Skip to main content

শীতে সুস্থ থাকুন

ডা. হুমায়ুন কবীর হিমু

উত্তরাঞ্চলে শীত পড়েছে অনেক আগেই। দেশের অন্যান্য এলাকায়ও শীত পড়তে শুরু করেছে। কুয়াশার চাদরে ঢেকে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকা। সপ্তাহ দুই-একের মধ্যে তা জেঁকে বসবে। শীতে শরীর ফিট রাখতে হলে প্রস্তুতি নিতে হবে এখন থেকেই। মেনে চলতে হবে পুরো শীতের সময়।

শীতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। শুষ্ক আবহাওয়া ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে সহায়তা করে। আর্দ্রতা কমে যায় বলে শ্বাসনালির স্বাভাবিক কর্মপ্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। ফলে ভাইরাস সহজেই আক্রমণ করে। দেখা দেয় ইনফ্লুয়েঞ্জা ও সর্দি-কাশি। এ ছাড়া ধুলাবালির পরিমাণ বেড়ে যায়। ঠান্ডা, শুষ্ক আবহাওয়া ও ধুলাবালি শ্বাসনালিকে সংকুচিত করে শ্বাসকষ্ট বাড়ায়। বাড়ায় হাঁপানির টান। এ ছাড়া বাড়ে সাইনুসাইটিস, কানের ইনফেকশন, টনসিলাইটিস। ত্বক শুষ্ক ও রুক্ষ হয়ে যায়। পায়ের গোড়ালি ফেটে যায়। মাথায় খুশকির উপদ্রব বাড়ে। ত্বকে দেখা দেয় বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগ। হাড়ের রোগ যেমন রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, অস্টিওআর্থ্রাইটিস বা বাতের ব্যথা প্রকট আকার ধারণ করে।

প্রথমেই আসা যাক সর্দি-কাশি প্রসঙ্গে। ঠান্ডাজনিত সর্দি-কাশিতে জ্বর জ্বর ভাব বা জ্বর থাকে, শরীর ম্যাজম্যাজ করে, নাক দিয়ে পানি ঝরে, নাক বন্ধ থাকে, মাংসপেশিতে ব্যথা থাকে, গলায় থাকে খুশখুশ ভাব বা ব্যথা এবং থাকে হাঁচি ও শুকনা কাশি। সাধারণত ভাইরাসের সংক্রমণে এটি হয়ে থাকে। ৫-১০ দিন পর আপনা-আপনি ভালো হয়ে যায়। তবে শুকনো কাশি অনেক দিন পর্যন্ত থাকতে পারে।

সর্দি-কাশি প্রতিরোধে হাঁচি-কাশি এলে টিস্যু বা রুমাল দিয়ে মুখ ঢেকে নিন। ব্যবহৃত টিস্যু যেখানে-সেখানে না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন। হাঁচি-কাশির পর সাবান-পানি দিয়ে ভালো করে হাত ধুয়ে ফেলুন। হাত না ধুয়ে চোখ, নাক, মুখ স্পর্শ করবেন না। বাইরে থেকে এসে হাত-মুখ ভালো করে পরিষ্কার করুন। আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকুন। কারও সঙ্গে কথা বলার সময় কমপক্ষে এক মিটার দূরত্ব বজায় রাখুন। যদি সর্দি-কাশি হয়েই যায় তাহলে কুসুম গরম পানির সঙ্গে লেবু, মধু মিশিয়ে পান করুন। তুলসী পাতার রস ও কালিজিরা রোগের উপসর্গ কমাতে পারে। শুকনো কাশি বেশিদিন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করুন।

ময়েশ্চারাইজার ত্বককে শুষ্কতর হাত থেকে রক্ষা করে কোমল ও মসৃণ রাখে। ত্বকে তেল দিলেও চলে, তবে অলিভ অয়েল ভালো। ময়েশ্চারাইজার বা তেল গোসলের পর শরীর ভালো করে শুকিয়ে মাখতে হবে, গোসলের আগে নয়। শীতকালে ত্বকে অল্প সাবান ব্যবহার করা উচিত। কারণ শীতকালে এমনিতেই ত্বক শুষ্ক থাকে। সাবান ব্যবহারের ফলে ত্বকের তৈলাক্ত ভাব কমে গিয়ে আরও শুষ্ক হয়ে পড়ে। শীতের শুরু থেকেই রাতে ঘুমানোর আগে ত্বকে নিয়মিত অলিভ অয়েল ম্যাসেজ করে নিলে ত্বক থাকবে মসৃণ ও নমনীয়।

বাইরে বেরোলে গরম কাপড় পরিধান করুন। মাথা ও কান ভালো করে মাফলারে ঢেকে নিন। শীতকালের শাকসবজি বেশি করে খান। মাঝেমধ্যে কুসুম গরম পানি দিয়ে গড়গড়া করুন। কুসুম গরম পানি, চা-কফি পান করতে পারেন। ঠান্ডা খাবার ও পানীয় বাদ দিন। ঘরে আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করুন। ঘরের মধ্যে বসে না থেকে ব্যায়াম, হাঁটাচলা করুন। ধুলাবালি এড়িয়ে চলুন। প্রয়োজনে মাস্ক ব্যবহার করুন। হাঁপানি ও দীর্ঘদিনের শ্বাসকষ্টে আক্রান্তরা শীতের শুরুতে চিকিৎসকের পরামর্শমতো ইনহেলার বা অন্যান্য ওষুধ সেবন করুন। প্রয়োজনে ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা নিন। শীতে বৃদ্ধরা বেশি কাবু হয়ে পড়েন। তাদের যেন ঠান্ডা না লাগে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ এ সময়ের ঠান্ডা থেকে হতে পারে প্রাণহারী নিউমোনিয়া।

রোগ প্রতিরোধে
শীতের সবজি
সিদ্ধার্থ মজুমদার
এখন শীতের সবজিতে বাজার সয়লাব। তাজা সবজি এখন নিত্যদিনের খাবার। এই শীতের সবজিগুলোর মধ্যে এমন কিছু সবজি আছে যেগুলো শুধু দেহের পুষ্টিচাহিদা পূরণ করে না, কিছু কিছু রোগের পথ্যেরও কাজ করে।

বাঁধাকপি
এই সময়ে বাজারে পাওয়া যাচ্ছে হরেক রকমের সবজি। এসব টাটকা সবজির মধ্যে বাঁধাকপি অন্যতম। শীতের এই সব্জিটি বেশ উচ্চপুষ্টিমানসম্পন্ন এবং খেতেও সুস্বাদু। খুব সহজেই তা রান্না করা যায়। পরিপাক হতেও সময় লাগে না। বাঁধাকপিতে আছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘সি’। ‘ই’ও আছে প্রচুর পরিমাণে। এছাড়া আছে সালফারের মতো খনিজ উপাদান। প্রতি ৩ দশমিক ৫ আউন্স বাঁধাকপিতে থাকে ২৪ ক্যালোরি পুষ্টি। এক পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে, লেবুর জুস থেকে কাঁচা বাঁধাকপিতে ভিটামিন ‘সি’-এর পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। কাঁচা বাঁধাকপি পাকস'লীর বর্জ্য পরিষ্কার করে। এছাড়া রান্না করা বাঁধাকপি খাদ্যদ্রব্য হজমে বেশ সহায়ক। কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতেও এই সবজি দারুণ কার্যকর। বাঁধাকপি ক্যান্সার প্রতিরোধক হিসেবেও কাজ করে। বিশেষ করে কোলন ক্যান্সার প্রতিরোধে এই শীতকালীন সবজি বেশ ভূমিকা রাখে। বাঁধাকপি মানুষের  রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া বাঁধাকপি মানবদেহের ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে, আলসার নিরাময় এবং দেহের রক্ত সঞ্চালনের উন্নতি সাধন করে। তাই এই শীতে অন্যান্য সবজির সঙ্গে বাঁধাকপি খেতে পারেন নিয়মিত।

টমেটো
পুষ্টিগুণে ভরপুর এই সবজিতে আছে লাইকোপেন নামের এমন এক উপাদান, যা বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার প্রতিরোধে কাজ করে। মানুষের ওপর এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই লাইকোপেন প্রোস্টেট, স্তন, ফুসফুস, প্যানক্রিয়াস এবং ত্বকের ক্যান্সার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়া টমেটোর এই লাইকোপেন চোখের রোগেরও উপশম করে। তাছাড়া টমেটোতে অন্যান্য ভিটামিনের সঙ্গে আছে প্রচুর পরিমাণ রিবোফ্লোবিন, যা ঘন ঘন মাথাব্যথা রোগের ওষুধের কাজ করে। এছাড়া ওজন কমানো, জন্ডিস, বদহজম, কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়ারিয়া ও রাতকানা রোগে টমেটো হতে পারে সবচেয়ে ভালো পথ্য।

ঢেঁড়শ
এ সবজিটি আঁশে পরিপূর্ণ। একদিকে এই সবজিতে যেমন আছে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন, অন্যদিকে কম মাত্রার ক্যালোরি। এ সবজিটি ডায়াবেটিস প্রতিরোধে কাজ করে। ঢেঁড়শের সহজপাচ্য আঁশ রক্তের সেরাম  কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। ঢেঁড়শে আছে উচ্চমাত্রায় ভিটামিন এ, আয়ামিন, ফলিক এসিড, রিবোফ্লোবিন ও জিংক। মূত্রতন্ত্রের সংক্রমণ প্রতিরোধে ঢেঁড়শ ভালো কাজ করে। এছাড়া মেদভুঁড়ি কমাতে চাইলে ঢেঁড়শ খান নিয়ম করে।

গাজর
ভারি সুন্দর সবজিটি এখন বাজার ঘুরলেই চোখে পড়ে। পুষ্টিগুণ বিচারেও সবজিটি অনন্য। এছাড়া গাজরে বিটা ক্যারোটিন নামের এমন এক উপাদান আছে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। গাজর শরীরের উল্লেখযোগ্য যেসব কাজে লাগে, তার মধ্যে এটি ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়, শ্বাসতন্ত্রের কর্মক্ষমতা বাড়ায়, হজমে সাহায্য করে, দাঁত, হাড় ও চুল শক্ত করে, আলসার প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। এছাড়া ত্বকের ঔজ্জ্বল্য বাড়ায় এই গাজর।

মুলা
প্রাচীনকালে মুলা শুধু সবজি হিসেবেই খাওয়া হতো না, ওষুধ হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। মুলায় আছে উচ্চমাত্রার কপার ম্যাঙ্গানিজ ও পটাসিয়াম। এছাড়া মুলা ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রন, জিংক, সোডিয়ামেরও ভালো উৎস। মুলা হজমে সাহায্য করে। রক্ত বিশুদ্ধকরণ, ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধি এবং দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধিতেও মুলা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।

তিল
তিলের বীজ, তিলের নাড়ু, খাজা-গজায়ও তিল। সুস্বাদু অনেক খাবারে মসলা হিসেবেও তিল প্রচলিত। মধ্যপ্রাচ্যে তিলের বীজের মাখন ছড়িয়ে দেয়া হয় রুটির ওপর। হালভা ক্যান্ডিতে তিল প্রধান উপকরণ। চীনে কেক, কুকিস ও পায়েসে তিল দেয়া হয়। তিলের ইংরেজি শব্দ সেস্যামি, এসেছে আরবি শব্দ সিমসিম থেকে। মিসরে এর নাম সেমসেন্ট। এই মসলার ব্যবহার ছিল প্রাচীনকালে। তিলবীজে রয়েছে হৃদসুখকর পলিআন স্যাচুরেটেড তেল (৫৫%), উ"চমাত্রায় প্রোটিন (২০%) এবং অন্যান্য ভিটামিন এ ও ই, বি। খনিজ দ্রব্য প্রচুর আছে তিলবীজে। আছে ক্যালসিয়াম, তামা, ম্যাগনেসিয়াম, লৌহ, ফসফরাস, দস্তা ও পটাসিয়াম। এতে আছে মিথিওনিন ও ট্রিপটিফ্যান।

ধনেপাতা
ধনেপাতা আমাদের দেশে ভীষণ পরিচিত। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই ধনেপাতা পাওয়া যায়। ধনেপাতা শুধু রান্নার উপকরণ নয়, এর রয়েছে নানাবিধ ঔষধি গুণ। তাই এই পাতাকে বলা হয় হার্বাল প্যান্ট বা ঔষধি পাতা। ধনেপাতার ইংরেজি নাম হলো মিলানট্রো।

ভিটামিন ‘সি’ আছে ধনে পাতায়, রয়েছে ভিটামিন ‘এ’ ফলিক এসিড (গুরুত্বপূর্ণ এক ধরনের ভিটামিন, যা ত্বকের উপকারের জন্য যথেষ্ট প্রয়োজনীয়)। এই ভিটামিনগুলো প্রতিদিনের পুষ্টি জোগায়, ত্বক, চুলের ক্ষয়রোধ করে, মুখের ভেতরের নরম অংশগুলোকে রক্ষা করে। মুখ গহ্‌বরের ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই করে। ধনেপাতার ভিটামিন ‘এ’ চোখের পুষ্টি  জোগায়, রাতকানা রোগ দূর করতে ভূমিকা রাখে।

কোলেস্টেরলমুক্ত ধনেপাতা দেহের চর্বির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। আমাদের শরীরে এলডিএল নামে এক ধরনের খারাপ কোলেস্টেরল রয়েছে, যা শরীরের শিরা-উপশিরার দেয়ালে জমে হৃৎপিণ্ডে রক্ত চলতে বাধা দেয়। পরিণামে হার্টঅ্যাটাক পর্যন্ত হতে পারে। ধনেপাতা এই খারাপ কোলেস্টেরলকে কমিয়ে দেয়। আর শরীরের জন্য উপকারী কোলেস্টেরল এইচডিএল মাত্রা বৃদ্ধি করে, এলডিএলকে কমিয়ে দেয়। ধনেপাতায় উপসি'ত আয়রন রক্ত তৈরিতে সাহায্য করে এবং রক্ত পরিষ্কার রাখতেও অবদান রাখে।

এছাড়া ভিটামিন ‘কে’তে ভরপুর ধনেপাতা হাড়ের ভঙ্গুরতা দূর করে শরীরকে করে শক্ত-সামর্থ্য। তারুণ্য ধরে রাখতেও এর অবদান অপরিসীম। তবে ধনেপাতা রান্নার চেয়ে কাঁচা খেলে উপকার বেশি পাওয়া যায়।

অ্যালঝেইমারস নামে এক ধরনের মস্তিষ্কের রোগ রয়েছে, যা নিরাময়ে ধনেপাতা রাখে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ধনেপাতা শীতকালীন ঠোঁট ফাঁটা, ঠান্ডা লেগে যাওয়া, জ্বর জ্বর ভাব দূর করতে রাখে যথেষ্ট অবদান। ধনেপাতায় রয়েছে ভিটামিন ‘সি’তে ভরপুর ‘অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট’ নামের এক উপাদান, যা  দেহের কাটাছেঁড়া অংশগুলো শুকানোর জন্য ভীষণ জরুরি। ধনেগাছের বীজের তেলের রয়েছে নানাবিধ ঔষধি ভূমিকা। যেমন : ব্যথানাশক, খাবার হজমে সহায়ক, ছত্রাকনাশক, ওজন বৃদ্ধিতে সাহায্য করে, খিদে বাড়িয়ে  দেয়। ধনেপাতা চিবানোর পর পরই থেঁতলে যাওয়া পাতার রস দিয়ে দাঁত মাজলে দাঁতের মাঢ়ি মজবুত হয়, রক্তপড়া কমে, মুখের দুর্গন্ধ দূর হয়। তাই ধনেপাতার বহুবিধ ব্যবহারের জন্যই সবার উচিত প্রতিদিনের খাবারের মেন্যুতে ধনেপাতাকে স্থান দেয়া। তবে অধিক পুষ্টির আশায় মাত্রাতিরিক্ত ধনেপাতা খাওয়া অনুচিত।