Skip to main content

রক্তে চর্বি ও খাদ্যাভ্যাস

আখতারুন নাহার আলো

আমাদের দেহে রক্তে যখন চর্বির আধিক্য দেখা যায়, তখন তা চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। কারণ রক্তে চর্বি বেশি থাকলে ধমনিগাত্রে রক্তের সঞ্চালন সীমিত হতে থাকে। কখনো কখনো রক্ত সঞ্চালন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এই বন্ধ হওয়া যদি করোনারি ধমনিতে হয়, তাহলে এর পরিণাম হার্ট অ্যাটাক আর যদি মস্তিষ্কের মধ্যে হয় তবে সেটা হয় স্ট্রোক। দুটি ঘটনা দুই রকম হলেও সাবধানতা অর্থাৎ জীবন-যাপন প্রণালী ও খাদ্য নিয়ন্ত্রণ একই রকমের হবে। অর্থাৎ উভয় ক্ষেত্রেই সম্পৃক্ত চর্বির আধিক্যের জন্য এটা ঘটে থাকে। এ জন্য বছরে অন্তত একবার রক্তের চর্বি মাপার জন্য লিপিড প্রোফাইল টেস্ট করা প্রয়োজন, যা রক্তের বিভিন্ন ধরনের চর্বি যেমন  কোলেস্টেরল, ট্রাইগ্লাইসেরাইড, এলডিএল ও এইচডিএলের মাত্রা নির্দেশ করে। এগুলোর আদর্শ মাপ হলো কোলস্টেরল ২০০ মিলিগ্রামের কম, ট্রাইগ্লাইসেরাইড ১৫০ মিলিগ্রামের কম এবং এলডিএল (খারাপ কোলেস্টেরল) ১০০ মিলিগ্রামের কম এবং এইচডিএল (ভালো কোলস্টেরল) ৪০ মিলিগ্রামের বেশি। এই মাত্রার বেশি হলেই হূদরোগ, স্ট্রোক, উচ্চ রক্তচাপ, ফ্যাটি লিভার ইত্যাদি দেখা যায়। যেসব কারণে রক্তে চর্বির মাত্রা বাড়তে পারে তা হলো ভুল খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান, কায়িক পরিশ্রমের অভাব, অধিক ওজন ইত্যাদি।

খাদ্যাভ্যাস
ব্যক্তির খাদ্যাভ্যাস তার দেহের ওপর খারাপভাবে প্রভাব বিস্তার করে। খাদ্যে যত বেশি সম্পৃক্ত চর্বি থাকবে যেমন-ঘি, মাখন, ডুবোতেলে ভাজা খাবার (ট্রান্স ফ্যাট), অধিক মিষ্টান্ন, অধিক চর্বিযুক্ত মাংস ইত্যাদি রক্তের চর্বিকে বাড়িয়ে তোলে। আবার হোটেল-রেস্টুরেন্টের খাবার, দাওয়াতের খাবার ঘন ঘন খেলেও রক্তে চর্বির পরিমাণ বেড়ে যায়। কোনো কোনো পরিবারে বংশানুক্রমিকভাবে ট্রাইগ্লাইসেরাইডের মাত্রা বেশি থাকতে দেখা যায়। এর কারণ হলো, সেসব পরিবারে রান্নার ধরন ও খাদ্যাভ্যাস অন্যদের তুলনায় ভিন্নতর হয়ে থাকে। পোলাও, বিরিয়ানি, কাবাব, পরোটা, রেজালা, রোস্ট, অধিক ঘি ও চিনির তৈরি মিষ্টান্ন তাদের নিত্যদিনের আহার। এদের মধ্যে হার্টঅ্যাটাক ও স্ট্রোকের মতো ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এদের রান্নায় অধিক তেলের ব্যবহার দেখা যায়।

সাধারণ আহার
ব্যাপারটি চমকপ্রদ। কারণ রিচ ফুড বা হাইক্যালরি বা সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত দামি খাবার খেলেই রক্তে চর্বি বাড়বে, এটা সবাই জানেন। কিন্তু বেশি ভাত, বেশি মিষ্টি ফলাহারেও কোলেস্টেরল-ট্রাইগ্লাইসেরাইডের মাত্রা বেড়ে যেতে দেখা যায়। এর কারণ অধিক শর্করা। শোষিত হওয়ার পর উদ্বৃত্ত শর্করা চর্বিতে রূপান্তরিত হয়। সেটাই রক্তে চর্বিরূপে দৃশ্যমান হয়। এদিকে নিম্নবিত্ত শ্রেণী যারা বড় মাছ, মুরগি, মাংস কিনে খেতে পারে না, যাদের ‘নুন আনতে পান্তা ফুরোয়’, তাদের মধ্যে রক্তে চর্বির আধিক্য চোখে পড়ে। এর কারণ মাছ-মাংসের স্বাদ গ্রহণের জন্য তারা মাছের ডিম, মাছের মাথা, মুরগির চামড়া, গুর্দা, কলিজা, গরুর ভুঁড়ি, মাংসের চর্বি ইত্যাদি খেয়ে থাকেন। আবার দেখা যায় মাছ-মাংসের পরিবর্তে তারা প্রায়ই ডিমের ওপর নির্ভর করতে থাকেন। এই খাবারগুলো দামে কম হলেও সম্পৃক্ত চর্বিতে ভরপুর। সুতরাং এ জন্যই তাদের রক্তে চর্বির মাত্রা দেখা যায়। আবার গৃহিণীদের বেলায়ও এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে। তারা সবাইকে মুরগির সবটুকু দিয়ে উদ্বৃত্তটুকু অর্থাৎ হাড়-চামড়া-মাথা ইত্যাদি খেয়ে থাকেন। দিনের পর দিন এ ধরনের আহার তাদের স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।

ধূমপান
সিগারেটের ধোঁয়ার মধ্যে কোনো চর্বি নেই। তবুও এটি কেন নিষেধ করা হয়, এ প্রশ্ন ধূমপায়ীদের। ধূমপানের ব্যাপারটি হলো-নিয়মিত ধূমপান করলে রক্তের নালিগুলো সংকুচিত হয়ে পড়ে। ফলে নালিতে চর্বি জমা হতে থাকে এবং শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।

তেল
উচ্চমাত্রায় তেলের ব্যবহার স্বাস্থ্যসম্মত নয়। যদিও তেল সবার জন্য প্রয়োজন। প্রতিদিন যেসব খাবার গ্রহণ করা হয় তা থেকে আমরা দুই ধরনের তেল পেয়ে থাকি-একটি দৃশ্যমান, অন্যটি অদৃশ্যমান। দৃশ্যমান হলো রান্নার সময় যে তেল-ঘি ব্যবহার হয়। আর অদৃশ্যমান হলো খাদ্যে নিহিত তেল, যা আপাতদৃষ্টিতে দেখা যায় না। যেমন মাছ, মাংস, ডিম, বাদাম, সয়াবিন, ভুট্টা ইত্যাদি। খাবারে তেল বা চর্বি কমাতে হলে কিছু পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

  • রান্নায় ঘি ও ডালডার পরিবর্তে উদ্ভিজ্জ তেল (নারিকেল তেল ছাড়া) ব্যবহার করতে হবে।
  • গরু, খাসির মাংস ও কলিজার পরিবর্তে মুরগির মাংস খেতে পারলে ভালো হয়।
  • প্রতিদিন মাছ খেতে পারলে ভালো হয়।
  • মাংস কাটার সময় পরিপাটিভাবে চর্বি ছাড়িয়ে নিতে পারলে ভালো হয়।
  • প্রতিদিনের আহারে শিম, ডাল ও বাদামের ব্যবহার বাড়াতে হবে।
  • খেতে হবে শাক-সবজি, সালাদ।
  • লো ফ্যাট ডেইরি প্রোডাক্ট খাবারে থাকলে ভালো হয়।
  • ভাপানো, ঝলসান, বেক, রোস্ট, পোচ অথবা রান্না যা-ই হোক খুব সামান্য তেল অথবা একেবারে তেল না দিয়ে রান্নার চেষ্টা করতে হবে।
  • ডুবোতেলে ভাজা খাবার (ট্রান্স ফ্যাট) সপ্তাহে দুই দিনের বেশি নয়।
  • ক্রিমযুক্ত পেস্ট্রি ও ডেজার্ট এক দিনের বেশি নয়।

যদি এভাবে সতর্কতার সঙ্গে খাবারে চর্বি কমানো যায়, তাহলে চর্বিসংক্রান্ত বিভিন্ন রোগ থেকে নিরাপদ থাকা সম্ভব।

লেখকঃ বিভাগীয় প্রধান, পুষ্টি বিভাগ
বারডেম জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা