Skip to main content

যৌন মনোবিজ্ঞান

হ্যাভলক এলিস

বিষয়-প্রবেশ
আজকাল যৌন মনোবিজ্ঞানের প্রতি, তা সে সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন লোকদের মনোবিজ্ঞান হোক, কিংবা বিকৃত মস্তিষ্ক লোকদের, সেই সাথে যৌন আরোগ্যশাস্ত্রের প্রতি সাধারণ মানুষের একটি আকর্ষণ ও মনোযোগিতা লক্ষ করা যাচ্ছে, তা বর্তমান শতাব্দীর আগে অকল্পনীয় ছিল। আজকের যুবকের মধ্যে যৌন বিষয় সম্পর্কিত সাহিত্যের প্রতি যথেষ্ট মনোযোগিতা লক্ষ করা যায়। আজকের যুবতীরাও কোনো প্রকারের লজ্জা ও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছাড়াই এ বিষয়ের প্রতি জিজ্ঞাসু হয়ে প্রয়োজনীয় জ্ঞান লাভে মনোযোগী হয়ে উঠছে। এই তো বছর কয়েক আগেও যৌনবিজ্ঞানবিষয়ক গবেষণাকর্মকে শুধু কুরুচিকর নয়; বরং অহিতকর প্রবৃত্তির দ্যোতক বলে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু বর্তমানে হাওয়া সম্পূর্ণ বদলে গেছে এবং বর্তমান যুগে যৌনবিজ্ঞানের গবেষক ও যৌনরোগ শাস্ত্রের প্রচারকদের বৈক্তিক ও সামাজিক নৈতিকতাবাদের দৃষ্টিতেও ব্যাপক সমর্থন জানানো হচ্ছে।

কিছুকাল আগে পর্যন্তও ডাক্তার ও চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা এই আন্দোলনের প্রচার-প্রসারে সক্রিয় অংশ নিতেন না। যদিও এ কথা সত্য যে, প্রায় এক শতাব্দী পূর্বে জার্মানি ও অস্ট্রিয়া এবং তাদের পরবর্তীকালে অন্যান্য দেশের ডাক্তাররাই এ ক্ষেত্রে অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করেন। তবে এদেরও তাদের সহ-ব্যবসায়ীরা সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখতেন। প্রথমদিকে তো যৌন মনোবিজ্ঞান তথা যৌন আরোগ্যশাস্ত্রকে ডাক্তারি প্রশিক্ষণের কোনো অঙ্গ বলেই স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। সত্যি কথা বলতে কি যৌন শারীরবিজ্ঞান (Pervension) শাস্ত্র বিষয়েও সেই একই কথা। কুড়ি বছরের কিছুকাল আগে এফএইচএ মার্শাল কর্তৃক লিখিত শারীরিক বিজ্ঞানবিষয়ক প্রথম প্রকাশিত পুস্তকখানিকে বাস্তবিকই বিস্তৃততর বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ বলে অভিহিত করা যেতে পারে।

কলেজের পাঠ্যপুস্তকগুলোতে যেমন যৌন শারীরিক সংরচনা ও যৌন শারীরশাস্ত্রকে উপেক্ষা করা হয় তেমনই চিকিৎসাশাস্ত্রের গ্রন্থাবলিতে যৌন মনোবিজ্ঞানকে উপেক্ষা করা হয়েছে। অর্থাৎ এটা যেন প্রাণী জীবনের কোনো অঙ্গই নয়। এর পরিণাম হলো এই যে, এ সমস্ত বিষয়সম্পর্কিত তথ্য, যা কিছু বিশেষ ক্ষেত্রের রোগীদের ঠিকমতো বোঝার জন্য অতীত প্রয়োজনীয়, তা ডাক্তারদের চেয়ে রোগীদের যেন অধিক প্রয়োজন। ডাক্তাররা এই দিশায় প্রায়শই প্রচলিত ভ্রান্ত ধ্যান-ধারণা এবং মান্ধাতা আমলের মানসিকতার শিকার হতেন। কিছু লোক তো এই বিষয়টি আড়াল করার জন্য সরাসরি ধর্ম ও নৈতিকতার দোহাই দিয়ে মূল বিষয়টিকে এড়িয়ে যেতে চাইতেন। এ সমস্ত লোকেরা এ কথাও ভুলে যান যে, চার্চেরই এক মহান নেতা এ বিষয়ে তার কট্টর দৃষ্টিভঙ্গি সত্ত্বেও এ কথা বলতে বাধ্য হয়েছিলেন যে, যা সৃষ্টি করতে স্বয়ং বিধাতাও লজ্জা করেননি সেখানে এ বিষয়ে কথা বলতে আমাদের কিসের লজ্জা?

যৌন বিকৃতির বিষয়ে যার উল্লেখ অধিকাংশই ভয়ের সাথে বিচ্যুতির (Physiology) রূপে করা হতো, এই অজ্ঞানতার পরিণাম ভয়াবহ হতে পারে। যেখানে যৌনবিভ্রাটের প্রশ্ন, প্রায়শই রোগীদের এই অভিযোগ করতে দেখা যায় যে, ডাক্তার হয় তার বিশেষ কাঠিন্যকে বুঝতে পারেন না অথবা তাকে গু্রুত্বহীন বলে উড়িয়ে দেন নতুবা তাকে পাপী, দুষ্ট এবং সম্ভবত তাকে ঘৃণার পাত্র মনে করে সেভাবে ব্যবহার করেন। এতে সন্দেহ নেই যে, ডাক্তারের বিষয়ে রোগীর এই ধরনের চেতনার কারণে বহু ডাক্তার, এমনকি বহু অভিজ্ঞ ডাক্তারও ফতোয়া দিয়ে বসেন যে, এ ধরনের যৌনবিভ্রাট খুবই বিরল ব্যাপার আর দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ ধরনের রোগীর সাথে পরিচয় ঘটে।

এ দাবি নিঃসন্দেহে করা যেতে পারে যে, এ প্রকারের অস্পষ্ট ঢঙেই সঠিক এবং সহজ-স্বাভাবিকতার আদর্শের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে রেখে এবং ওই আদর্শ থেকে কোনোভাবেই চ্যুত হওয়ার বিষয়ে শুনতেও আপত্তি করে ডাক্তার তার রোগীকে সঠিক পথে চলার উত্তেজনা ও প্রেরণা জোগায়। এ প্রসঙ্গে এ কথাও বলে দেয়া আবশ্যক যে, এই দিশায় মানসিক স্বাস্থ্য শারীরিক স্বাস্থ্যের চেয়ে ভিন্ন নয়। রোগীকে তার হৃত স্বাস্থ্য পুনরায় ফিরিয়ে দেয়ার জন্য তার বিকৃত দশার সঠিক এবং বুদ্ধিমত্তাপূর্ণ সমাধান অত্যন্ত আবশ্যক। যতক্ষণ যাবৎ আমরা জানতে পারব না যে, রোগী বর্তমানে কী অবস্থায় আছে ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা কীভাবে তার চিকিৎসা করতে পারি? এ ছাড়া মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে শারীরিক স্বাস্থ্য অপেক্ষা এক বড় সীমা পর্যন্ত স্বাভাবিক পরিস্তিতির বিষয়টি অনেক ব্যাপক হয়ে ওঠে। এ ছাড়া আমাদের এ কথা নিশ্চিত করার জন্য ব্যক্তিবিশেষের স্বাভাবিক অবস্থা কী, তার মানসিক এবং যৌন গঠন কী প্রকারের, এসবই ভালোমতো জানা উচিত। নইলে আমরা তাকে এমন একটা অবস্থায় নিয়ে যেতে পারি যা অন্যের জন্য তো সঠিক হতে পারে কিন' তার জন্য বাস্তবিকই তা অহিতকর এবং বিকৃত বলে সিদ্ধ হবে।

মানসিক এবং যৌনবিকৃতির বিষয়ে সাধারণভাবে সূত্ররূপে প্রদত্ত পরম্পরাগত পরামর্শ এই ভিত্তিতেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে সঠিক প্রতিপন্ন হয় না, এমনকি তা ক্ষতিকারক বলে সিদ্ধ হয়। উদাহরণত যৌনরূপে বিকৃত মস্তিষ্ক লোকদের বিবাহের জন্য যে পরামর্শ দেয়া হয়, এক্ষেত্রে এ কথা প্রযোজ্য। নিশ্চিতরূপে কিছু ক্ষেত্রে এ পরামর্শ খুবই উপযুক্ত প্রতীত হয়। তবে সম্পূর্ণরূপে প্রাপ্ত তথ্য ব্যতীত এবং ব্যক্তির সঠিক অবস্থা জানা ব্যতিরেকে এ ধরনের পরামর্শ বিপন্মুক্ত হয় না। প্রকৃত সত্য হলো এ সতর্কতা মনোযৌন ক্ষেত্রে প্রদত্ত সমস্ত পরামর্শের উপরেই তিক্ত প্রভাব ফেলে। যৌনজীবন সম্পূর্ণ ব্যক্তির মধ্যে পরিব্যাপ্ত থাকে এবং মানুষের যৌন গঠন তার সাধারণ গঠনের একটি অঙ্গ।

এ কথা বাস্তবিকই সত্য যে সেক্সই (লিঙ্গ) মানুষের যথার্থ পরিচয়-যতক্ষণ যাবৎ এ কথার ওপর মনোযোগ নিবন্ধ রাখা না হবে ততক্ষণ যাবৎ যৌনজীবনের পথপ্রদর্শন ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে কোনো প্রকারের উপযোগী পরামর্শ দেয়া যেতে পারে না। এ কথা সত্য যে, যে কোনো মানুষই তার প্রকৃতিকে বুঝতে ভুল করতে পারে। সম্ভব কেবল এটাই হতে পারে যে সে কেবল প্রত্যেক যুবসুলভ (‘যুব-সুলভ’ শব্দ দ্বারা এখানে যুব ও যুবতী সুলভ-অর্থাৎ দুই অর্থই বোঝানো হয়েছে) সাময়িক অবস্থা অতিক্রম করছে যা অতিক্রম করে সে সুস্থ এবং স্থায়ী পরিস্তিতিতে পৌঁছে যাবে। সে কোনো অযথা প্রতিক্রিয়ার কারণে নিজের স্বভাবের কোনো গৌণ মনোবৃত্তিকে প্রধান মনোবৃত্তিরূপে বুঝতে ভুল করতে পারে, কেননা আমরা সকলেই বিবিধ মনোবৃত্তির সমন্বয়ে গড়ে উঠেছি এবং যৌনরূপে সুস্থ মানুষ হলো সেই ব্যক্তি যে আকছারই কোনো অসাধারণ অথবা বিকৃত মনোবৃত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে। তা সত্ত্বেও মানুষ হিসেবে কোনো মানুষের যৌন-গঠন গভীরভাবে পরস্পর সামঞ্জস্যপূর্ণ। সেই সাথে আমাদের গঠনসম্পর্কিত, অর্থাৎ জন্মগতভাবে ব্যক্তির মধ্যে যা কিছু পাওয়া যায় আর যা তার গঠন-প্রকৃতির অঙ্গ বা অর্জিত, অর্থাৎ ব্যক্তি তা প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রভাব থেকে গ্রহণ করে, এর মধ্যকার ব্যবধান নির্ধারণ করার সময় সতর্ক থাকা উচিত। এ কথা আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে, এককিকে তো অর্জিত মূল তার চেয়ে অনেক বেশি গভীর, যতটা গভীর বলে ভাবা হতো, আর অন্যদিকে গঠনাত্মক অর্থাৎ গঠন-সম্পর্কিত তত্ত্ব এতটা সূক্ষ্ম ও অস্পষ্ট প্রতীত হয় যে তা আয়ত্তের মধ্যে আনা যায় না।

মানুষ আকছারই ভুলে যায় যে, অধিকাংশরূপে দুই প্রকারের তত্ত্ব সম্মিলিত থাকে। অনুকূল জমিন পেয়েই জীবাণু সক্রিয় হয়ে ওঠে। অন্য ক্ষেত্রের মতো এখানেও শুধু বীজ বা জমিনের কারণে নয়, বরং দুয়ের সংযোগ থেকেই পরিণাম বেরিয়ে আসে। এমনকি একই পরিবারের বাচ্চাদের মধ্যেও ম্যান্ডেলের উত্তরাধিকার তত্ত্ব অনুযায়ী পৃথক পৃথক প্রকারের বীজকে সক্রিয় করে দেয়। লন্ডনের শিশু-নির্দেশনা ক্লিনিকের পরিচালক সমপ্রতি জানিয়েছেন যে, একই বিষয়ের ওপরে জোর দেয়ায় একটি বাচ্চা চোর হয় আর অন্যটি কী অসাধারণভাবে লাজুক হয়ে যায়।

এই জ্ঞানের পরিণাম হলো যে, ডাক্তার অনেক ভেবে-চিনে-ও মনোযৌন বিষয়ে যে পরামর্শ দেন সে সীমা তার জানা হয়ে যায়, এমনকি, তিনি নিজেও তার মধ্যে সীমিত হয়ে যান। শুধুমাত্র পোশাক বৃত্তি থেকেই যৌন মনোবৃত্তির তুলনা করা যেতে পারে। তবে পোশাক বৃত্তি অপেক্ষা যৌন মনোবৃত্তির ওপর উপচারের ওপর স্বাস্থ্যদায়ক প্রভাব কেন এত কম পড়ে, এর একটি অন্য কারণও আছে। নিশ্চিতরূপে যৌন মনোবৃত্তি তার সীমার মধ্যে যত লোক মানতে প্রস'ত আছে তা থেকে কিছুটা বিস্তারিত ক্ষেত্রে চাইলেও নির্দেশিত এবং নিয়ন্ত্রিত করা যেতে পারে। তবে যৌন মনোবৃত্তি পোশাক বৃত্তি অপেক্ষা অনেক বড় অংশে ধর্ম, নৈতিকতা এবং সামাজিক রীতি অথবা প্রথার পরম্পরাগত প্রভাবের কারণে কিছু ক্ষেত্রে বিস্তৃত হতে পারে, আর কিছু ক্ষেত্রে তো পথ একেবারেই রুদ্ধ থাকে। এমন কিছু ডাক্তার তো আছেন যারা স্পষ্টই বলে থাকেন এ ধরনের প্রভাব একেবারেই উপেক্ষা করা উচিত। তাদের যুক্তি হলো সামাজিক প্রথা অথবা নৈতিকতার উপদেশের পরোয়া না করে এটাই দেখা উচিত যে, রোগীর জন্য কোনটা খারাপ আর কোনটা ভালো, সেই অনুসারে রোগীদের পরামর্শ দেয়া উচিত। যাই হোক না কেন এই কার্যপ্রণালীতে দূরদর্শিতার অভাব রয়েছে। এ থেকে অনেক নিকৃষ্ট পরিসি'তি ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। কোনো কোনো সময়ে তো ওই উৎপন্ন বিভ্রান্ত ওই নিকৃষ্ট অবস্থা থেকেও খারাপ হয়ে পড়ে, যার নিরাময় সে করতে চায়। প্রকৃত সত্য হলো পোশাক বৃত্তি থেকে যৌন মনোবৃত্তি এই অর্থে ভিন্ন যে তার স্বাভাবিক পরিতৃপ্তির জন্য অন্য ব্যক্তিকেও সম্মিলিত করতে হয়। এ জন্য তা প্রত্যক্ষরূপে সামাজিক ও নৈতিক সীমার মধ্যে এসে পড়ে। এ অধিকার কারোরই নেই এবং এ বিষয়ে কাউকে এ পরামর্শ দেয়া যেতে পারে না যে, নিজের কোনো প্রকারের ভালোর জন্য অন্যের ক্ষতি করে বসতে পারে।

সত্যি কথা বলতে কী, ব্যাপক এবং বুদ্ধিসঙ্গত ভিত্তির ওপরে রোগীর রোগ নিরাময় এমন কোনো পদ্ধতিতে হতে পারে না যা থেকে তার নিকট সম্পর্কে থাকা বা আগত ব্যক্তিদের ক্ষতি স্বীকার করতে হয় অথবা তার বিশ্বাস ও বিবেকহানি ঘটে। কোনো বুদ্ধিমান ডাক্তারই এই চিন্তাধারা উপেক্ষা করতে পারেন না। তা তিনি এ সংকল্প যতই করে থাকুন না যে, তার প্রদত্ত পরামর্শ কোনো রীতিপ্রথার ভিত্তিতে হবে না। এ চিন্তাধারা খুবই বাস্তবসম্মত এবং গু্রুত্বপূর্ণ এবং পরম্পরাগত সামাজিক অট্টালিকার সাথে প্রথিত, যেখানে আমরা সবাই বাস করি। এরকম আরো অজস্র বিষয়ও আছে যেখানে এ সমস্ত কারণ ডাক্তারের জন্য তার মনোযৌন চিকিৎসা প্রণালী নির্ধারিত করার সময় বিশুদ্ধরূপে প্রাণিশাস্ত্র কর্তৃক প্রদত্ত দিশা অনুসরণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। আকছারই চিকিৎসক এ কথা অনুভব করেন যে, যে দশটি তিনি প্রত্যক্ষ করছেন তা ব্যাপকরূপে এমন কোনো উপকরণের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে যার ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ঠিক এই প্রকারের অনুভব তার তখনই হয় যখন তিনি রোগীর জন্য কিছুই করতে পারেন না, যার রোগ সীমার বাইরে পরিশ্রম এবং অপর্যাপ্ত পুষ্টির কারণে হয় এবং এই অপর্যাপ্ত পুষ্টিই বা কেমন যা তার সামাজিক পরিসি'তিতে একান্ত অপরিহার্য।

সেই সাথে এ কথা বলে দেয়া বাঞ্ছনীয় যে, যেখানে রোগীর নৈতিক অবস্তাকে উপেক্ষা করা যায় না সেখানে নৈতিক স্তিতিকে সর্বদা দৃঢ় এবং অপরিবর্তনীয় মনে করাটা ভুল হবে। সদাচার শ্বাশত নয় বরং নিরন্তর পরিবর্তনশীল। এমন কোনো বিষয় যা আজ নৈতিক বলে গণ্য করা হয় এবং অন্য সকল পরিস্থিতিতে যা ইচ্ছামতো করা যায় তাই আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে অনৈতিক বলে গণ্য করা হতো এবং তা প্রকাশ্যে করা যেত না। নৈতিক অবস্থায় সংঘটিত পরিবর্তনানুসারে আজকের প্রখ্যাত ডাক্তার নিজের পূর্ণ দায়িত্ব ও কর্তব্য বিবেচনা করে যৌন বিষয়ে যে পরামর্শ প্রকাশ করছেন তা-ই আজ থেকে কিছুদিন পূর্বে নিজের মতো করেও প্রকাশ করতে সাহস পেতেন না। সমাজকল্যাণকর্মে স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণে ইচ্ছুক জাগ্রত-হৃদয় ডাক্তার জনগণের চিকিৎসা-সম্পর্কিত পরামর্শদাতা হিসেবে, সদাচারের পরিবর্তনে অংশগ্রহণ করছেন। কিন্তু তাকে সর্বদাই রোগীর বিশেষ অবস্থার প্রতি মনোযোগ রাখা উচিত।

উপর্যুপরি আলোচনা থেকে এই উপসংহারে পৌঁছানো বড়ই গু্রুতর ভুল হবে যে যৌনমনোরোগ এক দুরারোগ্য ব্যাধি অথবা এ কথা মনে করা যে এ এমনই একটি বিষয় যে সম্পর্কে ডাক্তারের চিন্তা করা উচিত নয়। এর বিপরীতে যৌন মনোরোগ-সম্পর্কিত বিষয়টি সঠিকভাবে মানসিক হওয়ার কারণে, অপ্রত্যক্ষরূপে পড়া প্রভাব থেকেও প্রভাবিত হতে পারে। এই অপ্রত্যক্ষ প্রভাবের রোগের শারীরিক অবস্থার ওপর যেমন সীমাতিরিক্ত পরিশ্রম, পুষ্টির স্বল্পতা ইত্যাদির ওপর, যা ডাক্তারের আয়ত্তের বাইরে, কোনো প্রভাব পড়ে না। অনেক সময়ে ডাক্তার এ দেশে বড়ই আশ্চর্যান্বিত হয়ে যান যে, এমন মামলায় যাকে তিনি নিরাশাপূর্ণ বলে মনে করতেন, রোগী সুস্থ রইল এবং সে বড়ই সততার সাথে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল। এমনটি সর্বদাই ডাক্তার কর্তৃক প্রদত্ত পরামর্শের পরিণামস্বরূপ হয় না বরং বিপরীত গুণযুক্ত এবং সমানরূপে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার পরিণামস্বরূপ হয়ে থাকে। ফ্রয়েড একে প্রারম্ভেই তার মনোবিশ্লেষণ পদ্ধতির ভিত্তিস্বরূপ গ্রহণ করেছিলেন, অর্থাৎ অবচেতন তত্ত্বের স্তরে নিয়ে আসা এবং অবদমিত আকাঙক্ষার দ্বারা উদ্বেগ দূর করা।

ডাক্তার আত্মদোষ-স্বীকরণের এই প্রক্রিয়ায় নিজের বুদ্ধি ও সহানুভূতির দ্বারা কেবল মনোযোগীই হন না, সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে থাকেন এবং এক বিকৃত অবস্থা দূরীভূত হয়ে যায়। তা সে এতটা যৌনস্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য পর্যাপ্ত হোক বা না হোক, কিন্তু আত্মদোষ-স্বীকরণ নিশ্চিতরূপে তাকে কম হানিকারক বানিয়ে দেয়, সেই সাথে সম্পূর্ণ মানসিক জীবনের কিছু অংশ পর্যন্ত উচিতরূপে সংবলিত করে দেয়। আত্মদোষ-স্বীকরণ এবং দোষ-ক্ষালনের এই ধার্মিক প্রক্রিয়া ক্যাথলিক কর্মে কিছুটা বিকশিত। (লেখক বৌদ্ধধর্মের খবর যে জানতেন না, এ কথা থেকে তা স্পষ্ট)। এই পদ্ধতি ওই মনোবৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর টিকে গিয়েছে এবং নিঃসন্দেহে তা থেকে সুফল পাওয়া যাচ্ছে। এটি একটি মনোযোগের বিষয় যে, অনেক লোকই এই সন্দেহ করেন যে, তিনি তার ডাক্তারের কাছ থেকে বুদ্ধিমত্তাপূর্ণ সহানুভূতি পাবেন না, এই কারণে তিনি যৌনবিভ্রাট থেকে আত্মদোষ-স্বীকৃতির মাধ্যমে মুক্তির জন্য পাদ্রীর কাছে, তা তিনি ছোট-বড় যেমনটিই হোক না কেন, যান, কেননা, পাদ্রীর কাজ হলো তার কাছে যিনিই শরণ নিতে আসুন না কেন, তাকে সাত্ত্বনা দেয়া। ধার্মিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে, এমনকি সম্মোহন এই প্রকারের পরামর্শ-সহযোগিতা ইত্যাদি দেয়া থেকে পৃথক, মনোরোগ চিকিৎসা-প্রণালীর এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র রয়েছে, যা সঠিকভাবে ডাক্তারিই অন্তর্গত এবং তা লক্ষণীয়ভাবে যৌনমনোবৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে সহায়ক হয়। ফ্রয়েডের বিশেষ কৃতিত্ব যে (তা সে তত্ত্ব স্বয়ং তার হাত থেকেই হোক বা অন্যের হাত ধরে যেভাবেই গ্রহণ করা হোক না কেন), তিনি অনেক আগেই মনোরোগ-চিকিৎসার এই বিশেষ ক্ষেত্রকে জেনে নিয়েছিলেন এবং চিত্রকলা তথা মূর্তিকলার ক্ষেত্রে গৃহীত এই উপমায় বুঝতে পেরেছিলেন যে, মনোবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা কেবল রোগীর মনের মধ্যে কিছু দিয়ে নয়; বরং কিছু বাইরে বের করে অনাবশ্যক প্রতিরোধ এবং দমনকে দূর করে নিজের কাজ করতে পারে এবং এভাবে মানসিক অস্তিরতাকে সুস্থ, স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারে।