ভীষণ রেগে গেছে। চণ্ডমূর্তি। প্রলয় নাচনে ফুঁসে উঠছে বারবার। এই রাগ প্রদর্শনী বহুমাত্রার হতে পারে। কড়া মেজাজ দেখানো, বিরামহীন কান্না বর্ষণ, সবকিছু পায়ের লাথিতে ভূমিসাৎ করে দেয়া, নিজেকে আঘাত করতে থাকা, একদম শ্বাস বন্ধ করে থাকা। মনে হয় এ যেন শিগগিরই থামছে না-সারা দিন চলতে থাকবে। আপনি কেবল সার্কাসের নীরব দর্শকের মতো বুক ধড়ফড় অবস্থা নিয়ে সময় পার করছেন। এর নাম ‘টেম্পার টেনট্রামস’। ছেলেমেয়ে উভয়ের সমান হারে হয়। সচরাচর বয়স এক-তিন বছর।
বাচ্চা কেন মেজাজ দেখায়
একটা উদাহরণ টানা যাক। আপনি ডিভিডি খুলে প্রোগ্রাম দেখতে চাচ্ছেন কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। নিজের রাগ আর হতাশার কথা ভেবে দেখুন। আর ছোট্ট বয়সের এ শিশু বিশেষ করে এখনো যার ভাষাজ্ঞান ভালোভাবে ফোটেনি। সে তার মনের কথা ভালোভাবে প্রকাশ করতে পারছে না।
- সে ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত কিংবা অস্বস্তিতে আছে। সে সবার মনোযোগ চায়। মেজাজ দেখানো এর এক ধরনের বহিঃপ্রকাশ।
- শিশু যখন কথা বলার নৈপুণ্য অর্জন করে তখন হতাশারূপ মেজাজ কমে আসে। তবে তার মধ্যে স্বাধীনচেতা মনোভাব বেশ পেকে বসে। সবকিছুর ওপর সে নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়, যদিও তার সে ক্ষমতা বেশ ক্ষীণ।
সন্তানের চণ্ডরাগ লাঘবের উপায়
প্রথম কাজ হলো শিশু যাতে রেগে না যায় সে জন্য ব্যবস্থা অবলম্বন-
- শিশুর প্রতি কিছু না কিছু মনোযোগ সব সময় রাখুন। তাকে সম্পূর্ণ পরিহার করে চলা সে সহ্য করে না।
- শিশুকে সব সময় কিছু করার সুযোগ দিন। তার মতামত জানুন। তুমি ব্রেকফাস্টের আগে না পরে দাঁত ব্রাশ করবে? যদিও এর বেশির ভাগ উত্তর আসবে- ‘না’।
- যদিও সব সময় সম্ভব নয়, বিশেষত বাইরের পরিবেশে শিশুর নাগালে ও চোখের সামনে কম জিনিস থাকা ভালো।
- শিশু যখন রেগে যাবে তাকে ভোলানোর মতো নতুন কোনো চমকজাগানিয়া খেলনা বা দৃশ্য তার সামনে হাজির করান।
- শিশুকে এমন প্রতিযোগিতা বা খেলায় নামান যা সে পারে-এতে সে আত্মবিশ্বাসী হয়, চিত্ত সন্তুষ্ট থাকে। সে পারবে না এমন অতি উচ্চাভিলাষী খেলনায়-খেলায় না জড়ানো ভালো।
- শিশুর যে কোনো বায়না সতর্কতার সঙ্গে মেটান। সাধ্যের বাইরে প্রতিশ্রুতি না জানানো ভালো।
- শিশুর ক্ষমতার কথা বিবেচনায় রাখা। খুব পরিশ্রান্ত শিশুকে নিয়ে অগ্রসর না হওয়া ভালো।
মেজাজ প্রদর্শনের ক্ষণে
- নিজে শান্ত থাকুন। পরিস্থিতি বুঝে নিন। একেক রাগে একেক রকম পানি ঢালতে হয়।
- শিশু যদি কোনো কিছু বায়না ধরে জেদ করতে থাকে তবে জানবেন এটা ওর বা অন্য কারও জন্য ক্ষতিকর নয়। তাই চোখ রেখে যান আর নিজের কাজে মগ্ন থাকুন। তবে ওকে একা রেখে চলে যাবেন না।
- শিশু যদি রেগে নিজেকে বা কাউকে আঘাত করে তবে তাকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে হবে।
- প্রি-স্কুল ও বড় শিশু রেগে গেলে তাকে স্কুলের রুমে পাঠিয়ে দিন। সে এই রাগ প্রদর্শনী কৌশল হিসেবে কাজে লাগাতে চায়। ধীরে ধীরে রাগের পারদ নেমে যাবে।
- শিশুকে পুরস্কৃত করতে যাবেন না। তাকে তার ভালো হয়ে ওঠার জন্য প্রশংসা করুন। আদর করুন।
- প্রয়োজনে শিশুবিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
লেখকঃ শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল



