Skip to main content

‘উদ্বেগ’ আপনার রক্তচাপ বাড়ায়

অধ্যাপক ডা. এআরএম সাইফুদ্দীন একরাম

মানসিক চাপ বা উদ্বেগের সঙ্গে উচ্চরক্তচাপের কোনো সরাসরি সম্পর্ক দেখা যায় না। কিন্তু উদ্বেগ এবং মানসিক চাপ লাঘব হলে সার্বিক স্বাস্থ্য ভালো থাকার পাশাপাশি রক্তচাপ কম থাকতে দেখা যায়।

যেকোনো উদ্বেগ এবং মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী পরিস্থিতিতে প্রত্যেকেরই রক্তচাপ সাময়িকভাবে বেড়ে যায়। কিন্তু সবার মনে একটি প্রশ্ন- উদ্বেগজনিত রক্তচাপের এ রকম বাড়াটা কি দীর্ঘমেয়াদে উচ্চরক্তচাপে পরিণত হতে পারে? কিংবা বারবার অতিরিক্ত মানসিক চাপের ফলে রক্তচাপ বেড়ে যেতে যেতে এক সময় কি তা সত্যিকারের উচ্চরক্তচাপ সৃষ্টি করে? দেখা যায় যেসব কার্যকলাপে উদ্বেগ কমে এবং মানসিক চাপ লাঘব করে, সেগুলো উদ্বেগজনিত অতিরিক্ত রক্তচাপ কমায়। যেমন-প্রতিদিন এক ঘণ্টা হাঁটলে, দৌড়ালে কিংবা জগিং করলে উদ্বেগ কমে, আবার রক্তচাপও কমে। এ ধরনের শারীরিক পরিশ্রম দীর্ঘমেয়াদি উচ্চরক্তচাপ কমাতেও সাহায্য করে।

যে কোনো উদ্বেগজনক পরিস্থিতি এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপের ফলে আমাদের শরীরে নানা রকম হরমোন এবং অন্যান্য রাসায়নিক উপাদান নিঃসৃত হয়। এসব হরমোনের প্রভাবে হূৎপিণ্ডের বিট বেড়ে যায় এবং রক্তনালি সংকুচিত হয়। ফলে রক্তচাপ বেড়ে যায়। এখন পর্যন্ত এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই যার সাহায্যে বলা যায়, মানসিক চাপ দীর্ঘমেয়াদি উচ্চরক্তচাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু উদ্বেগ এবং মানসিক চাপে আমরা এমন কিছু কাজ করি যা উচ্চরক্তচাপ সৃষ্টি করতে সাহায্য করে। যেমন- উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপ থাকলে অনেকে অতিরিক্ত ভোজন করেন, মদ্যপান করেন, ধূমপানের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং নিদ্রাহীনতায় ভুগে থাকেন। এসব অভ্যাস শরীরের ওজন বাড়ায় এবং পাশাপাশি রক্তচাপও বাড়ায়। শুধু তাই নয় ক্রমাগত অতিরিক্ত মানসিক চাপের মধ্যে বসবাসকারী ব্যক্তির রক্তচাপ শেষ পর্যন্ত বাড়ন্তই থেকে যায়।

এটাও সত্য যে, উদ্বেগ এবং মানসিক চাপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষণ্নতা ও বন্ধুবান্ধব এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতাবোধ ইত্যাদি হূদরোগ সৃষ্টি করতে পারে। কারণ উদ্বেগের ফলে যেসব অতিরিক্ত হরমোন নিঃসৃত হয়, তা রক্তনালির ক্ষতি সাধন করে এবং এমন পরিবর্তন ঘটায় তা হূদরোগের কারণ। আর অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং উদ্বেগ যে হতাশাবোধ এবং বিষণ্নতার সৃষ্টি করে তার ফলে অনেক আত্মঘাতী মনোভাব সৃষ্টি হয়। যেমন-সময়মতো ওষুধ সেবন না করা, স্বাস্থ্যহানিকর আচরণ এবং কার্যক্রমে জড়িত হয়ে পড়া।

আগেই বলা হয়েছে, উদ্বেগ এবং মানসিক চাপ সাময়িক রক্তচাপ বাড়ালেও তা দীর্ঘমেয়াদি উচ্চরক্তচাপ সৃষ্টি করে না এবং উদ্বেগ কেটে গেলে রক্তচাপ স্বাভাবিক হয়ে যায়। কিন্তু বারবার উদ্বেগ ও মানসিক পীড়ন রক্তনালির ক্ষতি সাধন করে; এমনকি হূদরোগ এবং কিডনির সমস্যা সৃষ্টি করে। আর উদ্বেগ ও মানসিক পীড়নের ফলে যেসব প্রতিক্রিয়ামূলক আচরণ সৃষ্টি হয় তা হলো ধূমপান, মদ্যপান, অতিভোজন কিংবা খাদ্যে অনীহা ইত্যাদি উচ্চরক্তচাপের ঝুঁকি সৃষ্টি করে এবং এর ফলে গুরুতর হূদরোগ, এমনকি স্ট্রোক বা মস্তিষ্কের পক্ষাঘাত হতে পারে।

অতএব মানসিক চাপ লাঘব করা এবং উদ্বেগমুক্ত থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে সার্বিকভাবে আমাদের শারীরিক সুস্থতা বজায় থাকে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়। উদ্বেগমুক্ত ও মানসিক চাপবিহীন জীবনযাপনের জন্য নানা রকম পদ্ধতি এবং কৌশল অনুসরণ করা যেতে পারে। যেমন-

  • প্রাত্যহিক কার্যক্রমের রুটিনটি সহজসাধ্য রাখতে হবে। যেসব কাজ জরুরি সেগুলোকে প্রাধান্য দিতে হবে এবং প্রতিটি কাজ যেন স্বাভাবিক গতিতে সুচারুভাবে সম্পন্ন করা যায় তার জন্য যথেষ্ট সময় হাতে রাখতে হবে। গুরুত্বহীন কার্যকলাপে সময় ব্যয় না করা উত্তম।
  • শিথিলায়নের জন্য শ্বাসগ্রহণ সচেতন শিথিলায়নের জন্য গভীর শ্বাসগ্রহণ ও ত্যাগ করার অভ্যাস রপ্ত করা শরীরের জন্য উপকারী।
  • নিয়মিত শরীরচর্চা করা মানসিক চাপ লাঘবের জন্য অত্যন্ত উপকারী। অতিব্যস্ত মানুষও যদি প্রতিদিন আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা হাঁটেন, দৌড়ান কিংবা জগিং করেন, তা উদ্বেগনাশক এবং রক্তচাপ থেকে ১০ মি:মি: পারদ চাপ কমায়।
  • যোগব্যায়াম এবং ধ্যানচর্চা করা যেতে পারে। এর ফলেও মানসিক স্থিতি এবং প্রশান্তি লাভ করা যায় এবং রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে।
  • পর্যাপ্ত ঘুম অত্যন্ত দরকারি। নিদ্রাহীনতা উদ্বেগ বাড়ায়, মানসিক চাপের জটিলতা বৃদ্ধি করে। কিন্তু পর্যাপ্ত ঘুম মনে প্রশান্তি আনে, পরিস্থিতিকে সহনীয় করে তোলে।
  • ইতিবাচক মনোভাব বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। সমস্যা মোকাবেলা করতে হলে সমাধান খুঁজতে হবে। অভিযোগ করে কিংবা নেতিবাচক মন্তব্য করে কোনো সমস্যার সমাধান করা যায় না।

অতএব স্থির মস্তিষ্কে সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য সমাধান খুঁজে তা প্রয়োগ করা উদ্বেগ ও মানসিক চাপ কমানোর প্রকৃত ওষুধ।
ব্যক্তিবিশেষে উদ্বেগ লাঘব ও মানসিক চাপ কমানোর কৌশল ভিন্ন হতে পারে। কৌশল যাই হোক উদ্বেগমুক্ত থাকা এবং মানসিক চাপবিহীন থাকার চেষ্টা করার বিকল্প নেই।

লেখকঃ বিভাগীয় প্রধান, মেডিসিন বিভাগ
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ