মনের ভাব বা ইমোশন সংযুক্ত চিন্তা, পরিত্যাজ্য ব্যবহার এবং শারীরিক কিছু লক্ষণের বহিঃপ্রকাশকেই দুশ্চিন্তাবা অ্যাংজাইটি বলে।
উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণী
- বাবা-মার অতিরিক্ত ব্যস্ততার কারণে বাচ্চাদের সময় না দেয়া। ছেলেমেয়েদের দুঃখ-বেদনা, সুখ, নতুন কিছু ভাবনা ভাগ না করা। ভালো জিনিসের জন্য উৎসাহ দেয়া, খারাপ জিনিসকে পরিত্যাগ করার জন্য বলা।
- স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা না থাকলে, ঝগড়াঝাঁটি বেশি হলে, নিজেরা নিজেদের নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকলে ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের দুশ্চিন্তা বাসা বাঁধতে শুরু করে। স্কুলে ভর্তির চাপ, প্রতিযোগিতা, শিক্ষকদের বকা, পড়াশোনার চাপ, কোচিং, পর্যাপ্ত খেলাধুলার জায়গার অভাব, সুষম খাবার না খাওয়ার পরিবর্তে বিভিন্ন ধরনের চাংক ফুড, ফাস্টফুড যাতে ক্যালরি ও স্যাচুরেটেড চর্বি বেশি তা খেয়ে মেদস্থুল হওয়া।
- আ্তীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, ভাইবোন সবার সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদান। একত্রে খাওয়া, বসা, বাইরে বেড়াতে যাওয়ার অভাব।
- ধর্মীয় শিক্ষা, রীতিনীতি, আচার-আচরণ মানার জন্য উপদেশ দেয়া, বলা, কার্যকর করা।
- সকালে উঠে দাঁত ব্রাশ করা, দৈনিক গোসল, হাত-মুখ ধোয়া, নখ কাটা, পড়াশোনার সময় পড়াশোনা, অন্য সময় খেলাধুলা বই পড়া, ছবি আঁকা, টেলিভিশন দেখা, খবরের কাগজ পড়া, দাদাবাড়ি, নানাবাড়ি, আ্তীয়-স্বজনের বাড়ি ছুটির সময় ভ্রমণ-সুস্বাস্থ্যর সহায়ক।
- ফলাফল খারাপ হলে বা পড়াশোনায় অমনোযোগী হলে রাগারাগি না করে ভালোমতো বুঝিয়ে আশ্বস্ত করা ইত্যাদি।
বয়ঃসন্ধি ছেলেমেয়েদের
- বয়ঃসন্ধি বা পিউবার্টি ছেলে বা মেয়েদের দেহে বা মনে যেসব পরিবর্তন হয় সেগুলো সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে বলা, ধারণা দেয়া এবং এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উপদেশ দেয়া।
- কোনো বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে ভালোবাসা বা সম্পর্ক হলে ভালোমতো এ ব্যাপারে বোঝানো, রাগারাগি না করা। জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য লেখাপড়ার বিকল্প নেই এটা উপলব্ধি করানো, নিজের পরিচয়ে পরিচিত হওয়া ভালো, চাকরির জন্য বা ব্যবসা-বাণিজ্য করতে হলে কী কী করতে হবে। বিদেশে লেখাপড়া বা কর্মসংস্থানের জন্য কী কী করা প্রয়োজন এসব বলা। কোনো কিছু বাবা-মায়ের কাছে গোপন না করার জন্য বলতে হবে।
- স্বাভাবিক এবং উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে গেলে উপদেশ ও সাহায্য করা।
- সঠিক জায়গায় চাকরি, উচ্চশিক্ষার জন্য ছেলেমেয়েকে প্রয়োজনীয় উপদেশ এবং পথ দেখানো।
- যত দিন বেকার থাকবে তত দিন আর্থিক, মানসিক, সামাজিকভাবে উৎসাহ দেয়া।
লেখকঃ উপাধ্যক্ষ ও বিভাগীয় প্রধান, প্যাথলজি
আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ
ভারতীয়রাই বেশি মানসিক অবসাদে ভোগে
মনোজগত ডেস্ক
যত দিন যাচ্ছে ততই সারা বিশ্বের অবসাদগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এই গবেষণার পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে যা পাওয়া গেছে তা হলো সারা বিশ্বে সবচেয়ে মানসিক অবসাদে ভোগে ভারতবাসীই। দেশটির ৩৬ শতাংশ মানুষ অবসাদের শিকার।
সুখ ও শান্তি নিয়ে ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে যে সমীক্ষা হয়েছে, তাতে দেখা গেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডের মতো ধনী দেশের মানুষ যতটা সুখী, তার থেকে বেশি সুখী কোনো দরিদ্র দেশের মানুষ। ধনী দেশের তুলনায় দরিদ্র দেশের মানুষের মনে অবসাদও জমে কম। ধনী দেশের প্রতি সাতজনে একজন মানসিক অবসাদে ভুগছে। কিন্তু অনুন্নত ও দরিদ্র দেশে প্রতি নয়জনের একজন এর শিকার।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, দুঃখে থাকা, যে কোনো বিষয়ে আগ্রহ কমে যাওয়া, অপরাধবোধ, ঘুমে ব্যাঘাত, শক্তিহীনতা এবং মনোযোগ না থাকা সবকিছুই মানুষকে হতাশ করে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ভারতের মতো গরিব দেশে হতাশাগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণ একাধিক। প্রধানত, কর্মহীনতা, অভাব বা প্রতিনিয়ত জীবনে নানা সমস্যা, চাপ জন্ম দিচ্ছে হতাশা, অবসাদের। পাশাপাশি, সাধারণ মানুষের জীবনে ভোগবিলাসের প্রবণতাও বেড়েছে। সেই প্রবণতা যখনই সম্পূর্ণতা পাচ্ছে না, তখনই চরম হতাশার সৃষ্টি হচ্ছে। যা অত্যন্ত মারাত্মক। কারণ এর থেকে আত্মহননের পথও বেছে নিচ্ছেন অনেক। এক বছরে সারা বিশ্বে এই কারণে সাড়ে ৮ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করছে।
নারীদের মধ্যে হতাশায় ভোগার সংখ্যা বেশি। একাকিত্ব তার প্রধান কারণ। বিবাহবিচ্ছদ বা স্বামীর মৃত্যু নারীদের মধ্যে একাকিত্বের জন্ম দিচ্ছে বলে সমীক্ষার দাবি। সারা বিশ্বে প্রায় ১২ কোটি মানুষ মানসিক হতাশার শিকার। এই সংখ্যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। আধুনিক জীবনযাপনের মধ্যে বা প্রচলিত কর্মব্যস্ততার মধ্যে নিজের জন্য বা পরিবারের জন্য সময় কমে গিয়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। হতাশা বা মন খারাপ কমাতে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছে অনেকে। কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হচ্ছে।
দীর্ঘায়ু লাভের জন্য
সুস্থ নীরোগ জীবনই একজন মানুষকে স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে। এটাই স্বাভাবিক। মানুষের জন্ম, মৃত্যুর ওপর এ নশ্বর পৃথিবীতে কারও হাত নেই। তবু কিছু স্বাস্থ্যগত নিয়ম-নীতি মেনে চললে সুস্থ থাকা যায়, লাভ করা যায় দীর্ঘ জীবন। অন্তত বিজ্ঞানীরা তাই মনে করেন। যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকগণ এক জরিপ রিপোর্টে উল্লেখ করেন যে, প্রায় ৯ হাজার ব্যাক্তি যারা ২৪ বছরব্যাপী গবেষণাকালে মারা যান, তাদের মৃত্যুর ক্ষেত্রে ৫টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়। এদের মধ্যে শতকরা ২৮ ভাগ মারা যান ধূমপানজনিত কারণে। শারীরিক নিষ্ক্রিয়তায় ১৭ ভাগ, অতিরিক্ত ওজনের ফলে ১৩ ভাগ, খাদ্যাভ্যাস যথাযথ না হওয়ায় ১৩ ভাগ এবং মদ্যপান করার কারণে শতকরা ৭ ভাগ লোক মারা যায়।
গবেষকগণ এটাও বলেছেন, মাত্র ৫টি মৌলিক নিয়ম মেনে চললে অন্তত শতকরা ৫৫ ভাগ মৃত্যু এড়ানো যায়। এসব নিয়ম হলো-ধূমপান না করা, নিয়মিত শরীরচর্চা করা, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাওয়া, যেমন প্রচুর পরিমাণ সবুজ শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়া, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপ কমানো। গবেষকগণ এটাও উল্লেখ করেছেন, বেশির ভাগ সচেতন মানুষই এসব ফল জানা সত্ত্বেও তেমনটি আমলে নেন না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটে। তাই সকলকে সুস্থ ও দীর্ঘ জীবন লাভের জন্য ধূমপান বর্জনসহ স্বাস্থ্যসম্মত, পরিমিত জীবন যাপন করা অপরিহার্য।
প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা ও বাস্তবতা
প্রচলিত ভুল ধারণাঃ
তিতা খেলে ডায়াবেটিস সারে!
বাস্তব সত্যঃ এটা প্রায়ই বলা হয়ে থাকে যে, ডায়াবেটিস হলে করলা বা তিতাজাতীয় খাবার বেশি করে খান, উপকার হবে। অনেকেই খুব আয়োজন করে নিমপাতার বড়ি, করলার রস কিংবা ভর্তা খান। আসলেই কি তিতার সঙ্গে ডায়াবেটিসের কোনো সম্পর্ক আছে? বিষয়টির আসলে কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। ডায়াবেটিস নিয়ে যারা গবেষণা করেন তারা কেউই ডায়াবেটিসের সঙ্গে তিতা খাবারের কোনো যোগসূত্র পাননি। কেউ কেউ মনে করেন, তিতা খাবারের তিক্ততা অগ্ন্যাশয়কে উদ্দীপ্ত করে। ফলে অগ্ন্যাশয় থেকে পর্যাপ্ত ইনসুলিন নিঃসৃত হয়। এটা একেবারেই ভিত্তিহীন। কারণ ইনসুলিন নিঃসরণের সঙ্গে খাবারের স্বাদের কোনো সম্পর্ক নেই। তাই বলে ডায়াবেটিস রোগীদের করলা খেতে নি্রুৎসাহিত করা হচ্ছে না। পুষ্টিকর সবজি হিসেবে করলা তো খাওয়া যেতেই পারে।
প্রচলিত ভুল ধারণাঃ
চিনি বেশি খেলে ডায়াবেটিস হয়!
বাস্তব সত্যঃ না, এটি সত্য নয়। জিনগত এবং কিছু অজানা প্রভাবক টাইপ-১ ডায়াবেটিসের কারণ। টাইপ-২ ডায়াবেটিসের কারণ জিনগত এবং জীবনযাত্রার ধরন। ওজন বেশি হলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে এবং বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবার, তা চিনি বা চর্বি যেখান থেকেই আসুক না কেন, ওজন বাড়ায়। কারও যদি ডায়াবেটিসের পারিবারিক ইতিহাস থাকে, তবে তার উচিত হবে স্বাস্থ্যকর সুষম খাবার এবং নিয়মিত শরীরচর্চার মাধ্যমে ওজন ঠিক রাখা।
প্রচলিত ভুল ধারণাঃ
শুধু বেশি ওজনের বা মোটা মানুষই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়!
বাস্তব সত্যঃ মাত্রাতিরিক্ত ওজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার একটি ঝুঁকি মাত্র, এক্ষেত্রে অন্যান্য ঝুঁকি, যেমন পারিবারিক ইতিহাস, জাতিসত্তা, বয়স ডায়াবেটিসে আক্তান্ত হওয়ার জন্য নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেকেই এই ধারণা পোষণ করেন যে, বেশি ওজনই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার একমাত্র ঝুঁকি। অনেক মোটা মানুষেরই ডায়াবেটিস নেই। আবার অনেক ডায়াবেটিক রোগীর ওজনই স্বাভাবিক, এমনকি স্বাভাবিকের চেয়েও কম।
প্রচলিত ভুল ধারণাঃ
ডায়াবেটিক রোগীদের বিশেষ ডায়াবেটিক খাবার খেতে হয়!
বাস্তব সত্যঃ ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য একটি খাবার তালিকা সুস্থ মানুষের স্বাস্থ্যকর খাবার তালিকা থেকে ভিন্নতর কিছু নয়। কম চর্বি, পরিমিত লবণ আর চিনি; এর সঙ্গে পূর্ণদানাযুক্ত খাদ্য, শাকসবজি ও ফলমূল এগুলোর মিশ্রণই হতে পারে আদর্শ খাবার। তথাকথিত ডায়াবেটিক খাবারে অতিরিক্ত কোনো উপকার পাওয়া যায় না।
প্রচলিত ভুল ধারণাঃ
ডায়াবেটিক রোগীদের কেবল অল্প পরিমাণ শর্করাসমৃদ্ধ খাবার, যেমন রুটি, আলু ও পেস্তা খেতে হবে!
বাস্তব সত্যঃ শর্করাসমৃদ্ধ খাবার একটি স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য তালিকার অংশ। এখানে পরিমাণটাই মূল বিবেচ্য বিষয়। লাল আটার রুটি, ভাত, সিরিয়াল, পেস্তা এবং শর্করাসমৃদ্ধ সবজি, যেমন আলু, মটরদানা, ভুট্টা খাবার তালিকায় থাকতে পারে। অন্যান্য ধরনের খাবারের সঙ্গে শর্করার অনুপাত ঠিক রাখতে হবে। ডায়াবেটিক রোগীদের দিনে তিন থেকে চারবার শর্করাসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া যুক্তিযুক্ত।
প্রচলিত ভুল ধারণাঃ
ফল স্বাস্থ্যকর খাদ্য, তাই যত ইচ্ছে ফল খাওয়া যেতে পারে!
বাস্তব সত্যঃ অবশ্যই ফল স্বাস্থ্যকর খাদ্য। এতে আঁশ ছাড়াও প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ও মিনারেল রয়েছে; কিন্তু ফলে শর্করাও থাকে, যাকে অবশ্যই খাদ্য তালিকার সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। প্রয়োজনে ডায়েটিশিয়ানের সঙ্গে আলাপ করে ঠিক করুন কোন ফল কত বার, কী পরিমাণে খাবেন

