মানসিক রোগ শিক্ষা, গবেষণা, চিকিৎসা ও জনসচেতনতায় পথিকৃৎ
পূর্ব প্রকাশের পর
এটা হলো তেমনি একটা অবস্থা যাতে পূর্বের প্রজন্মের লোকদের মনোসমীক্ষকগণ ‘চারিত্রিক বৈকল্য’ বা ক্যারেক্টার ডিসঅর্ডার অথবা সাইকোনিউরোসিস হিসেবে চিকিৎসা করতেন। বর্তমানে অনেক ধরনের প্রতিযোগিতামূলক থেরাপি আছে-সম্ভবত অন্য দেশের চেয়ে বেশির ভাগই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। তার মধ্যে সাইকোঅ্যানালাইটিক, কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল ইন্টারপার্সোনাল এবং ন্যাশনাল ইমোটিভ অরিয়েন্টেশনের নাম করলেও কয়েকটির মাত্র নাম করা হয়। অ্যানালাইটিকের রাজ্যেই অনেকগুলো স্কুল এবং অরিয়েন্টেশন রয়েছে-অর্থোডক্স, আলডারিয়ান, সুল্লিভানিয়ান, জাঙ্গিয়ান, হার্নিয়ান, রীচিয়ান, খৌটিয়ান ও অন্যান্য। এর সবগুলোই ব্যক্তিত্বে গোলযোগ নিয়ে চিকিৎসা করে তা যতই জটিল হোক না কেন। সাপোর্টিভ থেরাপিকে একটা আলাদা থেরাপি হিসেবে অথবা অন্যান্য থেরাপির তুল্য হিসেবে দেখা যেতে পারে। এসব বিভিন্ন চিকিৎসা রীতিনীতিকে দুটি প্রধান ভাগে পুনঃবিন্যাস করা যেতে পারে। প্রাথমিকভাবে ওইগুলো যার পূর্বাভিমুখীনতা হচ্ছে রোগীর চিন্তার ও মানসিক কল্পনার ছাঁচকে পরিবর্তন করা এবং ওই সকল যাদের প্রাথমিক পূর্বাভিমুখীনতা হচ্ছে ব্যবহার-আচরণের পরিবর্তনের দিকে। সাপোর্টিভ থেরাপিতে যেহেতু রয়েছে বৈদ্যুতিক সাজসরঞ্জাম-উপাদান এটাকে ওই বিভাজনের কোনো একটাতেও যথাযথভাবে স্থাপন করা যায় না। দুটো অথবা তার বেশি চিকিৎসার ক্ষেত্রে ব্যাখ্যার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে তারা বিহেভিয়ার চেঞ্জিং থেরাপির পরিবর্তে মাইন্ড চেঞ্জ থেরাপির দিকে টেনে নিয়ে যায়। অন্যান্য উদাহরণে এই দুটো শ্রেণীর মধ্যে একটিকে তুলনা করা হয় সাপোর্টিভ ট্রিটমেন্টের সাথে।
বর্তমানের অনেক সুযোগী চিকিৎসকের মত হচ্ছে এই যে, সব ধরনের কার্যকরী মনোরোগ চিকিৎসার যে বৈশিষ্ট্যটা সাধারণ তা হচ্ছে অন্যের চিন্তার প্রতি সহমর্মিতা, যত্নশীল হওয়া, চিকিৎসকের ন্যায়পরায়ণতা, রোগীর জন্য সেখানে উপস্থিত থাকা-যতটুকু সম্ভব সাহায্য করা বা তার চেয়েও বেশি ভালো করা। শুধু নিয়মমাফিক রোগীদের ছেড়ে দেয়া ঠিক নয়। থেরাপিতে মনোযোগের মাধ্যমে যে উন্নতি হয় এবং যা বেশির ভাগ আচার-আচরণের প্রতি পরিচালিত হয় তা রোগীর নিজস্ব মানসিক ভাবকে উন্নত এবং মিথ্যা ধারণাকে সঠিক করতে পারে। যার অর্থ দাঁড়ায় রোগীর চিন্তাধারার মধ্যে পরিবর্তন আনয়ন করে। এই পদ্ধতির মধ্যে যে কোনো ধরনের চিকিৎসা আসুক না কেন ঝঃবৎহ যেভাবে আমাদের জ্ঞাত করেছেন এটা সেই পদ্ধতির সমস্ত উপাদানকে পরিবর্তন করে দেয়। বিভিন্ন প্রকৃতির পূর্বাভিমুখীনতার বিভিন্ন ঈপ্সিত ফলদানের পার্থক্যকে খুব কম সময়ের মধ্যে মাপার প্রবণতা দেখা যায়। সচরাচর এক বছর বা দুই বছর। তথাপি প্রতিটি বিশিষ্ট পদক্ষেপকারী ঘোষকগণ তাঁদের পরিমিত পার্থক্যের জিনিসটিকে তুলে ধরে তাদের পদ্ধতির উৎকৃষ্টতা প্রমাণ করতে প্রয়াস পান। এই পার্থক্যসমূহ সম্ভব যা দেখানোর চেষ্টা করা হয়, আর তার চেয়ে অনেক কম শক্তিশালী এবং যে পার্থক্যসমূহ উপস্থিত থাকতে পারে তা অবশ্যই রোগীদের মধ্যস্থিত সংস্কৃতিগত পার্থক্যের জন্য হতে পারে। হতে পারে ভিন্নতর পূরাভিমুখীনতার জন্য।
ঝঃবৎহ এটাও উল্লেখ করেছেন যে সৌন্দর্য বিজ্ঞান ও রাজনৈতিক বিবেচনা থেরাপির সমীকরণের মধ্যে প্রবেশ করেছে। একজনকে শুধু সামপ্রতিক চীন ও সোভিয়েত রাশিয়ার কথা ভাবা প্রয়োজন, যেখানে মনোরোগ চিকিৎসার দ্বারা সুস্থ হওয়ার জন্য কাজকে ধরা হয় উপশমের মাধ্যম। রোগীরা ভালো হয়ে যায় উৎসাহের মাধ্যমে, কাজ বণ্টনের মাধ্যমে, কাজের ভুবনে পুনঃপ্রবেশের মাধ্যমে। রোগীদের অভ্যন্তরীণ জীবন, তাদের জীবনের স্বপ্ন এবং বন্ধুত্ব তাদের চিকিৎসকদের কাছে খুব একটা আকর্ষণীয় বস্তু নয়। তারা এই ধরনের সংস্রবকে মধ্যবিত্ত বুর্জুয়াশ্রেণীর অবক্ষয় বলে গণ্য করতেন। এই ধরনের আচরণগত কর্মকেন্দ্রিক ছিল কমিউনিস্ট/ কালেটিভিস্টদের রাজনৈতিক নীতি। পাশ্চাত্য দেশে ব্যক্তির স্বয়ংসম্পূর্ণতার ওপর প্রত্যক্ষকরণ রাজনৈতিক পদ্ধতির মধ্যে সূক্ষ্মভাবে প্রবেশ করত এবং হঠাৎ আশ্চর্যজনকভাবে নয়। এটা চিকিৎসা পদ্ধতির ক্ষেত্রেও একইভাবে হতো।
আমরা চিনতে শুরু করেছি যে, অনেক ধরনের শক্তিশালী মনোরোগ চিকিৎসার কার্যকরী ব্যবস্থা আছে। প্রত্যেকটি আবার সুসংহত ও অধিকতর শক্তিসম্পন্ন মনের আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তার এক একটির বিষয়ে জানতে অনেক বছর সময় লাগে। প্রত্যেকটি বিষয় নির্মিত হয়েছে একজন চাতুর্যপূর্ণ প্রতিষ্ঠাতার জ্ঞান-বুদ্ধি ও ঈশ্বরপ্রদত্ত কলাকৌশলের মাধ্যমে। সম্ভবত সবচেয়ে আদর্শিক চিকিৎসক তিনি হবেন সর্বপ্রকার প্রয়োজনীয় পদ্ধতির সুপণ্ডিত। কিন্তু এই প্রশিক্ষণের পরিসর খুব কমই সারাজীবনের জন্য তুষ্টকর হতে পারে। নিশ্চিত করেই আদর্শের মডেল, ব্যক্তিত্বের গোলযোগ বোঝার ও চিকিৎসা করার জন্য সমস্ত চালু প্রতিদ্বন্দ্বী স্কুলের সবচেয়ে যুক্তিসিদ্ধ ও কার্যকরী দিকসমূহকে একত্রিত করা উচিত।
এটা একটা অত্যধিক ভীতি ও নিরুৎসাহব্যঞ্জক কাজ। তথাপি আমাদের দলের অনেক পণ্ডিত ব্যক্তি তাদের চেষ্টাকে পরিচালিত করছেন এটার সংযোগ সাধনের জন্য। তাদের মধ্যে বিখ্যাত হলেন Danid Stein and Jeffrey young যাদের অধুনা প্রকাশিত পুস্তকে কগনিটিভ অ্যাপ্রোচ এবং তার সাথে মনোসমীক্ষণের আদর্শের সুফল ও ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আগামী যুগে এই মনোভাব বজায় থাকলে তা বিভিন্ন প্রকার কলাকৌশলের মধ্যে কোনটাকে গ্রহণ বা কোনটাকে বর্জন করব এই ধরনের মনোভাব অনেক কমে আসবে। যখন সম্ভাব্য সব ধরনের মনোরোগ চিকিৎসার নৈপুণ্যকে একত্রিত করে একটা নমনীয় পদ্ধতির উন্নতি লাভ করবে, যা হবে সব রোগী ও ডাক্তারের কাছে গ্রহণীয়।
জীববিদ্যাবিষয়ক মানসিক
গোলযোগের চিকিৎসা
জীববিদ্যাবিষয়ক মানসিক বৈকল্যের চিকিৎসা তার সাথে জড়িত তাবৎ মন সম্বন্ধীয় রোগের বিষয়টি সমসাময়িক মনোরোগ চিকিৎসা মানচিত্রের অনেকখানি জায়গা জুড়ে বিসতৃতি লাভ করেছে। যেভাবে একটি শতাব্দী শেষ হয়ে যাচ্ছে তার সাথে সাথে আমাদের দৃষ্টি ব্যক্তিগত মনস্তত্ত্ব থেকে সরে গিয়ে চলে যাচ্ছে পুরোদমে আত্মার রসায়ন ও পদার্থবিদ্যার দিকে। যেভাবে ঘটেছিল জার্মানির মনোরোগ চিকিৎসা বিষয়ের ক্ষেত্রে ১৯ শতকের শেষার্ধে। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে কয়েকজন গবেষক এই অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন, আমি বিশ্বাস করি যে তারা একটা নিরাপদ অবস্থানকে উপভোগ করতে পারবেন। অন্যরা ধারণা করতে পারেন এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ পথে যা আমরা ১৯৯০ দশকের মধ্যভাগে থেকে খুব জোর দিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারি না।
যে সকল প্রতিবেদন সব মানুষের মনোযোগ কাড়তে সক্ষম হয়েছে ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে যেমন the dexametha sone suppression test ছিল বিষণ্নতা রোগের জন্য অরক্ষিতার সূচি কিন্তু তা তাদের দাবি রক্ষা করতে সমর্থ হয়নি। অন্য বিষয় যেমন অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডারের ক্ষেত্রে basal ganglia abnormalities নিয়ে গবেষণা এবং সেরোটনিন রিআপটেক ইনহিবিটর চিকিৎসালয়ের প্রতিক্রিয়াসমূহ ১৯৮০-এর দশকের মধ্যভাগে খবরের হেডলাইন দখল করে নিয়েছিল এবং সেটা সাইকোবায়োলজিক্যাল গবেষণার সম্মুখভাগেই তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করে রেখেছিল। শেষ দশকে সিজোফ্রেনিয়া রোগের hyporrontality-এর গবেষণায় হৃদয়গ্রাহী ফলাফল পাওয়া গেছে। এই বৈকল্যের নেতিবাচক এবং আরো অনেক বেশি রঞ্জিত ইতিবাচক উপসর্গগুলো নতুন ওষুধের উদ্ভব ঘটিয়েছে। যেমন-ক্লোজিপাইন এবং রিসপেরিডল, যা অদ্যাবধি অনেক অবাধ্য নেতিবাচক উপসর্গের লাঘব করতে কিছুটা প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করছে।
সিজন্যাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডারকে ১৯৮০-এর দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত কেউ বড় একটা গ্রাহ্য করত না। এই সময়ের এক দশক পরে মেলাটোনিনের ওপরে গবেষণায় যা সিজন্যাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডারের সঙ্গে জড়িত। এমনকি জনপ্রিয় ম্যাগাজিনের কভারেজ পেয়েছে এবং একটা সুনাম লাভ করেছে-চিরন্তন যৌবনের চাবি এবং Jet lag থেকে মুক্তি হিসেবে। সজ্ঞানতা এবং স্মৃতির পেছনে যেসব কলকব্জা রয়েছে তা এখন ভালোভাবে হৃদয়ঙ্গম হচ্ছে। নবতর চাতুর্য বা কৌশল আসতে শুরু করেছে। এটা বলা এতটুকুও অতিরঞ্জিত হবে না যে বিগত ২০ বছর ধরে জীববিদ্যাবিষয়ক প্রত্যেকটি শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে সুগভীরভাবে গবেষণা করা হয়েছে এবং তার উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে। তার আদর্শ, পরিভাষা তৈরি হয়েছে। গবেষণাকর্ম গুরুতর মানসিক বিকৃতির সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূরে চলে গেছে। এখন এটা সুস্পষ্ট যে জীববিদ্যাবিষয়ক কারণগুলো বহু শতাব্দী ধরে কাজ করেছে। যেমন-জীববিদ্যার প্রভাবসমূহ সম্বন্ধে ধারণা পোষণ করে ছিলেন উইলিয়াম বেটিস তার ১৭৫৮ খ্রিষ্টাব্দের রচিত পাঠ্যপুস্তকে। তাতে তিনি বক্তব্য তুলে ধরেছিলেন Original এর বিরপরীতে Consequential madness সম্বন্ধে। তার মতে, Original আদিম বা প্রাথমিক পাগলামি বা মস্তিষ্ক বিকারত্বটা ঘটে থাকে Constitutional Predisposition বা শরীর বা মনের প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রবৃত্তি থেকে।
অধুনা অনেক ক্ষেত্রেই বিস্তর উন্নতি হয়েছে, যেখানে জীববিদ্যার উপাদান হচ্ছে বেশি সূক্ষ্ম। এই সমস্ত অঞ্চলের মধ্যে আমরা দেখতে পাব যৌনতার পূর্বাভিমুখীনতা, খাদ্যের গোলযোগ। তারপর যা আসে তা হচ্ছে কতগুলো মূল অঞ্চলের মধ্যস্থিত সংক্ষিপ্ত উদ্ভব বা বিকাশ।
-চলবে



