Skip to main content

জেনে নিন আপনার মানসিক চাপ

বাংলাদেশের বিশিষ্ট মনোশিক্ষাবিদ, মনোবিজ্ঞানী ও মনোচিকিৎসক
অধ্যাপক ডা. এ এইচ মোহাম্মদ ফিরোজ

মানসিক রোগ শিক্ষা, গবেষণা, চিকিৎসা ও জনসচেতনতায় পথিকৃৎ

স্ট্রেসের মাত্রা অনেক বেশি হলে তা আপনাকে ক্ষণিকের জন্য নির্বোধ বা মূঢ় করে দিতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, মস্তিষ্ক চরম স্ট্রেসযুক্ত অবস্থায় মোটেও ভালোভাবে কাজ করতে পারে না। আপনি যা করছেন এবং আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে যা কিছু করার আছে সব কিছু মিলিয়ে নিজেকে নিজের কাছে বিধ্বস্ত মনে হতে পারে, যে কাজগুলো আপনি করতে পারেন না সেগুলো আপনার জন্য খুব হতাশাব্যঞ্জক বা নৈরাশ্যকর হতে পারে। এমন হতেই পারে যে, আপনি দেখছেন সমাজে টিকে থাকার জন্য আপনার পিতা-মাতা লড়াই করছেন তবু আপনার সামাজিক জীবন বিশৃঙ্খলাপূর্ণ। কোনো স্ট্রেসের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ যেটা করা হয়, সেটা হচ্ছে নিজের সব কাজের সমালোচনা নিজে করা। আপনি হয়তো জীবনে নানা সমস্যা নিয়ে এতটাই হতাশ হয়ে পড়েছেন যে, আনন্দদায়ক কোনো কিছুই এখন আর আপনার কাছে আনন্দদায়ক মনে হয় না বরং জীবনটাকে একটা বোঝা মনে হয়। আপনি যদি এসব অবস্থায় পড়েন তবে মনে হতে পারে আপনি বুঝি এসব কাটিয়ে উঠতে পারেন না। আসলে তা সত্য নয়, কারণ একটু চেষ্টা করলেই আপনি স্ট্রেসজনিত নানা সমস্যা হতে নিজেকে সামলে নিতে পারবেন।

বিভিন্ন চাপ বা সমস্যার মুখোমুখি হয়ে আপনি যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন সেটি যদি স্বাভাবিক সীমা অতিক্রম করে, তবে তাকে স্ট্রেস বলা যাবে। এই মানসিক চাপ বা শারীরিক চাপের অবস্থান বা মূল উৎস হতে পারে-

  • স্কুল-কলেজ
  • স্কুল-পরবর্তী কাজ
  • বিভিন্ন কাজ
  • পরিবার-পরিজন
  • বন্ধুবান্ধব অথবা
  • আপনি খুব ভালো করতে চাচ্ছেন
  • প্রথম হতে চাচ্ছেন
  • আর দশ জনের সাথে নিজেকে তুলনা করতে চাইছেন
  • সমাজে বড় কিছু হতে চাইছেন
  • বড় কিছু করতে চাইছেন ইত্যাদি

সব সময় সব যুগেই প্রতিটি ব্যক্তিকে স্ট্রেসের মুখোমুখি হতে হয়-এটা একটা সাধারণ প্রতিক্রিয়া। কাজেই এটা আপনার-

  • আবেগজনিত কারণ
  • শারীরিক কারণ বা
  • বিপদকালীন সময়ে হতে পারে

স্ট্রেস এমন বেশি হতে পারে যে, এর সাথে খাপ খাওয়ানো বা তাল মেলানো খুব কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এতে মনে মনে এত ভয়ানক অনুভূতি চলে আসতে পারে যে, হয়তো নিজে নিজেকে আঘাতগ্রস্ত করে তুলতে পারেন। এ ধরনের স্ট্রেসে পড়লে প্রথমে যেটা করতে হবে সেটা হচ্ছে বিশ্বস্ত কাউকে মনের গহীনের সব কথা একেবারে সাদামাটাভাবে খুলে বলতে হবে। এতে আপনি নিজেই অনুভব করবেন যে, আপনার কষ্টের বা স্ট্রেসের তীব্রতা অনেক কমে গেছে।

স্ট্রেসের উপসর্গ

  • নিজেকে হতাশ ভাবা
  • অপরাধী ভাবা
  • ক্লান্ত মনে হওয়া
  • কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ হাসা
  • কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ কেঁদে ফেলা
  • নিজের জন্য খারাপ কিছু হলে অন্যকে অপরাধী ভাবা বা তার ওপর দোষ চাপানো
  • সর্বাবস্থায় না বোধ বা বিপরীতধর্মী জিনিস নিয়ে চিন্তা করা
  • মাথাব্যথা
  • পেটব্যথা
  • মাথা ঝিমঝিম করা
  • ব্যাকুলতা বা অস্থিরতা লাগা
  • মনে কেমন যেন ভয় জাগা
  • নিজের দায়িত্বে ক্ষুব্ধ হওয়া
  • অন্যকে অপমান করা
  • আগে যে মুহূর্তগুলোকে উপভোগ করতে পারতেন সেগুলোকে বোঝা মনে করা ইত্যাদি।

যে ফ্যাক্টরগুলোতে আপনি স্ট্রেস অনুভব করেন হয়তো তার সব কটিকে আপনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। যেটা প্রথমে করা দরকার সেটা হচ্ছে বিভিন্ন স্ট্রেসে কীভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবেন। আপনি আসলে যেভাবে চিন্তা করবেন সে রকমটি অনুভব করবেন। আপনি যদি আপনার   চিন্তাধারাকে পাল্টাতে পারেন তবে আপনার অনুভূতিও অন্য রকম হয়ে যাবে।

স্ট্রেসকে কখনো পাশ কাটিয়ে বা এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। স্ট্রেস কাটানোর জন্য ভুলেও ড্রাগস গ্রহণ করবেন না। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে ড্রাগ বা অ্যালকোহল সেবন খুব সহজ পন্থা। প্রকৃত অর্থে এগুলো ভয়াবহ বিপজ্জনক। স্ট্রেস কাটাতে ড্রাগ বা অ্যালকোহল সেবন আসক্তির পর্যায়ে চলে যেতে পারে। যা কিনা জীবনে নতুন আরেক স্ট্রেসের আগমন ঘটাতে পারে বা আপনার পারিবারিক বা সামাজিক বিভিন্ন সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন সমস্যা বয়ে আনবে।

প্রিয়জন বা বন্ধু-বান্ধব বা পরিবারের সদস্যদের সাথে আপনার আবেগ, অনুভূতি বা চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে আপনার স্ট্রেস কমানোর চেষ্টা করুন। সাথে সাথে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করুন। তাকে আপনার লুকানো কথা খুলে বলুন।

স্ট্রেসের কারণ
ইদানীং সময়ে মানসিক চাপের ব্যাপারে ধারণা করা হয় যে, এটি দীর্ঘায়িত হতে থাকলে তা বেশ বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ৫০ বছরের পর থেকে সাধারণ মানসিক চাপ অনেকের ক্রনিক পর্যায়ে চলে যায়। সন্তান সন্ততির শিক্ষাব্যবস্থা এবং তাদের পরিপূর্ণ মানুষ করে তোলার বিষয়, তাদের বিয়ের বিষয়, নিজের অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের ব্যাপারে বিচিত্র চিন্তা-ভাবনা বহু ক্ষেত্রে তাদের মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মনোবিজ্ঞানী হ্যানস সিলে এই ব্যাপারটিকে আপেক্ষিক স্পর্শকাতর হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে ৫০ বছরের পর থেকে এমন মানসিক চাপ বহু মাত্রায় বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক। পাশ্চাত্য মনোবিজ্ঞানীরা জীবনযাত্রার গতি পরিবর্তন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও পরিবর্ধনের দ্বারা মানসিক চাপ সমস্যার সমাধানের কিছু উপায় সম্বন্ধে ধারণা দেন। অনেক ক্ষেত্রে অনেক মনোদৈহিক কারণ মানসিক চাপের কারণ হতে পারে। আবার শারীরিক সমস্যার ঝুঁকি বহু ক্ষেত্রে মানসিক চাপের কারণ যেমন-

  • উচ্চরক্তচাপ
  • স্ট্রোক
  • তীব্র মাথাব্যথা
  • বাতের ব্যথা

কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাধারণ বহু কারণও একজনের মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। মনোবিজ্ঞানীরা মানসিক চাপের জন্য মনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে কয়েকটি উপায়ে ভাগ করেছেন। তাদের মতে, ৫টি দ্বন্দ্ব মানুষের মানসিক চাপ স্থায়ী হওয়ার জন্য যথেষ্ট। অনেক সময় স্কুলের ছেলেমেয়েদের মধ্যে এক ধরনের মানসিক চাপ পরিলক্ষিত হয়। এটিকে অস্থায়ী দ্বন্দ্বভীতি সংক্রান্ত মানসিক চাপ বলা যেতে পারে। এক্ষেত্রে স্কুলের বাচ্চারা স্কুলে উপস্থিতিকে এক ধরনের ভীতিকর কাজ বলে মনে করে এবং তারা মানসিক চাপে ভোগে। বিভিন্ন সময় স্কুলের বাচ্চাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মনোভাব বাবা-মায়েরাই তৈরি করে দেন বলে অনেক সময় এটি কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত মানসিক চাপের সৃষ্টি করে। বাবা-মায়ের বোঝা উচিত একটি শিশুর কতটুকু ধারণক্ষমতা রয়েছে এবং সে মতেই তাদের সাথে এবং তাদের প্রতি চাপ প্রয়োগ করা উচিত।

মানসিক চাপ ব্যক্তিবিশেষে বিভিন্ন রকমের হতে পারে। যেমন-কেউ হয়তো দুটো সুযোগ পেয়েছে এখন কোনটি সে বেছে নেবে সে বিষয়ে দুশ্চিন্তা শুরু হয়, সর্বোপরি তিনি মানসিক চাপে ভোগেন। কেউ হয়তো বিয়ে করবে, দুটি মেয়েকে সে পছন্দ করে, কোন মেয়েকে সে বিয়ে করবে এই ভেবে ভেবে তার মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়। এ ধরনের নানা জাতীয় মানসিক চাপের মুখোমুখি আমরা প্রায় সব সময়ই হচ্ছি।

মানসিক চাপের ৯টি বাহ্যিক এবং ১০টি অন্তর্গত কারণ বা উৎস সম্পর্কে ব্যাখ্যা করেন মনোবিজ্ঞানী শেফার। এই বাহ্যিক মানসিক চাপগুলোর মধ্যে রয়েছে-

  • অতিরিক্ত ভিড়
  • কোলাহল
  • মৃদু আলো
  • দূষিত বায়ু
  • অপ্রীতিকর সম্পর্ক
  • তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং
  • জীবনযাপনের অসামঞ্জস্যতা প্রধান

অন্তর্গত যেসব কারণে মানসিক চাপের সৃষ্টি হতে পারে তা হলো-

  • শারীরিক কোনো কঠিন রোগ
  • নিম্নমানের খাদ্যাভ্যাস
  • দুর্বলতা সমস্যা
  • যৌন সমস্যা
  • অনিয়মিত ব্যায়াম
  • নিজের প্রতি হতাশাবোধ প্রভৃতি

মনোশারীরিক চাপের জন্য আরও কিছু গবেষণালব্ধ কারণ পাওয়া যাচ্ছে। এগুলোর মধ্যে-

  • নিউক্লিয়ারজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হওয়া
  • জটিল ইনজুরি
  • ভালোবাসার মানুষকে হারানো
  • ডিভোর্স
  • ভুল বোঝাবুঝি
  • বিরোধ
  • সামাজিক অপবাদ
  • সামাজিক অনিশ্চয়তা
  • পারিবারিক সমস্যা থেকেও মানসিক চাপের সৃষ্টি হতে পারে

মানসিক রোগের ডাক্তারের কাছে এই ধরনের উপসর্গের রোগী প্রায়ই বেশি আসে। প্রায় ৫-৮% নারী-পুরুষের এ মানসিক চাপ সমস্যা ক্রনিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে ভীত হওয়ার কোনো কারণ নেই। এক্ষেত্রে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ প্রয়োজন। বহু ক্ষেত্রে ডাক্তাররা রোগীর পারিপার্শ্বিক এবং ব্যক্তিগত ডাক্তারি ইতিহাস জেনে তারপর রোগীর চিকিৎসা বিষয়ে   বিস্তৃত পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

আপনি কি স্ট্রেসে ভুগছেন?
মানসিক চাপে ভোগেনি এমন মানুষ খুব কমই খুঁজে পাওয়া যাবে। চাপ বলতে এর সাধারণ অভিযোগগুলোর ঊর্ধ্বেও কিছু বোঝায়। ফলে শুধু বিশ্রাম নিলেই চলবে না, চাপ নিয়ন্ত্রণে আরও অনেক কিছু করার আছে। চাপ শুধু খারাপ ও ধ্বংসাত্মক নয়, এর একটা ইতিবাচক দিকও আছে। সুখের সাথে এবং পরিপূর্ণভাবে বাঁচার জন্য আমরা প্রত্যক্ষ ও প্রাকৃতিকভাবে যেসব চাহিদা অনুভব করি তার মধ্যেই চাপ প্রতিফলিত হয়।

অনিয়ন্ত্রিত চাপের মূল্য ধ্বংসাত্মক। চাপের ফলে মানব সম্পদের প্রভূত ক্ষতি সাধিত হয়। যেমন-

  • কাজের সময়সংক্রান্ত
  • যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়া
  • উৎপাদনক্ষমতা হ্রাস ইত্যাদি

সাময়িক অক্ষমতাও চাপের কারণেই সৃষ্টি হয় এবং গত ১০ বছরে এটা দশবার বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু উত্তর আমেরিকান অর্থনীতিকে চাপের কারণে ১৩০-১৫০ বিলিয়ন ডলার মূল্য দিতে হয়। এই পরিসংখ্যানের বাইরেও লোক বসবাস করে, তারা সংগ্রাম করে জীবনের পিচ্ছিল পথ পাড়ি দেয় বেঁচে থাকার জন্য। তারা-

  • মাদক ব্যবহার করে
  • কঠিন অসুখে ভোগে
  • অসহায় হয়ে পড়ে
  • অনিদ্রায় ভোগে
  • পেটের সমস্যা
  • মাইগ্রেন ও
  • উচ্চরক্তচাপে ভোগে এবং
  • দেহের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়

এই চাপ ঠাণ্ডা, ইনফেকশন এবং ক্যান্সারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা শেষ করে দেয়। আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন ধারণা করে যে, মানুষের ৭৫% রোগই চাপের থেকে সৃষ্টি হয়।
সব চাপ খারাপ নয়, আবার সব চাপ ভালোও নয়। চাপ সাধারণত ৩ প্রকার, যথা-

  • খুব কম চাপ
  • খুব বেশি চাপ এবং
  • বিশেষ চাপ

খুব কম চাপ
যখনই চাপ খুব কম হবে তখনই আপনি নিষপ্রাণ এবং কর্মোদ্যমহীন হয়ে পড়বেন। সকালে বিছানা থেকে উঠতে ইচ্ছা করবে না, কেননা আপনার হাতে এমন কোনো কাজ নেই যার জন্য তাড়াতাড়ি উঠতে হবে। আপনার সামনে কোনো চ্যালেঞ্জও নেই তাই চাপবোধ না করাটাই স্বাভাবিক।

খুব বেশি চাপ
চাপ বেশি বা অত্যধিক চাপে শারীরিক নানা সমস্যা দেখা দেয়। এ অবস্থায় আপনি সর্বদা উদ্বিগ্ন ও চাপের মধ্যে থাকবেন।
আপনার পাকস্থলীতে সমস্যা দেখা দেবে এবং আপনার চিন্তা-ভাবনাগুলোও এলোমেলো হয়ে যাবে। অত্যধিক চাপ বলতে বোঝায়, আপনার জীবনে বেশি জটিলতা বা সামান্য সমস্যা থাকলেও সেগুলো এতই জটিল যে আপনার ধারণা হবে সেগুলোর সমাধান অসম্ভব।

বিশেষ চাপ
খুব বেশি ও খুব কম চাপের মধ্যেই একটা বিশেষ চাপ অবস্থান করে। এই চাপ খুবই শক্তিশালী হয়। এই বিশেষ চাপ আপনাকে উদ্যমী ও প্রাণবন্ত করে তোলে। আপনাকে স্বস্তি দেয়াই এর প্রধান লক্ষ্য।

চাপকে সহনীয় পর্যায়ে রাখার জন্য আপনার কিছু করণীয় আছে, যেমন-ভালো খাবার গ্রহণ করুন। চাপ আপনার শক্তি কমিয়ে দেয়, ফলে চাপ মোকাবিলার জন্য চাপ বাড়ায় এমন খাদ্য নিয়ন্ত্রণ এবং পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করা প্রয়োজন। এর মানে বেশি সবজি এবং ফল খাওয়া, শস্য দুগ্ধজাত খাদ্য এবং মাংস খাওয়া যদি পছন্দ করেন, যদি আপনি পুষ্টি সম্পর্কে সচেতন হন তাহলে আপনার দুশ্চিন্তা বেড়ে যাবে, যা আপনার সহ্য ক্ষমতার বাইরে। তাই সমস্যার উদ্ভব হলেই তা সমাধানের চেষ্টা করুন। দিনের কাজ শুরু করার পূর্বেই অসমাপ্ত কাজগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করুন এবং সেগুলো সমাধানের জন্য পরিকল্পনা করুন। সারাদিন ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করুন। কখনোই নেতিবাচক দিক চিন্তা করবেন না।

চাপ নিয়ন্ত্রণের সর্বশ্রেষ্ঠ পন্থা হলো অন্যদের সাথে তা ভাগ করে নেয়া। তাই অবলম্বনযোগ্য সম্পর্ক গড়ে তোলা খুব ভালো ব্যাপার। এমন একজন বন্ধু খুঁজে বের করুন যার সাথে কথা বলে আপনার ভালো লাগে। এছাড়া অন্য কোনো প্রথা অবলম্বনের কথা চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। কাজের সমাধানের কথা ছাড়াও অন্য কোনো সাধারণ কথাও আপনার অবস্থার উন্নতি করবে। এতে করে হয়তো সমস্যা সমাধানের কোনো নতুন পথও আপনি পেয়ে যাবেন। একমাত্র এই পথই এককভাবে আপনার চাপ কমাতে পারে।

হাসুন, হাসি চাপ নিয়ন্ত্রণের একটি খুবই কার্যকর উপায়। প্রকৃতপক্ষে হাসি ও চাপ কমানোর মধ্যে একটি বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক বিদ্যমান। এর নাম সাইকোনিউরোলজি। এ বিজ্ঞান যা বলে তা হলো হাসি আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। সেই সাথে চাপপ্রবণতাও কমিয়ে দিতে সাহায্য করে।

স্ট্রেসের নানা কথা
চাপ কোনো ঘটনা, অবস্থা বা ব্যক্তির আচরণের প্রতিক্রিয়া মাত্র। ভেতর ও বাইরে থেকে এটা খুব একটা খারাপ নয়। অন্যভাবে বলা যায়, আপনি সারাদিনের কর্মকাণ্ডে বিভিন্ন লোকের সাথে ওঠা-বসা করেন এবং বিভিন্ন অবস্থার প্রেক্ষিতে বিভিন্ন আচরণ করেন। এই ঘটনাগুলো আপনার অনুভূতি ও চিন্তাকে উদ্দীপিত করে এবং আপনার কিছু পদক্ষেপ নিতেই হয়। এ সকল পরিস্থিতি ও ব্যক্তি আমাদের সাড়া দিতে বাধ্য করে। এদের বলা হয় ‘স্ট্রেসার’ যা আমাদের-

  • চিন্তা
  • অনুভূতি ও
  • কার্যকে সাড়া দিতে চাপ দেয়। এসব চিন্তা, অনুভূতি এবং পদক্ষেপ যা আপনি ভেতরে অনুভব করেন তাই চাপ। চাপের উদাহরণ হলো-
  • উদ্বিগ্নতা
  • দুশ্চিন্তা
  • প্রতিহিংসা
  • প্রস্তুতি
  • কর্মোদ্যম ইত্যাদি

মানসিক চাপ হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসছে। বেঁচে থাকাই হলো চাপ। প্রাচীন যুগে মানুষ জানত না যে, সে কী খাবে অথবা নিজেই অন্যের খাদ্য হয়ে যাবে কি না। তাই প্রতিটি মুহূর্ত কাটত চাপের মধ্যে। সেই প্রাচীন যুগে চাপ মোকাবিলার দুটি বিকল্প পথ ছিল-

  • মোকাবিলা করা অথবা
  • পালিয়ে যাওয়া

যখন জীবনটা হুমকির সম্মুখীন হতো তখন সেই পরিস্থিতিতে একটি পথ বেছে নিতেই হতো। আপনি হুমকি বা চাপের সম্মুখীন হলে কী করবেন তা আপনার ওপরই নির্ভরশীল। আপনি যখন চাপ অনুভব করেন আপনার দেহ তা মোকাবিলা করার জন্য অথবা পালিয়ে যাবার জন্য তৈরি হয়। পালিয়ে যাওয়া অথবা মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত আপনার দেহ, মস্তিষ্ক এবং আবেগকে জটিলতাপূর্ণ করে তোলে। এটা আপনার মস্তিষ্কের ‘হাইপোথ্যালামাস’ নামক অংশে গড়ে ওঠে। যখনই আপনি চাপ অনুভব করবেন আপনি বুঝতে পারবেন যে, আপনার দেহ হুমকির সম্মুখীন সেই জীবনকে সামলানোর চেষ্টায় প্রস্তুতি নিচ্ছে অর্থাৎ আপনার দেহ কোনো কিছু মোকাবিলার জন্য অথবা পালিয়ে যাবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিবর্তনটা মূল্যের বিনিময়ে আসে। যেমন-আমাদের দেহের পরিবর্তন হয়, সেই সাথে চিন্তাশক্তির পরিবর্তন, জীবনে বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থার পরিবর্তন হয়। সময় বয়ে যেতে আমাদের মস্তিষ্ক উন্মোচিত হলো এবং শ্রম শিল্প বিজ্ঞান ও অস্ত্রের সাহায্যে সেই সকল বস্তুকে জয় করল, যা জীবনের জন্য ছিল হুমকিস্বরূপ। কিন্তু মূল্যের বিনিময়ে, যেহেতু বিবর্তন আসে তাই আমাদের ব্রেনের পরিবর্তনের সাথে সাথে আরও জটিল বিষয় চিন্তা করতে পারে। ফলে অনাগত জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ এমন জিনিসের কথাও আমরা চিন্তা করতে পারি।

কোনো মানুষের রক্তচাপ তখনই বাড়বে যদি অপছন্দের কাজটি তাকে করতে দেয়া হয়। আমরা জৈবিকভাবেই বিভিন্ন চাপসমৃদ্ধ অবস্থা মোকাবিলা করতে সক্ষম। এটা গুরুত্বপূর্ণ কেননা এটা আমাদের সজাগ ও সতর্ক রাখে। তবে এতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে যদি আমরা তা নিয়ন্ত্রণ না করি এবং সুচিন্তিত পরিকল্পনা ছাড়া কোনো সমস্যা সমাধানে অগ্রসর হই। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, আমরা কি আমাদের ইতিহাস এবং জৈবিক গঠন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত? নিশ্চয়ই যত দিন চিন্তা করতে পারব, তত দিন আমরা সমস্যা সমাধানেও সক্ষম হতে পারব।

আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত চিন্তা করতে পারি ততক্ষণ ইতিহাস বা জৈবিক গঠন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নই। একই চাপের জন্য আমরা ‘আলিঙ্গন’ অথবা ‘ত্যাগ’-এর বদলে ‘মোকাবিলা’ অথবা ‘পলায়ন পন্থা’ গ্রহণ করতে পারি। অ্যাড্রেনালকে উত্তেজক হিসেবে এবং তীব্র অনুভূতিকে ভুল ধরিয়ে দেয়ার কাজে লাগাতে পারি।

কোনো কোনো চাপ ক্ষতিকর, এগুলো আপনার-

  • চিন্তা
  • অনুভূতি
  • স্বাস্থ্য
  • আবেগ
  • কাজ-কর্ম ইত্যাদিতে বাধা সৃষ্টি করবে।

চাপের ইতিবাচক নিদর্শন
যদি আপনি মনে করেন যে, আপনি প্রতিদিনের চাহিদা সামলাতে পারবেন তাহলে চাপের ইতিবাচক চেহারা চিনে নিন। যেমন-

  • আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি
  • কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি
  • লক্ষ্য ও সংকল্পবোধ
  • সূক্ষ্মতার প্রতি মনোযোগ
  • একটা উত্তেজনার অনুভূতি
  • আশার অনুভূতি

চাপের ক্ষতিকর নিদর্শন

  • মনোনিবেশে অক্ষমতা
  • মনোবল হারানো
  • বিস্মৃতি
  • বিরক্তিভাব
  • ভয় বা উত্তেজনা
  • অনিদ্রা
  • উচ্চরক্তচাপ
  • পেশি সংকোচন
  • পাকস্থলীতে সমস্যা
  • বমি বমি ভাব বা বমি
  • মাথাব্যথা
  • কোষ্ঠকাঠিন্য