Skip to main content

সিজোফ্রেনিয়া

বাংলাদেশের বিশিষ্ট মনোশিক্ষাবিদ, মনোবিজ্ঞানী ও মনোচিকিৎসক
অধ্যাপক ডা. এ এইচ মোহাম্মদ ফিরোজ

মানসিক রোগ শিক্ষা, গবেষণা, চিকিৎসা ও জনসচেতনতায় পথিকৃৎ

আপনার বংশে সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত কেউ না থাকলেও ঝুঁকির পরিমাণ ১%। বিশ্বাস করুন আর না করুন, আর্থসামাজিক অবস্থার সাথে সিজোফ্রেনিয়া রোগের একটা সম্পর্ক সূত্র পাওয়া গেছে। আমরা অনেকে ধারণা করে থাকি যে, মানসিক রোগ ধনীদের বেশি হয়ে থাকে। সিজোফ্রেনিয়া কিন্তু অপেক্ষাকৃত দরিদ্র ঘরে বেশি হয়ে থাকে। আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে সিজোফ্রেনিয়ার দুটো তত্ত্ব বিদ্যমান।

রেডলিক আর হোলিং সেড নামের দুজন গবেষক পঞ্চাশের দশকে ঘোষণা দিয়েছিলেন নিম্নবিত্ত ঘরে সিজোফ্রেনিয়ার মাত্রা বেশি। অভাব-অনটনের কারণে প্রতিনিয়ত যে নানা মানসিক চাপের মুখোমুখি হতে হয় সেগুলো সিজোফ্রেনিয়ার কারণ ঘটিয়ে থাকে।

অপর একদল গবেষক বলে থাকেন আসলে এ রোগের সাথে আর্থসামাজিক অবস্থার তেমন কোনো যোগসূত্রতা নেই। রোগী যে সমাজেরই হোক না কেন, চিকিৎসার অর্থ জোগান দিতে পরিবারের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হবার অবস্থা হয়। রোগীরা উচ্চ আর্থসামাজিক অবস্থা হতে মধ্য আর্থসামাজিক অবস্থায় চলে আসে অথবা মধ্য হতে নিম্ন সামাজিক দশায় চলে যায়।

সিজোফ্রেনিয়াতে আক্রান্ত হবার ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ বয়স কি বাড়তি ঝুঁকি রাখে? আসলেও তাই। যৌবনকালেই মূলত এর সর্বাধিক প্রকাশ ঘটে। সিজোফ্রেনিয়া সুন্দর জীবনের ওপর চেপে বসে সবচেয়ে বেশি। সিজোফ্রেনিয়া যে কোনো বয়সেই ঘটতে পারে। তবে দুটো বয়স গ্রুপ অনেক কম ঝুঁকি রাখে-

  • একটা শৈশব অবস্থা আর
  • অপরটা বার্ধক্য দশা

১০ বছর বয়সের নিচে সাধারণত সিজোফ্রেনিয়া মনোরোগটি হয় না বললেই চলে। তবে পৃথিবীর রোগের ইতিহাসে ৭ বছরের শিশুও এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে এমন বিরল কেস হিস্ট্রি বর্তমান।
৫০ বছর বয়স পার হয়ে গেলে সিজোফ্রেনিয়ার ঝুঁকি কমে যায় অনেক মাত্রায়। এদের বেলাতে বাড়তি সৌভাগ্য হলো-সিজোফ্রেনিয়া এদেরকে মারাত্মকভাবে ঘায়েল করতে পারে না এ বয়সে। চিকিৎসা নিয়ে একেবারে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন এসব প্রবীণ সিজোফ্রেনিক। কিন্তু শৈশবাবস্থায় সিজোফ্রেনিয়া হওয়া মানে একেবারে মারাত্মক বিপর্যয়। চিকিৎসা করেও বাস্তব জীবনে এরা তেমন একটা সুবিধা করে উঠতে পারে না। বয়সের দিক থেকে পুরুষ আর নারীদের মাঝে সামান্য পার্থক্য দেখা যায়।

  • পুরুষদের বেলাতে সবচেয়ে ঝুঁকিপ্রদ বয়স হলো ১৫-৩০ বছর।
  • মেয়েদের বেলাতে এর সর্বাধিক আক্রমণ ঘটে ২৫-৩৫ বছর বয়সকালে।

এক্ষেত্রে মহিলাদের বেলাতে গড়ে ৫ বছর সময়কাল পরে ঘটে থাকে। রোগের ধরন আর প্রকটতা নির্ধারণে বয়স একটা বিশেষ প্রভাব রাখে। লিঙ্গিক প্রভাব অপেক্ষা বয়সের প্রভাব অনেক বেশি প্রকট। গবেষণায় দেখা গেছে-

  • অল্প বয়সে যেসব সিজোফ্রেনিয়া রোগের প্রকাশ ঘটে সে সব ক্ষেত্রে রোগী অনেক বেশি বিশৃঙ্খল আর অগোছালো ধরনের হয়ে থাকে। এদের রোগ হতে ভালো হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম। এরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় অক্ষম হয়ে থাকে। নিজের নির্বাহের যোগ্যতার তো প্রশ্নই আসে না, সারাজীবন পরিবারের ওপর নির্ভরশীল হয়েই এদের থাকতে হয়।
  • যাদের বেলাতে অপেক্ষাকৃত বেশি বয়সে সিজোফ্রেনিয়ার প্রকাশ ঘটে তাদের তেমন বেশি বিশৃঙ্খল আর অগোছালো হতে হয় না। এদের উপসর্গ হিসেবে মূলত সন্দেহপ্রবণতা দেখা যায়। রোগ রোগীর কার্যক্ষমতা একেবারে স্থবির করে দেয় না, বলা চলে এ রোগীর পরিণতি আশাব্যঞ্জক। চিকিৎসার মাধ্যমে অনেকটা স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নির্বাহের সম্ভাবনা রাখে এসব রোগী।
  • সিজোফ্রেনিয়া পুরুষদের বেলাতে
  • রোগীর আচার-আচরণে মারাত্মক বিশৃঙ্খলা প্রকাশ পায়
  • অল্প বয়সেই এর সূচনা ঘটে থাকে। সাধারণত ২০ বছর বয়সের আগেই
  • বারবার রোগের নানা উপসর্গ প্রকট আকার ধারণ করে
  • সিজোফ্রেনিয়া রোগে মস্তিষ্কের গড়নে জৈব রাসায়নিক কতক পরিবর্তন দেখা যায়। এ পরিবর্তনগুলো মূলত পুরুষদের বেলাতেই বেশি দেখা যায়।

সিজোফ্রেনিয়া মহিলাদের বেলাতে

  • অপেক্ষাকৃত বয়ঃপ্রাপ্ত অবস্থায় সাধারণত ৩০ বছর বয়সের পরে এর প্রকাশ ঘটে থাকে।
  • একবার রোগাক্রান্ত হয়ে মোটামুটি সুস্থ হয়ে ওঠার পর আবার রোগের প্রকাশ মহিলাদের বেলাতে কম হয়ে থাকে এবং প্রকাশ হলেও তা তেমন প্রকট মাত্রায় হয় না।
  • রোগের উপসর্গগুলো তেমন বেশি বিশৃঙ্খল ধরনের হয় না। মজার ব্যাপার হলো রোগীর মাঝে আবেগসংশ্লিষ্ট উপসর্গ প্রাধান্য পায়, যেগুলো পুরুষ রোগীদের বেলাতে তেমন বেশি দেখা যায় না।
  • মহিলাদের বেলাতে সিজোফ্রেনিয়া সংশ্লিষ্ট মস্তিষ্কের পরিবর্তনগুলো তেমন একটা দেখা যায় না।
  • অপেক্ষাকৃত বেশি বয়সে রোগের প্রকাশ ঘটে বলে মহিলাদের ডিভোর্স হতে বেশি দেখা যায়।
  • মহিলাদের বেলাতে সিজোফ্রেনিয়া রোগের রোগ ভবিষ্যৎ অপেক্ষাকরৃত ভালো।

সিজোফ্রেনিয়া রোগে
সচেতনতা
সিজোফ্রেনিয়া রোগ সম্পর্কে আমাদের সমাজে প্রচলিত রয়েছে নানা ধরনের কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনোভাব, দৃষ্টিভঙ্গি এবং সামাজিক অপবাদ। প্রকৃত অর্থেই এ জন্য অনেক পরিবারের সদস্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞের নিকট সামাজিক অপবাদের ভয়ে এবং এক ধরনের লজ্জাবোধ করে আসতেও দ্বিধাবোধ করেন। রোগটি যত বিকাশ লাভ করে ততই আমাদের-

  • চিন্তন প্রক্রিয়া
  • আবেগ
  • অনুভূতি
  • প্রত্যক্ষণ প্রক্রিয়া
  • ইচ্ছাশক্তি ইত্যাদি নানা মানসিক প্রক্রিয়াকে চারপাশ থেকে জড়িয়ে ধরে। তাই উপসর্গ দেখা দেয়ার সাথে সাথে সব ধরনের লাজ-লজ্জা ভেঙে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া উচিত। তবে সুখের বিষয় হলো মানসিক রোগ আজকের দিনে আর কোনো লজ্জার বিষয় নয়। সমাজের কত মানুষ বুঝতে পেরেছে এটি কোনো অপশক্তির প্রভাব নয় এবং লোকজন এখন বুঝতে পারছে যে, যে কোনো মানসিক রোগের বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা আমাদের দেশে থেকেই সম্ভব।

এ ভয়াবহ মানসিক রোগের আরেকটি উপসর্গ রয়েছে, যাকে বলা হয় পেসিভিটি ফেনোমেনো। এ উপসর্গটিতে রোগী ধারণা করে থাকে যে তার সমস্ত-

  • আবেগ
  • অনুভূতি
  • কাজ-কর্ম সবকিছু বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে-
  • এটি হতে পারে বাহ্যিক কোনো অপশক্তির প্রভাব
  • হতে পারে জিন
  • পরী/ভূত-প্রেত
  • আলগা বাতাস এরূপ কোনো ধারণাসম্পর্কিত বিষয়। কতক রোগী এমনটি পর্যন্ত ধারণা করে থাকে যে, চাঁদের আলো সূর্যের আলোক রশ্মি তাদের শরীরে ঢুকে তাদের কোনো ক্ষতি করছে।

সিজোফ্রেনিয়া শব্দের শব্দগত অর্থ হলো স্পিট মাইন্ড যার বাংলা শাব্দিক অর্থ দাঁড়ায় খণ্ডিত মন। অর্থাৎ যে মন ভেঙেচুরে খণ্ডিত হয়ে গেছে। এতে করে মস্তিষ্কের এবং মননপ্রক্রিয়ায় যে সমন্বিত মানস প্রবৃত্তিমূলক কার্যকলাপ রয়েছে তাতে কোনো প্রকার কানেকশন বা সমন্বয় থাকে না, ব্যক্তির চিন্তাগুলো বিচ্ছিন্ন মনে হয়। এর প্রকাশ ঘটে রোগী যখন তার আবেগ, অনুভূতি ইত্যাদি প্রকাশ করে। আসলে আমরা যদি চিন্তা করি যেভাবে চিন্তা করি ভাষাতে বা প্রকাশভঙ্গিতে মূলত তার প্রতিফলন ঘটে। আর একটি হচ্ছে আচরণ। তাই ব্যক্তির আচরণ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ সিজোফ্রেনিয়া রোগ সহজে ডায়াগনোসিস বা নির্ণয় করতে পারেন।

সিজোফ্রেনিয়া রোগের প্রকৃত কারণ জানা যায়নি। এর জন্য কোনো একক কারণ দায়ী নয়। জেনেটিক ফ্যাক্টর এর সাথে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। যেসব পরিবারে সিজোফ্রেনিয়া রোগের ইতিহাস থাকে তাদের বংশে অন্য সদস্যদের কতকের মাঝে এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। এছাড়া পরিবেশগত নানা কারণ যেমন-

  • পারিবারিক দাম্পত্য জীবনের নানা জটিলতা
  • ব্যক্তিগত নানা সমস্যা
  • দীর্ঘমেয়াদি, মনোদৈহিক বা মনোশারীরিক চাপজনিত জীবনযাপন
  • আর্থসামাজিক নানা প্রেক্ষিতজনিত সমস্যাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে।

বায়োলজিক্যাল ফ্যাক্টরের মাঝে রয়েছে মূলত নিউরোলজিক্যাল বা স্নায়বিক ক্ষয়জনিত কতক ব্যাধি যেমন-জন্মপূর্ব এবং জন্মকালীন পরিবেশে বাচ্চার কোনো মেডিকেল অসুস্থতা, মস্তিষ্কের ডোপামিন নামক যে নিউরোট্রান্সমিটার রয়েছে তার অস্বাভাবিক কার্যকারিতা ইত্যাদি নানা কারণে রোগটি দেখা দিতে পারে। এ রোগে নানা ধরনের উপসর্গ রোগের তীব্রতাভেদে স্পষ্টতর হতে পারে। স্নাইডার নামক একজন মনোবিজ্ঞানী সিজোফ্রেনিয়া রোগটি ডায়াগনোসিস বা শনাক্তকরণের জন্য কতক উপসর্গের বর্ণনা দিয়েছেন। যদি কোনো সোমাটিক বা শারীরিক অসুস্থতা এবং মাদকাসক্তির সমস্যা না থাকে তথাপি সাথে নিজের উপসর্গগুলো থাকে তবে সিজোফ্রেনিয়া শনাক্ত করা যেতে পারে। সব কটি উপসর্গ একত্রে থাকতে হবে এমন কোনো কথা নেই। অভিজ্ঞ মনোচিকিৎসক রোগীর মানসিক অবস্থার পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সহজে রোগটি নির্ণয় করতে পারেন। সিজোফ্রেনিয়া রোগটি দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে একথা ঠিক। কতিপয় শারীরিক অসুখ যেমন-

  • হাইপারটেনশন
  • ডায়াবেটিস
  • বাতরোগ ইত্যাদি নানা অসুখের মতো সিজোফ্রেনিয়াও সারা জীবনব্যাপী থাকতে পারে। মূল কথা হলো চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে রোগী পাচ্ছে কি না। মানসিক রোগের ক্ষেত্রে যে ব্যাপারটি সবচেয়ে বেশি সমস্যার উদ্রেক করে তা হলো আমাদের মানসিক রোগ সম্পর্কে নিজস্ব বা ব্যক্তিনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি। কারো উচ্চরক্তচাপ হলে যেমন মুখ দিয়ে উচ্চস্বরে বলতে শোনা যায় যে, আমি অমুক রোগে ভুগছি বা অমুক রোগের ওষুধ খাচ্ছি। মানসিক রোগের ক্ষেত্রে সামাজিক অপবাদ, লজ্জা ও ভয়ভীতির কারণে কেউ তা প্রকাশ করতে চায় না। ফলে সিজোফ্রেনিয়ায় যারা আক্রান্ত তারা রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন সাধারণত হন না। আর এ অবস্থাটাই রোগকে আরো জটিল করে তোলে। তাই এ অবস্থার পরিবর্তন দরকার। আর এ পরিবর্তনে দরকার মানসিক রোগ-সচেতনতা।

সিজোফ্রেনিয়ার প্রতিবন্ধকতা
সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা বুঝতে পারে না যে তারা মানসিকভাবে অসুস্থ। এটিই সিজোফ্রেনিয়া রোগীদের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতার অদৃশ্যতা এবং দুর্বোধ্যতা। তাদের এই প্রতিবন্ধকতার অদৃশ্যতা এবং দুর্বোধ্যতার জন্য তারা চিকিৎসার প্রয়োজন মনে করে না। তাই তাদের চিকিৎসার ব্যাপারটি গিয়ে বর্তায় আত্মীয়দের ওপর। সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত রোগীরা মনে করেন যে, তাদের মনোগত কোনো সমস্যা নেই। তাদের এই অদৃশ্যতা ও দুর্বোধ্যতার জন্য রোগীরা তাদের সর্বোচ্চ মানসিক শক্তি, বুদ্ধিমত্তা ও মেধা দিয়ে প্রমাণ করতে চায় যে, তাদের মাঝে মানসিক কোনো সমস্যা নেই, বরং তারা সম্পূর্ণরূপে সুস্থ। ফলে তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে চাইলে সে মোটেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না।

যেসব পরিবারে সিজোফ্রেনিয়ার রোগী থাকে সেসব পরিবারে আমাদের সমাজে ভোগান্তির সীমা থাকে না। সিজোফ্রেনিয়া সম্পর্কে রয়েছে হাজার মানুষের ভুল ধারণা। সিজোফ্রেনিয়া এমন একটি  মানসিক রোগ যা ঠিক পুরোপুরি বোঝা যায় না এবং এটি নিয়ে বেশ ভীতিতে ভোগে মানুষেরা। বেশির ভাগ লোক সিজোফ্রেনিয়া সম্পর্কে যে চিন্তা করে তা আসলে অন্ধকারাচ্ছন্ন। অনেক সময় এ রোগটি এত ধীরে ধীরে বিকশিত হয় যে, পরিবারের সদস্য এমনকি রোগী নিজেও ঠিক বুঝতে পারে না যে তিনি এক ভয়াবহ মানসিক ব্যাধিতে জড়িয়ে যাচ্ছেন। পরিবারের সমস্যা হলো যে তাদের প্রশ্ন করা হলে বলেন, আমরা তো দেখি সবই ঠিক আছে, কিন্তু আমরা বুঝতেই পারিনি যে কখন সে মানসিক পীড়াগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। পরিবারের অনেক সদস্য বলেন এবং ভেবে থাকেন যে, তার মেজাজ কিছুদিন যাবৎ খারাপ ছিল, মাঝে মাঝে অল্পতেই তার মেজাজ রুক্ষ হয়ে যায়। আর মাঝেমধ্যে অবসন্ন থাকে। এ আর এমন কি? আমাদেরও মাঝেমধ্যে এমন হয়ে থাকে। কাজেই এটাকে পৃথক করে দেখানোর কিছু নেই। কিন্তু পরে এটাই নীরব ঘাতক বিষণ্নতায় রূপ নেয়। সিজোফ্রেনিয়ায় যেহেতু আচরণগত নানা অসংলগ্নতা থাকে তাই পরিবারের সদস্যদের নানা রকম পরিবেশ মোকাবিলা করতে হয়। অনেক সময় সিজোফ্রেনিয়ার রোগীদের আচার-আচরণে পরিবারের সদস্যরা ঘাবড়ে যান, তারা বুঝতে পারেন না ঠিক কী করতে হবে, রোগী ঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর করতে পারে, এমনকি নিজের ক্ষতিও করতে পারে। এ সমস্যাগুলো অবশ্যই বুদ্ধিমত্তার সাথে পরিবারের সদস্যদের মোকাবিলা করতে হবে। কারণ পরিবারের সদস্যরাই রোগীকে ভালোভাবে জানেন। প্রয়োজনে পুলিশের সাহায্যও নিতে হতে পারে।

সিজোফ্রেনিয়া রোগ নির্ণয়ের তেমন কোনো প্যাথলজিক্যাল টেস্ট নেই। তাই অসুস্থ ব্যক্তির রোগ নির্ণয় করা হয় রোগীর উপসর্গ দেখে-

  • রোগীর চালচলন
  • হাবভাব
  • আচার-আচরণ
  • মন-মেজাজ ইত্যাদি রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে উপযুক্ত পুনর্বাসন চিকিৎসার অংশ হয়ে দাঁড়ায়। রোগীকে বাসায় রেখে নাকি পুনর্বাসন কেন্দ্রে রেখে চিকিৎসা করানো হবে তা নির্ভর করে রোগীর অসুস্থতার তীব্রতার ওপর। যেসব রোগীকে সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, তাদের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্র দরকার হয় বেশি। বর্তমানে হাতে গোনা যে কয়েকটি পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল, বিধায় ব্যাপকভাবে পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। যেন সেখানে সুচিকিৎসার মাধ্যমে রোগীরা সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসে সমাজের বোঝা না হয়ে সম্পদে পরিণত হতে পারে।

মানব সভ্যতায় সবচেয়ে পুরাতন রোগ হলো মানসিক রোগ। ১৫ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে এমন রোগীর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। আধুনিক বিজ্ঞানে এখন এই জটিল মনোরোগের চিকিৎসায় অনেক নতুন নতুন ওষুধ আবিষ্কার হয়েছে কিন্তু দক্ষ জনশক্তির অভাব আছে বলেই আমরা সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা নিতে পারছি না। তাই আমাদের প্রথমে মানসিক রোগের অজ্ঞতা দূর করতে হবে। সরকারকেও এ ব্যাপারে আরো বেশি এগিয়ে আসা প্রয়োজন ও মানসিক রোগ সম্পর্কে ব্যাপক প্রচার চালিয়ে জনগণকে সচেতন করে তুলতে হবে। এ ব্যাপারে আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

সিজোফ্রেনিয়া রোগ ব্যক্তির জীবনে কোনো প্রকার অভিশাপ নয়, নয় অপরাধ বা পাপের ফল। এটি যে কারোর মাঝেই দেখা দিতে পারে। যুগে যুগে এ মনোরোগে অনেক মানুষই আক্রান্ত হয়েছে। এখনো হচ্ছে। এ রোগ ব্যক্তির-

  • সামাজিক
  • পারিবারিক
  • অর্থনৈতিক
  • ধর্মীয় সব দিকেই

দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি করে থাকে। এ রোগ সারা জীবনের রোগ। চিকিৎসার মাধ্যমে এ জটিল রোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। তাই চিকিৎসার কোনো বিকল্প নেই। সিজোফ্রেনিয়ার চিকিৎসা সচেতনতার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

সিজোফ্রেনিয়া রোগের
উপসর্গ
সিজোফ্রেনিয়ার তীব্র উপসর্গ অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদিভাবে অব্যাহত থাকতে পারে। তাই রোগটির নানা উপসর্গ প্রায়ই ঘুরেফিরে জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আসতে পারে। সিজোফ্রেনিয়ার উপসর্গ পুনরায় দেখা দেয়ার অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোনো কারণ নাও থাকতে পারে। সাধারণত উপসর্গগুলো পুনরায় প্রকাশ হওয়ার কারণের মধ্যে রয়েছে-

  • চিকিৎসায় গ্যাপ
  • অনিয়মিত চিকিৎসা করানো
  • সামাজিক সমর্থনহীনতা
  • পারিবারিক অবহেলা
  • পারিবারিক তাচ্ছিল্য
  • কাজ-কর্ম হারানো
  • নতুন স্থানে যাওয়া
  • নেশায় আসক্ত হয়ে পড়া
  • ডিভোর্স
  • প্রিয়জনকে হারানো
  • প্রিয়জনের মৃত্যু
  • ওষুধ সেবন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেয়া
  • রোগীর মানসিকতার ওপর মনোদৈহিক চাপ বৃদ্ধি পাওয়া

সিজোফ্রেনিয়ার রোগী যখন সাইকোটিক পর্যায় অতিক্রম করে তখন পরিবারের সদস্যরা ভয় পেয়ে যায়। রোগী এ সময় যে হ্যালুসিনেশন বা অলীক প্রত্যক্ষণ বা অলীক শ্রবণ শোনে তা রোগী ও তার পরিবারের সদস্যদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই এক্ষেত্রে অবশ্যই যত দ্রুত সম্ভব রোগীকে হাসপাতালে বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। রোগী যদি ইচ্ছাকৃতভাবে হাসপাতালে বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে চায় তাহলে তো ভালো, আর যদি না যেতে চায় তাহলে তো চিন্তা-ভাবনার বিষয়। এ সময় তার প্রিয় কোনো ব্যক্তি বললে তিনি হয়তো রাজি হয়ে যেতে পারেন। মোট কথা হলো এ সময় যে কোনো উপায়েই হোক না কেন রোগীকে হাসপাতালে বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যেতে হবে।

সাইকোটিক পর্যায়ে রোগী যে ভয়ংকর অবস্থা বা মেজাজ প্রকাশ করে তার জন্য রোগীকে মারধর করা ঠিক নয়। কারণ এটা রোগীর ইচ্ছাকৃত কোনো ব্যাপার নয়। সাইকোটিক পর্যায়ে রোগী যেসব অবস্থা প্রকাশ করে তা হলো-

  • ভ্রান্ত বিশ্বাস বা ডিলিউশন
  • অলীক শ্রবণ প্রত্যক্ষণ বা হ্যালুসিনেশন
  • অদ্ভুত কথাবার্তা
  • অদ্ভুত আচার-আচারণ
  • বিকৃত চিন্তা-ভাবনা
  • আবেগজনিত অসংলগ্নতা
  • আচরণগত অসংলগ্নতা
  • উল্টা-পাল্টা কার্যকলাপ

এ সময় যা করবেন, তা হলো-

  • রোগীর সমালোচনা করবেন না
  • রোগী থেকে দূরে সরে থাকবেন
  • রোগীকে মারধর করবেন না
  • কোনো প্রকার শাস্তি দেবেন না
  • রোগীর সাথে কোনো বিষয়ে তর্ক করবেন না
  • রোগীর সাথে একই ঘরে চিৎকার, চেঁচামেচি করবেন না
  • তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকবেন না
  • তাকে প্রচণ্ডভাবে ধমক দেবেন না
  • তাকে উন্মাদ বা পাগল বলবেন না
  • তার ওপর প্রচণ্ড মাত্রায় রাগ প্রকাশ করবেন না
  • রুমে টেলিভিশন খোলা থাকলে বন্ধ করে দিন
  • কম্পিউটার চালু থাকলে বন্ধ করে দিন
  • রোগীর সাথে অস্পষ্ট স্বরে কথা বলবেন না
  • রোগীর রুমে ভিড় করবেন না
  • রোগীর সাথে নরম সুরে কথা বলুন
  • তাকে শান্ত হতে বলুন
  • ধমক দেবেন না
  • আদরের সঙ্গে তাকে বসতে বলুন
  • রোগীর সাথে কঠিন ভাষায় কথা বলা যাবে না
  • তাকে হুমকি দেবেন না
  • রোগীকে বোঝাতে গিয়ে একই কথা বারবার বলবেন না. কারণ এতেও সন্দেহ সৃষ্টি হতে পারে
  • রোগীকে ভরসা দিন

সিজোফ্রেনিয়া রোগীকে কঠিন অবস্থায় মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞের দেয়া চিকিৎসাব্যবস্থা অব্যাহত রাখুন। রোগীর মারদাঙ্গা অবস্থা কেটে যাওয়ার পর ভুলেও নিজের ইচ্ছামতো চিকিৎসা বন্ধ করবেন না। যাই করুন ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক করুন।

সিজোফ্রেনিয়া রোগের চিকিৎসা প্রয়োজন
বেশির ভাগ পরিবারই আত্মীয়দের মধ্যে কারো সিজোফ্রেনিয়া রোগ হলে উপযুক্ত ডাক্তার খুঁজতে গিয়ে আতঙ্কিত হন। খুব অল্প সংখ্যক ডাক্তার সিজোফ্রেনিয়া রোগকে ভালোভাবে জানেন বা এই রোগের ব্যাপারে অনুসন্ধিৎসা প্রকাশ করেন। এই সমস্যার কোনো সহজ প্রতিকার পাওয়া যায় না।

সিজোফ্রেনিয়ার সাথে অন্যান্য অনেক রোগের মিল আছে, কাজেই রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য উত্তম বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন। যেহেতু সিজোফ্রেনিয়া একটি দুরারোগ্য ব্যাধি, বিরতিহীন চিকিৎসা এবং ওষুধের ব্যবহার প্রয়োজন। মানসিক রোগের বিখ্যাত বিশেষজ্ঞ ফুলার টোরি বলেন, ‘ডাক্তার খোঁজার কাজে অবহেলা করা চলে না।’

শুরুতেই ফ্যামিলি ডাক্তারকে প্রশ্ন করে সিজোফ্রেনিয়া রোগের বিশেষজ্ঞের সন্ধান নিতে হবে আর একটা উপায় হলো যে সিজোফ্রেনিয়া রোগীর পরিবারমণ্ডলীর কাছে খোঁজ নেয়া, এরা আপনার গোষ্ঠীর মধ্যে এ ব্যাপারে বিশেষ সহায়কদের সাথে পরিচয় করে দেবে এবং আপনার অযথা সময় নষ্ট ও হতাশার হাত থেকে রক্ষা করবে।

বিশেষ পারদর্শী মনোচিকিৎসক খুঁজে পাওয়া ছাড়াও এই রোগ সম্বন্ধে-

  • সহানুভূতিসম্পন্ন
  • সহমর্মী এবং
  • যিনি অন্যান্য বিশেষজ্ঞের সাথে একযোগে কাজ করতে পারেন, এমন একজন বিশেষজ্ঞ পাওয়া দরকার।

ডাক্তার ও রোগীর মধ্যে কথোপকথনে রোগী তার ব্যক্তিগত কথা বলে, যা অন্যকে জানাতে চায় না। সে যাই হোক, আত্মীয়-স্বজনদের রোগীর সেবা ও চিকিৎসার ব্যাপারে খবরাদি জানা চাই। আপনি নিম্নলিখিত বিষয়গুলো ডাক্তারের সাথে আলোচনা করতে পারেন।

  • রোগের লক্ষণাদি
  • উপসর্গ
  • কত দিন ধরে রোগ ভোগ চলতে পারে
  • রোগের গতি-প্রকৃতি

চিকিৎসা প্রণালী
যদি সিজোফ্রেনিয়ার উপসর্গ দেখা দেয়, আপনার ডাক্তারকে রোগ নির্ণয় করতে বা অন্য বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠাতে বলুন। আত্মীয়রাই প্রথমে রোগীর উপসর্গ লক্ষ করে এবং চিকিৎসার সাহায্য নেয়ার উপদেশ দেয়। মনে রাখবেন রোগী যদি অবাস্তব ভয় ও ভ্রান্ত চিন্তাকে বাস্তব ভাবে তবে চিকিৎসা করাতে নারাজ হতে পারে। সিজোফ্রেনিয়া রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসার জন্য এই রোগের বিশেষজ্ঞ দরকার। এই রোগে-

  • উৎসাহী
  • দক্ষ
  • রোগী ও তারা আত্মীয়দের প্রতি সহমর্মী এমন চিকিৎসক নিয়োগ করুন।
  • চিকিৎসককে সাহায্য করুন। সিজোফ্রেনিয়ার রোগী স্বেচ্ছায় রোগের সব খবর দিতে চায় না, আপনি নিজে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন বা আপনার মনের কথা জানিয়ে চিঠি লিখুন।
  • ডাক্তারকে বারবার রোগীর সমস্যার কথা মনে করে দিন, এতে করে আপনি যে সূচনা দেবেন তাতে সঠিক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার ব্যাপারে ডাক্তারের সুবিধা হবে।

আপনার উচিত হবে সিজোফ্রেনিয়ার উপসর্গকে চিনে নেয়া, এতে করে আপনি রোগীকে আরো ভালোভাবে সাহায্য করতে পারবেন, ভালোভাবে রোগীকে বুঝতে পারবেন। রোগীর মাঝে যখন অযৌক্তিক ব্যবহার অনুভব করেন বা দেখেন, তখন চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা প্রয়োজন। হঠাৎ করে তীব্র উপসর্গ দেখা দিতে পারে বা উপসর্গ অনেক দিন ধরে প্রকাশ পায়। এগুলোর মধ্যে প্রধান উপসর্গগুলো হলো-

  • চিন্তাধারা নিয়ন্ত্রণে অক্ষমতা
  • ব্যক্তিত্বের লক্ষণীয় পরিবর্তন
  • সামাজিক মেলামেশায় অতিরিক্ত অনীহা
  • গায়েবি আওয়াজ কানে আসা
  • অদ্ভুত অদ্ভুত কিছু দেখা
  • কেউ নজর রাখছে সর্বদা এই অনুভূতি
  • ভাষা প্রকাশ করার অক্ষমতা
  • অর্থহীন কথাবার্তা
  • সীমাহীন হঠাৎ ভক্তি
  • সবকিছুর বাড়াবাড়ি
  • আত্মীয়-স্বজনের প্রতি অযৌক্তিক ক্রোধ
  • ভীতিজনক ব্যবহার
  • অস্থিরতা
  • অনিদ্রা

সিজোফ্রেনিয়া কঠিন ধরনের মনোরোগ। এই কঠিন মনোরোগের চিকিৎসা করা না হলে তা রোগী ও তার পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজনদের জন্য কঠিন পরিণতি নিয়ে আসতে পারে। অন্যান্য রোগের মতো এই মনোরোগেরও চিকিৎসার কোনো বিকল্প নেই। রোগ যত বেশি দিন চিকিৎসাবিহীন থাকবে, তত বেশি রোগের ভয়াবহতা সৃষ্টি হতে পারে। সিজোফ্রেনিয়ার রোগীর একটি কঠিন ব্যাপার রয়েছে তা হলো, ডিলিউশন বা ভ্রান্ত বিশ্বাস, আর এই ভ্রান্ত বিশ্বাসের বা ডিলিউশনের চিকিৎসা করা না হলে রোগীর দ্বারা বড় রকমের অঘটন ঘটে যাওয়া বিচিত্র নয়। তবে সুখের সংবাদ হলো, উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে সিজোফ্রেনিয়া রোগের তাণ্ডবতা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।