বদমেজাজ
বন্ধুত্বের মূল্য
ভালোবাসা মানুষের সহজাত অনুভূতি। এ জন্য আমরা প্রতিটি মানুষকে তার সমগোত্রীয়দের প্রতি এক অভ্যন্তরীণ শক্তি দ্বারা আকৃষ্ট হতে দেখতে পাই। এভাবে এ সহজাত প্রয়োজন অবশ্যই পূর্ণ হতে হবে যেন প্রত্যেক মানুষ অন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সমষ্টির সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে পারে। এ ধরনের সম্পর্কের মাধ্যমে সে তার সামাজিক জীবনে উপকৃত হতে পারে।
ভালোবাসা ও নিরাপত্তা শান্তির ভিত্তি। এটা সর্বশ্রেষ্ঠ উপভোগ্য আত্মিক চাহিদা যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ দুনিয়ায় ভালোবাসার চেয়ে অধিকতর মূল্যবান আর কোনো জিনিস নেই। তাই অনেক সময় কোনো প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি সর্বনাশা হয়ে থাকে। আমাদের আত্মসমূহ অন্য আত্মার কাছে আশ্রয়লাভের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে থাকে, যা না হলে নিরাপত্তাহীনতা ও দুশ্চিন্তার হাতে নিগৃহীত হয়ে আমরা ক্ষতবিক্ষত হতাম। এভাবে আমরা আমাদের নিজস্ব ভুবনেও নির্যাতনের শিকারে পরিণত হয়ে যেতাম।
এ ব্যাপারে জনৈক পণ্ডিতের বক্তব্যের উদ্ধৃতি প্রদত্ত হলো-‘বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পরিবর্তে, দুনিয়ার লোকদের সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক বজায় রাখার মধ্যে আমাদের সুখী জীবনযাপনের রহস্য নিহিত রয়েছে। যারা তাদের সমগোত্রীয়দের ভালোবাসতে পারে না তারা দুশ্চিন্তামুক্ত নিরাপত্তার জীবনযাপন করতে পারে না। প্রকৃত অনুভূতি ও সত্যিকারের ভালোবাসার সম্পর্ক সর্বোৎকৃষ্ট উপায়ে সমাজের বিভিন্ন লোককে এক সুদৃঢ় ঐক্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাখে। দুটো আত্মার মধ্যে যে সমপ্রীতি দেখা যায় তা তাদের ভালোবাসা ও ঐক্যের জগতে একই ব্যক্তিতে পরিণত করে। এখান থেকে অনন্তকালীন সুখের ভিত রচিত হতে থাকে। তথাপি এ সুখ অব্যাহত রাখার জন্য, পারস্পরিক বিভেদসমুহ অবশ্যই মিটিয়ে ফেলতে হবে এবং অন্যদের সাথে এমন সব বিষয়সমূহের ব্যাপারে সমঝোতা করে নিতে হবে যা তারা যথাযথভাবে মেনে নিতে রাজি নয়। সবচেয়ে মূল্যবান ভালোবাসা হচ্ছে এমন সব যা মানুষের ব্যক্তিগত স্বার্থের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয় বরং তা মানুষের ভ্রাতৃত্বের অনুভূতির সাথে একাত্ম হয়ে তার ভালোবাসার চাহিদা পূরণে সক্ষম। একজন মানুষ যে নিজেকে একজন বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে পেশ করবে তাকে অবশ্যই এমন কোনো কাজ বা আচরণ হতে বিরত থাকতে হবে যা তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে চিড় ধরাতে পারে। বস্তুতপক্ষে তাকে তার বন্ধুর ওপর অর্পিত বিপদ ও দুঃখকষ্ট দূর করার জন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকতে হবে এবং বন্ধুকে আশা ও শান্তির বাগান প্রদান করতে হবে। যারা অন্যের কাছ থেকে ভালোবাসার প্রত্যাশী হতে চায় তাদেরকে তাদের এ অনুভূতির ছায়ায় বসবাসের পূর্বে প্রতিপক্ষের প্রতিও একই ধরনের ভালোবাসা প্রদর্শনে সক্ষম হতে হবে।
জনৈক বিজ্ঞ পণ্ডিতের মতে-আমাদের জীবন একটা পাহাড়িয়া অঞ্চলের মতো যেখানে কেউ কোনো শব্দ করার সঙ্গে সঙ্গে তা প্রতিধ্বনিত হয়ে পুনঃ তারই কাছে ফেরত আসে, যাদের অন্তর অন্যদের প্রতি ভালোবাসায় পরিপূর্ণ তারা অন্যদের কাছ থেকে একই ধরনের ভালোবাসা পেতে থাকবে। এটা সত্য যে আমাদের বস্তুজীবন পারস্পরিক লেনদেনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আমরা এটা বলতে চাই না যে আমাদের আধ্যাত্মিক জগৎও একই ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভবপর বলে আশা করা যায় যে আমরা অন্যের প্রতি বিশ্বস্ত না হয়ে তাদেরকে আমাদের প্রতি বিশ্বস্ত হতে আশা করতে থাকব। একজন কীভাবে অন্যদের না ভালোবেসে, তাদের কাছ থেকে ভালোবাসা প্রত্যাশা করতে থাকবে?
অন্যদের সাথে আমাদের পারস্পরিক কাজকর্মের সম্পর্ক অত্যন্ত ক্ষতিকর হতে পারে যদি তা উভয় পক্ষ থেকে ভালোবাসা ও সততার মনোভাবের ওপর প্রতিষ্ঠিত না হয়।
ভয়াবহ কপটতা যখন মানুষের জীবন ও অন্তরসমূহকে আচ্ছন্ন করে ফেলবে, যখন চাটুকারিতা সততার স্থলাভিষিক্ত হয়ে পড়বে এবং বন্ধুত্ব, একাত্বতা, সহযোগিতা ও স্নেহশীলতা দুর্বল হয়ে পড়বে তখন সমাজ হতে পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাবের অবলুপ্তি ঘটবে।
নিঃসন্দেহে, আমাদের সমাজের অনেকের সাথে এমন সব লোকের সাথে দেখা হয়েছে যাদের অন্তরে প্রকৃত ভালোবাসা বা অনুভূতি বলতে কিছুই নেই। তারা তাদের প্রকৃত সত্তাকে ভালোবাসার আবরণে আবৃত করে রাখে কিন্তু বারবার আমরা তাদের এই আবরণ উন্মোচন করে তাদের সঠিক অবস্থা ও প্রকৃত অনুভূতি পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম হই। এর ফলে তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক তাদের মুখোশ ধ্বংসের কাজেই পর্যবসিত হয়ে যায়।
বস্তুতপক্ষে সুখী হওয়ার পূর্বশর্ত ও আত্মিক উন্নয়নের ফলপ্রসূ পদ্ধতি হচ্ছে সত্যপন্থী লোকদের সাথে প্রকৃত বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠা করা। এটা এ জন্য যে, এ ধরনের সম্পর্কের ছায়াতলে ব্যক্তিগত চিন্তার উন্নতি খোদাভীরুতার পর্যায়ে উন্নীত হয়ে উৎকৃষ্ট গুণাবলির জন্ম দিতে থাকে। সুতরাং বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য পূর্ব থেকেই, অবশ্যই, সতর্কতার সাথে পরীক্ষা কাজ চালাতে হবে। যাদের সাথে বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে তাদের সততা ও পবিত্রতা সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে বন্ধুত্ব করা এক অমার্জনীয় ভ্রান্তি। কেননা মানুষকে তাদের সঙ্গে সাহচর্যকারীদের চরিত্র বৈশিষ্ট্যের প্রভাবে অতি সহজে প্রভাবিত হওয়ার যোগ্য করে সৃষ্টি করা হয়েছে। নেতিবাচক সম্পর্ক মানুষের সুখের পথে হুমকিস্বরূপ।
বদমেজাজি লোকেরা ক্ষুব্ধ থাকে
বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য ও অবাঞ্ছিত অভ্যাস ভালোবাসার সম্পর্ককে দুর্বল করে এবং কোনো কোনো সময় পরিণতি এতদূর পর্যন্ত গড়ায় যে তা উত্তম সম্পর্ককে পর্যন্ত ছিন্ন করে ফেলে। বদমেজাজি ব্যক্তিরা অন্যের ভালোবাসার মর্যাদাকে অক্ষুণ্ন রাখতে সক্ষম হয় না। তারা সমাজ ও তাদের নিজেদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার এক স্থায়ী প্রাচীর গড়ে তোলে যা তাদের অন্যের ভালোবাসা উপলব্ধি করার পথে বাধা প্রদান করে। সুতরাং বদমেজাজ সুখের ভিত্তিমূলকে ধ্বংস করে দেয় এবং মানুষের চরিত্রের অধঃপতন ঘটায়। এটা নির্বিবাদে বলা যায় যে, মন্দ আচরণ মানুষকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। কেননা মানুষ এমন লোকদের ব্যবহারে ক্ষতিগ্রস্ত হয় যাদের ওপর সে ক্ষুব্ধ অথবা যাদের সাথে সে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না। এভাবে খারাপ আচরণ মানুষকে তার যেমন কিছু যোগ্যতাকে পরিহার করতে বাধ্য করে যা উন্নত আচরণের সাথে করা হলে তার জীবনের অগ্রগতির জন্য অত্যন্ত ফলপ্রসূ বলে বিবেচিত হতো। কেউ যদি তার সমাজের লোকদের সঙ্গে মিশতে চায় তবে তাকে সর্বপ্রথম পারস্পরিক লেনদেনের কলাকৌশল জেনে নিতে হবে এবং এ সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পরই সমাজের গ্রহণযোগ্য নিয়মে তার কাছে তা প্রয়োগ করতে হবে। এ প্রক্রিয়া ছাড়া একজন মানুষ যেমন সমাজের অন্য মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে চলতে পারে না, তেমনিভাবে এমন একটি সমাজে মানুষের পারস্পরিক আচরণ পরিপূর্ণতার লক্ষ্যে পরিচালিত হতে পারে না। অতএব, উত্তম আচরণ মানুষের পারস্পরিক সুখী জীবনযাপনের প্রধান বুনিয়াদ হিসেবে পরিগণিত। এটা ব্যক্তি মানুষের ব্যক্তিত্বকে উন্নততর করার লক্ষ্যে একটা আবশ্যকীয় উপাদানও বটে।
বস্তুতপক্ষে উত্তম আচরণ মানুষের যোগ্যতাকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা প্রদান করে। এ কারণে সমাজ পরিচালনার সাধারণ পর্যায়ে এটা অত্যন্ত ফলপ্রসূ প্রমাণিত হয়। মানুষের সহানুভূতি ও ভালোবাসাকে আকৃষ্ট করার ব্যাপারে যেমন, তেমনি জীবনে চলার পথে আপতিত বিপদ-আপদে, দুঃখ-কষ্টের তীব্রতাকে লাঘব করার ক্ষেত্রেও উন্নত আচরণের সমান আর একটি বৈশিষ্ট্যও নেই।
এসব গুণ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ব্যক্তিরা তাদের দুঃখের দিক অন্যের কাছে প্রদর্শন করে না, এভাবে তারা তাদের গোপনীয়তার সীমা লঙ্ঘন করতে দেয় না। এসব লোক তাদের চতুর্দিকে সুখ ও সহানুভূতির একটা রামধনু সৃষ্টি করার সংগ্রামে নিয়োজিত থাকে। সুতরাং তাদের সঙ্গে লেনদেন ও কাজকর্মে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের দুঃখের কথা ভুলে যায় এবং তাদের মধ্যে একটা নিরাপত্তার মনোভাব এসে যায়। তারাও তাদের কোনো প্রকার সম্ভাব্য দুঃখকষ্ট থাকা সত্ত্বেও নিজেদের নিশ্চিন্ততার মনোভাব প্রদর্শন করতে থাকে এবং এভাবে তারা তাদের সফলতা ও বিজয়ের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে। অনেক ব্যক্তির জন্য তাদের ভালো ব্যবহার সফলতা অর্জনের ক্ষেত্রে একটা শক্তিশালী উপাদান হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে। এটা বলা নিষপ্রয়োজন যে, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের সফলতা সরাসরি তাদের কর্মচারীদের উত্তম আচরণের সাথে সম্পৃক্ত।
কোনো কোম্পানির ম্যানেজার যদি অমায়িক ব্যবহারের অধিকারী হন তবে তিনি সাধারণত কর্মঠ হবেন এবং এভাবে তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ তার নিজের প্রতি আকৃষ্ট করতে সক্ষম হবেন। উপসংহারে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছা যেতে পারে যে নিজেকে অপরের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য অমায়িক ব্যবহারই হচ্ছে সফলতার একমাত্র চাবিকাঠি। যত বড় পদমর্যাদার অধিকারী হোক না কেন, মানুষ বদমেজাজি মানুষকে কিছুতেই বরদাশত করতে রাজি নয়। কোনো লোকের চেয়ে কোনো লোকের প্রতি মানুষের অপেক্ষাকৃত বেশি ঝোঁক প্রদর্শনের কারণ সম্পর্কে ব্যক্তিগত সমীক্ষা চালানো হলে এর কারণসমূহ সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়বে। এ সম্পর্কে জনৈক পাশ্চাত্য পণ্ডিত তার ব্যক্তিগত সমীক্ষায় যে অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করে গেছেন তা নিচে বর্ণনা করা গেল-
‘সদা হাসিমুখ ও অন্যের প্রতি মনোযোগ আমার জীবনকে কতখানি প্রভাবিত করেছে এ সম্পর্কে আমি একদিন একটা পরীক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। সেদিনের পূর্বে আমার চেহারা বিষাদ ও বিমর্ষ থাকত। আমার চেহারাকে হাস্যোজ্জ্বল করার উদ্দেশ্যে সেদিন সকাল বেলা আমি বাড়ি হতে বের হয়ে গেলাম। আমি নিজে নিজে ভেবে দেখলাম যে আমি অনেক সময় লক্ষ করে দেখেছি যে অন্যদের সহাস্য মুখ ও আমার প্রতি মনোযোগ আমার মধ্যে একটা শক্তির সঞ্চার করে। ঠিক একইভাবে, আমি নিজেও অন্যকে প্রভাবিত করার কাজে সফলকাম হতে পারি কি না তা আবিষ্কার করার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি নিজেকে পুনরায় বললাম যে আমি যখন আমার কাজে রওয়ানা হব তখন আমার সংকল্প হবে এই যে আমি মনোযোগী হব এবং আমার মুখমণ্ডল থাকবে সদা প্রফুল, এমনকি আমি আমার নিজেকে আশ্বস্ত করতে সক্ষম হলাম যে আমি অত্যন্ত ভাগ্যবান ব্যক্তি। এর ফলে এক প্রকার আনন্দের মনোভাব আমার সমগ্র দেহকে এমনি পুলকিত করে ফেলেছিল যাতে আমার মনে হতে লাগল আমি যেন উড়ে বেড়াচ্ছি। আমি আমার মুখমণ্ডলে একটা প্রশস্ত হাসি দিয়ে আমার পারিপার্শ্বিক অবস্থার দিকে তাকাতে লাগলাম। এখনো আমি আমার চতুর্দিকের কিছু লোকের মুখে বিষণ্নতার ছাপ স্পষ্ট দেখতে পেলাম। এসব লোকের জন্য আমার অন্তর জ্বলছিল এবং আমার মনে হচ্ছিল যে আমার অন্তরের কিছু আলো যদি এদেরকে দেয়া যেত’।
‘সেদিন সকালে আমি আমার অফিসে ঢুকে হিসাবরক্ষককে এমনিভাবে সম্ভাষণ জ্ঞাপন করলাম যা তিনি পূর্বে কখনো আমার মধ্যে দেখেননি। এর পূর্বে আমি কখনো কচিৎ হাসতাম এবং তাকে কখনো এভাবে সম্ভাষণ জানাইনি। হিসাবরক্ষক প্রত্যুত্তরে আমাকে সম্ভাষণ না জানিয়ে থাকতে পারলেন না এবং সে সম্ভাষণ ছিল অত্যন্ত স্নেহমাখা ও উষ্ণ। ঠিক এ মুহূর্তে আমি এটাই অনুভব করলাম যে আমার সুখ সত্যই তাকে প্রভাবিত করেছিল।’
‘আমি যে কোম্পানির কাজ করতাম তার প্রেসিডেন্ট এমন এক ব্যক্তি ছিলেন যিনি কখনো তার মাথা উঠিয়ে অন্য কারোর সাথে কথা বলতেন না। তিনি ছিলেন একজন বদমেজাজি লোক। সেদিন তিনি অত্যন্ত খারাপ ভাষায় আমাকে গালাগাল দিলেন যা এর পূর্বে তিনি কখনো করেননি। এটা আমি কিছুতেই বরদাশত করতাম না যদি আমার এমন কোনো সংকল্প না থাকত যে যত কিছুই ঘটুক না কেন আমি কিছুতেই আমার প্রতিশ্রুতি ভাঙতে পারি না। আমি সত্যই বিনয়ের সাথে উত্তর দিলাম যে এর ফলে তার মুখমণ্ডলে কিছু মূল্যবান আভা দেখা দিল। এটা ছিল সেদিনের দ্বিতীয় ঘটনা। সেদিনের শেষদিকে আমি আমার মনোযোগ ও মুখের প্রফুল্লতা বজায় রাখার চেষ্টাই করেছিলাম, যেন তা আমি আমার সহকর্মীদের কাছে পৌঁছিয়ে দিতে পারি। এভাবে আমি আমার পরিবারের সঙ্গে এ নিয়মের অনুশীলন করেছি এবং এতেও ইতিবাচক ফল পেয়েছি। ফলে আমি এটা উদ্ভাবন করেছি যে এভাবে আমি কর্মঠ ও সুখী হতে পারি এবং আমার চতুর্দিকের সবাইকেও তা একইভাবে অনুভব করাতে পারি। তোমাদের পক্ষেও এটা সম্ভবপর। এই মনোভাব নিয়ে লোকদের সাথে সদা সহাস্য সাক্ষাৎকার, তোমার জীবনে সুখের ফুল ফোটাবে যেমনিভাবে বসন্তকালে গোলাপ ফোটে এবং এটা তোমার জন্য অনেক বন্ধু নিয়ে আসবে যারা তোমার অনন্তকালীন জীবনের জন্য বয়ে আনবে শান্তি ও কল্যাণ।’
শত্রুদের অন্তরে দয়ার সঞ্চার করার ব্যাপারে এই বৈশিষ্ট্যের শ্রেষ্ঠ অবদানের কথা কেউই অস্বীকার করতে পারবে না। সম্মান প্রদর্শন ও ভালো ব্যবহারের দ্বারা শত্রুদের ঈমানদার বানানো এবং আদর্শের প্রতি আনুগত্যশীল করা সম্ভব।
অন্য একজন পাশ্চাত্য লেখক এ সম্পর্কে নিম্নোক্ত বক্তব্য রেখে গেছেন-‘উত্তম ব্যবহারকারী ও সদা প্রফুল্ল মুখমণ্ডলের অধিকারী লোকের জন্য সকল দরজা খোলা থাকবে, আর বদমেজাজি লোকদের দরজা খোলার জন্য ডাকাতের মতো দরজায় আঘাত করতে হবে। সর্বোত্তম বস্তু হচ্ছে এমন সব যা দয়া, অমায়িক ব্যবহার ও প্রফুল্লতার সাথে সম্পৃক্ত।’
অধিকন্তু, এ প্রসঙ্গে আমি যা যোগ করতে চাই তা হচ্ছে এই যে, ভালো আচরণের জন্য সুখ দরকার এবং তা সৎস্বভাবের লোকদের পূর্ণতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু এ জন্য এ ধরনের ভালো আচরণ ও সদগুণাবলি কপটতাপূর্ণ ও নিছক লোক দেখানো না হয়ে অন্তরের অন্তস্তল থেকে উৎসারিত হতে হবে। অন্য কথায় বলতে গেলে, মানুষের প্রতি অন্তরে যে ভালোবাসার মনোভাব রয়েছে এটা হতে হবে তারই বাস্তব বহিঃপ্রকাশ। বাহ্যিক চেহারার মধ্যে সাধারণত একজন মানুষের অন্তরের ভেতরে যা কিছু লুকানো থাকে তার প্রকৃত বহিঃপ্রকাশ ঘটে না। এটা সম্ভব যে একজন মানুষের কোনো কোনো ভালো বৈশিষ্ট্য তার অন্তরের গোলযোগ ও বিভ্রান্ত মনের বিরোধী। অনেক শয়তান প্রকৃতির লোক, অনেক সময় তাদের ফেরেশতার পোশাকে সজ্জিত করে এবং এভাবে তাদের ভীতপ্রদ মুখমণ্ডলকে সৌন্দর্যের পর্দার আড়ালে ঢেকে রাখে।
আল্লাহর নবী (সা.) : নৈতিক দিক দিয়ে নিখুঁত নমুনা
আমরা সকলেই জানি যে ইসলামের অগ্রগতির একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল নবীর (সা.) পূর্ণাঙ্গ আচরণ। এই সত্য কালামে পাকে বর্ণিত হয়েছে। যেখানে সর্বশক্তিমান আল্লাহ বলেন, ‘আপনি যদি কঠোর ও নির্মম হতেন তা হলে তারা নিশ্চিতরূপে আপনার চতুর্দিক হতে সরে যেত’।
আল কোরআন, ৩ : ১৫৮।
আল্লাহর নবী (সা.) সকলের প্রতি সমান ব্যবহার করতেন। মানবতার প্রতি তাঁর গভীর ও অবর্ণনীয় ভালোবাসা, তাঁর ফেরেশতারূপ সত্তার মধ্যে, পরিপূর্ণরূপে পরিস্ফুট হয়ে পড়েছিল। তিনি সকল মুসলমানের অভাব অভিযোগের প্রতি সমান দৃষ্টি দিতেন।
‘এবং আল্লাহর নবী (সা.) তাঁর সময়কে তাঁর সাহাবাদের মধ্যে বণ্টন করে দিতেন। তিনি তাঁর নিকটবর্তী ও দূরবর্তীদের সবাইকে সমানভাবে দেখতেন’।
রাওদা আলী কাফী, ২৬৮ পৃষ্ঠা।
তিনি বদস্বভাবের অধিকারীদের ঘৃণা করতেন, তিনি বারবার বলেছেন-‘বদস্বভাব হচ্ছে খারাপ এবং বদস্বভাবী লোক তোমাদের মধ্যে নিকৃষ্টতম।’ - নাহজ আল ফাসাহা, ৩৩১ পৃষ্ঠা।
‘হে আবদুল মুত্তালিবের সন্তানরা, নিশ্চিতভাবে তোমরা তোমাদের টাকা দিয়ে মানুষকে খুশি করতে পারবে না, অতএব প্রফুল্ল মুখমন্ডল ও উৎফুল্ল আচরণের মাধ্যমে তাদের সাথে সাক্ষাৎ করো।
ওছায়িল আশ শিয়া, দ্বিতীয় খণ্ড, ২২২ পৃষ্ঠা।
নবী (সা.)-এর খাদেম আনাস বিন মালিক প্রায়ই বলতেন যখনই নবী (সা.)-এর চমৎকার বৈশিষ্ট্যের কথা মনে পড়ত তখনই তিনি বলতেন, ‘আমি দশ বছর ধরে নবীর (সা.) খেদমতে নিয়োজিত ছিলাম, এই সময়ের মধ্যে আমি যা কিছু করতাম বা না করতাম তিনি আমাকে কখনো উহ্ পর্যন্ত (অভিযোগের সুরে) বলেননি’।
ফাজাইল আল খামছাহ, ১ম খণ্ড, ১১৯ পৃষ্ঠা।
এছাড়া ভালো ব্যবহার এবং উৎফুল্ল বদন এমন উপাদান যা মানুষের আয়ু বৃদ্ধি করে। এ সম্পর্কে ইমাম ছাদিক (র.) বলেছেন, ‘দয়া ও নম্র ব্যবহার জমিনকে অধিক ফলনশীল করে এবং মানুষের আয়ু বৃদ্ধি করে।’
ওছায়িল আশ শিয়া, ২য় খণ্ড, ২২১ পৃষ্ঠা।
ডা. স্যান্ডরসন এই বিষয়ের ওপর নিম্নোক্ত কথা লিখেছেন, ‘রোগের প্রতিরোধ ও নিরাময়ের ব্যাপারে দয়া অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটা উপাদান। অনেক ওষুধ সাময়িক রোগমুক্তির সাথে সাথে অবাঞ্ছিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে অথচ দয়া স্থায়ী রোগমুক্তি ঘটিয়ে দেহের সকল অংশকে রোগমুক্ত করে। পরোপকারিতা দেহের সকল শক্তিকে প্রভাবিত করে। ভালো আচরণকারীদের রক্ত সঞ্চালন অত্যন্ত চমৎকার এবং শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রিয়াও অপেক্ষাকৃত ভালো।’
ফিরোজী ফিকর।
ইমাম সাদেক (র.)-এর বর্ণনার মধ্যে একটা সুন্দর বিচার্য বিষয় রয়েছে। তিনি বলেছেন যে, উত্তম আচরণ ও পরোপকারিতার মধ্যে একটা প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে এবং এটা মানুষের আয়ু বৃদ্ধিকারী উপাদানসমূহের অন্তর্ভুক্ত। এর পশ্চাতে যে কারণ নিহিত রয়েছে তা হচ্ছে এই যে পরোপকারী লোকেরা তাদের মধ্যে একটা সুখ ও তৃপ্তি অনুভব করে থাকে, এভাবে পরোপকারী ও উত্তম আচরণ উভয়ের মধ্যে একই ইপ্সিত ফল রয়েছে। ইমাম সাদেক (র.) সুখ লাভের জন্য এসব গুণ বৈশিষ্ট্যের কথাও বিবেচনা করেছেন যখন তিনি বলেছেন যে-
‘মানুষের সুখের একটা দিক হচ্ছে তার অমায়িক ব্যবহার’
মোস্তদরাক আল ওয়ায়িল, দ্বিতীয় খণ্ড, ৮৩ পৃষ্ঠা।
স্যামুয়েল স্মাইলম এই বিষয়ের ওপর যে সংযোজন করেছেন-‘মানুষের আবেগের ভারসাম্য ও সদাচরণ মানুষের উন্নতি ও সুখকে ঠিক অতখানি প্রভাবিত করে থাকে যতখানি এ ব্যাপারে তার অন্যান্য শক্তি ও প্রবণতা কার্যকর থাকে। বস্তুতপক্ষে মানুষের সুখ বহুল পরিমাপে তাদের অনুরাগ ও উত্তম আচরণের সাথে সম্পর্কিত’।
আখলাক।
অধিকন্তু, সদাচরণ মানুষের জীবনকে সহজতর করে এবং তার জীবনোপকরণও তার সঙ্গে অন্যদের সহযোগিতা বাড়িয়ে দেয়, ইমাম আলী (র.) বলেছেন-‘সদাচরণ প্রচুর পরিমাণে জীবনোপকরণ বৃদ্ধি করে এবং বন্ধুত্বের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতাকে বাড়িয়ে দেয়।’
গুরার আল হিকাম, পৃষ্ঠা ২৭৯।
এস মার্দিন তার গ্রন্থে নিম্নোক্ত কথাগুলো লিখেছেন-‘আমি এমন একজন রেস্টুরেন্ট ম্যানেজারকে জানি যিনি তার অমায়িক ব্যবহারের ফলে অনেক সম্পদশালী ও জনপ্রিয় হয়েছেন। আমি জানতে পারলাম যে, পর্যটকরা অনেক দূর-দূরান্ত থেকে তার রেস্টুরেন্টে আসত, এ জন্য যে ওই রেস্টুরেন্টের নির্জনতা ও আনন্দদায়ক পরিবেশ তাদের কাছে অত্যন্ত ভালো লাগত। খদ্দেররা রেস্টুরেন্টে থাকাকালীন, ম্যানেজার তাদেরকে এমন সানন্দ সম্ভাষণ জানাত যা তারা আর কোথাও কেউ দেখতে পায়নি। বস্তুতপক্ষে অন্যান্য রেস্টুরেন্টে যেখানে অভিযোগের পর অভিযোগ করেও সাড়া পাওয়া যেত না, এমন কোনো পরিস্থিতি এ রেস্টুরেন্টে কেউ কখনো হতে দেখেনি। এই রেস্টুরেন্টের কর্মচারীরা খদ্দেরদের সাথে স্বাভাবিক ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্কের ঊর্ধ্বে খদ্দেরদের সাথে অত্যন্ত আন্তরিকতা ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলত। কর্মচারীরা অত্যন্ত হাসিখুশি সহকারে খদ্দেরদের সেবাযত্নের প্রতি বিশেষ মনোযোগ প্রদর্শন করত। এ বিশেষ মনোযোগ অতিথিদের প্রতি তাদের প্রীতি ও শুভেচ্ছার মনোভাব হতে উদ্ভূত। কর্মচারীরা তাদের অতিথিদের সাথে এমন সম্পর্ক গড়ে তুলত যা তাদের মধ্যে পুনরায় এখানে আসার আগ্রহ সৃষ্টির মধ্যেই সীমিত থাকত না বরং তারা তাদের বন্ধুদেরও এখানে নিয়ে আসত। নতুন খদ্দের আকৃষ্ট করার ব্যাপারে তাদের অনুসৃত এ পদ্ধতিটা কতই না ফলপ্রসূ ছিল।’
তিনি এ প্রসঙ্গে আরো বলেছেন-‘উত্তম আচরণ ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে যে মূল্যবান ভূমিকা পালন করে এসেছে ওসবের চেয়ে বর্তমান সময়ে এর গুরুত্ব সর্বাধিক। যারা জীবনে সুখী, সফলকাম হতে চায় উত্তম আচরণ হতে হবে তাদের মূলধন।’
ইমাম সাদিক (র.) প্রফুল্লতাকে মানুষের বিচার-বিশ্লেষণ করার ক্ষমতার একটা লক্ষণ হিসেবে গণ্য করেছেন। তিনি বলেছেন-মানুষের মধ্যে যাদের পরিপূর্ণ যুক্তিসজ্ঞান ও বিচার-বিশ্লেষণ ক্ষমতা রয়েছে তারাই হলেন সর্বোত্তম আচার-আচরণের অধিকারী।
ওছায়িল আশশিয়া, ২য় খণ্ড, ২০১ পৃষ্ঠা।
স্যামুয়েল স্মাইলস বলেন, ইতিহাসে দেখা যায় শ্রেষ্ঠ প্রতিভাবান লোকেরা সুখী ও আশাবাদী ছিলেন কেননা তারা জীবনের প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং তারা তাদের যুক্তিকে তাদের নিজ সত্তার মধ্যে সুস্পষ্ট করে তোলার চেষ্টা করেছেন। কেউ তাদের অবদানসমূহের প্রতি চিন্তা করলে তাদের সুস্থ সবল আত্মা, চিন্তা, পরোপকারিতা ও উৎসাহ-উদ্দীপনা অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে দেখতে পাবে। শ্রেষ্ঠ ও জ্ঞানী লোকেরা সুখী ও আনন্দোজ্জ্বল চেহারার অধিকারী ছিলেন। তাদের অনুসারীদের জন্য তারা ছিলেন উত্তম আচরণের বাস্তব নমুনাস্বরূপ। তাদের ভক্ত অনুরক্তরা সব সময় তাদের উন্নত চরিত্র ও মহত্ত্বের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। অতএব তারা তাদের স্বাভাবিক সুখ ও সহজাত আলোর পথ অনুসরণ করেছেন।’
আখলাক
আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন- ‘সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ বৈশিষ্ট্যসমূহ যা আমার উম্মতকে বেহেশতে দাখিল করবে তা হচ্ছে আল্লাহর ভয় ও উত্তম আচরণ।’
ওছায়িল-আশশিয়া, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২১
সুতরাং যুক্তিকে গ্রহণকারী ব্যক্তি, যিনি সম্মানিত জীবনযাপন করতে চান, তার জন্য এটা অত্যাবশ্যক যে তিনি ভদ্র আচরণের মতো মহামূল্যবান আত্মিক পুঁজির অধিকারী হবেন। একটা অবাঞ্ছিত বৈশিষ্ট্যের মূলোৎপাটন করতে হলে মানুষকে ঐকান্তিক ইচ্ছা সহকারে লক্ষ্যে পৌঁছার প্রচেষ্টা চালাতে হবে। দুর্ব্যবহারের ক্ষতিকর দিকসমূহের প্রতি একটু দৃষ্টি দিলেই তা হতে এসব আচরণের মূলোৎপাটনের জন্য প্রয়োজনীয় সংগ্রাম চালানোর উপযোগী প্রেরণা, আগ্রহ ও উৎসাহ পাওয়া যাবে।
অনুবাদকঃ আবুল হোসেন

