জলাতঙ্ক রোগটি র্যাবিস নামেই আমাদের কাছে বেশি পরিচিত। এ রোগীরা পানি দেখলে ভয় পায় বলেই একে জলাতঙ্ক বা হাইড্রোফোবিয়া বলা হয়। শুধু পানি নয়, জলাতঙ্ক রোগীদের বাতাসের সংস্পর্শেও ভীতি জন্মে (অ্যারোফোবিয়া)। গ্রিক পুরাণ বিজ্ঞান মতে চার হাজার বছর আগে থেকে মানুষ ও জন্তু এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু অদ্যাবধি এ রোগ হতে মুক্তি পাওয়ার কোনো ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি। এটি বাংলাদেশের অন্যতম জনস্বাস্থ্য সমস্যা। পৃথিবীতে হাতেগোনা যে কটি অসুখে মৃত্যুহার ১০০ ভাগ, এরই একটি জলাতঙ্ক; লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পর এ রোগের কোনো চিকিৎসা নেই। তবে আশার কথা, সঠিক সময়ে সঠিক ডোজে জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন চিকিৎসা নিলে এ অসুখ ১০০ ভাগ প্রতিরোধযোগ্য। বিভিন্ন ধরনের জলাতঙ্ক আক্রান্ত জীব জন্তুর কামড় ও আঁচড়ের মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায়।
আক্রান্তের হার
প্রতি বছর পৃথিবীতে প্রায় ৫০-৬০ হাজার লোক জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যবরণ করে। এর মধ্যে এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশে আক্রান্তের হার উন্নয়নশীল দেশগুলোর শতকরা ৯৫ ভাগ, তন্মধ্যে ৩১ হাজার (৫৬ শতাংশ) মানুষ এশিয়া মহাদেশে। ভারতে প্রতি বছর ২০ হাজারের অধিক জলাতঙ্কে মারা যায়। বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য হারে এ রোগের প্রাদুর্ভাব লক্ষ করা যায়। সরকারি সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর দুই হাজারের অধিক লোক জলাতঙ্ক রোগে মারা যায়। ঢাকার সরকারি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ২০০৪-২০০৮ সালে মোট ১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৩৯ জন জীব জন্তুর কামড়ের রোগী আসে। জানুয়ারি ও এপ্রিল মাসে এ রোগের প্রাদুর্ভাব খুব বেশি। শতকরা ৮৫ শতাংশ রোগী এ হাসপাতালে গ্রাম থেকে আসে।
কীভাবে রোগ ছড়ায়
প্রধানত জলাতঙ্ক-আক্রান্ত কুকুর দ্বারাই র্যাবিস ভাইরাস মানুষের শরীরে ঢোকে। এ ছাড়া জলাতঙ্ক আক্রান্ত বিড়াল, গবাদিপশু, বন্যপ্রাণীর (নেকড়ে বাঘ, খেঁকশিয়াল, বানর, বেজি) কামড়েও এবং কোনো কোনো দেশে রক্তচোষা বাদুড়ের কামড়েও মানুষের জলাতঙ্ক হতে পারে। বাংলাদেশে শতকরা ৯১ ভাগ জলাতঙ্ক রোগ হয় জলাতঙ্ক আক্রান্ত কুকুরের কামড়ে। সাধারণত কামড় বা আঁচড় দেয়ার ২ সপ্তাহ থেকে ৬ মাস পর এ রোগের লক্ষণ দেখা যায়। বিশেষ করে ১৫ বছরের নিচে শিশু-কিশোর ও বয়স্ক মানুষ এ রোগের জন্য অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। শিশুরা জীব জন্তু নিয়ে খেলা করে এবং বয়স্কদের জীব জন্তু প্রতিহত করার ক্ষমতা থাকে কম। জলাতঙ্ক আক্রান্ত জন্তুর কামড় বা নখের আঁচড়ে জলাতঙ্ক রোগ ছড়ায়। জলাতঙ্ক আক্রান্ত পশুর লালা কোনো সুস্থ মানুষের ত্বকের কাটা-ছেঁড়া, খোলা-ক্ষত এমনকি ত্বকের নিচের স্তরে (মিউকাস মেমব্রেনে) কোনোভাবে পৌঁছলেও জলাতঙ্ক হতে পারে। জলাতঙ্ক আক্রান্ত মৃত মানুষের অঙ্গ (কর্নিয়া/অন্য অঙ্গ) কোনো সুস্থ মানুষে প্রতিস্থাপন করলে তারও জলাতঙ্ক হতে পারে।
উপসর্গ
একজন মানুষ জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হলে, পশুর লালায় অবস্থিত জলাতঙ্ক ভাইরাস মানুষের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে পোঁছে। ক্ষতস্থানে ব্যথা করে, চুলকায় এবং একই সঙ্গে জ্বর, মানসিক অবসাদ, অস্থিরতা, পানি দেখে ভয় পাওয়া, আলো-বাতাস সহ্য করতে না পারা, শ্বাসকষ্ট ও পুরো শরীর পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে শেষে মৃত্যুবরণ করে। অগ্রসর পর্যায়ে স্নায়ুতন্ত্রে বিভিন্ন সমস্যা দেখা যায়, যেমন ঘুমে সমস্যা, উত্তেজনা, দ্বিধাগ্রস্ত, শরীর আংশিক প্যারালাইসিস হওয়া, আবোল-তাবোল বকা, খাবার গিলতে অসুবিধা, মুখ থেকে অতিরিক্ত লালা ঝরা এবং হাইড্রোফোবিয়া ও অ্যারোফোবিয়া। এ লক্ষণগুলো দেখা দেয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই মৃত্যু হয়।
জলাতঙ্ক প্রতিরোধ ও ভ্যাকসিন
ক্ষতস্থান সাবান ও প্রচুর পানি দিয়ে অন্তত ১০-১৫ মিনিট ধরে ধুয়ে ফেলুন এবং পরে টোটকা-ফোটকা চিকিৎসা না নিয়ে সঠিক চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল বা চিকিৎসকের কাছে যান। মনে রাখবেন সাবান বা ডিটারজেন্ট দিয়ে ক্ষতস্থান ভালোভাবে ধুলে ৫০ ভাগ ক্ষেত্রে জলাতঙ্ক ভাইরাস মরে যায়। পরে ক্ষতস্থানে অ্যান্টিসেপটিক লোশন বা ক্রিম যেমন পভিডন আয়োডিন লাগাতে পারেন। টিটেনাস টিকা সাবধানতার জন্য দেয়া উচিত। ক্ষত জায়গায় ইনফেকশন বা সেপসিস প্রতিরোধের জন্য উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা যায়। ১৮৮৫ সালে ফ্রান্সের লুই পাস্তুর নামক একজন বিজ্ঞানী জলাতঙ্ক রোগ প্রতিরোধের জন্য ভ্যাকসিন আবিষ্কার করেন। জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত প্রাণী কামড়ানোর পরপরই জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন সঠিক ডোজে নিলে (মাংসপেশিতে/চামড়ার মধ্যে) এ রোগ থেকে আর মৃত্যুর সম্ভাবনা থাকে না। মনে রাখতে হবে জলাতঙ্ক লক্ষণ শুরু হওয়ার পর ভ্যাকসিন নিলে তা আর কাজে লাগে না। বিজ্ঞানীরা বর্তমানে আধুনিক, নিরাপদ ও কার্যকরী টিস্যু কালচার ভ্যাকসিন (টিসিভি) আবিষ্কার করেছেন, যা পেটের নার্ভ টিস্যু ভ্যাকসিনের (এনটিভি) চেয়ে উন্নততর ও অধিকতর নিরাপদ। প্রকৃতপক্ষে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০০৫ সালে সব দেশকে এ নার্ভ টিস্যু ভ্যাকসিন দিতে নিষেধ করেছে এর নানাবিধ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে।
আধুনিক টিস্যু কালচার ভ্যাকসিন (টিসিভি) পোস্ট-এক্সপোজার অর্থাৎ কামড়ানোর পর জলাতঙ্ক প্রতিরোধক হিসেবে দেয়া হয়। টিসিভির বর্তমান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত আইডি (চামড়ার মধ্যে) ডোজ ০.১ মি.লি. করে ত্বকের দুই বাহুতে (০.১ মি.লি. ২ আইডি ডোজ, ৪ বারে, ৪ দিন); ০ দিন, ৩য় দিন, ৭ম দিন ও ২৮তম দিনে দিতে হয়। এছাড়া ভ্যাকসিন (টিসিভি) মাংসপেশিতে ০ দিনে ১টিসহ, ৭ম দিন ১টি ও ২১তম দিনে ১টিসহ মোট ৩ বার ৪টা দেয়া যায়। প্রাণীর কামড় খুব মারাত্মক হলে অর্থাৎ রক্তসহ মাংসপেশিতে গভীর কামড় দিলে টিসিভির সঙ্গে র্যাবিস-ইম্যুনোগবুলিন দিতে হয়।
বাংলাদেশে উদ্যোগ
বাংলাদেশ সরকার স্বাস্থ্য অধিদফতর, রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার যুগান্তকরী পদক্ষেপ ২০০৯ সালের জুলাই মাস থেকে ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পাইলট স্টাডির অংশ হিসেবে প্রায় বিনা খরচে এ ভ্যাকসিন (টিসিভি) প্রদানের কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসক ও নার্সদের সপ্তাহব্যাপী ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশে সফল জলাতঙ্ক প্রতিরোধ কার্যক্রমের আওতায় সারাদেশে সব জেলার চিকিৎসক ও নার্সদের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে। বর্তমানে টিস্যু কালচার ভ্যাকসিন (টিসিভি) ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিরাপদ। টিসিভি চালু হওয়ার পর থেকে ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসা রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলেছে। অতি সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে ভবিষ্যতে টিসিভি তৈরির পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আগামী ২০১১ সালের মধ্যে সরকারিভাবে এনটিভি বন্ধ করে দিয়ে টিসিভি পুরোদমে চালুর পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। ২০১১-১৬ স্বাস্থ্য সেক্টর প্রোগ্রামে জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে আলাদা কর্মসূচি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
জলাতঙ্ক রোগ নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলের জন্য জলাতঙ্ক আক্রান্ত কুকুর নিধন কার্যক্রমসহ কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ; কুকুরের বন্ধ্যাত্বকরণ, গৃহপালিত কুকুরের ভ্যাকসিনেশন, রোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি কার্যক্রম সরকারি ও বেসরকারিভাবে জোরদার করা জরুরি। জলাতঙ্ক একটি ভয়ানক রোগ। এ রোগের কারণ ও প্রতিরোধের উপায়ও আমাদের জানা আছে। নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলে চাই সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ। চলুন আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করি ও জলাতঙ্কমুক্ত দেশ গড়ি। পৃথিবীর অন্য দেশ যদি জলাতঙ্ক রোগ নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল করতে পারে, আমরাও নিশ্চয়ই পারব।
লেখকঃ সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
ভাইস প্রেসিডেন্ট, অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল অব র্যাবিস ইন বাংলাদেশ



