Skip to main content

একজিমা কী ও কেন

ডা. দিদারুল আহসান

একজিমা কী?
একজিমা ত্বকের এক বিশেষ ধরনের অ্যালার্জিজনিত প্রদাহ। রাসায়নিক পদার্থ, প্রোটিন, জীবাণু, ছত্রাক ইত্যাদির প্রভাবে একজিমা হতে পারে। যে একজিমা শরীরের বাইরের কারণে হয় তাকে বলে বাহির একজিমা, আর যে একজিমার কারণ শরীরের ভেতরে নিহিত তার নাম আনড়র একজিমা।

একজিমা কি সারে না?
নিশ্চয়ই সারে। সঠিক চিকিৎসা এবং যে কারণে একজিমা হচ্ছে তা পরিহার করতে পারলে বাহির একজিমা প্রায় সব ক্ষেত্রেই নির্মূল হয়। আনড়র একজিমাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রায় সময়ই সেরে যায়। তবে তার চিকিৎসা একটু দীর্ঘস্থায়ী। আনড়র একজিমা বারবার হওয়ার প্রবণতা অবশ্য কিছুটা থাকেই।

একজিমা সারলে কি হাঁপানি হবে?
এ ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। একমাত্র অ্যাটোপিক একজিমার সঙ্গে হাঁপানির একটা সম্পর্কে আছে। দেখা গেছে, অ্যাটোপিক একজিমায় আক্রান্ত রোগীর নিজের অথবা পরিবারের (যাদের সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক আছে) কারও কারও হাঁপানি থাকে। কোনো রোগীর হয়তো ছোটবেলায় একজিমা ছিল, বড় বয়সে হাঁপানি হলো। আবার উল্টোটাও হয়। কিন' একটা সেরে গেছে বলে আরেকটা হচ্ছে-এ ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আমাদের হাতে নেই।

একজিমা কি বংশগত রোগ?
কিছু কিছু একজিমা যেমন অ্যাটোপিক একজিমা, লাইকেন সিমপ্লেক্স বংশগত। তবে বাবা-মায়ের কারও থাকলে সব সন্তানেরই যে এ রোগ হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। সংস্পর্শ একজিমা, স্কেবিয়াস একজিমা, অপুষ্টিজনিত একজিমা বা ছত্রাকজনিত একজিমার সঙ্গে সাধারণত বংশগতির কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায় না।

ক্রনিক একজিমার কি চিকিৎসার প্রয়োজন আছে?
নিশ্চয় আছে। এটাও একটা রোগ। পুষে রাখলে এ থেকে অনেক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। যেমন একজিমার ওপরে জীবাণুর আক্রমণ ঘটতে পারে। একজিমা দেহের অন্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়তে পারে- এমনকি সারা দেহে ছড়িয়ে এক্সফোলিয়েটিভ একজিমার সৃষ্টি করতে পারে। এক্সফোলিয়েটিভ একজিমা রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হতে পারে।

একজিমা কি ছোঁয়াচে?
একেবারেই নয়। ছোঁয়াচ থেকে অন্যের দেহে একজিমা যেতে পারে না। তবে একজিমার ওপরের জীবাণুর সংখ্যাধিক্য অনেক সময় অন্যের ত্বকে লেগে জীবাণুর আক্রমণ ঘটাতে পারে। নখ ছোট করে কাটলে জীবাণু দূষণ কম হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিংবা স্কেবিয়াস একজিমা লেগে অন্যের দেহে স্কেবিস বা চুলকানি রোগের সংক্রমণ ঘটতে পারে। কিন্তু একজিমাকে কিছুতেই ছোঁয়াচে রোগ বলা উচিত নয়।

একজিমা হলে কি রক্ত খারাপ হয়ে যায়?
মোটেই নয়। ত্বকের প্রদাহের জন্য একজিমা হয়। রক্তের উপাদানের কিছু হেরফের অনেক সময় ঘটতে পারে। কিন্তু ‘রক্ত খারাপ হয়ে গেছে’- এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।

একজিমা রোগীর কি বিয়ে করা উচিত?
নিশ্চয়ই উচিত। অন্য অনেক রোগের মতো এটাও একটা রোগ। এ থেকে অন্যের (স্ত্রী বা স্বামীর) কোনো ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে না। বাচ্চাও স্বাভাবিক হয়। তবে কিছু কিছু একজিমা যেমন, অ্যাটোপিক একজিমা বংশানুক্রমে ছেলেমেয়েদের দেহে দেখা দিতে পারে। কিন্তু এজন্য এক জিমা রোগীর বিয়ে না দেয়ার যুক্তি সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক ও ভ্রান্ত। ডায়াবেটিস বা হাঁপানি রোগীর যখন বিয়ে হচ্ছে তখন একজিমা রোগীর বিয়ে হতেই বা কি বাধা!

একজিমা হলে কি হার্টের অসুখ হয়?
না, একজিমার সঙ্গে হার্টের অসুখের কোনো সম্পর্ক নেই।

একজিমার সঙ্গে কুষ্ঠরোগের কি কোনো সম্পর্ক আছে?
না, কুষ্ঠের সঙ্গে একজিমার কোনো সম্পর্ক নেই।

একজিমা হলে নিমপাতার পানি বা ডেটল পানি দিয়ে কি পরিষ্কার করা যেতে পারে?
কখনোই নয়। একজিমার জায়গাটুকু শুধু পরিষ্কার ফোটানো ঠাণ্ডা পানি কিংবা ডাক্তারের পরামর্শমতো লোশন দিয়ে ধোয়া যেতে পারে। নিমপাতা বা অন্য গাছগাছড়া, ডেটল, সাবান ইত্যাদি কখনো লাগানো উচিত নয়। এতে একজিমা আরও বেড়ে যেতে পারে।

একজিমা রোগীর কোন কোন খাবার নিষেধ?
সাধারণত একজিমার সঙ্গে খাবারের সম্পর্ক খুব কম। তবে অ্যালার্জিজনিত একজিমায় কিছু কিছু রোগীর ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ খাবার- যেমন চিংড়ি, ডিম, বেগুন ইত্যাদি রোগকে বাড়িয়ে দিতে পারে। এ ধরনের বিশেষ খাবারগুলো সেই নির্দিষ্ট রোগীর ক্ষেত্রে বন্ধ করা হয়। সব রোগীর ক্ষেত্রে এ ধরনের বিধি-নিষেধের প্রয়োজন হয় না। একজনের একজিমা বেগুন খেলে বাড়ছে বলে সবারই তা হবে তা নয়।

একজিমা থেকে কি পরে ক্যান্সার হতে পারে?
সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তবে অনেক দিন ধরে স্থায়ী কোনো ঘাযুক্ত একজিমা- যেমন ভেরিকোস আলসারযুক্ত একজিমা থেকে কিছু ক্ষেত্রে ক্যান্সার রোগের সৃষ্টি হলেও হতে পারে। তবে তা খুবই বিরল ঘটনা।

একজিমা রোগীর কি সাবান মাখা উচিত?
খুব কম ক্ষারযুক্ত সাবান- যেমন গ্লিসারিন জাতীয় সাবান ব্যবহার করা যেতে পারে। ওষুধ বা নিমযুক্ত সাবান পরিহার করে চলা ভালো।

একজিমা রোগীর কী কী লাগানো উচিত নয়?
বেশিমাত্রায় ক্ষারীয় সাবান, সরিষার তেল, কাদা-মাটি, গাছপালা, চন্দন, নোংরা পানি, তরিতরকারি বিশেষত পেঁপে, রসুন, পেঁয়াজ ইত্যাদির সংস্পর্শে একজিমা রোগীর আসা উচিত নয়।

একজিমার উৎপত্তি কি পেটের গোলমাল থেকে?
সাধারণত নয়। তবে অপুষ্টিজনিত একজিমা অনেক সময় দীর্ঘস্থায়ী পেটের অসুখের পর দেখা দেয়। অবশ্য যে কোনো একজিমার সঙ্গে পেটের গোলমাল থাকলে তার জন্যও চিকিৎসা করাতে হবে।

বোরিক অ্যাসিডযুক্ত মলম বা ওষুধ লাগালে কি একজিমা সেরে যায়?
বোরিক অ্যাসিডের মলম একজিমার ওষুধ নয়। একজিমার কারণ বিভিন্ন। শুধু এক ধরনের ওষুধেই সব একজিমা সারে না। বোরিক অ্যাসিডে অনেক রোগীর ত্বকে অ্যালার্জির সৃষ্টি হয়। ফলে একজিমা বেড়ে যেতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়ে কোনো মলমই লাগানো উচিত নয়।

একজিমায় কি স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ খাওয়া উচিত নয়?
খুব বাধ্য না হলে অর্থাৎ একজিমা খুব বেশিমাত্রায় না হলে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া স্টেরয়েড ওষুধ কখনোই খাওয়া উচিত নয়। স্টেরয়েড জাতীয় খাবার ওষুধে এমন অনেক বিক্রিয়া হয় যা দেহের পক্ষে অনেক সময় মারা্তক হয়। একজিমা রোগে পারতপক্ষে খাবার স্টেরয়েড ওষুধ না দেয়াই উচিত। এতে একজিমা সাময়িকভাবে সারলেও পরে একজিমার পুনরাবির্ভাব ঘটলে কোনো ওষুধেই আর কাজ হতে চায় না। তবে ত্বকের ওপরে লাগানোর স্টেরয়েড মলম, ক্রিম বা লোশন লাগাতে কোনো বাধা নেই। কারণ শরীরের ভেতরে তা খুব সামান্যই প্রবেশ করে। ছোট ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রেও স্টেরয়েড ক্রিম লাগানো যেতে পারে।

একজিমা রোগীর কি সমুদ্র গোসল করা উচিত?
সমুদ্র গোসল না করাই ভালো। লোনা জল এবং বালির প্রভাবে একজিমা অনেক সময় বেড়ে যায়।

একজিমা রোগীর কি রোদে বেড়ানো নিষেধ?
দেহের উন্মুক্ত স্থানের কিছু একজিমা, বিশেষত আলোকজনিত একজিমা সূর্যের আলো লাগলে বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে রোদে না যাওয়াই ভালো। গেলেও ছাতা বা সানগ্ল্লাস ব্যবহার করা উচিত। তবে সব একজিমাই রোদে বাড়ে না।

ডায়াবেটিস রোগীদের কি বেশি একজিমা হয়?
সে রকম কোনো নির্দিষ্ট সম্পর্ক নেই। তবে ডায়াবেটিস রোগীর অন্য চর্মরোগ যেমন ফোড়া, কার্বাঙ্কল ইত্যাদির মতো একজিমা সারতে সময় নেয়। তবে রক্তে শর্করার হার ঠিক রাখলে এবং একজিমার সঠিক চিকিৎসা করালে দুটি রোগই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

একজিমা হলে কী করব?
একেবারেই ঘাবড়াবেন না। প্রথম অবস্থা থেকেই সঠিক চিকিৎসায় সারিয়ে ফেলুন। অযথা যেমন আতঙ্কগ্রস্ত হবেন না, তেমনি রোগ পুষেও রাখবেন না।

লেখকঃ ত্বক ও যৌন ব্যাধি বিশেষজ্ঞ, গ্রীন লাইফ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, গ্রীন রোড, ঢাকা। মোবাইল : ০১৭১৫৬১৬২০০