মানসিক চাপ এবং উদ্বেগ স্বাভাবিক মানসিক ও শারীরিক প্রতিক্রিয়া। দৈনন্দিন জীবনের নানাবিধ চাহিদার কারণে উদ্বেগ ও মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়। প্রতিটি মানুষই তার জীবনের বিভিন্ন সময়ে এবং পর্যায়ে এ ধরনের অতিরিক্ত উদ্বেগ এবং মানসিক চাপের শিকার হয়ে থাকেন। উদ্বেগ ও অতিরিক্ত মানসিক চাপের মুখোমুখি হলে আমাদের মস্তিষ্কের ওপর তার প্রভাব পড়ে। কারণ প্রকৃতিগতভাবে মস্তিষ্কে বিপদ-আপদের মুখে নিজেকে রক্ষা করার জন্য বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া কৌশল সংরক্ষিত রয়েছে। যে কোনো উদ্বেগ কিংবা মানসিক চাপ মস্তিষ্কের নিকট অস্তিত্বের জন্য বিপদ সংকেত হিসেবে বিবেচিত হয় এবং নিজেকে রক্ষা করার জন্য সংকেত প্রেরিত হয়। এর ফলে শরীরে বিভিন্ন ধরনের হরমোন এবং রাসায়নিক উপাদান নিঃসৃত হয়। ফলে শরীরের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আসন্ন বিপদ মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠে। এটাকে বলা হয় ‘লড়ো কিংবা পালাও’ (Fight or flight response)। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় জঙ্গলে একজন মানুষ দৈনন্দিন প্রয়োজনে কাঠ কাটতে কিংবা মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে যদি হিংস্র বাঘের মুখোমুখি হয়, তাহলে কী ঘটে? মানুষটি শরীরে আসন্ন বিপদ মোকাবেলা করার জন্য তৈরি হয়। তখন সে বাঘটির সঙ্গে লড়াই করে কিংবা পালানোর চেষ্টা করে। প্রাত্যহিক জীবনে যে কোনো উদ্বেগ এবং মানসিক চাপকে আমাদের মন ও শরীর অস্তিত্বের সংকট হিসেবে বিবেচনা করে এবং একই রকম লড়ো না হলে পালাও প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করে। বিপদ কেটে গেলে সবকিছু শান্ত হয়ে আসে এবং আমাদের শরীর ও মন শিথিল স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় আধুনিক দ্বন্দ্বময় জীবনে একটার পর একটা উদ্বেগ সৃষ্টিকারী সমস্যা আসতেই থাকে। ফলে আমাদের শরীরে সব সময় টান টান উত্তেজনা বিরাজমান থাকে। এ রকম ক্রমাগত উদ্বেগ ও মানসিক চাপ মন এবং শরীরের ওপর যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে দীর্ঘমেয়াদে তা নানা রকম ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক ব্যাধির সৃষ্টি হয়। এ জন্য উদ্বেগ ও মানসিক চাপ লাঘব করে স্বাভাবিক জীবন যাপন করা এত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিকভাবে উদ্বেগ ও মানসিক চাপ লাঘব করতে পারলে আমরা নানা রকম শারীরিক ও মানসিক ব্যাধিমুক্ত সুস্থ দুশ্চিন্তাবিহীন আনন্দময় জীবন যাপন করতে পারি।
মানসিক পীড়নের লক্ষণ ও উপসর্গ
মানসিক পীড়ন আমাদের স্বাস্থ্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা তা উপলব্ধি করতে পারি না। ঘনঘন মাথাব্যথা, অনিদ্রা কিংবা কাজকর্মে অমনোযোগী-এ রকম হাজারো সমস্যা হতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় এগুলো সাধারণ শারীরিক অসুখ-বিসুখেরই প্রকাশ। কিন্তু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে এসব রোগ-ব্যাধির পেছনে মানসিক পীড়নের বিশেষ ভূমিকা দেখতে পাওয়া যায়। অতিরিক্ত উদ্বেগ ও মানসিক পীড়ন আমাদের শরীরকেই শুধু ক্ষতিগ্রস্ত করে তা নয় আমাদের চিন্তা-চেতনা এমনকি আচার-আচরণকেও প্রভাবিত করতে পারে। এ জন্য মানসিক পীড়নের ফলে সৃষ্ট শারীরিক ও মানসিক লক্ষণ উপসর্গ সম্পর্কে জানা থাকলে তা দ্রুত শনাক্ত করা যায় এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়। অনিয়ন্ত্রিত মানসিক পীড়নের ফলে নানা রকম রোগব্যাধি হতে পারে যেমন-উচ্চরক্তচাপ, হৃদরোগ, মেদভুঁড়ি, ডায়াবেটিস ইত্যাদি। অবশ্য এ সকল সমস্যা শুধুই অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও উদ্বেগের কারণে হচ্ছে, নাকি সত্যিকারের শারীরিক ব্যাধি তা অনেক সময় পার্থক্য করা সহজ নয়। এ জন্য উপযুক্ত চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
মানসিক পীড়নের শারীরিক প্রতিক্রিয়া
- মাথাব্যথা
- পেশির ব্যথা কিংবা খিঁচুনি
- বুকের ব্যথা
- অবসাদ ও ক্লান্তি
- যৌন সমস্যা
- পেটের গোলমাল
- ঘুমের সমস্যা ইত্যাদি
মানসিক পীড়নের
মানসিক প্রতিক্রিয়া
- অস্থিরতা
- দুশ্চিন্তা
- কাজকর্মে অমনোযোগিতা
- খিটখিটে রুক্ষ মেজাজ
- অকারণে রাগ
- বিষণ্নতা ইত্যাদি
মানসিক পীড়নের আচরণগত প্রতিক্রিয়া
- ক্ষুধামান্দ্য
- অতিভোজন
- মাদকাসক্তি
- মদ্যপান
- ধূমপান
সামাজিক কর্মকাণ্ডে অনীহা
মানসিক পীড়নের এ সকল লক্ষণ-উপসর্গ দেখা গেলে অবশ্যই সতর্ক হতে হবে এবং ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আধুনিক জীবনের প্রাত্যহিক গতির সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে মানসিক পীড়ন আমাদের নিত্য অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। এ জন্য সকলেরই উদ্বেগ ও অতিরিক্ত মানসিক চাপ লাঘব কৌশল রপ্ত করা উচিত। অফিস-আদালতের কাজের চাপ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, সংঘাত, দাম্পত্য সংকট, সন্তান লালন-পালন, বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন ইত্যাদি নানাবিধ কারণে এ ধরনের পীড়ন সৃষ্টি হয়। সমস্যা হচ্ছে আমরা এতসব উদ্বেগ ও মানসিক চাপ কীভাবে লাঘব এবং নিয়ন্ত্রণ করব?
- মানসিক পীড়ন নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এর কারণে জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হচ্ছে কি না তা শনাক্ত করা এবং সেটা সমাধানের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা।
- এরপর গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে মানসিক পীড়নের কারণ অনুসন্ধান করা। মানসিক পীড়নের কতগুলো কারণ শনাক্ত করা সহজ; যেমন কাজকর্মের চাপ, সম্পর্কের টানাপোড়েন, আর্থিক সংকট ইত্যাদি। জীবনের ইতিবাচক ঘটনাসমূহও অনেক সময় মানসিক চাপ সৃষ্টি করে, যেমন-বিয়ে, নতুন চাকরি, পদোন্নতি, বিদেশে গমন ইত্যাদি।
- মানসিক পীড়নের কারণ শনাক্ত করার পর প্রধান কাজ হচ্ছে সেটা লাঘবের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। অনেক ক্ষেত্রে লাঘবের কৌশল খুবই সহজ। যেমন-টিভির খবর শুনলে মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়, সে ক্ষেত্রে টিভি না দেখা হচ্ছে সহজ সমাধান। পরিবারের সদস্যদের সাহায্য, বন্ধু-বান্ধবদের সহযোগিতা, কর্ম ক্ষেত্রে সহকর্মীদের পরামর্শ অনেক ক্ষেত্রে মানসিক চাপ লাঘবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে অনেক ক্ষেত্রে মানসিক পীড়নের সহজ সমাধান থাকে না। সে ক্ষেত্রে উপযুক্ত চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত। সবশেষে মানসিক পীড়ন লাঘবে বিভিন্ন শিথিলায়ন কৌশলের কথা বলতে হয়। এ সকল কৌশলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে খেলাধুলা, যোগব্যায়াম, ধ্যান চর্চা, সঙ্গীত কিংবা সুগন্ধির ব্যবহার, বডি ম্যাসাজ ইত্যাদি। অনেকেই এ সকল পদ্ধতি প্রয়োগ করে উপকৃত হয়েছেন।
আধুনিক জীবনে উদ্বেগ ও অতিরিক্ত মানসিক চাপ আমাদের নিত্যসঙ্গী। আমাদের জীবন থেকে এটা কখনোই দূর হবে না। অতএব মানসিক পীড়ন লাঘবের কৌশল রপ্ত করেই স্বাভাবিক জীবনযাপনের চেষ্টা করতে হবে। মানসিক চাপ কমানোর কাজটি কেউ সহসা করতে পারে না। এ জন্য তাকে প্রতিনিয়ত সচেষ্ট থাকতে হয় এবং এভাবে প্রতিনিয়ত চর্চা করলে আমরা উদ্বেগমুক্ত মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তাবিহীন জীবন যাপন করতে পারি।
পুরুষের মেদভুঁড়ি
মেদভুঁড়ি নিয়ে আর হাসি-তামাশা করা যাচ্ছে না। আগে ভুঁড়ি সচ্ছলতা এবং আভিজাত্যের পরিচয় বহন করত। ভুঁড়িদার ব্যক্তিদের খাওয়া-দাওয়া নিয়ে কিছু রসিকতাও করা হতো। কিন্তু আজকাল ভুঁড়ি একেবারে বেমানান বিষয়। তারপরেও আমাদের অনেকের ভুঁড়ি বড় হচ্ছে-ভুঁড়িদারদের কাফেলা লম্বা হচ্ছে। এটা মোটেও সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ নয়। পেটে প্রতি কেজি অতিরিক্ত চর্বি জমার মানে স্বাস্থ্যের ওপর হুমকি ক্রমশ বেড়ে যাওয়া।
মহিলাদের চেয়ে পুরুষদের পেটে চর্বি জমা হওয়ার প্রবণতা বেশি। কারও ওজন যাই হোক না কেন, পেটে অতিরিক্ত চর্বি জমা নানা রকম স্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি করে যেমন-
- হৃদরোগ
- উচ্চরক্তচাপ
- মস্তিষ্কের পক্ষাঘাত
- বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার
- ডায়াবেটিস (টাইপ-২)
- ইনসুলিনের প্রতিরোধ্যতা বেড়ে যাওয়া
- রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড বেড়ে যাওয়া
- কম ঘনত্বের ভালো কোলেস্টেরল কমে যাওয়া
- বিপাকজনিত সমস্যা
- ঘুমের মধ্যে দম বন্ধ হওয়া
অনেকে জানতে চান-পেটে অতিরিক্ত চর্বি জমেছে কি না তা কেমন করে বোঝা যাবে? সাধারণত কটিদেশ এবং কোমরের মাপ নিয়ে তার অনুপাত নির্ণয় করলে এটা বোঝা যায়। আরেকটি সহজ উপায় হচ্ছে শরীরের ঘনত্ব সূচক (Body mass index বা BMI ) নির্ণয় করা। তবে যে কারও কটিদেশের মাপ (Waist size) জানলেই আন্দাজ করা যায় তার অবস্থা কী? সাধারণত যাদের কটি ৪০ ইঞ্চির (১০২ সেন্টিমিটার) বেশি তারা বিপদের মুখে রয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে আরেকটি প্রশ্ন চলে আসে-বয়সের সঙ্গে কি ভুঁড়ির কোনো সম্পর্ক আছে? এর উত্তর হচ্ছে বয়স বাড়ার পাশাপাশি কেউ যদি শরীর চর্চা বা ব্যয়াম না করেন, তা হলে তার বেশি ক্ষয় হতে থাকে এবং এর ফলে শরীরের ক্যালরি খরচের পরিমাণ আরও কমে যায়। এ জন্য বয়সের সঙ্গে ভুঁড়ি বাড়তে থাকে।
স্থূলকায়ত্ব কিংবা অতিরিক্ত ওজনের জন্য অনেকে বংশগতি বা জিনকে দায়ী করে থাকেন। তবে বংশগতি বা জিন যত না ওজন বাড়ার জন্য দায়ী, তার চেয়ে অনেক বেশি দায়ী আমাদের জীবনাচরণ বা লাইফ স্টাইল। যারা শারীরিক পরিশ্রম কম করে এবং বেশি খায়-তারাই মোটা হয়। তাদেরই ভুঁড়ি বাড়ে। অতিরিক্ত মদ্যপান বিশেষত বিয়ার সেবন করাকেও ভুঁড়ি হওয়ার জন্য দায়ী করা হয়। অতিরিক্ত বিয়ার সেবন করলে পেটে প্রচুর চর্বি জমে যায়। অতএব যারা ভুঁড়ি কমাতে চান তাদের এ বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেমন করে ভুঁড়ি কমাবেন
ভুঁড়ি কমানো আর শরীরের ওজন কমানোর মূল সূত্র একই-ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ কমাতে হবে আর শারীরিক পরিশ্রমের পরিমাণ বাড়াতে হবে।
ক্যালরি গ্রহণ কমানোর সহজ কোনো বুদ্ধি নেই। তবে কতগুলো কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে-
- পাতে খাবারের পরিমাণ কম নিতে হবে
- তেল-চর্বির পরিবর্তে শাকসবজি-ফলমূল বেশি খেতে হবে
- ফাস্টফুড যত কম খাওয়া যায় ততই মঙ্গল
- রেস্টুরেন্টে যত কম খাওয়া যায় ততই মঙ্গল
- রেস্টুরেন্টে গেলে অন্যদের সঙ্গে খাবার ভাগ করে খেলে কম খাওয়া হবে
- শারীরিক পরিশ্রম বাড়াতে হবে
- সুস্বাস্থ্যের জন্য আমাদের প্রত্যেকের প্রতি সপ্তাহে আড়াই ঘণ্টা (১৫০ মিনিট) মাঝারি মানের শারীরিক ব্যায়াম করা উচিত অথবা ৭৫ মিনিট ভারী ব্যায়াম করা যেতে পারে। যারা ওজন কমাতে চান তাদের এর চেয়ে বেশি ব্যায়াম করতে হবে এবং তা নিয়মিত চর্চা করতে হবে।
- যাদের পক্ষে একটানা বেশি সময় ব্যায়ামের ফুরসৎ নেই তারা কাজের ফাঁকে ফাঁকে অল্প সময়ে কিংবা বারবার ব্যায়াম করতে পারেন।
- নৈশভোজের পর অবশ্যই কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করতে হবে।
- একবার ওজন সঠিক মাত্রায় নিয়ে আসতে পারলে তা বজায় রাখার জন্য যথাযথ খাদ্যাভ্যাস এবং ব্যায়াম চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে।
সবশেষে আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে অতিরিক্ত মেদভুঁড়ি কমানো সম্ভব। প্রয়োজন একনিষ্ঠ প্রচেষ্টা এবং ধৈর্য। কয়েক কেজি অতিরিক্ত ওজন কমাতে পারলেই তা চিত্তকে প্রফুল্ল করে এবং স্বাস্থ্য বহুলাংশে লাঘব করে।
হৃদরোগ
- পুরুষের প্রধান শত্রু হৃদরোগ। অতএব সকল পুরুষকে হৃদরোগ প্রতিরোধ করার জন্য সচেষ্ট থাকতে হবে। এ জন্য-
- ধূমপান পরিহার করতে হবে। হৃৎপিণ্ডের অন্যতম প্রধান শত্রু ধূমপান। অতএব প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সব ধরনের ধূমপান পরিত্যাগ করতে হবে।
- স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ। শাকসব্জি, ফল-মূল, আকাড়া শস্যদানা, অতিরিক্ত আঁশযুক্ত খাদ্য ইত্যাদি বেশি খেতে হবে। কিন্তু সম্পৃক্ত চর্বি এবং লবণযুক্ত খাবার পরিহার করতে হবে।
- ক্রনিক রোগ পরিহার করতে হবে। যেমন উচ্চরক্তচাপ কিংবা ডায়াবেটিস হলে অবশ্যই তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
- প্রতিদিন ব্যায়াম করতে হবে। প্রতিদিন যে কোনো ধরনের শরীরচর্চা কিংবা খেলাধুলা করতে হবে।
- শরীরের ওজন সীমিত রাখতে হবে। অতিরিক্ত ওজন মানেই হৃৎপিণ্ডের ওপর অতিরিক্ত বোঝা।
- মদ্যপান পরিহার করতে হবে। অতিরিক্ত অ্যালকোহল রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয় এবং তা হৃৎপিণ্ডের জন্য ক্ষতিকর।
- মানসিক চাপ ও উদ্বেগমুক্ত হতে হবে। সব সময় দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। কাজেই মানসিক চাপমুক্ত হাসি-খুশি প্রাণবন্ত জীবনযাপনের চেষ্টা করতে হবে।
ক্যান্সার
হৃদরোগের পরে পুরুষের দ্বিতীয় প্রধান শত্রু ক্যান্সার। ফুসফুস, ত্বক, প্রোস্টেট, অন্ত্র ইত্যাদি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্যান্সার বহু পুরুষের অকালমৃত্যু হয়। ক্যান্সারের ঝুঁকি কমানোর জন্য নিচের পদক্ষেপগুলো বেশ কার্যকরী।
- ধূমপান পরিহার। ধূমপান পরিহার করলে যেমন হৃদরোগের সম্ভাবনা কমে, তেমন ক্যান্সারের ঝুঁকিও কমে। এমনকি পরোক্ষ ধূমপান থেকে দূরে থাকলেও ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে।
- ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। অতিরিক্ত ওজন কমাতে পারলে নানা ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেকাংশে হ্রাস পায়।
- ব্যায়াম করতে হবে। নিয়মিত শরীরচর্চা ওজন কমাতে সাহায্য করে, হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় এবং একইভাবে ক্যান্সারের ঝুঁকিও কমায়।
- প্রচুর শাকসব্জি এবং ফল মূল খেতে হবে। শাকসব্জি এবং ফলমূল ক্যান্সারের প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকরী।
- সূর্যের আলো থেকে সুরক্ষা। অতিরিক্ত সৌরালোক ত্বকের জন্য ক্ষতিকর। সূর্যের আলোতে অতিরিক্ত ঘোরাঘুরি করলে অবশ্য ‘সানস্ক্রিন’ বা সৌরালোক সুরক্ষাকারী ক্রিম ব্যবহার করতে হবে কিংবা ছাতা ব্যবহার করা উচিত।
- মদ্যপান সীমিত করতে হবে। উত্তম হলো সম্পূর্ণ পরিহার করা। অতিরিক্ত মদ্যপান করলে অন্ত্র, ফুসফুস, কিডনি, যকৃৎ ইত্যাদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অতএব মদ্যপান পরিহার করলে অনেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্যান্সার প্রতিরোধ করা যায়।
- ক্যান্সার শনাক্তকারী পরীক্ষা-নিরীক্ষা। কিছু কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ক্যান্সার সুপ্তাবস্থায় বা প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা যায়। এ জন্য প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।
ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি
অবরোধাত্মক ব্যাধি
ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি রোগে অনেক পুরুষের স্বাস্থ্যহানি হয়ে থাকে। বিশেষত ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস এবং পালমোনারি এসফিসিমায় অনেক পুরুষের জীবন দুর্বিসহ হয়ে থাকে। এ জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত-
- ধূমপান পরিহার করতে হবে। ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি রোগের প্রধান কারণ ধূমপান। ধূমপান পরিহার করলে এর থেকে মুক্ত থাকা সহজ হবে।
- বায়ু দূষণ পরিহার করতে হবে। ধুলাবালি-ধোঁয়াযুক্ত পরিবেশ এড়িয়ে চলতে হবে।
- শ্বাসনালির সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে হবে। ঘন ঘন শ্বাসনালির সংক্রমণ দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের রোগের প্রকোপ বাড়িয়ে দেয়। অতএব শ্বাসনালির সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকার জন্য সতর্ক থাকতে হবে।
মস্তিষ্কের পক্ষাঘাত বা স্ট্রোক
মস্তিষ্কের পক্ষাঘাত অনেক ঝুঁকি উপাদান আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। যেমন-বয়স, পারিবারিক ইতিহাস, জাতি ইত্যাদি। কিন্তু কতগুলো উপাদান নিয়ন্ত্রণযোগ্য যেমন-
- ক্রনিক রোগসমূহ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তের অতিরিক্ত কোলেস্টেরল ইত্যাদি পক্ষাঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। অতএব এগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখা পক্ষাঘাত প্রতিরোধের জন্য জরুরি।
- ধূমপান পরিহার করতে হবে। অতিরিক্ত ধূমপান পক্ষাঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। অতএব ধূমপান পরিহার করে পক্ষাঘাতের সংখ্যা কমানো সম্ভব।
- মদ্যপান পরিহার করতে হবে। অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। অতএব মদ্যপান পরিহার করে আমরা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে পারি।
ডায়াবেটিস
ডায়াবেটিস বিশেষত টাইপ-২ ডায়াবেটিস থাকলে শরীরে গ্লুকোজের পরিমাণ বেড়ে যায়। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের ফলে হৃদরোগ, চোখের রেটিনার সমস্যা, স্নায়ুরোগ এবং আরও অনেক জটিলতা হয়। অতএব ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অধিকাংশ পুরুষ তাদের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে পারেন। এ জন্য-
- নিয়মিত জীবনাচরণ মেনে চলতে হবে
- স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ করতে হবে
- নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে
- অতিরিক্ত ওজন কমাতে হবে
আত্মহত্যা
পুরুষের স্বাস্থ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা আত্মহত্যাপ্রবণতা। সাধারণত বিষণ্নতা থেকে আত্মহত্যা করার ইচ্ছা জাগে। কারও বিষণ্নতার লক্ষণ-উপসর্গ দেখা গেলে অবশ্যই তার চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে বিষণ্নতা দূর করার মাধ্যমে আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
সবশেষে বলতে হয় স্বাস্থ্য ঝুঁকি চিহ্নিত করা সহজ; কিন্তু প্রতিরোধের পদক্ষেপ গ্রহণ করা সহজ নয়। তবে সবক্ষেত্রে পুরুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার মূল সূত্রটি একই; আর তা হচ্ছে-স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম ও শরীর চর্চা করা, ধূমপান পরিহার করা, মদ্যপান না করা এবং নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো। এর সুফল আমরা যা কল্পনা করি, তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি।



