ইতিহাস
রক্ত বা রক্তের কোনো উপাদান আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেলে রক্ত পরিবহনতন্ত্র যে পদ্ধতিতে অন্যের রক্ত বা রক্তের কোনো উপাদান প্রবেশ করানো হয় তাকে রক্ত পরিসঞ্চালন বা ব্লাড ট্রান্সফিউশন বলে।
রক্ত পরিসঞ্চালনের মাধ্যমে দেয়া হয়-
- সব উপাদানসম্পন্ন রক্ত বা হোল ব্লাড
- শ্বেতকণিকা বা ডাব্লিউবিসি
- প্লেটলেট বা অণুচক্রিকা
- রক্তের তরল অংশ বা ফ্রেশ প্লাজমা
- রক্ত জমাটবদ্ধ করা উপাদানগুলো বা ক্লটিং ফ্যাক্টর
১৯০১ সালে অস্ট্রিয়ান কার্ল ল্যান্ডস্টেইনার রক্তের বিভিন্ন গ্রুপ আবিষ্কার করার পর রক্তদান শুরু হয়। তবে প্রায়শই বিভিন্ন জীবনহানিকর দুর্ঘটনার কারণে এটি নিরাপদ ছিল না। তখন পর্যন্ত জানা যায়নি যে ভিন্ন গ্রুপের রক্ত শরীরে নিলে মৃত্যু হতে পারে। ল্যান্ড স্টইনার প্রথম আবিষ্কার করেন যে দাতা ও গ্রহীতার রক্ত একই গ্রুপের না হলে গ্রহীতার মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। ১৯৩০ সালে এই আবিষ্কারের জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার পান। এর পরই শুরু হয় নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ওসহেলান্ড হোপ রবার্টসন নামের আমেরিকান আর্মি অফিসার সর্বপ্রথম ব্লাড ব্যাংকের প্রচলন করেন। এরপর থেকে ব্যাপকভাবে শুরু হয় রক্ত পরিসঞ্চালন প্রক্রিয়া।
রক্তদান আসলে কী
কেউ যখন স্বেচ্ছায় নিজ রক্ত অন্য কারও স্বার্থে দান করেন তাকে রক্তদান বলা হয়। এ কারণে রক্তদাতার অবশ্যই সম্মতির প্রয়োজন আছে এবং এর মাধ্যমে পূর্ণবয়স্ক নয় (১৮ বছরের নিচে) এমন কারও রক্ত নেয়া নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। বর্তমানে ১৭ বছর হলেই রক্ত দেয়ার উপযুক্ত ধরা হয়। রক্ত দেয়ার আগে রক্তের স্ক্রিনিং টেস্ট বা দাতার রক্ত নিরাপদ কি না তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। এ ছাড়া দাতা রক্তদানের জন্য উপযোগী কি না তা দেখার জন্য কিছু পরীক্ষাও করা হয়। যেমন-এমিনিয়া বা রক্তাল্পতা, জন্ডিস, নাড়ির গতি বা পালস, রক্তচাপ, শরীরের তাপমাত্রা, ওজন। এগুলো সবার ক্ষেত্রেই দেখা হয়। এর বাইরে স্ক্রিনিং ছাড়া প্রয়োজনে নিচের টেস্টগুলোও করা হয়। হিমোগ্লোবিন, ব্লাড সুগার বা রক্তে চিনির মাত্রা, সেরাম ক্রিয়েটিনিন, ইসিজি, প্রেগন্যান্সি টেস্ট।
কতদিন পর রক্ত দেয়া যায়?
একজন পূর্ণবয়স্ক মুক্ত মানুষ কত দিন পর পর রক্ত দিতে পারবেন, এটা তার শারীরিক অবস্থার পাশাপাশি দেশের আইনের ওপরও নির্ভর করে। যেমন-আমেরিকায় অন্তত ৮ সপ্তাহ (৫৬ দিন) পর রক্তদান করা যায়। আবার বাংলাদেশে প্রতি তিন মাস পরপর রক্তদান করাকে নিরাপদ ধরা হয়ে থাকে।
কতটা রক্ত দেয়া যায়?
শরীরে সাধারণত ৫-৬ লিটার রক্ত থাকে। রক্ত দানের সময় সাধারণত ৪০০ থেকে ৪৫০ মিলিলিটার রক্ত দান করা হয়। অর্থাৎ শরীরে থাকা রক্তের মাত্রা ১০ ভাগের ১ ভাগ। এ কারণেই অধিকাংশ রক্তদাতা রক্তদানের পর তেমন কিছুই অনুভব করেন না। যে পরিমাণ রক্তের তরল অংশ নেয়া হয় সেই তরল অংশ মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আবার আগের মতো হয়ে যায়।
বছরে তিনটি জীবন বাঁচান
ডা. মুনশী এম হাবিবুল্লাহ
রক্ত না পেলে রোগীকে বাঁচানো যাবে না-এমন কথা শোনার সাথে সাথে বুকের পাঁজর ভেঙে ভেতরে ঢুকতে চায়। কান্না যেন বাঁধ মানে না। কোথায় পাওয়া যাবে রক্ত, ব্যস্ত হয়ে পড়ে সবাই। দ্বারে দ্বারে ছুটেও যখন রক্ত মেলে না নীরবে চোখের পানি ফেলা ছাড়া কিছুই করার থাকে না। এক ব্যাগ রক্তের জন্য প্রিয়জনকে হারাতে হয়েছে এমন মানুষের সংখ্যা কম নয়। অসহায় এ মানুষগুলোর কথা বিবেচনা করে রক্তদানে উৎসাহিত করার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতি বছর ১৪ জুন ‘বিশ্ব রক্তদাতা দিবস’ পালন করে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় এ বছরও তা পালন করা হলো। এ বছর প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘আরও রক্ত, আরও জীবন’।
সড়ক দুর্ঘটনা, অপারেশন, গর্ভবতী মায়েদের প্রসবকালীন জটিলতায় রক্তক্ষরণ, থ্যালাসেমিয়া, লিউকেমিয়া, হেমোফিলিয়াসহ বিভিন্ন রক্তরোগের চিকিৎসায় আমাদের দেশে বছরে প্রায় পাঁচ লাখ ব্যাগ রক্ত দরকার হয়। কিন্তু প্রতি বছর রক্তের ঘাটতি থাকে। রক্তের অভাবে ঝরে পড়ে অনেক তাজা প্রাণ। আজ থেকে আট-নয় বছর আগেও আমাদের দেশের মোট রক্ত চাহিদার ৭০ শতাংশই পূরণ হতো পেশাদার রক্তদাতার মাধ্যমে। পেশাদার রক্তদাতারা টাকার বিনিময়ে রক্ত বিক্রি করে। এরা ইনজেকশনের মাধ্যমে নেশা করে। অবাধ ও অনিরাপদ যৌনমিলনে অভ্যস্ত। এ কারণে এদের রক্তের মাধ্যমে রক্তগ্রহীতা হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’, এইডস, সিফিলিস এবং ম্যালেরিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হন।
দেশে রক্তদানের ব্যাপারে ব্যাপক প্রচারণায় আজ ৯০ শতাংশ রক্তই আসে স্বেচ্ছা রক্তদাতার মাধ্যমে। স্বেচ্ছা রক্তদান ও পরিসঞ্চালনের আগে বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষায় রক্ত পরিসঞ্চালন এখন নিরাপদ ও বিপদমুক্ত।
রক্তদান করলে শারীরিক কোনো ক্ষতি হয় না। ধর্মীয় দৃষ্টিতে কোনো বাধা নেই। শুধু ভীতিই রক্তদানের মতো মহৎ কাজ থেকে বিরত রাখে। সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক (১৮ থেকে ৬০ বছর) ও ৪৫ কেজি বা তার বেশি ওজনের যে কেউ প্রতি চার মাস অন্তর রক্ত দিতে পারেন। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত রক্তদানের ফলে দেহ ক্ষতিকর ফ্রি-রেডিক্যালমুক্ত হয়। ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমে যায়। ফলে হূদরোগ, স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে যায়। বার্ধক্য প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। পরিসঞ্চালনের আগে রক্তদাতার শরীরে পাঁচটি মারাত্মক রোগ (হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’, এইডস, সিফিলিস ও ম্যালেরিয়া) আছে কি না তা পরীক্ষা করা হয়। এ পরীক্ষার খরচ কিন্তু অনেক। রক্তদান করলে বিনা খরচে আপনি এ রোগগুলোতে আক্রান্ত কি না তা জানতে পারবেন। চিকিৎসকের কাছে খরচ করে চেকআপ করতে যাওয়ার দরকার নেই। চার মাস পর পর রক্তদান চেকআপের কাজ করবে।
যাদের রক্ত ঝুঁকিপূর্ণ
পেশাদার রক্তবিক্রেতা, বাণিজ্যিক যৌনকর্মী, শিরায় মাদকাসক্ত ব্যক্তি, ট্রাকচালক, নাবিক, প্রবাসী, অবাধ যৌনাচারী বা বহুগামী, এইডস অধ্যুষিত দেশ ভ্রমণকারী বা বসবাসকারী।
যারা রক্ত দিতে পারবেন না
ছয় মাসের মধ্যে টাট্টু, আকুপাংচার, চর্মরোগ ও রক্ত দেয়া হয়েছে, তিন বছরের মধ্যে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন, সমপ্রতি টিকা দিয়েছেন, দুই সপ্তাহের মধ্যে দাঁত উঠানো বা মুখে সার্জারি হয়েছে, ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তি রক্তদান করতে পারবেন না। এ ছাড়া থ্যালাসেমিয়া, লিউকেমিয়া, অ্যাপ্লাস্টিক এনিমিয়া, হেমোফিলিয়া, হূদরোগ, স্নায়বিক রোগ, থাইরোটকসিকোসিস, এমফাইসেমা, টাইপ-১ ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তিরা কখনোই রক্তদান করবেন না।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগ স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ
ও মিটফোর্ড হাসপাতাল, ঢাকা
রক্তদানে ক্ষতি নেই
ফখরুল ইসলাম চৌধুরী পরাগ
দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী বিভিন্ন ধরনের ভ্রান্ত ধারণা থেকে রক্তদানে আগ্রহী নয়। অথচ একটু সচেতন হলে রক্তের অভাবে কোনো লোক মারা যাবে না। রক্ত দিতে খুব একটা সাহসের প্রয়োজন হয় না, আবার রক্ত দান করা নায়কি কাজও নয়, তবে একটি মহৎ কাজ। আমাদের এক ব্যাগ রক্ত হাসি ফোটাতে পারে একজন মায়ের, একজন বাবার, একজন স্ত্রীর, একজন সন্তানের। হয়তো আমাদের রক্তে বেঁচে যেতে পারে একটি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি। তাই আসুন একটু সচেতন হই, স্বেচ্ছায় রক্ত দান করি, ধরে রাখি হাসি-আনন্দ।
রক্তদানে করণীয় বা রক্তদাতার যোগ্যতা
রক্ত দান করতে হলে কিছু যোগ্যতার প্রয়োজন হয়। রক্ত দান করতে হলে রক্তদাতার বয়স অবশ্যই ১৮ বছর ও ওজন কমপক্ষে ৪৮ কেজি এবং তাকে সুস' হতে হবে। রক্তদাতার যদি কয়েক মাসের মধ্যে কোনো বড় ধরনের অপারেশন না হয়; জন্ডিস, ম্যালেরিয়া জাতীয় কোনো অসুখ না হয় এবং রক্তসংক্রান্ত কোনো অসুখ না থাকে তাহলেই তিনি রক্ত দান করতে পারবেন। রক্তদানের সময় রক্তদাতার প্রেসার অবশ্যই স্বাভাবিক থাকতে হবে। এসব ঠিক থাকলেই কেবল একজন ব্যক্তি রক্তদান করতে পারবে।
রক্তদাতার লাভ
রক্তদান কেন্দ্রের মাধ্যমে রক্ত দিলে পাঁচটি পরীক্ষা সম্পূর্ণ বিনা খরচে করে দেয়া হয় যা বাইরে করলে খরচ লাগবে প্রায় তিন হাজার টাকার মতো। সেগুলো হলো-এইচআইভি/এইডস, হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সি, ম্যালেরিয়া ও সিফিলিস। তাছাড়া রক্তের গ্রুপও নির্ণয় করা হয়।
ধর্মে রক্তদানে বাধা নেই
রক্তদানের ব্যাপারে ধর্মে কোনো বাধা নেই। তবে রক্ত বিক্রয় বৈধ নয়। ডাক্তারি গবেষণামতে সুস্থ-সবল মানুষ প্রতি তিন মাস পরপর রক্ত দান করতে পারে, এতে শারীরিক কোনো সমস্যা হয় না। রক্তদান একটি মহৎ কাজ। কারণ রক্ত কোনো ফ্যাক্টরিতে উৎপাদন হয় না, একজন মানুষই কেবল আরেকজনকে দিতে পারে। বাংলাদেশে বর্তমানে রক্তের চাহিদা রয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ ব্যাগ। রক্তের চাহিদা পূরণের জন্য নিজে নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্তদান করা এবং রক্তদান কর্মসূচি গ্রহণ একটি কার্যকর উদ্যোগ হতে পারে।
তথ্য : বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি
যুব রেড ক্রিসেন্ট, চট্টগ্রাম



