Skip to main content

মানসিক সুস্বাস্থ্যে চাই সচেতনতা

ডা. তাজুল ইসলাম

প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। বাংলাদেশেও এ দিবসটি গুরুত্বসহকারে পালন করা হয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য হচ্ছে : অগ্রগতির জন্য প্রয়োজন বড় ধাক্কা : মানসিক স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ করুন। জোর ধাক্কার কথা আমরা তখনই বলি যখন অনেক পিছিয়ে পড়া কোনো কিছুকে সামনে দ্রুত এগিয়ে আনতে হয়। যে সমাজ, শ্রেণী, পেশা অনেক পশ্চাতে পড়ে আছে তাকে অগ্রসর অংশের সমান লেভেলে তুলে আনতে প্রয়োজন বিরাট আন্দোলন, জাগরণ বা বিরাট ধাক্কার। এ ক্ষেত্রে ছোটখাটো ধাক্কা তেমন কাজে আসে না।

মানসিক স্বাস্থ্য : বিশ্ব ও বাংলাদেশ প্রেক্ষিত
আমাদের দেশে তো বটেই পৃথিবীর সব দেশেই অন্যান্য স্বাস্থ্য খাতের তুলনায় মানসিক স্বাস্থ্য খাত অনেক পিছিয়ে রয়েছে। অজ্ঞতা, কুসংস্কার, অনাগ্রহ যে কারণেই হোক মানসিক রোগীর চিকিৎসাব্যবস্থা সমাজ-রাষ্ট্র-পেশাজীবীসহ সবার কাঙিক্ষত মনোযোগ পায়নি। অথচ মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা শারীরিক স্বাস্থ্যের তুলনায় কোনো অংশে কম নয়। সংখ্যাগত দিক, ভোগান্তির দিক, জাতীয় উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধির ক্ষতির দিক এমনকি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কারণে মৃত্যু হারের দিক থেকেও মানসিক স্বাস্থ্যকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে নন-কমিউনিকেবল ডিজিজের ভয়াবহতা ও গুরুত্বের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এত দিন আমরা জানতাম সংক্রামক ব্যাধির কারণে মৃত্যুহার বেশি হয়। তাই এ ব্যাধিকে বেশি অগ্রাধিকার দিতে হবে। তবে বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য চিত্রে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। অনেক দেশই সংক্রামক ব্যাধিকে অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছে। কিন্তু এত দিন অসংক্রামক ব্যাধিকে উন্নত দেশগুলোর স্বাস্থ্য সমস্যা মনে করে আমরা দরিদ্র দেশের নাগরিকরা কিছু আত্মতৃপ্তিতে ছিলাম। তবে সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের সব দেশে অসংক্রামক ব্যাধির কারণে মৃত্যুহার শতকরা ৬০-৬৫ ভাগ। এ অসংক্রামক ব্যাধির মতো যেমন রয়েছে ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, হূদরোগ তেমনি রয়েছে মানসিক রোগও। বরং মানসিক রোগ উপরোক্ত ব্যাধিগুলো ছাড়াও অন্যসব শারীরিক রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি, মাত্রা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখে থাকে।

মানসিক থেকে শারীরিক সমস্যা
অনেকের মধ্যেই একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে হাঁপানি, ম্যালেরিয়া যেমন একেকটি রোগ; মানসিক রোগও তেমনি একটি রোগ মাত্র। তাই এর গুরুত্ব ও ব্যাপ্তি তেমন বড় নয়। শারীরিক যত ধরনের ব্যাধি বা লক্ষণ হতে পারে তার সব লক্ষণই কোনো না কোনো মানসিক রোগেরও লক্ষণ হতে পারে। পা থেকে মাথা পর্যন্ত শরীরের প্রতিটি তন্ত্রের মধ্যেই মানসিক সমস্যা বা রোগের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। বরং শারীরিক লক্ষণ ছাড়াও আরও বহুবিধ ধরন ও লক্ষণ নিয়ে রোগীরা সাধারণ চিকিৎসকের কাছে হাজির হন যেগুলো পূর্ণভাবে মানসিক সমস্যা বা রোগের লক্ষণ।

এর ব্যাপকতা ও ভয়াবহতা যে দিন দিন বাড়ছে সে সম্পর্কে সচেতন মানুষ মাত্রই অবগত রয়েছেন। আমাদের দেশের মানসিক স্বাস্থ্যের সার্বিক চিত্রের কয়েকটি পরিসংখ্যান দিচ্ছি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় পরিচালিত দুটি কমিউনিটি সার্ভের ফলাফল থেকে দেখা যায়, ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে প্রাপ্তবয়স্ক জনগণের মাঝে মানসিক রোগের হার শতকরা ১৬ ভাগ এবং ১৮ বছরের নিচে শিশু-কিশোরদের মধ্যে মানসিক রোগের হার শতকরা ১৮.৪ ভাগ। আমাদের দেশের জনগোষ্ঠীর শতকরা ৩৪.৪ ভাগ লোক কোনো না কোনো ধরনের মানসিক রোগে ভুগছে, এর সংখ্যা ৫ কোটি ৬০ লাখ। অথচ এর বিপরীতে আমাদের দেশে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন ২২৩ জন। যা প্রতি ১ লাখ জনসংখ্যার জন্য ০.০৭ জন। মানসিক রোগীদের জন্য মানসিক হাসপাতাল, পাবনায় রয়েছে ৫০০ শয্যা অর্থাৎ প্রতি ১ লাখ জনসাধারণের জন্য ০.৪ শয্যা; দেশের বিভিন্ন স্বাস্থ্যবিষয়ক আন্তঃবিভাগে ৮১৩টি শয্যা (প্রতি লাখ জনসাধারণের জন্য ০.৫৮ শয্যা) ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটে রয়েছে ২০০টি শয্যা। সবচেয়ে অবাক হওয়ার বিষয় মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বাজেটে বরাদ্দ রয়েছে স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র শতকরা ০.৪৪ ভাগ।

তাহলে সহজেই অনুমেয় সমস্যার ব্যাপকতার তুলনায় আমাদের রিসোর্স কত কম। মানসিক স্বাস্থ্য শাখাটি কত বেশি পিছিয়ে রয়েছে। তবে উন্নত দেশে আমাদের চেয়ে অবস্থা অনেক ভালো হলেও সেসব দেশের অন্য স্বাস্থ্য খাতের তুলনায় মানসিক স্বাস্থ্য অনেক পিছিয়ে আছে। তাই সঙ্গত কারণেই এবারের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ঠিক করা হয়েছে। অগ্রগতির জন্য প্রয়োজন জোর ধাক্কা : মানসিক স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ করুন। এ উদ্যোগ ও ধাক্কা আসতে হবে নীতি-নির্ধারক, প্রশাসন, পেশাজীবী এবং সচেতন জনগণসহ মিডিয়া ও সুশীল সমাজের কাছ থেকে। এ ধাক্কা হতে হবে বড় মাপের। এর জন্য প্রথমেই প্রয়োজন মানসিক স্বাস্থ্যে বিরাট অঙ্কের বিনিয়োগ। এ বিনিয়োগ সরকারিভাবে তো হতে হবে ঠিকই তবে বেসরকারি উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এ আর্থিক বিনিয়োগ ছাড়াও জ্ঞান, মেধা, শ্রম, সচেতনতা সৃষ্টিসহ নানাবিধ সামাজিক আন্দোলন এ মোমেন্টামকে আরও বেগবান করতে পারে। মানসিক রোগীরা অন্যদের মতো নিজের অধিকার আদায়ে মাঠে থেকে সোচ্চার ভূমিকা নিতে পারে না। আমরা সবাই তাদেরই অভিভাবক বা প্রতিনিধি।

লেখকঃ সহযোগী অধ্যাপক
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট, ঢাকা