Skip to main content

সম্পর্ক উন্নয়নে করণীয়

ড. মো. আলমাসুর রহমান

মানুষ সামাজিক জীব। পরিবার নিয়ে, সমাজ নিয়ে তাকে বসবাস করতে হয়। একজন মানুষ তত বেশি সফল ও জনপ্রিয় যত বেশি মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের উন্নয়ন হয়। একজন মানুষের এই সফলতার রহস্য হলো মানুষের প্রতি তার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। Unconditional love. অর্থাৎ শর্তহীন ভালোবাসা, শর্তযুক্ত ভালোবাসা কখনোই স্থায়ী ও দৃঢ় হয় না। আমাকে অমুক জিনিস দিলে ভালোবাসব বা আমাকে অমুক জিনিস দাও বলে ভালোবাসি। অর্থাৎ ওইসব জিনিস না পেলে বা না দিলে ভালোবাসা থাকবে না অথবা আমি তোমার জন্য বা তোমার ভালোবাসার জন্য এত সব কাজ বা পরিশ্রম করেছি বা করছি কিন্তু বিনিময়ে তুমি কী দিয়েছ বা করেছ। অর্থাৎ বিনিময়। অথচ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভালোবাসা কখনোই শর্ত সাপেক্ষে বা বিনিময়ে হয় না। প্রকৃতপক্ষে ভালোবাসা মানুষের প্রকৃতি, ভালোবাসা মানুষের ন্যাচার, ভালোবাসা মানুষের সম্পদ। প্রতিটি মানুষের ভেতরে থাকে ভালোবাসার পূর্ণতা। ভালোবাসা যত দেয়া যাবে, ভালোবাসা তত বৃদ্ধি পাবে। যে জিনিসটি দিলে কখনো কমে না বরং দিলে মানুষ খুশি হয়, কৃতজ্ঞ হয়, সুসম্পর্ক হয়, সেই জিনিসটি না বিলিয়ে ভেতরে জমিয়ে রাখার মানেটা কি? আপনি টাকা বিলালে টাকা শেষ হবে। বস্তুগত সম্পদ বিলালে তা নিঃশেষ হবে এবং এই টাকা বা বস্তুগত সম্পদ যত দিন দেবেন তত দিন মানুষের ভালোবাসা পাবেন। কিন্তু ভালোবাসা, শুভ ইচ্ছা, ভালো চাওয়া, ভালো করা, আন্তরিকতা দেখানো, অন্যের উন্নতিতে ভালোবোধ করা, মানুষের দুঃখে দুঃখবোধ করা এই সকল অবস্তুগত সম্পদ বা অন্তর্গত সম্পর্ক মানুষকে যত দেবেন তত ভালোবোধ করবেন এবং এই সম্পর্ক মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করে। যেহেতু ভালোবাসা এক প্রকার ফ্রিকোয়েন্সি বা এনার্জি সুতরাং আপনার ভালোবাসার এনার্জি অন্যকে এনারজায়িস বা স্পন্দিত করে ভালোবাসার টানে প্রভাবিত করবে। সুতরাং অন্যের সাথে অর্থাৎ সবার সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রধান শর্ত কোনো কিছু বিনিময় না চেয়ে ভালোবাসা দেয়া। শর্তহীন ভালোবাসা। মজার ব্যাপার হলো এই শর্তহীন ভালোবাসা প্রদানের কারণে আপনিও শর্তহীন ভালোবাসা দ্বিগুণ ফেরত পাবেন সবার কাছ থেকে। অনেকে হয়তো ভাবছেন শর্তহীন ভালোবাসা কীভাবে দেয়া যায়? আমি তো চাই সবাইকে ভালোবাসতে। কিন্তু উপায় কি? উপায় খুব সহজ। আপনি আজকে থেকেই সবাইকে কোনো কিছুর বিনিময় ছাড়া ভালোবাসা দিতে পারবেন। শুধু একটি সূত্র যদি আপনি মনের মধ্যে লিখে নিতে পারেন। যা আপনার জন্য সত্যি খুবই সহজ কাজ আর সেই সূত্রটি হলো-আপনি মনে করবেন ‘ভালোবাসা আমার স্বভাব’ ‘ভালোবাসা আমার অভ্যাস’। প্রাতঃভ্রমণ, বইপড়া প্রভৃতি যেমন আমার অভ্যাস তেমনি সবাইকে ভালোবাসাও আমার অভ্যাস। অন্যের ভালো চাওয়া, শুভ কামনা করা এবং আমাকে অন্যের ভালোতে ভালোবোধ করা এবং দুঃখে দুঃখবোধ করা আমার স্বভাব, আমার অভ্যাস। কে ভালোবাসল, কে বাসল না সেটা আমার দেখার বিষয় নয় আমি সবাইকে ভালোবাসব। ভালোবাসা আমার স্বভাব, ভালোবাসা আমার অভ্যাস। তুমি ভালোবাস আর নাইবা বাসো আমি ভালোবাসবই। এই চেতনা, এই চৈতন্য লালন করতে পারলেই যেমন একজন আদর্শবান, সুন্দর মানুষ হওয়া যায় তেমনি সবার ভালোবাসা পাওয়া সম্ভব। সর্বোপরি সবার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং সম্পর্ক উন্নয়ন করা সম্ভব।

মানুষের সাথে আমাদের সম্পর্ক খারাপ হয় বা দূরত্ব তৈরি হয় আমাদের বিচারকীয় (Judge mental) বৈশিষ্ট্যের জন্য। আমরা যখন কারও সম্পর্কে কথা বলি তখন আমরা আমাদের বিচারকীয় রায় দিয়ে থাকি। যে কোনো কারণেই হোক আপনি একজনকে পছন্দ করেন না কিন্তু তার সম্পর্কে আপনি অন্যের কাছে বক্তব্যে বলছেন ‘ওই লোকটি খারাপ’। এই ধরনের বক্তব্যকে বলে জাজমেন্টাল বক্তব্য। আপনি কারও সম্পর্কে রায় দিতে পারবেন না, আপনার অভিমত জানাতে পারেন। ওই লোকটির কোনো আচরণ আপনার কাছে খারাপ লাগতে পারে, কিন্তু অন্যের কাছে বা অন্যদের কাছে ভালো লাগতে পারে। সুতরাং আপনি আপনার অভিমত জানাতে পারেন যেমন ‘লোকটিকে আমি পছন্দ করি না’। এবার ঠিক আছে, লোকটিকে আপনি পছন্দ করেন না। কিন্তু অন্য কেউ পছন্দ করে। লোকটি খারাপ বলতে বোঝায় লোকটিকে কেউই পছন্দ করে না। যেমন-‘কালো কাপড় খারাপ’। এ কথা আপনি বলতে পারেন না। আপনার বলা উচিত ‘কালো কাপড় আমার পছন্দ নয়’। আপনি আপনার অভিমত জানাতে পারেন এবং রায় দিতে পারেন না। জাজমেন্টাল বৈশিষ্ট্যের ব্যক্তিদের কেউ পছন্দ করে না। এরা সবার সাথে সুসম্পর্ক রাখতে পারে না। সুতরাং সবার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার জন্য জাজমেন্টাল এটিচিউড ত্যাগ করা কর্তব্য। আপনি আপনার অভিপ্রায় বা অভিমত অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে পারেন না। অন্যের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করতে পারেন না। স্বাধীনতা হরণকারীকে কেউ পছন্দ করে না।

নেতিবাচক সমালোচনা করা, বদনাম করা, গিবত করা সম্পর্ক উন্নয়নে একটি বড় বাধা। একটি বড় ক্ষতিকারক দিক। সমালোচনা এবং বদনাম তারাই করেন যারা আপ টু দা মার্ক পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন না। ভীতুরাই সমালোচনা, বদনাম করে। তারা ভয় পায় যে আমার চেয়ে সে বড় বা দামি বা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে সুতরাং তাকে ছোট না করলে আমার বড়ত্ব বা মূল্য বা গুরুত্ব থাকে না। বিষয়টি গুরুতর ভুল। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, বদনাম করা, সমালোচনা করা একটি বদঅভ্যাস। ইগো থেকে এর উৎপত্তি। ইগো হলো নিজের ভেতর ভুল ইমেজ তৈরি করা বা সঙ্গে করা। নিজের ভেতর ভুল বিশ্বাস তৈরি করা বা সংযোগ করা। নিজে যা নয় নিজেকে তা মনে করা। ফলে অন্যের উন্নতি, অন্যের সমৃদ্ধি দেখে নিজের বালুর পাহাড় ধসে পড়ার উপক্রম হয়। কারোর সমালোচনা করার আগে মনে করতে হবে আমি কে? আমি কেন বদনাম করছি। আমার ভয়টি কিসের, আমার এতে ক্ষতি কী হচ্ছে, আমার সম্মান মর্যাদার সাথে আমার বক্তব্যের প্রয়োজনীয়তা কি? আমি যা, আমি তাই, ও যা ও তাই। ভেতরের ইমেজের ক্ষতির ভয়ে মানুষ সমালোচনা বদনাম করে। নিজের ইমেজকে বজায় রাখার চেষ্টা করে। এই ভয় যুক্তিহীন, হাস্যকর। কারও সমালোচনা বা বদনাম করার আগে এক মুহূর্তের জন্য ভাবুন এটি আমি কী করছি? কেন করছি? এতে কে লাভবান হচ্ছে, কে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে? এতে সম্পর্কের শুধু ক্ষতিই হয় না নিজের নিচুতা ও মূর্খতা প্রকাশ পায়।

সুসম্পর্ক তৈরি করা, বজায় রাখা এবং উন্নয়ন ঘটানোর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বচ্ছ মন। ইনার বিউটি পিউরিটি, ইনার স্ট্রেইন্থ, ইনার পিস, সেলফ রেসপেক্ট এবং সেলফ অ্যাওয়ারনেস। মনে রাখা জরুরি যে, সম্পর্ক হচ্ছে এনার্জির বিনিময়, চিন্তা হলো এনার্জি। ভালো চিন্তা বা ভালো ভাবনা, ভালো এনার্জি তৈরি করে অন্যকে প্রভাবিত করে। ঠিক তেমনি খারাপ চিন্তা বা নেতিবাচক ভাবনা খারাপ এনার্জি তৈরি করে এবং অন্যকে সেভাবেই প্রভাবিত করে। সব সময় সব বিষয়ে ইতিবাচক চিন্তা সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ। একটি কথা গুরুত্বের সাথে মনে রাখতে হবে যে, ‘মানুষকে বিশ্বাস করে ঠকাও ভালো, অবিশ্বাস করে জেতার চেয়ে’। কাউকে অবিশ্বাস করা মনের দুর্বলতা বা অসুস্থতা। বিশ্বাস করাটাই স্বাভাবিক। বিশ্বাস আমার সম্পদ। আমার শক্তি। আর মনুষ্যত্বের অংশ। কেউ বিশ্বাস ভাঙ্গুক বা না ভাঙ্গুক সেটি তার নৈতিকতার বিষয়। আমি মানুষকে বিশ্বাস করব। এটাই আমার মানবিক গুণ। আপনার চিন্তা চেতনা যেমন হবে আপনি অন্যকে তেমনি ভাববেন, যেমন আপনি চিন্তা করেন এক, বলেন আরেক, করেন অন্য এক। সুতরাং আপনি যখন কারও সম্পর্কে ভাববেন ঠিক তেমনি ভাবনাই আসবে। ধরুন, আপনার কাছে লাল, নীল, কালো রং রয়েছে, অন্যকে আঁকতে গেলে ওই তিনটি রং দিয়েই কিন্তু আঁকতে হবে। কারণ আপনি সংরক্ষণ করেন তিনটি রং। সুতরাং সন্দেহযুক্ত মন, হিংসা, স্বার্থপরতা ইত্যাদি যদি আপনার চরিত্রের অংশ হয়, তবে অন্যকে আপনার মতোই মনে হবে। হিংসুক, স্বার্থপর ইত্যাদি। কারণ আপনি ওই সকল নেতিবাচক রং সংরক্ষণ করেন। সুতরাং যার সাথে সম্পর্ক গড়ছেন তাকে মেজার করতে প্রথমেই আপনার সংরক্ষিত রং দিয়েই তো তাকে আঁকবেন। সুতরাং সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ হলো ইতিবাচক চিন্তা। অর্থাৎ ভালো রং মনের মধ্যে সংরক্ষণ করা। সব সময় সব বিষয়ে পজিটিভ চিন্তা করা। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো। আমরা নিজেকে বড় করার জন্য বা অন্যকে সুখী করার জন্য সুন্দর সুন্দর প্রশংসাসূচক কথা বলছি। অর্থাৎ আপনি হয়তো একজনকে সন্দেহ করেন অথচ মুখে বলছেন ‘আপনাকে বিশ্বাস করি’। একজনকে অপছন্দ করেন অথচ মুখে বলছেন ‘আপনাকে পছন্দ করি’ অর্থাৎ নিজের সাথে প্রতারণা করছেন। মনের এই অস্থিতিশীলতা সম্পর্ক উন্নয়নে বড় বাধা।

উপসংহার
আপনি যদি লাল চশমা পরেন তবে আপনি সবকিছু লাল দেখবেন, সবুজ চশমা পরলে সবুজ, হলুদ পরলে হলুদ দেখবেন। অর্থাৎ চোখের দৃষ্টির সামনে যেমন রঙের চশমা পরবেন তেমনই দেখবেন সবকিছু। ঠিক তেমনি মনটিকে সুন্দর করতে পারলে সবকিছুই সুন্দর দেখবেন। প্রতিটি মানুষ মহান আল্লাহর মহান সৃষ্টি, সৃষ্টিকর্তা মানুষকে সৃষ্টির সেরা এবং সবচেয়ে সুন্দর করে তৈরি করেছেন। সমস্ত ভালো গুণ এবং সৌন্দর্য দিয়ে তৈরি করেছেন। প্রতিটি মানুষের ভেতর নম্রতা, ভদ্রতা, সততা, দয়া, মায়া-মমতা, পরোপকারিতা, ভালোবাসায় ভরপুর রয়েছে। এগুলো মানুষের সম্পদ। মানুষকে ভালোবাসলে, অন্যের ভালো চাইলে দ্বিগুণ ভালোবাসা পাওয়া যায়। সম্পর্ক সুন্দর ও স্থায়ী হয়। মানুষকে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দিতে হবে। সব বিষয়ে বিচারকীয় দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। রায় প্রদান না করে অভিমত দেয়া যেতে পারে। কারণ আপনাকে কেউ বিচারক নির্বাচন করেননি। তৃতীয় বিষয় কারও সমালোচনা, বদনাম করার বদ অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে, এতে নিজের নিচুতা এবং মূর্খতা প্রকাশ পায়। চতুর্থ বিষয় আমরা নিজেকে যে রং নিয়ে আঁকি বা যে চিন্তা বা রং আমরা ভেতরে সংরক্ষণ করি অন্যকে সেই বিশ্বাস দিয়ে বা রং দিয়ে আঁকি। সুতরাং নিজের ভেতরে চিন্তা চেতনা স্বচ্ছ পবিত্র ইতিবাচক করা প্রয়োজন, নেতিবাচক চিন্তা-চেতনার ব্যক্তিরা কখনোই জনপ্রিয় এবং যথার্থ সফলতা বলতে যা বোঝায় সেখানে পৌঁছাতে পারে না। মন সুন্দর তো পৃথিবী সুন্দর। সুতরাং সফলতার জন্য, শান্তিময় জীবনের জন্য সম্পর্ক উন্নয়ন জরুরি। আর সেটার জন্য প্রয়োজন থট প্যাটার্নকে পরিবর্তন করা। চিন্তার ধরন যেমন হবে, অনুভূতির ধরন তেমন হবে। অনুভূতির ধরন যেমন হবে ব্যবহার (এটিচিউড) তেমন হবে, এটিচিউড যেমন হবে গন্তব্য তথা ডেসটিনেশন তেমনই হবে। মূল বিষয় চিন্তার ধরন, সবার সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে ইতিবাচক চিন্তায় জাগ্রত থাকা যেমন, আমি শান্তিময়, সুখী স্বচ্ছ, পরিপূর্ণ মানুষ এবং অন্যরাও আমার মতোই।