Skip to main content

আপনার মন এবং চেতনার সম্পর্ক

বাংলাদেশের বিশিষ্ট মনোশিক্ষাবিদ, মনোবিজ্ঞানী ও মনোচিকিৎসক
অধ্যাপক ডা. এ এইচ মোহাম্মদ ফিরোজ

অধ্যাপক সাইকিয়াট্রিঃ দি রয়েল কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স
এন্ড সার্জনস অব দি ইউএসএ

মনের সাথে চেতনার সম্পর্ক
চেতনা মনের ধর্ম। কোনো কোনো মনোবিদ চেতনা ও মনকে অভিন্ন মনে করেন। কিন্তু সামপ্রতিককালে মনোবিদগণ মনে করেন যে, চেতনা ও মন সমব্যাপক নয়। মন চেতনা থেকে ব্যাপক। চেতনার নিচে মনের আরো দুটি স্তর আছে-

  • অবচেতন ও
  • নির্জ্ঞান

চেতনার কোনো তর্কবিদ্যাসম্মত সংজ্ঞা দেয়া সম্ভব নয়। চেতনা হলো মনের নিজের অবস্থা সম্পর্কে অবগতি বা অ্যাওয়ারনেস। চেতনা বিভিন্ন উপাদানের উল্লেখ করে যেমন-চেতনা হলো চিন্তা, অনুভূতি ও ইচ্ছা প্রভৃতি মনের প্রক্রিয়ার সাধারণ লক্ষণ। চেতনা তার বিপরীত অবস্থার অর্থাৎ বস্তুর পার্থক্য দেখিয়ে দেয় যেমন-চেতনা হলো মনের ধর্ম, বিস্তৃত হলো জড়ের ধর্ম। চেতনা জ্ঞাতা ও জ্ঞেয়র সম্পর্ক নির্দেশ করে যেমন-চেতনা হলো জ্ঞাতা মন এবং জ্ঞেয় বস্তুর মধ্যে এক সম্বন্ধ। চেতনা হলো অভ্যন্তরীণ আলো, যার সাহায্যে মনে যা কিছু ঘটে তা আমাদের কাছে প্রত্যক্ষ গোচর হয়ে ওঠে।

বিজ্ঞানী ল্যাডের বর্ণনা অনুসরণ করে বলা যায়, ‘গভীর এবং শব্দহীন ঘরে নিমগ্ন থাকার যে অবস্থা তার সঙ্গে তুলনা করলে আমরা যে জাগ্রত অবস্থা দেখি তাই হলো চেতনা।’ চেতনাকে এভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে তা হলো-অন্তর অভিজ্ঞতা যা প্রত্যেক মনেরই হয়ে থাকে যেমন-সুখ-দুঃখ অনুভূতির অভিজ্ঞতা, যে অভিজ্ঞতার অংশীদার অপর লোক হতে পারে না। ভিন্ন ভাষায় বলা যেতে পারে, ‘যাকে আমরা বাহ্যত মন বলি, তারই অবগতি রূপ বা অভ্যন্তরীণ ক্রিয়া হলো চেতনা।’

     চেতনার বৈশিষ্ট্য

  • চেতনার মধ্যে একটা নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা আছে। মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ও ইচ্ছা প্রভৃতি চেতন প্রক্রিয়াগুলো একটির পর একটি আসা-যাওয়া করছে, এ পর্যায়ের মধ্যে কোনো ফাঁক-ফোকর নেই, এর গতি অব্যাহত।
  • চেতনার এ ঐক্যভূত অবিরাম ধারা লক্ষ করে মনোবিদ উইলিয়াম জেমস চেতনাকে একটি নদী বা স্রোতস্বিনীর সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং চেতনার অবিচ্ছিন্ন স্রোতপ্রবাহকেই Stream of consciousness বা মন বলে অভিহিত করেছেন।
  • চেতনার সাধারণ ঐক্য এবং নিরবচ্ছিন্নতার মধ্যে আবার বিশেষ এক ঐক্য এবং নিরবচ্ছিন্নতা লক্ষ করা যায়। সময়ের দিক থেকে চেতনার বিভিন্ন অবস্থার মধ্যে যদিও অনেক সময় কোনো নিরবচ্ছিন্নতা লক্ষ করা যায় না, তবু কোনো উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য এবং এ লক্ষ্য সাধনের জন্য যে আগ্রহ, এসব আপাত ভিন্ন চেতনার অবস্থাগুলোকে একটি যোগসূত্রের দ্বারা পরস্পরকে সংযুক্ত করে। যেমন-একটি বই রচনা করার পূর্বে লেখকের বিভিন্ন কার্য, চিন্তাধারা, অনুভূতি একটি বিশেষ উদ্দেশ্যকে লক্ষ্য করেই অগ্রসর হয়।
  • কাজেই লেখকের মনের বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্যে একটা অবিচ্ছিন্ন ধারা বর্তমান।
  • পরিবর্তনশীলতা চেতনার অন্যতম ধর্ম।
  • কোনো বস্তু সম্পর্কে সচেতন হতে হলে অন্য বস্তু থেকে তাকে পৃথক করে নিতে হয়। অর্থাৎ অন্য বস্তুর সঙ্গে পার্থক্য বা বৈসাদৃশ্য লক্ষ করে তবেই আমরা কোনো একটি বস্তু সম্পর্কে সচেতন হতে পারি, এর জন্য প্রয়োজন চেতনার পরিবর্তনশীলতা।
  • যদি একই বস্তু আমরা ক্রমান্বয়ে প্রত্যক্ষ করতে থাকি, তাহলে ধীরে ধীরে সে বস্তুর চেতনা লুপ্ত হয়ে যায়। যে কারণেই সংবেদন, ধারণা এবং অনুভূতির পরিবর্তন প্রয়োজন।
  • একেই বলা হয় চেতনার আপেক্ষিকতা সম্বন্ধনীয় নীতি।
  • জ্ঞাতা ও জ্ঞেয়র পার্থক্যবাধ চেতনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
  • চেতনার মধ্যে একদিকে আছে জ্ঞাতা এবং অপরদিকে আছে জ্ঞেয়।
  • যখন আমরা কোনো বিষয় সম্পর্কে সচেতন হই তখন আমাদের এই চেতনা থাকে যে-আমিই জ্ঞাতা, আমিই জানছি।
  • অপরদিকে আবার এই চেতনা থাকে যে, আমি কোনো কিছুকে জানছি। ‘আত্ম-জ্ঞান’ এবং ‘বস্তু-জ্ঞান’ এবং উভয়ের পার্থক্যের যে বোধ, তা চেতনার উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
  • মনোনয়ন বা নির্বাচন করা চেতনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
  • একটি পরিবেশের সব বস্তুর প্রতিই সচেতন হওয়া চেতনার পক্ষে সম্ভব নয়।
  • চেতনা পরিবেশের বস্তুবিশেষের ওপর নিজেকে নিবিষ্ট করে এবং অপর বস্তুকে বর্জন করে।
  • মনের আগ্রহই নির্ধারণ করে চেতনা কার ওপর নিবিষ্ট হবে বা কার ওপর নিবিষ্ট হবে না।
  • অনুভূতি, চিন্তা ও ইচ্ছা-মনের এ সাধারণ প্রক্রিয়াগুলোর মাধ্যমেই চেতনা নিজেকে প্রকাশ করে। মানব-মন বুঝতে হলে চেতনা বোঝা প্রয়োজন।

    মন ও চেতনার ক্ষেত্র
    অনেকেই ‘মন’ ও ‘চেতনা’ কে সমার্থক শব্দ বলে মনে করেন এবং মনের ক্ষেত্রকেই চেতনার ক্ষেত্র বলে মনে করেন; কিন্তু ‘মন’ ও ‘চেতনা’ সমার্থক শব্দ নয়, চেতনা মনের স্বরূপ ধর্ম।

  • মন ও চেতনার ক্ষেত্রও সমব্যাপক নয়।
  • চেতনার ক্ষেত্রের তুলনায় মনের ক্ষেত্রের ব্যাপকতা অনেক বেশি।
  • মনের চেতন স্তর ছাড়াও রয়েছে নির্জ্ঞান স্তর।
  • চেতন স্তর ও নির্জ্ঞান স্তর উভয়কে একত্রে যুক্ত করে দিলেই মনের ক্ষেত্রটিকে পাওয়া যাবে এবং মনের বিস্তৃতি বা ব্যাপকতা কতদূর তা বোঝা যাবে।
  • নির্জ্ঞান স্তরটি চেতনার স্তরের বহির্ভূত হলেও মনোরাজ্যের বহির্ভূত নয়।
  • দু-একটি উপমার সাহায্যে বিষয়টিকে বুঝে নেয়া যাক : মনকে একটা বৃহৎ হলঘরের সঙ্গে তুলনা করতে পারি। এ হলঘরটি বিচিত্র বস্তুতে পূর্ণ; এর মাঝে রয়েছে একটা ছোট্ট বৈদ্যুতিক বাতি। যেটির নিচের কিছু অংশ ছাড়া আর সবটা একটা আচ্ছাদনি দিয়ে ঢাকা। বৈদ্যুতিক বাতিটির ঠিক নিচের কিছু অংশ বেশ স্পষ্টালোকিত, যার জন্য সেখানের জিনিসগুলো স্পষ্টভাবে দেখা যায়। তবে তার দূরের যে অংশ সেটি হলো স্বল্পালোকিত, সেখানের বস্তুগুলোর আকার অস্পষ্টভাবে প্রত্যক্ষ করা যায়। হলঘরের এই স্পষ্টালোকিত ও অর্ধালোকিত বা স্বল্পালোকিত ক্ষেত্রগুলোই মনের চেতন স্তর। এর দূরের যে অংশে কোনো আলো পৌঁছায়নি, যেটি সম্পূর্ণ অন্ধকারে নিমজ্জিত এবং এ অন্ধকারের ক্ষেত্রটিই হলো মনের নির্জ্ঞান স্তর। হলঘরের অন্ধকার অংশে যে বস্তুগুলো রয়েছে সেগুলো প্রত্যক্ষের সাহায্যে জানা সম্ভব নয়, তাদের অনুমানের সাহায্যে বা অন্য উপায়ে জানতে হয়।
  • আমাদের মনের এ নির্জ্ঞান স্তরের অস্তিত্ব সম্পর্কেও আমাদের অন্যভাবে সচেতন হতে হয়।
  • মানুষের আচরণ দেখে বা পরোক্ষ উপায়ে, অর্থাৎ মনোসমীক্ষণ বা স্বপ্নের বিশ্লেষণের সাহায্যেই মনের এ নির্জ্ঞান স্তরের অস্তিত্ব জানতে পারা যায়।
  • আরো একটি উপমার সাহায্যে মনের এ ব্যাপকতা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যেতে পারে। যেমন-সমুদ্রে ভাসমান তুষার শিলার একটা ক্ষুদ্র অংশ পানির উপরে থাকার জন্যই আমাদের প্রত্যক্ষ গোচর হয় এবং এর বৃহত্তম অংশ পানির মধ্যে নিমজ্জিত থাকার জন্য আমাদের দৃষ্টির আড়ালে থাকে। সেরূপ মনের যেটি চেতন স্তর, সেটি ছাড়াও একটি বৃহত্তর অংশ আছে, সেটি হলো নির্জ্ঞান স্তর। এই চেতন স্তর ও নির্জ্ঞান স্তর মিলেই মনের ক্ষেত্র।

     অবচেতন মনের প্রমাণ
      নিম্নলিখিত ঘটনাগুলো অবচেতন মনের অস্তিত্ব প্রমাণ করে। এগুলো হলো-

  • স্মৃতিঃ অনেক অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের মনে সংরক্ষিত হয়ে থাকে, যেগুলোকে পরে আমরা প্রয়োজনমতো পুনরুজ্জীবিত করি। অতীত অভিজ্ঞতার ফল প্রতিরূপের আকারে অবচেতন মনে সংরক্ষিত থাকে।
  • প্রত্যভিজ্ঞাঃ অতীতে দেখেছি এমন কোনো কোনো ব্যক্তিকে দেখা মাত্র চিনতে পারি। ব্যক্তিটির প্রতিরূপ অবচেতন মনে সংরক্ষিত থাকে বলেই তাকে চেনা সম্ভব হয়।
  • অভ্যাস এবং সহজাত প্রবৃত্তিঃ অভ্যাস এবং সহজাত প্রবৃত্তি প্রকাশের মাধ্যমে অবচেতন মনের ক্রিয়া লক্ষ করা যায়। অভ্যাসসিদ্ধ কাজের বেলায় লক্ষ করা যায় যে, কাজটির সঙ্গে আরো একটি কাজও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। মোটর গাড়ির চালক অপরের সঙ্গে কথোপকথনরত থেকে গাড়ি চালনা করতে পারেন। এক্ষেত্রে মনের অবচেতন স্তর গাড়ি চালনার কাজটি সম্পন্ন করে এবং কথোপকথনের কাজটি সম্পন্ন করে মনের চেতন স্তর।
  • সংবেদন, প্রত্যক্ষ, চিন্তনঃ প্রভৃতি মনের প্রক্রিয়াগুলো ও অবচেতন মনের অস্তিত্ব প্রমাণ করে। যেমন- সংবেদনের প্রতিরূপ অবচেতন মনে সংরক্ষিত থেকে যদি পুনরুজ্জীবিত না হয় তাহলে প্রত্যক্ষ সম্ভব হয় না। সাদৃশ্যকরণ, পৃথককরণ, প্রত্যভিজ্ঞা প্রভৃতি যেসব ক্রিয়ার উপরে প্রত্যক্ষ নির্ভর করে সেগুলো অবচেতন মনের দ্বারাই সম্পন্ন হয়।
  • অব্যক্ত যুক্তিঃ খুব সাধারণ একটি প্রত্যক্ষের বিষয়কে বিশ্লেষণ করলে অনেক সময় অবচেতন মনের ক্রিয়া লক্ষ করা যায়। একটি লাঠি দেখানো মাত্রই শিশু চট করে সিদ্ধান্ত নেয় এবং ভয়ে দৌড়ায়। এক্ষেত্রে শিশুটির অবচেতন মনই অব্যক্ত যুক্তির বিভিন্ন স্তর দ্রুত অতিক্রম করে।
  • মনের সাথে রয়েছে চেতনার সম্পর্ক। আর এ সম্পর্ককে বুঝতে না পারলে মনকে পরিপূর্ণভাবে বোঝা সম্ভব নয়।

মনের নির্জ্ঞান স্তরের প্রমাণ
চেতনার পরিধি অপেক্ষা মনের পরিধি অনেক বেশি ব্যাপক। মনের সামান্য অংশই চেতন স্তর। এ চেতনার স্তরকে অতিক্রম করেও এক গভীর স্তর আছে যেটি হলো মনের নির্জ্ঞান স্তর। এ নির্জ্ঞান স্তর চেতনার স্তরবহির্ভূত, কিন্তু মনোরাজ্যের বহির্ভূত নয়। নির্জ্ঞান স্তরে বিশ্বাস স্থাপন না করলে অনেক মানসিক ঘটনার কোনো যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব হয় না। যারা মনকে চেতনার ক্ষেত্রের সঙ্গে সমব্যাপক মনে করেন তারাই মনের নির্জ্ঞান স্তরের অস্তিত্বে বিশ্বাসী নয়। কিন্তু মনোবিদরা নির্জ্ঞান স্তরের অস্তিত্বের স্বপক্ষে কতকগুলো যুক্তি উপস্থাপিত করেছেন। মনোচিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী ফ্রয়েডের মতে, শৈশবকালে ব্যক্তির অনেক অন্যায় কামনা স্বাভাবিক ও সমাজ অনুমোদিত পথে আত্মপ্রকাশ করতে সুযোগ পায় না। শাস্তি, নিন্দা প্রভৃতির ভয়ে এসব অন্যায় কামনা অবদমিত হয়ে নির্জ্ঞান মনে আশ্রয় গ্রহণ করে এবং আত্মপ্রকাশের সুযোগ খোঁজে, কিন্তু স্বাভাবিক পথে প্রকাশিত হতে না পেরে বিকৃতরূপ নিয়ে বা ছদ্মবেশে সেগুলো প্রকাশিত হয়। দৈনন্দিন জীবনে ভুলভ্রান্তি, স্বপ্ন, মানসিক রোগ-ব্যাধি প্রভৃতির মাধ্যমে এগুলোর আত্মপ্রকাশ ঘটে। মনোসমীক্ষণের ফলে এগুলো জানা যায়। কাজেই ফ্রয়েডের মতে, নির্জ্ঞান মন অবদমিত ইচ্ছার আশ্রয়স্থল। অনেক মনোবিদ মনে করেন যে, অবদমিত ইচ্ছার ব্যাখ্যা ছাড়াও স্বভাবী মনের মানসিক প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যার জন্যও নির্জ্ঞান স্তরের সহায়তার প্রয়োজন হয়।
নির্জ্ঞান স্তরের প্রমাণ

  • দৈনন্দিন জীবনের ভুলভ্রান্তিঃ ফ্রয়েডের মতে, দৈনন্দিন জীবনের অনেক  ভুলভ্রান্তি যেমন-নাম ভুলে যাওয়া, কথা বলার ভুল, লেখার ভুল প্রভৃতি নির্জ্ঞান মনের অস্তিত্ব প্রমাণ করে। কোনো ব্যক্তি কতকগুলো নিমন্ত্রিত ব্যক্তির তালিকা তৈরি করতে গিয়ে দেখলেন যে, একটি পরিচিত ব্যক্তির নাম তিনি ভুলে গেছেন। কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেল যে, লোকটিকে আদৌ তার পছন্দ নয়। আসল কারণ তার নির্জ্ঞান মনে লুকিয়ে আছে।
  • স্বপ্নঃ নির্জ্ঞান মনের অবদমিত কামনা-বাসনা যখন চেতন বা সজ্ঞান মনে বিকৃতভাবে প্রবেশ করে তখনই ব্যক্তি স্বপ্ন দেখে। কাজেই স্বপ্ন নির্জ্ঞান মনের অস্তিত্ব প্রমাণ করে।

দিবাস্বপ্ন
অনেক সময় ব্যক্তি জাগ্রত অবস্থায় স্বপ্ন দেখে। অলীক কল্পনায় বিভোর হয়ে সে হাস্যকর আচরণ করে। নিজেকে বিরাট ধনী ব্যক্তি ভেবে কল্পিত কোনো অধীনস্ত ব্যক্তিকে আঘাত করার চেষ্টা করে। এরকম আচরণের ক্ষেত্রেও বর্তমান থাকে কোনো অবদমিত ইচ্ছা, যা নির্জ্ঞান মনে আশ্রয় নিয়ে তার সজ্ঞান মনের আচরণকে প্রভাবিত করে।

সংবেশন ও সংবেশনোত্তর অভিভাবন
সংবেশন বা কৃত্রিম উপায়ে উৎপাদিত স্বপ্নাবস্থাও মনের নির্জ্ঞান স্তরের অস্তিত্ব প্রমাণ করে। আমাদের অতীত জীবনের অনেক ঘটনা আমরা অনেক চেষ্টা করেও স্মরণ করতে পারি না। আবার সংবিষ্ট অবস্থায় আমরা সেগুলো স্মরণ করতে পারি। আবার সংবিষ্টকাল অতীত হয়ে গেলে জাগ্রত অবস্থায় সেসব ঘটনা বিস্মৃত হই। সুতরাং এসব ঘটনার স্মৃতি মনের নির্জ্ঞান স্তরে প্রচ্ছন্ন অবস্থায় থাকে, এরূপ অনুমানই যুক্তিসঙ্গত মনে হয়। আবার সংবিষ্ট অবস্থায় কোনো ব্যক্তিকে সংবেশনোত্তরকালে একটি নির্দিষ্ট সময়ে কার্য করার জন্য আদেশ করে দেখা গেছে যে, ব্যক্তি সংবেশনোত্তরকালে কার্যটি সম্পন্ন করেছে। কিন্তু সংবেশকের আদেশের কথা তার মোটেই মনে নেই। এ ঘটনা থেকে অনুমান করা যেতে পারে যে, নির্জ্ঞান স্তর ব্যক্তির অগোচরে ব্যক্তিকে দিয়ে কাজটি করিয়ে নিয়েছে।

অনেক উদ্দেশ্যের বিকৃত প্রকাশ
যেমন-উদগতি, অভিক্রান্তি, বিপরীত গঠন প্রভৃতি নির্জ্ঞান মনের অস্তিত্ব প্রমাণ করে। কোনো নারী সেবিকাব্রত গ্রহণ করেছে কিন্তু আসল কারণ মাতৃত্বের কামনা নির্জ্ঞান মনে আত্মগোপন করে আছে। একে বলা হয় উদগতি। আবার কোনো নারী হয়তো পশু-পাখি পুষে খুব আনন্দ পান, আসল কারণ অবদমিত মাতৃত্বের কামনা, একে বলা হয় অভিক্রান্তি। কোনো সৎ ব্যক্তি অন্যায় শাস্তি লাভ করে হঠাৎ এক বড় মাপের দুর্বৃত্তে পরিণত হওয়া বিপরীত গঠন বা রিয়্যাকশন ফরমেশনের উদাহরণ। এরূপ ক্ষেত্রে নির্জ্ঞান ইচ্ছা তার বিপরীত রূপের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে। এছাড়াও প্রতিফলন, অভিক্ষেপ, যুক্তাভ্যাস, ক্ষতিপূরণ, অবাধ কল্পনা, প্রত্যাবৃত্তি প্রভৃতি ঘটনাও নির্জ্ঞান মনের প্রমাণ করে।

মানসিক রোগগ্রস্ত ব্যক্তিদের কার্যকলাপ
মানসিক রোগগ্রস্ত ব্যক্তিদের কার্যকলাপও নির্জ্ঞান মনের প্রমাণ দেয়। যেমন-আতঙ্কগ্রস্ত রোগী অকারণে ভীতিগ্রস্ত হয়। শৈশবের কোনো অবদমিত অন্যায় কামনা নির্জ্ঞান মনে লুকিয়ে থেকে সজ্ঞান মনের আচরণকে প্রভাবিত করে। শুচিবায়ু, হিস্টিরিয়া, বিষাদ বায়ু, চিত্তভ্রংশী, বাতুলতা প্রভৃতি মানসিক ব্যাধির মূলেও কোনো কোনো অবদমিত নির্জ্ঞান কামনা থাকে, যেগুলো নির্জ্ঞান মনে আত্মগোপন করে থাকে।

আকস্মিক স্মৃতি
অনেক সময় কোনো একটি বিষয় আপ্রাণ চেষ্টা করেও মনে আনা সম্ভব হয় না। কিন্তু অন্য আর একটি বিষয় চিন্তা করার সময় সে বিষয়টি হঠাৎ মনে জেগে ওঠে। নির্জ্ঞান মনের স্তর থেকেই যে বিষয়টি চেতনার কেন্দ্রস্থলে এসে পৌঁছায়, এরূপ অনুমানই এ জাতীয় ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে সহায়তা করে।
নিদ্রাকালে মনের ক্রিয়া

ঘুমাতে যাওয়ার আগে যে সমস্যার সমাধান খুঁজে পাওয়া যায়নি, দেখা গেছে ঘুম ভাঙার পর বিনা প্রচেষ্টায় তার সমাধান খুঁজে পাওয়া যায়। মনের চেতনাস্তর যখন এ সমস্যার সমাধান জোগায়নি তখন নির্জ্ঞান স্তরই সে সমস্যার সমাধানটি জুগিয়ে দিয়েছে-এরূপ অনুমান করা যুক্তিযুক্ত মনে হয়।

অগোচর আবেগ
অনেক সময় কোনো লোকের প্রতি আমরা অকারণেই আকর্ষণবোধ করি বা অকারণেই ঘৃণাবোধ করি। কিন্তু এ আকর্ষণ বা ঘৃণা বিনা কারণেই মনে উৎপন্ন হয়েছে, এরকম অনুমান যুক্তিসঙ্গত নয়। বস্তুত মনের নির্জ্ঞান স্তরেই আবেগগুলো মনের অগোচরে জন্মলাভ করেছে, দিন দিন বৃদ্ধিলাভ করেছে এবং সুযোগমতো মনের চেতন স্তরে এসে উপস্থিত হয়েছে।

মানব-মন এক জটিল ব্যাপার। একে বুঝতে হলে মনোবিজ্ঞানের অনেক কিছুই বুঝতে হয়, জানতে হয়। আর এভাবেই মনকে চেনার পথ সহজ হয়ে আসে। মন ও শরীর মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। মন ভালো হলে যেমন শরীর ভালো থাকে, তেমনি শরীর ভালো হলেও মন ভালো থাকে। তবে মন অসুস্থ হলে শরীর সুস্থ থাকতে পারে কিন্তু মনের অসুস্থতা শরীরের ওপর কিছু না কিছু প্রভাব বিস্তার করে। অনেক অসুখ রয়েছে শুধু মনে হয়, যেমন-ডিপ্রেশন, সিজোফ্রেনিয়া ইত্যাদি। আর অনেক অসুখ রয়েছে শুধু শরীরে হয়, যেমন-ডায়াবেটিস, ক্যান্সার ইত্যাদি। কিন্তু বেশির ভাগ অসুখ হয় শরীর ও মন জুড়ে। হাঁপানি, ব্লাডপ্রেসার, চর্মরোগ, যৌনতার সমস্যা শরীর ও মনের যুক্ত সমস্যা। মানব শরীরের সকল অসুখই মন ও শরীরকে কমবেশি আঘাত করে। আজকের আলোচনায় আমি মন ও শরীরের মতবাদ সম্পর্কে তুলে ধরছি।

মন ও শরীরের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে একাধিক মতবাদের অস্তিত্ব রয়েছে। একেক বিজ্ঞানী একেক রকম মতবাদ দিয়েছেন মন ও শরীর সম্পর্কে। মনোবিজ্ঞানের দিক থেকে যে দুটি মতবাদ আলোচনা করা প্রয়োজন তা হলো-

  • মিথষ্ক্রিয়াবাদ বা অন্যান্য ক্রিয়াবাদ এবং
  • সমান্তরালবাদ বা সহচরবাদ

     মিথষ্ক্রিয়াবাদ

  • এ মতবাদ অনুযায়ী যদিও মন ও শরীর দুটি পৃথক সত্তা তবুও তারা পরস্পরের ওপর ক্রিয়া করে।
  • মন শরীরের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে অর্থাৎ শরীরের কার্যকলাপকে নিয়ন্ত্রিত করতে পারে।
  • অনুরূপভাবে শরীর মনের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
  • মন যদি প্রফুল্ল থাকে, শরীরের সক্রিয়তা বেড়ে যায়।
  • আবার শরীরের অসুস্থতা মনে বিষণ্নতার মতো মনোব্যাধির জন্ম ঘটাতে পারে।
  • সংবেদন, চিন্তন প্রভৃতি মানসিক ক্রিয়া শরীরের সহায়তা ছাড়া ঘটতে পারে না।
  • সৃষ্টিগত স্নায়ু, দর্শনেন্দ্রিয়, মস্তিষ্কের দর্শনকেন্দ্র না থাকলে দর্শন-সংবেদন ঘটতে পারে না।
  • কাজেই শরীর মনের ওপর ক্রিয়াশীল এ কথা বলা যেতে পারে।
  • আবার জীবনের অধিকাংশ ক্রিয়াই তার কোনো উদ্দেশ্য বা প্রয়োজন মেটানোর জন্য ঘটে থাকে।
  • সুতরাং মন শরীরের ওপর ক্রিয়াশীল এ কথাও বলা যেতে পারে।
  • উদ্দেশ্য সাধন করার জন্য শরীরের মাধ্যমেই মনকে তা করতে হয়।
  • এ মতবাদের মূল বক্তব্যটি হলো শরীর ও মনের মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্ক বর্তমান।
  • সময় সময় শারীরিক প্রক্রিয়া মনের প্রক্রিয়ার কারণ।
  • আবার অনেক সময় মনের প্রক্রিয়া শারীরিক প্রক্রিয়ার কারণ।
  • যেমন-আমার ইচ্ছা হলো একটি গল্পের বই পড়ি। বইটি নেয়ার জন্য টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলাম, এখানে মন আমার শরীরের পেশির অর্থাৎ শরীরের ওপর ক্রিয়া করল। আবার যখন আমি বইটি পড়ছি তখন হঠাৎ আমার হাত পাশে রাখা কলমটি স্পর্শ করল এবং আমার মনোযোগ সেদিকে চলে গেল। এখানে আমার হাত অর্থাৎ শরীর মনের ওপর ক্রিয়া করল। অর্থাৎ শরীর প্রত্যক্ষভাবে মনের ওপর কার্য করে, আবার মন প্রত্যক্ষভাবে শরীরের ওপর কার্য করে।
  • মিথষ্ক্রিয়াবাদকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মনোবিদ ‘স্টাউট’ মনকে একটি স্বতন্ত্র হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছেন।
  • কোন নির্দিষ্ট পথে স্নায়বিক উত্তেজনাকে চালিত করতে হবে-মনই তা নির্ধারণ করে নেয়।
  • তার মতে আমাদের কোনো শারীরিক কার্যকে কেবল পূর্ববর্তী মস্তিষ্কের ক্রিয়া দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় না।
  • মনের ইচ্ছা, আকাঙক্ষা বা উদ্দেশ্যই মস্তিষ্কের ক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে।

     মন ও শরীরের মিথষ্ক্রিয়াবাদের সমালোচনা

  • মন ও শরীর যদি স্বতন্ত্র সত্তা হয়, তাহলে উভয়ের মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্ক কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে?
  • পরস্পর পৃথক হয়েও অর্থাৎ শরীর অচেতন এবং মন চেতন হলে একটি আর একটির ওপর কার্য করা কীভাবে সম্ভব?
  • একটি শারীরিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে আর একটি শারীরিক প্রক্রিয়ার বা একটি মনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে আর একটি মনের প্রক্রিয়ার কার্যকারণ সম্পর্কের বিষয়টি উপলব্ধি করা যায়।
  • কিন্তু পৃথক সত্তাবিশিষ্ট শারীরিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে মনের প্রক্রিয়ার কার্যকারণ সম্পর্কের স্বরূপটি বুঝে ওঠা কঠিন।
  • মন ও শরীরের পারস্পরিক প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি স্বীকার করে নিলেও যেহেতু ওই প্রতিক্রিয়া দুটি জড়বস্তুর মধ্যে প্রতিক্রিয়া নয়, সেহেতু বিষয়টি রহস্যময় হয়েই থেকে যায়।
  • শরীর মূর্ত বস্তু, মন অমূর্ত।
  • মন অমূর্ত হয়ে কীভাবে শরীররূপ একটি বস্তুর ওপর প্রভাব বিস্তার করে এবং শরীর একটি মূর্ত বস্তু হয়েও কীভাবে অমূর্ত মনের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে, তার কোনো যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায় না।

     মন ও শরীরের মিথষ্ক্রিয়ার দার্শনিক ভূমিকা

  • এ মতবাদ অনুযায়ী মন ও শরীর দুটি স্বতন্ত্র সত্তা।
  • এরা পরস্পরের বিপরীত দ্রব্য।
  • এদের ধর্ম পরস্পরবিরুদ্ধ।
  • শরীরের ধর্ম বিস্তৃত বা স্থানব্যাপ্তি এবং মনের ধর্ম চেতনা।
  • শরীর জড় বা অচেতন, মন চেতন ও অজড়াত্মক।
  • কিন্তু মন ও শরীরের ধর্ম পরস্পরবিরোধী হলেও এদের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক আছে এবং একটি আর একটির ওপর ক্রিয়া করে।
  • আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনে ফরাসি দার্শনিক দেকার্ত মিথষ্ক্রিয়াবাদের প্রবর্তক।
  • মন ও শরীর পরস্পরবিরুদ্ধ দ্রব্য বা বস্তু হওয়া সত্ত্বেও যে পরস্পরের উপরে ক্রিয়াশীল হতে পারে, দেকার্ত স্পষ্টতই তা স্বীকার করেছেন এবং তার অভিমতানুযায়ী মন ও শরীর মানব মস্তিষ্কের নিচে অবস্থিত পিনিয়াল গ্রন্থির মাধ্যমেই পরস্পরের ওপর ক্রিয়াশীল হয়।
  • দেকার্তের অনুগামী ‘মালেব্রা ও জিউলিক্‌স’-এর অভিমতানুযায়ী পিনিয়াল গ্রন্থি নয়, ঈশ্বরের মধ্যস্থতায় মন ও শরীর পরস্পরের ওপর ক্রিয়াশীল হয়।
  • যখনই শরীর মনের ওপর এবং মন শরীরের ওপর ক্রিয়া করার প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন ঈশ্বর উভয়ের মধ্যে সম্বন্ধ স্থাপন করে দেয়।
  • পাশ্চাত্য দর্শনে এ অভিমত প্রয়োজনবাদ বা উপলক্ষবাদ।
  • তবে মজার কথা হলো মনোবিজ্ঞানে এ দার্শনিক মতবাদের কোনো উপযোগিতা নেই।

     সমান্তরালবাদ বা সহচরবাদ

  • এ মতবাদ অনুসারে মন ও শরীর দুটি স্বতন্ত্র সত্তা, তবু তারা সমান্তরালভাবে সক্রিয়।
  • মন ও শরীরের মধ্যে কোনো কার্যকারণ সম্বন্ধ নেই।
  • শরীর মনের ক্রিয়ার কারণ নয় বা মন শরীরের ক্রিয়ার কারণ নয়।
  • মন ও শরীর পরস্পর প্রভাবমুক্ত।
  • তবে যখনই মনের কোনো ক্রিয়া ঘটে তখনই তার অনুষঙ্গ বা সহগামী হিসেবে কোনো শারীরিক ক্রিয়া ঘটে।
  • আবার শারীরিক ক্রিয়ার অনুষঙ্গ হিসেবে মনের ক্রিয়া ঘটে।
  • এ মতবাদকে সমান্তরালবাদ নামে অভিহিত করার কারণ এই যে, দুটি সমান্তরাল সরলরেখার কোনোটি যেমন অপরটির ওপর নির্ভর না করেও বা কোনো বিন্দুতে ছেদ না করেও পারস্পরিক দূরত্ব সমান রেখে একই দিকে অগ্রসর হতে পারে।
  • তেমনই মন ও শরীর পরস্পরের ওপর নির্ভর না করে, একটি আর একটির সঙ্গে যুক্ত না হয়ে একই তালে পরিবর্তিত হতে পারে।
  • এ মতবাদের যারা সমর্থক তাদের মধ্যে কেউ কেউ শরীর বলতে মস্তিষ্কের ক্রিয়া বুঝে থাকেন।
  • তাদের মতে, মন ও শরীর পরস্পর নিরপেক্ষ হওয়া সত্ত্বেও মনের ক্রিয়া এবং স্নায়বিক ক্রিয়ার মধ্যে এক অদ্ভুত অনুগমন লক্ষ করা যায়-একটি ঘটলে আর একটিও ঘটে।
  • যেমন-‘দেখা’ এ মানসিক প্রক্রিয়া যখনই ঘটে তখন তার অনুষঙ্গ হিসেবে মস্তিষ্কের দর্শন কেন্দ্রে স্নায়বিক ক্রিয়া ঘটে।
  • মানসিক ক্রিয়া এবং স্নায়বিক ক্রিয়ার মধ্যে সময়ের দিক থেকে একটি সহগামিতা আছে বটে।
  • তবে কোনো কার্যকারণ সম্পর্ক নেই এবং মানসিক ক্রিয়া ও স্নায়বিক ক্রিয়া দুটি সমান্তরাল রেখার মতো পাশাপাশি চলেছে।

     মন ও শরীরের সমান্তরালবাদের সমালোচনা

  • সব রকমের শারীরিক ক্রিয়ার সহগামী মনের ক্রিয়ার অস্তিত্ব আছে কিনা সে সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের জ্ঞান আজ অসম্পূর্ণ।
  • যেমন-সুস্থ অবস্থায় পরিপাকক্রিয়া, রক্ত চলাচল ক্রিয়া প্রভৃতি শারীরিক ক্রিয়ার আনুষঙ্গিক কোনো মানসিক ক্রিয়ার কথা সম্পূর্ণ জানা নেই।
  • আবার নির্জ্ঞান মনের সমান্তরাল শারীরিক ক্রিয়ার কথাও ১০০% জানা নেই।
  • সব চেতন বৃত্তির সমান্তরাল শারীরিক ক্রিয়া নিরূপণ করা সম্ভব হয় না, জটিল চিন্তা, বিমূর্ত চিন্তা, আত্মচেতনা প্রভৃতি মনের ক্রিয়ার সমান্তরাল শারীরিক প্রক্রিয়া নিরূপণ করা কঠিন।
  • আকস্মিক অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে যে মনের প্রক্রিয়া ক্রিয়াশীল হয় তার সমান্তরাল শারীরিক প্রক্রিয়া নিরূপণ করা সহজ নয়।
  • এ মতবাদ শারীরিক ক্রিয়া ও মনের ক্রিয়ার সহগামিতার কথাই কেবল উল্লেখ করে, কিন্তু কেন এরা পরস্পরের সহগামী বা যখনই কোনো মনের ক্রিয়া দেখা যায় তখনই তা সমান্তরাল কোনো শারীরিক ক্রিয়া কী কারণে দেখা যায়, তার কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারে না।
  • মনের ক্রিয়া এবং শারীরিক পরিবর্তনের মধ্যে কোনো সুনির্দিষ্ট সমান্তরালতা আছে কিনা অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায় না।
  • দেহের কোনো স্থানে আঘাত করলে মনে বেদনার অনুভূতি জাগে।
  • কিন্তু যদি দ্বিগুণ জোরে আঘাত করা যায় তাহলে বেদনার অনুভূতিও দ্বিগুণ হবে এমন কথাও বলা যায় না।
  • মন ও শরীরের মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্কের কথা চিন্তা না করে কেবল তাদের সম্পর্ককে সমান্তরাল বর্ণনা করে উভয়ের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা সহজসাধ্য নয়।

মনের প্রক্রিয়া মস্তিষ্কনির্ভর
এ প্রকল্পে দেখা যায় বিভিন্ন রূপ। তারই কয়েকটি রূপ হচ্ছে-

উপবস্তুবাদ
এ মতবাদের সঙ্গে বিখ্যাত বিজ্ঞানী টি এইচ হাকসলের নাম যুক্ত। বিজ্ঞানী হাকসলের মতে, মনের প্রক্রিয়া হলো মস্তিষ্ক প্রক্রিয়ার উপবস্তু। মনের প্রক্রিয়া মস্তিষ্ক প্রক্রিয়ার দ্বারা উৎপন্ন হয়, কিন্তু তারা নিজেরা কোনো কিছু উৎপন্ন করে না। একটি উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টা বুঝে নেয়া যেতে পারে। যেমন-একটি মিউজিক ইন্সট্রুমেন্ট যেভাবে সুরের সৃষ্টি ঘটায়, সেই একইভাবে মস্তিষ্ক প্রক্রিয়া মনের প্রক্রিয়াকে উৎপন্ন করে। মিউজিক ইন্সট্রুমেন্টের যাবতীয় প্রক্রিয়াই সুরগুলোকে সৃষ্টি করে, সুরগুলো পরস্পরকে সৃষ্টি করে না, অর্থাৎ কোনোটি কোনোটির কারণ নয় বা মিউজিক ইন্সট্রুমেন্টের ওপর তাদের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই বললেই চলে। মনের প্রক্রিয়াগুলো মস্তিষ্কের প্রক্রিয়ার এক ধরনের নিষ্ক্রিয় সহগামী। মানুষকে বাদ দিয়ে মানুষের ছায়ার কোনো নিজস্ব সত্তা নেই। মানুষের জন্যই মানুষের ছায়া। তেমনি মস্তিষ্ক ক্রিয়ার জন্যই মনের ক্রিয়ার অস্তিত্ব। মানুষের গতি তার ছায়ার গতির কারণ। কিন্তু ছায়ার গতি মানুষের গতির কারণ হয় না।

সমালোচনা
এ অভিমতটি অপ্রমাণ করা এক প্রকার অসম্ভব ব্যাপার, কিন্তু এ অভিমতকে স্বীকার করে নিলে এক আপাতবিরোধী অবস্থায় উপনীত হতে হয়, সেটি হলো সুখ এবং দুঃখ নিছক উপবস্তু এবং তারা মানুষের আচরণকে প্রভাবিত করে না। পরাবর্তক ক্রিয়া সম্পর্কে এটি সত্য হতে পারে। কারণ দেখা যায় যে, কাউকে কাঁটা দিয়ে খোঁচা দিলে সে যখন লাফ দিয়ে ওঠে তখন তাকে কাঁটার খোঁচা যে ব্যথা উৎপন্ন করে তার প্রতি বাস্তবিক পক্ষে প্রতিক্রিয়া করে না। কিন্তু আমরা এ মতবাদটিকে ঐচ্ছিক ক্রিয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারি এবং উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি যে, নিলয়ের যখন প্রচণ্ড পেট ব্যথা করছিল এবং সে যখন ডাক্তারকে ওই ব্যাপারে ফোন করেছিল তখন তার কাজটি নিছক মস্তিষ্ক প্রক্রিয়াপ্রসূত এবং ঐচ্ছিক কার্যটিকে ঘটানোর ব্যাপারে যেন পেট ব্যথার কোনো ভূমিকা নেই।

মনের ক্রিয়া
মনের ক্রিয়া কার্যকারণের দিক থেকে নিষ্ক্রিয় নয়। ‘মনের প্রক্রিয়া মস্তিষ্ক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর’ এ প্রকল্পের অপর একটি রূপ হলো এ মতবাদটি। কিন্তু এ মতবাদটি প্রথম মতবাদটির মতো এত চরম নয়, মাঝামাঝি ধরনের। এ মতবাদের প্রবর্তক হলেন উইলিয়াম জেমস।

টি এইচ হাকসলের সঙ্গে উইলিয়াম জেমস একমত যে, মনের ক্রিয়া সব সময়ই এবং নিঃশর্তভাবে মস্তিষ্কের কার্যেরই একটি পরিণাম। মস্তিষ্কের ক্রিয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মনের ক্রিয়ার পরিবর্তন ঘটে এবং উভয়ের মধ্যে সম্বন্ধ হলো কার্যকারণ সম্বন্ধ। অর্থাৎ মস্তিষ্কের ক্রিয়া হলো কারণ। মনের ক্রিয়া হলো তার কার্য। কিন্তু মনের প্রক্রিয়া মস্তিষ্কের ক্রিয়ার এক ধরনের নিষ্ক্রিয় সহগামী অর্থাৎ মনের ক্রিয়ার কোনো কার্যকারণ ক্ষমতা নেই, যাকে বলা যায় Causally ineffective। মস্তিষ্কের ক্রিয়ার ওপর তাদের কোনো প্রভাব নেই। হাকসলের এ অনুসিদ্ধান্ত জেমস স্বীকার করতে রাজি নন। উইলিয়াম জেমসের মতে, মনের প্রক্রিয়া একবার উৎপন্ন বা অস্তিত্বশীল হলে মস্তিষ্ক প্রক্রিয়ার উপরে প্রতিক্রিয়া করতে পারে। অর্থাৎ যে মস্তিষ্ক প্রক্রিয়ার দ্বারা উৎপন্ন তাকে বাড়িয়ে দিতে পারে বা কমিয়ে দিতে পারে।

দ্বিপার্শ্ববাদ
বিজ্ঞানী সি ডি ব্রড এ দ্বিপার্শ্ববাদ মতবাদের উপস্থাপক। তার এ মতবাদটি স্বীকার করতে চায় না যে, কোনো একটি প্রক্রিয়া হয় শারীরিক হবে অথবা মানসিক মনের হবে, উভয়ই হতে পারে না। বিজ্ঞানী ব্রডের মতে, কোনো কোনো মস্তিষ্কের প্রক্রিয়া শারীরিক এবং মনের উভয়ই হতে পারে বা আরো সঠিকভাবে বলতে গেলে তাদের শারীরিক এবং মানসিক উভয় বৈশিষ্ট্যই থাকতে পারে। দ্বিপার্শ্ববাদ মতবাদের অনুসারে এখানে দুটি ক্রমের কথা বলা যাবে না-একটি মস্তিষ্ক প্রক্রিয়ার ক্রম এবং তারই সমান্তরাল একটি মনের প্রক্রিয়ার ক্রম। এ মতবাদ অনুসারে একটি মাত্র মস্তিষ্ক প্রক্রিয়ার ক্রম রয়েছে, যার অধিকাংশই দৈহিক এবং যার কিছু কিছু মানসিক। সূক্ষ্ম যন্ত্রের সাহায্যে কোনো কার্যের ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষক দৈহিক বৈশিষ্ট্যগুলো পর্যবেক্ষণ করতে পারে। অর্থাৎ তত্ত্বের দিক থেকে তারা পর্যবেক্ষণযোগ্য। মনের বৈশিষ্ট্যগুলোকে কেবল অন্তর্দর্শনের দ্বারাই পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে।

দ্বিপার্শ্ববাদ অনুসারে যে মস্তিষ্ক প্রক্রিয়ায় মনের বৈশিষ্ট্য রয়েছে, সেগুলো এমন কার্য উৎপন্ন করতে পারে, যেগুলো মস্তিষ্ক প্রক্রিয়ার শুধু দৈহিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে সেগুলো থেকে স্বতন্ত্র। আর উপবস্তুবাদ মতবাদ যে অভিমত ব্যক্ত করে অর্থাৎ আমাদের কার্যের ওপর মনের প্রক্রিয়ার কোনো প্রভাব নেই, এ মতবাদ তাকে অগ্রাহ্য করে।

বিজ্ঞানী রেক্স এবং মার্গারেট নাইট বলেন যে, এসব প্রকল্পকে পরীক্ষণমূলক দিক থেকে কীভাবে পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে তা কঠিন। অনেকেই এ ধরনের মতবাদের আলোচনাকে বর্জন করতে আগ্রহী। কেননা এ ধরনের আলোচনা সময়ের অপচয় মাত্র। কিন্তু মন ও শরীরের সম্পর্কের সমস্যাটি অনেক মনোবিজ্ঞানীর ভাবনাকে যে আকৃষ্ট করবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।