Skip to main content

COMA এবং ব্রেইন ডেথ্‌

ডা. মো. মাহাবুবুর রহমান

 

একজন মানুষের চেতনার স্বাভাবিক পর্যায়টি এমন একটি অবস্থা যখন মানুষটি তার নিজের ও পারিপার্শ্বিকতা সম্বন্ধে সম্পূর্ণ সজাগ থাকেন এবং সর্বপ্রকার অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বাহ্যিক উদ্দীপনায় সাড়া দেন। মানুষের চেতনার পর্যায়গুলো নির্ণয় করা হয় বিভিন্ন বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উদ্দীপনায় তার সাড়া দেয়া, স্বাভাবিক কথাবার্তা ও ব্যবহার, ঘুম থেকে জেগে ওঠা ও স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারার ওপর। চেতনার স্বাভাবিকতা নিয়ন্ত্রিত হয় বহুলাংশে সেরিব্রাল কর্টেক্স থেকে এবং সেরিব্রাল হেমিস্ফিয়ারের বিশেষ বিশেষ এলাকা অথবা ব্রেনস্টিমের টিস্যুগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে মানুষের চেতনার স্বাভাবিকতা ব্যাহত হয়।

কোমা হচ্ছে অচেতন অবস্থার একটি অপরিবর্তনীয় পর্যায়, যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তিটির বাহ্যিক উদ্দীপনা অথবা অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রতি সাড়া দেয়ার মতো ব্যাপারগুলো অনুপস্থিত থাকে। যদিও এ ক্ষেত্রে চোখ খোলা অথবা ব্যথাদায়ক কোনো উদ্দীপনায় গোঙানির মতো শব্দ করা এগুলো থাকতে পারে। কোমার কারণ হিসেবে আমরা প্রথমেই যে বিষয়গুলো চিন্তা করি সেগুলো হলো-

১.    মস্তিষ্কে আঘাত
২.    মাত্রাতিরিক্ত মাদকদ্রব্য অথবা ঘুমের ওষুধ সেবন
৩.    রক্তে অক্সিজেনের অনুপস্থিতি
৪.    রক্তে অক্সিজেনের ঘাটতিজনিত টিস্যুর ক্ষতিগ্রস্ততা, রক্তে     গ্লুকোজের পরিমাণ কমে যাওয়া বা হাইপোগ্লাইসেমিয়া এবং
৫.    রক্তে খনিজ লবণের ভারসাম্যহীনতা প্রভৃতি। কোমা একটি মেডিক্যাল ইমারজেনিস যেখানে আক্রান্তদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য রক্ষা, কোমা-পরবর্তী মস্তিষ্কের অপরিবর্তনীয় ক্ষতিকে রোধ করা এবং এ অবস্থা থেকে ফিরে আসার মতো রোগীদের চিহ্নিত করার জন্য তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

কোমার তাৎক্ষণিক চিকিৎসা
প্রথমেই আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাস ও রক্ত চলাচলের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য অক্সিজেন, কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস অথবা অ্যান্ডোট্র্যাকিয়াল ইনটিউবেশন প্রয়োজন হতে পারে। স্যালাইনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ফ্লুইড দিতে হবে। দরকার হলে যে কোনো প্লাজমা এক্সপান্ডার অথবা ভেসোপ্রেসোর অ্যাজেন্ট ব্যবহার করতে হবে। মাথায় বা শরীরের কোথাও কোনো আঘাত আছে কিনা দেখতে হবে। গ্লাসগো কোমা স্কেলের মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তি কোমার কোন পর্যায়ে আছে তা নির্ণয় করতে হবে। কোমার ঘটনাটি কখন কীভাবে শুরু হলো তা আদ্যোপান্ত জানতে হবে, জরুরি বিভাগ অথবা ক্যাজুয়ালিটিতে কর্তব্যরত চিকিৎসক অবশ্যই কোমার পুরো ইতিহাসটি জেনে নেবেন, নিদেনপক্ষে অ্যাম্বুলেনস অথবা পুলিশের লোকের কাছ থেকে হলেও। বিষপ্রয়োগ, মাত্রাতিরিক্ত মাদকদ্রব্য বা ঘুমের ওষুধ সেবন, দুর্ঘটনাজনিত কোমার কেসগুলো সাধারণত কোমার ইতিহাস থেকে সহজেই চিহ্নিত করা যায়।

এরপর রোগীকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করতে হবে। অ্যালকোহল অথবা ঘুমের ওষুধজনিত কোমার ক্ষেত্রে শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক রকম কমে যেতে পারে। কোমার রোগীর বেশি তাপমাত্রা কোনো সিস্টেমিক ইনফেকশন, মেনিনজাইটিস, এনকেফালাইটিস, অ্যাবসেস-পরবর্তী জটিলতা নির্দেশ করে। আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তচাপের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শক, মায়োকার্ডিয়াল ইনফারকশন, সেপটিসেমিয়া-পরবর্তী জটিলতাজনিত কোমায় সাধারণত নিুরক্তচাপ পাওয়া যেতে পারে। শারীরিক পরীক্ষার আরেকটি জরুরি বিষয় হচ্ছে শ্বাস-প্রশ্বাস। আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি, গভীরতা, নিঃশ্বাসের সাথে নির্গত যে কোনো ধরনের গন্ধ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মাত্রাধিক্য অ্যালকোহল সেবনের ক্ষেত্রে নিঃশ্বাসের সাথে তার গন্ধ পাওয়া যাবেই। অ্যারোমেটিক ফ্লেভারের কিটোন বডির গন্ধ পেলে বুঝতে হবে আক্রান্ত ব্যক্তিটি ডায়াবেটিক রোগী এবং তার কোমায় যাওয়ার কারণ রক্তে গ্লুকোজ স্বল্পতাজনিত কিটোঅ্যাসিডোসিস। ওষুধ বা অন্য কোনো বিষক্রিয়াজনিত কোমার ক্ষেত্রে ধীরগতিসম্পন্ন অগভীর শ্বাস-প্রশ্বাস এবং নিউমোনিয়া বা বিপাকজনিত অ্যাসিডোসিসের ক্ষেত্রে গভীর দ্রুতলয়ের শ্বাস-প্রশ্বাস পাওয়া যেতে পারে। কোমায় আক্রান্ত ব্যক্তির স্বায়ুতন্ত্রের পরীক্ষা বা নিউরোলজিক্যাল পরীক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ব্রেইনস্টিমের নিয়ন্ত্রণাধীন শারীরিক কাজগুলো, আলোর বিপক্ষে পিউপিল ও কর্নিয়ার প্রতিক্রিয়া, চোখের স্বাভাবিক নড়াচড়া, মোটর ফাংশন এসবও দেখতে হবে। এর পাশাপাশি মাথার খুলি, ঘাড় ও শিরদাঁড়ায় কোনো সমস্যা আছে কি না তা-ও দেখতে হবে। অপথ্যালমোস্কপি করা হলে খুবই ভালো হয়। কান ও নাকও ভালোভাবে পরীক্ষা করতে হবে। নিউরোলজিক্যাল পরীক্ষাগুলো করার পর গ্লাসগো কোমা স্কেলের মাধ্যমে রোগী কোমার কোন পর্যায়ে আছে, তা আবারও নির্ণয় করতে হবে এবং প্রাপ্ত স্কোরটিকে পূর্ববর্তী স্কোরের সাথে তুলনা করতে হবে। এতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের পর থেকে এ পর্যন্ত রোগীর উন্নতি বা অবনতি হয়েছে কি না তা বোঝা যাবে এবং সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যাবে। উন্নত বিশ্বে সাধারণত কর্তব্যরত নার্সের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর গ্লাসগো কোমা স্কেলের সাহায্যে এ ধরনের রোগীর মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা থাকে।

ল্যাবরেটরি পরীক্ষা
কোমায় আক্রান্ত একজন রোগীর ক্ষেত্রে শুরুতেই রুটিন প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষাগুলো করিয়ে ফেলতে হবে। আমরা সাধারণত যত দ্রুত সম্ভব রুটিন পরীক্ষা, রক্তে শর্করা ও খনিজ লবণের পরিমাণ নির্ণয় এবং কিডনি ও লিভার ফাংশন টেস্টগুলো করার জন্য রক্ত ও মূত্রের নমুনা ল্যাবরেটরিতে পাঠিয়ে থাকি। ইমেজিংয়ের মধ্যে বুকের এক্স-রে একটি রুটিন পরীক্ষা। সিটিস্ক্যান (বহুল ব্যবহূত) এবং অবস্থাভেদে এমআরআই করা যেতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী অন্যান্য পরীক্ষাও করা হয়।

কোমার রোগীদের একটি বিরাট অংশেরই প্রয়োজন হয় দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার। দীর্ঘ সময় ধরে ওষুধ সেবন, নিয়মিত পথ্য এবং ভালো নার্সিংয়ের প্রয়োজন হয়। কোমার রোগীর আংশিক বা সম্পূর্ণ ভালো হওয়ার সম্ভাবনা নির্ভর করে কোমার কারণ, পর্যায়, সময়কাল এবং আরও কিছু ক্লিনিক্যাল সাইনের ওপর। মাথায় আঘাতজনিত কোমার ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির বয়স, মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বেঁধেছে কি না, অন্য কোনো সিস্টেমিক ইনজুরি আছে কি না প্রভৃতি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মস্তিষ্কে আঘাতজনিত কারণ ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে বিপাকজনিত কারণ (যেমন হাইপোগ্লাইসেমিয়া) অথবা সংক্রমণ বা তৎপরবর্তী জটিলতাজনিত কোমার রোগীদের সম্পূর্ণ ভালো হওয়ার সম্ভাবনা সর্বাধিক।

ব্রেইন ডেথ্‌
১৯৭৬ ও ১৯৭৯ সালে অনুষ্ঠিত রয়েল কলেজের বিভাগীয় সম্মেলনের প্রস্তাব অনুযায়ী ব্রেইন ডেথ্‌ বা ব্রেইনস্টিম ডেথকে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এই সংজ্ঞা অনুসারে ব্রেইন ডেথ হলো অচেতন অবস্থা থেকে সচেতন অবস্থায় ফিরে না আসার অপরিবর্তনীয় পর্যায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে না পারার অপরিবর্তনীয় পর্যায়ের সমন্বিত রূপ। কোমার রোগীর ব্রেইন ডেথের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য নিচের তিনটি বিষয় সবার আগে বিবেচনা করা হয়-

১.    এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, রোগীর বর্তমান অবস্থা জ্ঞান কারণসমপন্ন অপরিবর্তনীয় ব্রেইন ড্যামেজের ফল।
২.    গভীর কোমায় আচ্ছন্ন এ রোগীর বর্তমান অবস্থাটি কোনো বিপাকীয় বা অন্তঃক্ষারীয় ভারসাম্যহীনতা বা অত্যন্ত কম তাপমাত্রা (হাইপোথার্মিয়া) নয়, যা প্রাথমিকভাবে পরিবর্তনীয়।
    এটা মোটামুটি সর্বজনস্বীকৃত, ব্রেইন ডেথ বহুলাংশেই বিপাকীয় বা অন্তঃক্ষারীয় ভারসাম্যহীনতার (ডায়াবেটিস, ইনসিপিডাস, হাইপোন্যাট্রেমিয়া) কারণ নয় বরং তার ফলাফল।
৩.    ভেন্টিলেটরের মাধ্যমে রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাস চালানো হচ্ছে, কারণ তার স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে গেছে।
    উপরের বিষয়গুলো নিশ্চিত হওয়ার পর নিচের বিষয়গুলো নিশ্চিত হওয়ার জন্য রোগীকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করা হয়-
১.    রোগীর চোখের পিউপিল স্থির এবং তীব্র আলোতেও প্রতিক্রিয়াহীন।
২.    রোগীর কর্নিয়াল রিফ্লেক্স এবং অকুলোভেসটিকুলার রিপ্লেক্স অনুপস্থিত।
৩.    পর্যাপ্ত উদ্দীপনা সত্ত্বেও রোগীর মোটর রেসপন্স অনুপস্থিত।
৪.    রোগীকে দীর্ঘক্ষণ ভেন্টিলেটরের বাইরে এনে রাখলেও শ্বাসযন্ত্রের কোনো নড়াচড়া অনুপস্থিত।

এটা নিশ্চিত করতে হবে যে, উপরের সব পরীক্ষা নির্ভুলভাবে করা হয়েছে এবং কমপক্ষে দুজন চিকিৎসকের কাছ থেকে একই ফলাফল পাওয়ার পরই ব্রেইন ডেথের চূড়ান্ত ঘোষণা দেয়া যাবে, তার আগে নয়।