প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। মাত্র ১০০ টাকা জমা দিয়ে একজন গ্রাহক মোবাইল অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবেন।
ব্যাংকিং প্রক্রিয়া
মোবাইল ফোন থাকলেই এখন থেকে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবেন বাংলাদেশের যে কেউ, দেশের যেকোনো স্থান থেকে। তাকে ব্যাংকের শাখায় যেতে হবে না। কল রিচার্জ বা ফ্লেক্সিলোড করেন যারা তারাই অ্যাকাউন্ট খুলে দেবেন, আর ব্যাংকের হয়ে তারাই টাকা-পয়সা লেনদেন করবেন। এ ক্ষেত্রে গ্রাহকের মোবাইল ফোন নম্বরটি হবে অ্যাকাউন্ট নম্বর। ব্যাংক কর্তৃক মনোনীত যেকোনো এজেন্ট পয়েন্টে মোবাইল অ্যাকাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করা যাবে। বিভিন্ন মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানি ইতোমধ্যে দেশজুড়ে এজেন্ট মনোনয়ন দিয়েছে; যারা ব্যাংকের এজেন্ট, সনদ ও মোবাইল ব্যাংকিং ব্যানার প্রদর্শন করতে পারবে তারাই ব্যাংকের গ্রাহক রেজিস্ট্রেশন করতে পারবে। যেকোনো মোবাইল অপারেটরের মোবাইল ব্যবহারকারী নির্দিষ্ট কোম্পানির মনোনীত এজেন্ট পয়েন্টে তার মোবাইল রেজিস্ট্রেশন করতে পারবেন। রেজিস্ট্রেশনের জন্য কেওয়াইসি ফরম, গ্রাহকের ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা অন্য যেকোনো ছবিসংবলিত গ্রহণযোগ্য পরিচয়পত্র প্রয়োজন হবে। ব্যবহারকারীদের মোবাইল ফোন নম্বরটিই হচ্ছে তার মোবাইল অ্যাকাউন্ট নম্বর। যার সাথে একটি চেক ডিজিট যুক্ত হবে। অন্য কেউ যাতে অ্যাকাউন্টধারীর মোবাইল অ্যাকাউন্টে অনাকাঙ্ক্ষিত টাকা জমা দিতে না পারে সে জন্য এ ব্যবস্থা। মোবাইল অ্যাকাউন্টের যাবতীয় গোপনীয়তা রক্ষার বিভিন্ন ব্যবস্থা রয়েছে। মোবাইল অ্যাকাউন্ট গ্রাহকেরা এজেন্টের কাছ থেকে টাকা জমা দেয়া এবং তোলার সুবিধা লাভ করবেন। অ্যাকাউন্ট খোলার সাথে সাথেই টাকা জমা দেয়া যাবে। তবে অ্যাকাউন্টটি সম্পূর্ণভাবে নিবন্ধিত হওয়ার পর টাকা তোলা যাবে।
নিরাপত্তা
মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নিরাপত্তা নিয়ে কেউ কেউ সংশয় প্রকাশ করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছে ব্যাংকগুলো। এতে যোগাযোগের জন্য যে ধরনের সর্বাধুনিক কারিগরি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় তাতে ব্যাংকিং কার্যক্রম অনেকটা নিরাপদে করা সম্ভব। ব্যাংক মনোনীত যেকোনো এজেন্ট ও ব্যাংকের শাখায় টাকা জমা দেয়া যায় মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থায়। টাকা জমা দেয়ার পর গ্রাহক ব্যাংকের কাছ থেকে একটি জমা রসিদ পাবেন। নিরাপত্তা ও সঠিক লেনদেনের জন্য গ্রাহক এসএমএস প্রেরকের নম্বর ও টাকার পরিমাণ নিরীক্ষা করবেন। ব্যাংক মনোনীত যেকোনো এজেন্ট এবং ব্যাংকের এটিএম শাখাসহ সকল শাখা থেকে টাকা তোলা যাবে।
মোবাইল ব্যাংকিং নীতিমালা
দেশে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের যাত্রা শুরু হয়েছে এ বছরের ৩১ মার্চ। মোবাইল অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে একজন গ্রাহক যেকোনো জায়গায় টাকা জমা, উত্তোলন, কেনাকাটা, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, বেতনভাতা বিতরণ, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স আহরণ, সরকারি অনুদানপ্রাপ্তি, মোবাইলে তাৎক্ষণিক ব্যালান্স রিচার্জসহ বিভিন্ন সেবা নিচ্ছেন। বর্তমানে একজন গ্রাহক এক দিনে সর্বোচ্চ পাঁচবার টাকা জমা দিতে ও উঠাতে পারেন। আর এক মাসে সর্বোচ্চ ২০ বার জমা দেয়া বা উঠানো যায়। যেকোনো জায়গা থেকে টাকা পাঠাতে জমাকৃত টাকার ১ শতাংশ অথবা ৫ টাকা যেটি বেশি হবে সে পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হবে। আর টাকা উঠানোর সময় উত্তোলনকৃত টাকার ২ শতাংশ অথবা ১০ টাকা অথবা যেটি বেশি হবে সে পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হবে। বর্তমানে সিটিসেল ও বাংলালিংকের যেকোনো রেজিস্ট্রেশন পয়েন্ট থেকে মোবাইল অ্যাকাউন্ট খোলা যায়। অ্যাকাউন্ট খুলতে ব্যয় করতে হয় ১০০ টাকা।
প্রত্যন্ত অঞ্চলে মোবাইল ব্যাংকিং
ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেড পরীক্ষামূলকভাবে ২০টি ইউনিয়ন তথ্য ও সেবা কেন্দ্র থেকে শাখাহীন ব্যাংকিংয়ের সাথে মোবাইল ব্যাংকিং চালু করবে। গ্রামের মানুষ কাছের ইউআইএসসি থেকে অ্যাকাউন্ট খোলা, নাগরিক সেবার বিল প্রদান, রেমিট্যান্স গ্রহণ, টাকা জমা দেয়া এবং মোবাইল ফোনের মাধ্যমে টাকা তুলতে পারবেন। ইতিমধ্যে দেশে চার হাজার ৫০১টি ইউনিয়নে স্থাপন করা হয়েছে ইউনিয়ন তথ্য ও সেবা কেন্দ্র। এসব কেন্দ্র থেকে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা দেয়ার কথা পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
ব্র্যাকের ‘বিকাশ’ মোবাইল ব্যাংকিং
কোটি মানুষের কাছে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সহজেই সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ব্র্যাক ব্যাংক চালু করেছে বিকাশ মোবাইল ফাইন্যান্সিং সার্ভিস। ব্র্যাক ব্যাংক ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানি ইন মোশনের যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বিকাশ-এর মাধ্যমে ব্র্যাক ব্যাংক কোডবদ্ধ ভিসা টেকনোলজি প্লাটফর্ম ব্যবহার করবে।
মোবাইল ফোনের মাধ্যমে এমনিতে কথা বলা আর এসএমএস আদান-প্রদানে সবাই অভ্যস্ত হলেও ব্যাংকিং কার্যক্রমে মোবাইলের ব্যবহার আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। বোস্টন কনসালটিং গ্রুপ বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত, মালয়েশিয়া ও সার্বিয়ার ওপর এক গবেষণায় দেখেছে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মোবাইল অর্থনৈতিক সেবা এক দশকের মধ্যে ২০০ কোটি মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নসহ অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জনসংখ্যার ৭২ শতাংশই ব্যাংকিং সেবা কিংবা ক্রেডিট কার্ডের আওতায় নেই।
ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিল্প বিপ্লবে মোবাইল ব্যাংকিং এখন আলোচনার তুঙ্গে। ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধায় বদলে গেছে মানুষের প্রাত্যহিক জীবনমান। গার্টনারের সূত্র মতে, এ মুহূর্তে ভারতে ৭৭ কোটি ৫০ লাখ মোবাইল ফোন গ্রাহক আছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বাড়াতে দ্য রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া তাদের ৩৯টি শাখাকে রুরাল মোবাইল ব্যাংকিং সেবার আওতাভুক্ত করেছে। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এ প্রযুক্তির মাধ্যমে আমাদের দেশেও রচিত হবে নতুন ব্যাংকিংয়ের দুয়ার।
গোলাপ মুনীর
পৃথিবী নামের এ গ্রহে নানা প্রাণীর বসবাস। প্রতিটি প্রাণীদেহেই পড়ে নানা মাত্রার তেজস্ক্রিয় বিকিরণ বা রেডিয়েশন। সে রেডিয়েশনের উৎস হতে পারে প্রাকৃতিক কিংবা মানবসৃষ্ট। প্রাণীদেহে এই বিকিরণ অতিমাত্রিক হলে প্রাণীর দেহকোষ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। অতিমাত্রার তেজস্ক্রিয় বিকিরণ সৃষ্টি করতে পারে ক্যানসার নামের মরণব্যাধির। কারণ হতে পারে মৃত্যুর। তেজস্ক্রিয় বিকিরণ বা রেডিওয়েকটিভিটি হচ্ছে অণুগুলোর নিউক্লিয়াসগুলোর অস্থিতিশীল অবস্থা। আর এ অস্থিতিশীল অবস্থা প্রকাশ পায় এর তাৎক্ষণিক ক্ষয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। সেই সাথে এর আয়নায়িত বিকিরণ বা আয়নাইজিং রেডিয়েশন রিলিজের মাধ্যমেও এর প্রকাশ ঘটে। এই বিকিরণের শক্তি এতই জোরালো যে, এর প্রভাব বস্তু বা মেটারের ওপর পড়তে বাধ্য। আর বস্তুর ওপর এর প্রভাবের ফলে বিভিন্ন ধরনের আয়ন সৃষ্টি হয়। শরীরের ওপর রেডিয়েশন বা তেজস্ক্রিয় বিকিরণের ক্ষতিকর প্রভাব শুরু হয় তখন, যখন এসব আয়ন সৃষ্টি হয় জীবন্ত কোষে। কোনো কিছুর ওপর বিকিরণ বর্ষণের নাম ইরেডিয়েশন। এই ইরেডিয়েশনের দুটি উপায় আছে। প্রথমত, যদি তেজস্ক্রিয় পদার্থ বা রেডিওয়েকটিভ মেটেরিয়েল দেহের বাইরে কোথাও থাকে এবং এর প্রভাব যদি শরীরের বাইরের দিকে পড়ে তবে তাকে আমরা বলি এক্সটারনাল রেডিয়েশন বা বাহ্যিক বিকিরণ। দ্বিতীয়ত, বায়ুসেবন, পানিপান কিংবা খাবারের সময় রেডিওনিউক্লিয়াস শরীরে ঢুকে ভেতর থেকে বিকিরণ সৃষ্টি করা। আর এ রেডিয়েশনের উৎস হতে পারে দুই ধরনের প্রাকৃতিক বা ন্যাচারাল এবং কৃত্রিম বা আর্টিফিশিয়াল। কৃত্রিম বিকিরণ উৎস বলতে আমরা বুঝি মানবসৃষ্ট উৎসগুলোকে। বিজ্ঞানীরা বলেন, পৃথিবীতে যেসব বিকিরণ উৎস রয়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগই মানুষের দুর্ভোগের কারণ। ভূপৃষ্ঠের ওপর যে প্রাকৃতিক তেজস্ক্রিয় বিকিরণ পড়ে সেগুলো হয় আসে মহাকাশ থেকে কিংবা আসে কঠিন ভূত্বকে থাকা তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে।
মহাকাশ থেকে আসা তেজস্ক্রিয় বিকিরণের মাত্রা পৃথিবীতে কতটুকু পড়বে, তা নির্ভর করে এর উৎসের উচ্চতা ও কৌণিক দূরত্ব অর্থাৎ অল্পিটচ্যুড ও লেটিচ্যুডের ওপর। সে কারণে যারা পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করেন এবং খুব ঘন ঘন বিমানে চড়েন, তাদের ওপর তেজস্ক্রিয় বিকিরণের প্রভাব বেশি পড়ার সম্ভাবনা থাকে। ভূপৃষ্ঠের তেজস্ক্রিয়তা বিপজ্জনক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যদি মানুষ বসবাস করে খোলা জমি বা মাঠ এলাকায়। হয়তো সেখানকার ভূত্বকে থাকতে পারে কোনো তেজস্ক্রিয় পদার্থ। তা ছাড়া ভূপৃষ্ঠের কোনো বস্তু থেকেও তেজস্ক্রিয় বিকিরণ আমাদের কাছে আসতে পারে। যেমন ফসফেট সার কিংবা কোনো খাবার, যাতে রয়েছে ক্ষতিকর কোনো তেজস্ক্রিয়তা। নির্মাণসামগ্রীর মধ্যে রেডনে রয়েছে ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয়তা। রেডন স্বাদহীন ও গন্ধহীন একটি নিষ্ক্রিয় গ্যাস। বিজ্ঞানের ভাষায় এটি একটি ইনার্ট গ্যাস। রেডন জমা হয় ভূপৃষ্ঠের নিচে। কঠিন ভূত্বকে ফাটল দেখা দিলে কিংবা খনি খননের সময় রেডন ভূপৃষ্ঠের ওপরে উঠে আসে। রেডিওয়েকটিভিটি আবিষ্কার হওয়ার পর মানুষ ভাবতে শুরু করে কী করে এর প্রয়োগ মানব কল্যাণে করা যায়। এ ভাবনা থেকেই কৃত্রিম তেজস্ক্রিয় বিকিরণ উৎস সৃষ্টি করে তা কাজে লাগানো হলো ওষুধ তৈরিতে, পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনে, খনিজ পদার্থ সন্ধানে, আগুন চিহ্নিত করার কাজে। প্রয়োগ করা হলো কৃষি ও প্রত্নতত্ত্বে। পাশাপাশি এর ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ল পারমাণবিক মারণাস্ত্র তৈরিতে। পারমাণবিক চুল্লিতে দুর্ঘটনা ঘটার পর ‘নিষিদ্ধ’ ঘোষিত এলাকায় পাওয়া অনেক মূল্যবান পদার্থ থেকেও বিপজ্জনক তেজস্ক্রিয় বিকিরণের প্রমাণ পাওয়া গেছে। চিকিৎসার বেলায় এক্স-রে করার সময় মানুষের দেহে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ঘটে। বিভিন্ন রোগ চিহ্নিত করা ও চিকিৎসায় ব্যবহার হয় তেজস্ক্রিয় পদার্থ। অতি অপকারী ভয়াবহ সংক্রামক রোগের চিকিৎসায় আয়োনাইজিং রেডিয়েশন ব্যবহার হয়। চিকিৎসাকাজে ব্যবহূত রেডিয়েশন থেরাপির মাধ্যমে শরীরের ঝিল্লিকোষে তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব ফেলা হয় এগুলোর ভেঙে দেয়ার ক্ষমতা বিলোপ করার জন্য। আজকের দিনে বায়ুমণ্ডলে যে পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালানো হয়, তাতে করে মানুষের শরীরে তেজস্ক্রিয় বিকিরণের উৎস সৃষ্টি হচ্ছে বায়ুমণ্ডল। অর্ধশত বছর ধরে পারমাণবিক ও হাইড্রোজেন বোমা বিস্ফোরণের ফলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ব্যাপকভাবে তেজস্ক্রিয় পদার্থ দিয়ে দূষিত হয়ে পড়েছে। পারমাণবিক চুল্লিগুলোও তেজস্ক্রিয় বিকিরণের আরেক উৎস। পারমাণবিক চুল্লিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ভিত্তি হচ্ছে ভারী নিউক্লিয়াসগুলোর চেইন ফিশন রিয়েকশন। পারমাণবিক দুর্ঘটনা হচ্ছে মানুষকে তেজস্ক্রিয় বিকিরণের মুখে ঠেলে দেয়ার মানবসৃষ্ট আরেক ক্ষেত্র। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্বাভাবিকভাবে চলার সময়ের চেয়ে দুর্ঘটনার সময়ে রেডিয়েশনের বিপদ বেশি। পারমাণবিক চুল্লির প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ কতটুকু ক্ষতিকর হবে বা না হবে।
দুর্ঘটনা কেন্দ্র থেকে বায়ু কোনদিকে প্রবাহিত হচ্ছে, কত জোরে বইছে তার ওপরও নির্ভর করে তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব চারপাশের কোথায় কেমন পড়বে। পারমাণবিক বিস্ফোরণ এলাকার সব প্রাণী ও উদ্ভিদকুল পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তার শিকারে পরিণত হয়। বৃষ্টিপাতের সময় রেডিওয়েকটিভ ক্লাউড বা তেজস্ক্রিয় পদার্থের মেঘ ভূপৃষ্ঠে এসে জমা হয়। যেকোনো উপায়ে মানবদেহে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ঢুকতে পারে। আমরা এমন অনেক পদার্থের সংস্পর্শে প্রতিনিয়ত আসি, সেগুলো থেকে যে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ আমাদের দেহে প্রবেশ করছে তা-ও আমাদের জানা নেই। এ থেকে বেঁচে থাকার জন্য আপনার একটি উপায় হচ্ছে, রেডিয়েশন ডোসিমিটার ব্যবহার করা। ছোট্ট এ যন্ত্র দিয়ে আপনি নিজে নিজে মনিটর করতে পারবেন আপনার চারপাশ তেজস্ক্রিয় বিকিরণ থেকে কতটুকু মুক্ত, চারপাশের পরিবেশ কতটুকু দূষণমুক্ত। তেজস্ক্রিয়তার দূষণমাত্রা যদি খুব বেশি ধরা পড়ে, তবে আপনার প্রথম করণীয় হবে তেজস্ক্রিতার উৎস থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেয়া। এরপর গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে কোনো পাকা ভবনে আশ্রয় নেয়া, যাতে শরীর ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে রক্ষা পায়। এ সময় ভবনের দরজা-জানালা বন্ধ রাখতে হবে। এমনকি ভেন্টিলেটরও বন্ধ করে দিতে হবে। চামড়ার ওপরের অংশকে তেজস্ক্রিয়তা থেকে বাঁচানোর জন্য পানি দিয়ে বারবার ধুয়ে দিতে হবে। চুল ও নখকে তেজস্ক্রিয়তার হাত থেকে বাঁচাতে বিশেষ ধরনের তরল ব্যবহার করতে হয়। গর্ভবতী মায়েদের এক্স-রে ও সিটি স্ক্যান করা থেকে বিরত রাখতে হবে। মোটকথা, আপনি যেখানেই থাকুন তেজস্ক্রিয় পদার্থ ও এর বিকিরণ আপনার পিছু নেবেই। অতএব, আপনাকে এ থেকে বেঁচে থাকার জন্য সতর্ক হতেই হবে। জানতে হবে তেজস্ক্রিয়তা থেকে বেঁচে থাকার উপায়গুলো।
সৌরশক্তি হতে পারে আমাদের আশীর্বাদ
দেশে বর্তমানে দৈনিক প্রায় ৬০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদা রয়েছে, যার বিপরীতে মাত্র ৩৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে আমাদের ঘাটতি রয়েছে প্রায় ২২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এ পরিস্থিতিতে দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি মেটাতে বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে সবাই ভাবছে।
সৌরশক্তি সংরক্ষণে বিশ্ব প্রেক্ষাপট
আধুনিক সভ্যতার মূল ভিত্তি শক্তি। এর সরবরাহ যার যত বেশি, সে প্রতিযোগিতার বাজারে তত বেশি দিন টিকে থাকবে। ২০০৯ সালে ফটোভল্টেক পাওয়ার স্টেশন থেকে প্রথম ২১ গিগাওয়াট শক্তি উৎপাদন করা সম্ভব হয়। এরপর থেকে নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস সন্ধান ও উৎপাদনে উন্নত দেশগুলো অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কাজ করে চলেছে। এ ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশ ভারত উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ভারতে বর্তমানে মোট প্রয়োজনের প্রায় ১১ শতাংশ শক্তির সরবরাহ হয় নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস থেকে। যার এক শতাংশ আসে সৌরশক্তি থেকে। ২০০৯ সালে মাত্র ১৮ মেগাওয়াট শক্তি উৎপাদন করে ভারত। আর এ বছরে এর পরিমাণ দাঁড়াবে আনুমানিক ১৫০ থেকে ২০০ মেগাওয়াটের ওপরে। তবে ভারতের পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিমাণটা খুবই কম মনে হতে পারে। আশার বিষয় হলো, ২০১৩ সালে এ উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়াবে ১০০০ মেগাওয়াট। আর বর্তমান শক্তিনীতি অনুযায়ী ২০২০ সালে ভারত ২০ গিগাওয়াট সৌরশক্তি উৎপাদন করবে, যা কিনা ২০০৯ সালের বিশ্বের মোট উৎপাদনকে ছাড়িয়ে যাবে। সৌরশক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভারতের পাশাপাশি চীনও ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে ইউরোপের দেশগুলোতেও সৌরশক্তিচালিত পাওয়ার স্টেশন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আর এ আয়োজন বেশি চোখে পড়ছে জার্মানি ও স্পেনে। উন্নত দেশগুলো নবায়নযোগ্য শক্তির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করলেও এখন পর্যন্ত সৌরশক্তি সঞ্চয় প্রকল্পে প্রাথমিক বিনিয়োগ যথেষ্ট ব্যয়বহুল।
সৌরশক্তি সংরক্ষণে দেশের প্রেক্ষাপট
সৌরশক্তির জন্য প্রয়োজনীয় সৌরালোকসহ নবায়নযোগ্য অন্যান্য শক্তির মজুদ করতে পারলে আমাদের দেশও নিজের প্রয়োজন মিটিয়ে বিদেশে বিদ্যুৎ রফতানি করতে সক্ষম হবে। তবে এ জন্য সবার সম্মিলিত সদিচ্ছা ও প্রচেষ্টা থাকতে হবে। নবায়নযোগ্য শক্তি উৎসের কোনো অভাব আমাদের নেই। শুধু প্রয়োজন এই উৎসকে ব্যবহার করার জন্য সঠিক বিনিয়োগ। এ বছরের জানুয়ারিতে সৈয়দপুর ও সান্তাহারে ১০০ মেগাওয়াট ও ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসমপন্ন দুটো বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পপনা চলছে। এটি হয়তো অনেকের কাছেই আশাব্যঞ্জক একটি পদক্ষেপ মনে হবে। কিন্তু দুর্লভ এই পণ্য তৈরিতে আপাতত সমস্যার আংশিক সুরাহার চেয়ে প্রয়োজন দীর্ঘস্থায়ী সমাধান। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র চলবে মূলত ফার্নেস অয়েলে, যা একদিকে ব্যয়বহুল, অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব নয়। এ ধরনের বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় পড়ে। এখন থেকেই স্বল্পমেয়াদি শক্তিনীতির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি শক্তিনীতির দিকে নজর না দিলে আমরা বহির্বিশ্ব থেকে পিছিয়ে পড়ব কয়েক গুণ। আর এ কারণেই দীর্ঘমেয়াদি শক্তিনীতির আওতায় সৌরশক্তিকে প্রাধান্য দেয়া উচিত। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের উচ্চ সৌর ‘ইনসোলেশন’ এবং ব্যাপকসংখ্যক গ্রাহক থাকায়, প্রাথমিক পর্যায়ে এ প্রকল্পে বিনিয়োগ বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় এটি হতে পারে বাস্তবসম্মত সমাধান। বিশেষ করে এই শক্তির কাঁচামাল ঝুঁকিহীন ও সহজলভ্য এবং পরিবেশবান্ধব।
সৌরশক্তি রক্ষণাবেক্ষণ
সূর্যের আলোকে সরাসরি সৌরশক্তিতে পরিণত করা হয় সৌরসেলের মাধ্যমে। সৌরসেলকে ফটোভল্টেক সেলও বলা যায়। একাধিক সৌরসেলকে একত্র করে তৈরি করা হয় সৌর মডিউল বা প্যানেল। সৌর প্যানেলে যে সৌরশক্তি উৎপাদন হয়, তা হলো সৌরক্ষমতা। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করতে ‘ফটোভল্টেক’ ব্যবহার করা হয়। ফটোভল্টেক হলো, সরাসরি সূর্য থেকে আলোকশক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করার প্রক্রিয়া ও গবেষণা। সূর্যের আলো থেকে উৎপাদিত শক্তিকে বিদ্যুৎ হিসেবে ব্যবহার করার জন্য ব্যবহার করা হয় ‘ইনভার্টার’। এর মাধ্যমে শক্তিকে বৈদ্যুতিক গ্রিডের সাথে সংযুক্ত করা হয়। জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রয়োজন না থাকলে ব্যাটারির মাধ্যমে শক্তি সঞ্চয় করে রাখা হয়।
সৌরশক্তির বহুবিধ ব্যবহার
সৌরশক্তি সম্পূর্ণ বিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে সক্ষম। সৌরশক্তি বাংলাদেশের গ্রামীণ অবস্থা ও জীবনযাত্রাকে একেবারেই বদলে দিতে পারে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুতায়ন ছাড়াও সৌরশক্তির সাহায্যে জলসেচসহ বিদ্যুৎচালিত যাবতীয় কর্মকাণ্ডে সৌরশক্তি ব্যবহার করে যেকোনো ধরনের বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে সৌরশক্তির ব্যবহারে জনগণকে আকৃষ্ট করার কাজ করছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে সৌরশক্তি হতে পারে বিদ্যুতের উৎকৃষ্ট সমাধান। গ্রামাঞ্চলে যেখানে এখনো বিদ্যুৎ পৌঁছেনি, সেখানে কেরোসিনের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। বর্তমানে গ্রামে ১০ থেকে ২০ ওয়াটের ছোট ছোট এসএইচএস বাল্ব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সৌরশক্তির কল্যাণে। প্রতিবছর সেচপাম্পগুলো প্রায় ৭৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি ঘটায়। তাই বিদ্যুৎ সমস্যা নিরসনে বর্তমানে সেচকাজেও সৌরশক্তি ব্যবহার হচ্ছে। শহরাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের সন্তোষজনক বা বিকল্প সমাধান দিতে পারে সৌরশক্তি। বিশেষ করে রাজধানীর বিশাল জনগোষ্ঠীর বিদ্যুৎ সমস্যা অনেকাংশে কমানো সম্ভব সৌরশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে। রাজধানীজুড়ে রয়েছে অসংখ্য বড় বড় দালানকোঠা। আর এ দালানকোঠার ছাদ হতে পারে সৌরশক্তি সংগ্রহের বিশাল ভাণ্ডার। বিশেষ করে অনেক আবাসিক ফ্ল্যাটে জেনারেটরের ব্যবস্থা করা হয় বিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ও ব্যয়বহুল। কিন্তু একটু সচেতন হলেই ফ্ল্যাটের ছাদে সৌরপ্যানেল ব্যবহার করে নিজস্ব বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো সম্ভব। প্রথম পর্যায়ে একটু ব্যয়বহুল হলেও এটি পরিবেশবান্ধব ও শক্তির নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। শহরের হাইরাইজ ভবনগুলোর ছাদ হতে পারে উৎকৃষ্ট পাওয়ার হাউস। বিশেষ করে বড় বড় শপিং সেন্টারে বিদ্যুৎ ঘাটতি রোধে সৌরশক্তি ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। সর্বোপরি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত হুমকি থেকে রক্ষা পেতে নিজেদের তাগিদেই আমাদের সৌরশক্তি ব্যবহারে সচেষ্ট হওয়া উচিত।
সৌরশক্তি ব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় শক্তিনীতি তৈরি হয় ১৯৯৬ সালে। এরপর থেকে এ নীতি বাস্তবায়নে তেমন কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। নীতির বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগসহ অন্যান্য গবেষণাকেন্দ্রের ভূমিকা ও উপস্থিতি ততটা জোরদার না থাকায় সৌরশক্তি ব্যবস্থাপনা পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশে। সৌরশক্তি উৎপাদনে বিশ্ব প্রচুর পরিমাণে এগিয়ে গেছে এবং এই অগ্রগতি অব্যাহত রয়েছে; বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশ এখনো সৌরশক্তি সংগ্রহের দৌড়ে সফল অংশীদার হতে পারেনি। কারণ এই শক্তি সংরক্ষণের কাঁচামাল এখনো সহজলভ্য হয়নি ।
দেশের তৈরি রোবট অংশ নেবে নাসার প্রতিযোগিতায়
মামুন আল করিম
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১ সদস্যের রোবোটিক দল তৈরি করেছে চাঁদে মাটি সংগ্রহ করতে সক্ষম রোবট। যদিও রোবট নির্মাণের তালিকায় আগেই নাম লিখিয়েছে বাংলাদেশ। তবে ‘চন্দ্রবোট’ নামক নতুন প্রযুক্তির রোবট তৈরি করেছে দেশের মেধাবীরা। কন্টেইনার আদলে তৈরি ‘চন্দ্রবোট’ সহজে মাটি, বালু বা পাথরজাতীয় নমুনা সংগ্রহের কাজ করতে সক্ষম। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার ল্যাবে দীর্ঘ সাত মাসের পরিশ্রমে বিজ্ঞানীরা তৈরি করেছেন রোবটটি। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন শিক্ষক এবং আট শিক্ষার্থী রয়েছেন। গত মে মাসে বিশ্বের শীর্ষ বহির্বিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠান নাসা আয়োজিত নাসার (ন্যাশনাল অ্যারোনোটিক অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) সেকেন্ড অ্যানুয়াল লুনাবোটিকস মিনিং কম্পিটিশনে অংশ নেয় চন্দ্রবোট। এটিই হচ্ছে বাংলাদেশের ইতিহাসে নাসার বৃহৎ বৈজ্ঞানিক প্রতিযোগিতায় প্রথম অংশগ্রহণ এবং রোবট তৈরির মতো বড় কোনো ঘটনা। এই প্রতিযোগিতায় সেরা হলেই ব্যতিক্রমী এই রোবট পাঠানো হবে পৃথিবীর বাইরে। সেটা হতে পারে চাঁদ কিংবা মঙ্গল গ্রহে। দলের প্রধান প্রফেসর ড. মো. খলিলুর রহমান বলেন, আমরা সফলভাবেই চন্দ্রবোট তৈরি সমপন্ন করতে পেরেছি। আমাদের প্রত্যাশা, নাসা আমাদের ‘চন্দ্রবোট’কে পাঠাবে বহির্বিশ্বে। বিজ্ঞানীরা জানান, এটি তৈরি হয়েছে পুরোপুরি নিজস্ব টেকনোলজিতে। পরিবেশবান্ধব করা হয়েছে একে। এর কাঠামোর বিভিন্ন অংশ নেয়া হয়েছে পরিত্যক্ত বা ব্যবহূত যন্ত্রপাতি থেকে। এর মধ্যে রয়েছে মোটরসাইকেল ও বাস। চন্দ্রবোট তৈরিতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৯০ হাজার টাকা। এর মধ্যে উপাদানের মূল্য পড়েছে ৩৫ হাজার টাকার মতো। যন্ত্রাংশগুলোর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছে বাসের পাদানির অ্যাঙ্গেল, মোটরসাইকেলের চেইন, সকেট ও রিং। ব্যাটারিই হচ্ছে এর একমাত্র জ্বালানি। তবে ব্যাটারিতে কোনো লিকুইড থাকছে না।
২০১০ সালের অক্টোবর মাসে নাসা দ্বিতীয় লুনাবোটিকস কমিপটিশন আহ্বান করে। অংশগ্রহণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আবেদন করা হয়। এ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে নাসার রোবট তৈরির একটি নির্দেশনা ছিল। আবেদনের জবাব পাওয়ার আগেই সে অনুযায়ী অক্টোবরের ২০ তারিখ চন্দ্রবোট নির্মাতা দলের সদস্যরা একটি প্রাথমিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। নাসার কোনো সাড়া না পেলেও তারা রোবটটি কেমন হবে, ডিজাইন কী রকম করা যায় এ বিষয়ে পরিকল্পনা নেন। এ পর্যায়ে চন্দ্রবোট তৈরি যখন সম্ভব মনে হয়, তার কিছুদিন পর নাসা থেকে জানানো হয়, প্রতিযোগিতা হচ্ছে না। কিন্তু তার পরও বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা তাদের কাজ থামাননি। পরিকল্পনামতোই কাজ এগোতে থাকে। এর মধ্যে কমিপউটার বিভাগের ছাত্র শিবলী ইমতিয়াজ হাসান রোবটের একটি থ্রিডি ক্যাড-এ অ্যানিমেশন তৈরি করে। এটিকে ইন্টারনেটের ইউটিউবে আপলোড করা হয়। পাশাপাশি পাঠানো হয় নাসার কাছেও। সেখানে এটি কীভাবে কাজ করবে, কেমন হবে তার একটি স্পষ্ট বর্ণনাও দেয়া হয়। এতেই আগ্রহী হয়ে ওঠে নাসা। সাথে সাথে এটিকে মনোনয়নের কথা জানিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে অনুরোধ জানায় নাসা।
এই দলের অন্য সদস্য হলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. বেলাল ভূঁইয়া ও ড. মোসাদ্দেকুর রহমান। শিক্ষার্থীরা হচ্ছেন শিবলী ইমতিয়াজ হাসান, মো. জোনায়েদ হোসেন, মাহমুদুল হাসান অয়ন, আসিফুর রহমান, কাজী মুহাম্মদ রাজিন, ইফতিখার করীম রাহাত, ইমরান বিন জাফর ও নির্ঝর তাহমিদুর রউফ। তারা জানান, এই রোবটটি দুটি জোনে কাজ করবে। প্রতিযোগিতায়ও এ রকম জোন রাখা হবে। জোনগুলো হচ্ছে অবস্ট্রাকল ও মাইনিং। অবস্ট্রাকল জোনকে ধরে নেয়া হবে যেখানে রকেট অবতরণ করেছে সে জায়গা হিসেবে। যেহেতু রকেট অবতরণের পর সেখানকার মাটি পুড়ে যায় বা আসল অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন ঘটে। তাই গ্রহ থেকে নমুনা সংগ্রহে রোবটকে যেতে হবে একটু দূরে মাইনিং জোনে। সেখান থেকে নমুনা এনে আবার রকেটে ফেলতে হবে। এটি সম্পূর্ণ রিমোট কন্ট্রোলে নিয়ন্ত্রিত হবে। রোবটটি নাসার প্রতিযোগিতায় সাড়ে তিন বাই সাত মিটার দূরত্বের জায়গায় সর্বোচ্চ নমুনা সংগ্রহ করতে পারলেই গ্রহে যাওয়ার টিকিট পাবে চন্দ্রবোট।
নাসা অসমান চন্দ্রপৃষ্ঠ থেকে ধুলোমাটি (লুনার ডাস্ট) সংগ্রহ করতে সক্ষম রোবট সংগ্রহ করতে এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে। লুনার ডাস্ট সংগ্রহ করার এ প্রতিযোগিতার প্রথম পুরস্কার ১০ হাজার মার্কিন ডলার। টানা ১৫ মিনিটে যে রোবট সবচেয়ে বেশি ডাস্ট সংগ্রহ করবে সেটিই হবে প্রথম।
এ বছর বিশ্বের ৪৩টি বিশ্ববিদ্যালয় এ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে একমাত্র দল হিসেবে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের দলটিই অংশ নেবে।



