রাত্রি, গভীর, তন্দ্রা, নিঃশ্বাস, ঝিঁঝিঁ পোকা, স্বপ্ন, বিশ্রাম, ভোর, সূর্য, জাগরণ... একনাগাড়ে এতগুলো শব্দ বলে ভদ্রলোক থামলেন। এবার আমাদের পালা। সামনের খাতায় ঝটপট তুলে ফেললাম এতক্ষণ যে শব্দগুলো শুনলাম। শব্দগুলোর নিজস্ব একটা গতি আছে। একটা গভীর নৈঃশব্দ্যের ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। অন্ধকার রাত্রি থেকে ভোরের জাগরণ। সামনের খাতায় লিখতে থাকি দ্রুত। হঠাৎই চোখে পড়ে পাশের মিসরীয় ভদ্রমহিলার খাতায়। ভদ্রমহিলা আমার গ্রুপমেট। এক সারি শব্দ স্মৃতি থেকে লিখে চলেছেন। একটা বিশেষ শব্দে চোখ আটকে গেল, ‘ঘুম’। ইংরেজিতে ভদ্রমহিলা লিখেছেন ঝষববঢ়। ছাড়া-ছাড়া শব্দগুলোর সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে শব্দটি। মনে হয় শুধু এই শব্দটিই পূর্ণতা দিয়েছে পুরো ঘটনাটিকে। ঘটনাটি কয়েক দিন আগের। চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী প্রাগে সায়েন্টিফিক কমিউনিকেশনের ওপর একটা ক্লাস করছি। আমাদের গ্রুপে আমরা বাংলাদেশী চারজন আর মিসরীয় চারজন ডাক্তার। আলোচনার বিষয় ছিল আমরা যে কথাটি শুনিনি সে কথাটাও অনেক সময় শুনেছি বলে ভ্রম হয়। আরো সোজা করে বললে আমাদের মন কখনো কখনো কোনো বিশেষ শব্দ, কথা নিজে থেকেই তৈরি করে নেয়। পুরো ক্লাসটায় (আমি ছাড়া) প্রায় দেড়শ জন সারা পৃথিবীর তাবড় তাবড় ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ছিলেন। নিজেদের পেশাগত নৈপুণ্যে তারা একেক দিকপাল। শরীরের গভীর থেকে অতল অজানা থেকে বের করে আনতে পারেন রোগের স্বরূপ। প্রয়োজনে শরীরের অণু-পরমাণুকে বিশ্লিষ্ট করে খুঁজে নেন কাঙিক্ষত কারণ। অথচ প্রায় সবাই ভুল শুনলেন। প্রায় সবাই উচ্চারিত শব্দগুচ্ছের মধ্যে উল্লেখহীন ‘ঘুম’ শব্দটি সবেমাত্র শোনা শব্দের তালিকায় ঢুকিয়ে দিলেন। হ্যাঁ দিয়েছেন। মন ওই শব্দ তৈরি করেছে। আমাদের বিশ্বাস করাতে বাধ্য করেছে যে সেই শব্দটি বলা হয়েছে। কারণ ওই শব্দগুচ্ছ যে মনছবিকে মূর্ত করে তোলে, ‘ঘুম’ শব্দটি তার আংশিক অনুষঙ্গ। ওই শব্দটি না হলে চিত্রকল্প সম্পূর্ণ হয় না।
আমাদের কথার উচ্চারণে, বাচনভঙ্গিতে, স্বরের ওঠা-নামার যে বিশেষ বার্তা পৌঁছাতে চাই, শ্রোতা সেটা ঠিকই বুঝে নেন। এমনকি সে কথাটা উচ্চারণ না করালেও। কমিউনিকেশন টেকনিকে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বা শরীরী ভাষা বলে একটা বিষয় আছে। কোনো কথা না বললেও শরীরের বিশেষ ভঙ্গিমার নির্দিষ্ট ভাষা আছে। মুখে এক কথা আর শরীরী ভাষায় যদি আরেক কথার প্রকাশ থাকে তাহলে? কমিউনিকেশন এক্সপার্টরা বলেন, তবে শরীরী ভাষাকেই বিশ্বাস করতে হবে কেননা মুখে মিথ্যা বলা যায়, কিন্তু শরীরে বলা যায় না। মনের অনেক কথাই বলে দেয়া যায় কোনো কথা না বলেই।
মানস নদীতে সেতুবন্ধন...
আমার গন্তব্য স্বপ্নময় ভেনিস। হোটেল থেকে হুটোপুটি করে ব্যাগ গুছিয়ে মেট্রো স্টেশনে দৌড়। ব্যাগে সম্বল কিছুই না-টুথব্রাশ, টুথপেস্ট, চুলের ব্রাশ, একটা টাওয়েল আর ক্যামেরা। পকেটে পয়সাও যৎসামান্য। নিখাদ টুরিস্ট। ঠিক করেছি রাত কাটাতে হলে স্টেশনে বসে-ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেব। ট্রেনে ওঠার সময় চেকার পাসপোর্ট দেখতে চাইল। দেখতে দিলাম। দুটো পাতা উল্টে হাতের ব্যাগে পাসপোর্টটা চালান করে দিল। কী ব্যাপার? পাসপোর্ট ফেরত দেবে না? আমার উদ্বেগ দেখে চেকার হাসল। ‘ডোন্ট ওরি। উই উইল গেট ইট ব্যাক ইন ভেনিস।’ আশ্বস্ত হয়ে এবার বগিটা খুঁজতে লাগলাম। ছয়জনের বগি। যথারীতি দুজন যাত্রী বসে আছেন। একজন বৃদ্ধ ভদ্রমহিলা আর তার হাত ধরে আছে সমবয়সী আরেক ভদ্রলোক। হাতের ব্যাগটা কোথায় রাখা যায় ভাবছি। হঠাৎ পেছন থেকে ভদ্রমহিলা কী যেন বলে উঠলেন। কথাগুলো সব বুঝতে না পারলেও শেষ শব্দটা কানে পড়ল। ‘ভেনিস’? ঘুরে তাকাতেই ভদ্রমহিলার দিকে চোখ পড়ল। হাসিমুখে আমার দিকেই তাকিয়ে আছেন। আবার কী যেন বলে উঠলেন। অনেক দুর্বোধ্য শব্দের শেষে স্পষ্ট উচ্চারণ ‘ভেনিস’ শব্দটা বুঝতে পারলাম। এবার ভদ্রলোকও আমার দিকে তাকিয়ে আছেন।
মনে হলো জানতে চাইছেন আমি ভেনিস যাচ্ছি কি না?
ইংরেজিতে বললাম-আমি ভেনিস যাচ্ছি।
এবার দুজনেই এক সঙ্গে যেন বলে উঠলেন। মনে হলো বললেন-আমরাও যাচ্ছি। আমার জন্য এক দুর্বোধ্য ভাষা, তবে ফ্রেঞ্চ নয় সেটা বুঝতে পারি।
ব্যাগটা রেখে মুখোমুখি সিটে এসে বসি। এখনো হাসি-হাসি মুখ করে ভদ্রমহিলা তাকিয়ে আছেন। একটু অস্বস্তিতে পড়ি।
- ইন্ডিয়া?
এবারও আমাকে। জোরের সঙ্গেই বলি। - না বাংলাদেশ। ইন্ডিয়ার কাছাকাছি এক ছোট সুন্দর দেশ।
এরপর শুরু হয় আমাদের অবিশ্বাস্য বাক্যালাপ। ভদ্রমহিলা স্প্যানিশে আর আমি ইংরেজিতে। আমি কস্মিনকালেও স্প্যানিশ শুনিনি। অথচ আমরা দুজন হাজারো কথার ফুলঝুড়ি ফুটিয়ে দিলাম। ভদ্রলোক হাসিমুখে আমাদের শ্রোতা হয়ে রইলেন। ভদ্রমহিলার কাছেই শুনলাম উনারা মাদ্রিদে থাকেন। বাচ্চাদের স্কুলে পড়ান। উনাদের এক মেয়ে প্যারিসে থাকেন। ছুটিতে বুড়োবুড়ি মেয়ের কাছে বেড়াতে এসেছিলেন। মাঝে ভেনিসে কয়টা দিন কাটিয়ে মাদ্রিদে ফিরে যাবেন। ট্রেন চলছে বেশ কিছুক্ষণ। রাতও হয়েছে বেশ।
- তুমি ঘুমিয়ে পড়।
গভীর মমতায় ভদ্রমহিলা বললেন। আমি ঘাড় নেড়ে আমার জায়গায় শুয়ে পড়ি। অবাক হয়ে ভাবতে থাকি ভাষার দূরত্ব এভাবেই অতিক্রম করা যায়? আজকে আমি নিজেই তো এর প্রমাণ। মনের সেতুবন্ধন তৈরি হলে বোধ হয় এমনি হয়। ট্রেনের দুলুনিতে ঘুমিয়ে পড়ি।
মাঝরাতে প্রবল ধাক্কায় ঘুম ভাঙে। চোখ মেলেই দেখি পুলিশ। নিচে ভদ্রমহিলার ঘুম ভেঙে গেছে। আতঙ্কিত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। ইংরেজিতে পুলিশ জিজ্ঞেস করে,
- কোথায় যাচ্ছ? ভেনিসে। তুমি কি জানো যে এখন সুইস টেরিটরির ওপর দিয়ে যাচ্ছ?
- না,
আমার ছোট্ট জবাব।
- তোমার সুইস ভিসা আছে?
- না নেই। আমি তো আর সুইজারল্যান্ডে নামছি না। মুখের রেখাগুলোকে কঠোর করে তুলে পুলিশটি চিবিয়ে চিবিয়ে যা বলল তার সারমর্ম হচ্ছে যে, সুইস ভিসা না থাকায় আমাকে পরের স্টেশনে নামিয়ে ফিরতি ট্রেনে তুলে দেয়া হবে। এবার আমি ঘামতে শুরু করি। এ যে দেখছি মহাবিপদ।
- কী করতে হবে? এবার সুবোধ বালকের মতো আত্মসমর্পণ করলাম।
- আমাকে চারশ ফ্রাঁ দাও, আমি ভিসা দিয়ে দিচ্ছি।
চা-র-শ ফ্রাঁ ! আমার পকেট তো গড়ের মাঠ হয়ে যাবে। কী আর করা। অগত্যা মধুসূদন, ভালো মানুষের মতো চারশ ফ্রাঁ দিয়ে দিই।
ভিসাটা দেখিয়ে দিও আর আমাকে একটা রসিদ দিও। পুলিশকে বলি।
- ঠিক আছে তুমি এখন ঘুমাও। বলে পুলিশটি চলে যায়। আলো নিভিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করি। সাধারণত এপাশ ওপাশ করে কাটল। ভোরের আলো কামরায় ঢুকল। ভদ্রমহিলা আমার আগেই জেগেছেন।
- তোমার চারশ ফ্রাঁ ও ব্যাটা মেরে দিয়েছে। মজার সুরে ভদ্রমহিলা বললেন। যাই হোক আমার উপোস দিতে হবে। আমি জবাব দেই। মনে মনে ঠিকও করে ফেলি সকালে নাস্তাটা ট্রিস্কে ফেলব। ভোরেই ভেনিস শহরে পৌঁছে যায় ট্রেন, নামার সময় পাসপোর্ট ধরিয়ে দিয়ে চেকার বলে,
- তোমার ডাবল এন্ট্রি ভিসা দিয়েছে সুইট ইমিগ্রেশন। ফেরার সময় ঝামেলা হবে না। আর ঝামেলা, সবচেয়ে বড় ঝামেলা আমার পকেটে সম্বল নেই।
- একটা ডে সিটি ট্যুর টিকিট কিনে ঘুরছি। এখানে-ওখানে, মুগ্ধ হচ্ছি প্রাচীন অথচ চির নবীন শহরটির সৌন্দর্যে। সারাক্ষণ ছল ছল শব্দ এক অন্য রকম নেশা ধরিয়ে দেয়। ‘রিয়েরটো ব্রিজের’ ওপরে ঝুঁকে নিচের পানিতে গন্ডোলার আসা-যাওয়া দেখছি। সকালের নরম আলো ছোট ছোট ঢেউয়ের মাথায় চুরমার হয়ে ভেঙে পড়া। অপূর্ব। হঠাৎ পিঠে কে যেন হাত রাখে। ফিরেই দেখি সেই দম্পতি। ভদ্রমহিলার হাতে টিস্যু পেপারে জড়ানো একটা জিনিস আমার হাতে ধরিয়ে দিয়েই ভিড়ে হারিয়ে গেলেন। টিস্যু পেপার খুলতেই দেখি গরম পিৎজা। এখন মনে হলো সকালে পেটে কিছুই পড়েনি। মনটা বড় আর্দ্র হয়ে যায়। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। ভদ্রমহিলা মায়ের মমতায় আমাকে সিক্ত করে গেলেন। অথচ আমরা পরস্পরের ভাষা বুঝি না। থাকি হাজার হাজার মাইল দূরে। আর কোনো দিন নিশ্চিত দেখা হবে না। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামে। একটা দুটো করে আলো জ্বলে উঠতে থাকে। ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটায় ওভারকোটটাকে আঁটসাঁট করে নিই। কয়েকটা নক্ষত্র আকাশে উঁকি দিচ্ছে। ভেনিসের অবিশ্রাম ছলছল শব্দ ছাপিয়ে এক অতি পরিচিত সুর ভেসে আসে। রাস্তায় এক ধরনের মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট বিক্রি করছে এক লোক। সুর ভেসে আসছে ওই বিচিত্র যন্ত্র থেকেই। রাস্তার পাশে বেঞ্চে বসে পড়ি। অনেক চেনা অপরূপ সেই ঘুমন্ত প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাই।
তন্ময় হয়ে শুনতে থাকি-এভরি নাইট ইন মাই ড্রিমস আই ফিল ইউ, আই সি ইউ। দ্যাট ইজ হাউ আই নো ইউ গো অন। ফার অ্যাক্রস দ্য ডিসটেন্স অ্যান্ড স্পেসেস বিটুইন আস...।
ডা. পিনাকী ভট্টাচার্যের
‘বালাই ষাট’
বই থেকে সংকলিত

