Skip to main content

হাইড্রোসিলঃ অপারেশনই একমাত্র চিকিৎসা

ডা. এসএম নজরুল ইসলাম

হাইড্রোসিল এক ধরনের রোগ, যেখানে প্রসেসাস ভেজাইনালিসে (সাধারণত টুইনিকা) অস্বাভাবিকভাবে তরল পদার্থ জমা হয়। স্বাভাবিকভাবে গর্ভাবস্থায় আট মাস বয়সে অণ্ডকোষ যখন অণ্ডথলিতে নামতে থাকে তখন অণ্ডকোষের সঙ্গে পেরিটনিয়ামের (পেটের ভেতরকার পাতলা পর্দা) একটি অংশ নেমে আসে এবং অণ্ডকোষকে আংশিকভাবে আবরিত করে। একে প্রসেসাস ভেজাইনালিস বলে। এটি স্বাভাবিকভাবে জন্মের পর ধীরে ধীরে পেটের মধ্যকার অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

হাইড্রোসিলের কারণ
১. তরল পদার্থ বেশি তৈরি হলে
২. তরল পদার্থের শোষণ কম হলে
৩. লসিকানালি দ্বারা তরল পদার্থ অপসারণ বাধাগ্রস্ত হলে
৪. পেরিটনিয়ামের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন না হলে

অন্যান্য যুক্ত অবস্থা

  • বয়সঃ যে কোনো বয়সের হতে পারে।
  • লিঙ্গঃ পুরুষ-স্ত্রী উভয় লিঙ্গেই হতে পারে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুরুষের হয়।
  • আবহাওয়াঃ গরম আবহাওয়ায় বসবাসকারীদের বেশি হয়।
  • কিছু কিছু ক্ষেত্রে হাইড্রোসিলের সঙ্গে হার্নিয়াও যুক্তভাবে থাকতে পারে।
  • অন্য অপারেশনের পরঃ যেমন- হার্নিয়া অপারেশনের পর।
  • অন্যান্য রোগের পরঃ যেমন- অণ্ডকোষে টিউমার, অণ্ডকোষে প্রদাহ, পেরিটনিয়ামে প্রদাহ, পেটে পানি জমা (এসাইটিস) ও ফাইলেরিয়া ইত্যাদি।

হাইড্রোসিলের ধরন
ক) কনজেনিটাল- প্রসেসাস ভেজাইনালিস এবং পেরিটনিয়ামের যোগাযোগ অক্ষুণ্ন থাকে।
খ) ইনফেন্টাইল- প্রসেসাস ভেজাইনালিস এবং পেরিটনিয়ামের সংযোগস'ল বন্ধ থাকে।
গ) ইনসিস্টেড- প্রসেসাস ভেজাইনালিসের ওপর এবং নিচের অংশ বন্ধ হয়ে মধ্যখানের কিছু অংশ অক্ষুণ্ন থাকে।
ঘ) ভেজাইনাল- প্রসেসাস ভেজাইনালিসের অণ্ডকোষের সম্পর্কিত কিছু অংশ অক্ষুণ্ন থাকে।

হাইড্রোসিলের উপসর্গ
এ রোগে কোনো ব্যথা হয় না। রোগীরা তাই দেরিতে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়। ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে অণ্ডথলি অস্বাভাবিক দেখা যায় বিধায় বাবা-মা তাদের বাচ্চাদের চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যায়।

রোগীরা/অভিভাবকরা যা বলেন-

  • ধীরে ধীর অণ্ডথলি বড় হয়ে যাওয়া।
  • অনেক সময় শোয়া অবস্থায় ফোলা আংশিক কমে যায়।
  • অণ্ডকোষ বড়, শক্ত ও অমসৃণ মনে হতে পারে।

হাইড্রোসিল পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে

  • অণ্ডথলি ফোলা
  • অণ্ডথলি ফোলা ওপরের প্রান্ত অনুভূত হবে (গেট এভাব দি সোয়েলিং পসিবল)
  • অণ্ডথলির মধ্যে তরল পদার্থের উপস্থিতি অনুভূত হবে (ফ্লাকচুয়েশন টেস্ট পজিটিভ)
  • অণ্ডকোষ নাও অনুভূত হতে পারে বা বড়, শক্ত, অমসৃণ অনুভূত হতে পারে।
  • অন্ধকার পরিবেশে অণ্ডথলির এক প্রান্তে পেনসিল টর্চের আলো দিয়ে অন্য প্রান্ত থেকে কালো চুঙ্গি দিয়ে তাকালে লাল বর্ণ দেখা যায় (ট্রান্সইলউমিনেশন টেস্ট পজিটিভ)
  • অণ্ডথলির আল্ট্রাসনোগ্রাম- এটা রোগ নির্ণয়ের জন্য অত্যন্ত সহজ ও নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা। এটি অণ্ডথলির মধ্যকার তরল পদার্থের উপসি'তি ছাড়াও অণ্ডকোষের অবস্থা সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।

হাইড্রোসিলের চিকিৎসা
জন্মের পর দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে অপারেশনের প্রয়োজন নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ছয় মাসের মধ্যে এমনিতেই ভালো হয়ে যেতে পারে। বাচ্চার ক্ষেত্রে ছয় মাসের মধ্যে ভালো না হলে বা অন্যান্য বয়সে এই রোগ দেখা দিলে অপারেশনই একমাত্র চিকিৎসা।

হাইড্রোসিলের জটিলতা
অপারেশন না করালে-

  • আঘাত>রক্তপাত>হেমাটোসিল
  • ক্যালসিফিকেশন- হাইড্রোসিল থলিতে ক্যালসিয়াম সল্ট জমে যায়।
  • অণ্ডকোষ ছোট হয়ে যেতে পারে।
  • হাইড্রোসিল থলি অণ্ডথলির মধ্যে ঢুকে হার্নিয়া করতে পারে।

অপারেশন জটিলতা

  • রক্তপাত
  • অণ্ডকোষের শিরা, ধমনী কেটে যেতে পারে।
  • শুক্রবাহী নালি (ভাস ডিফারেন্স) কেটে যেতে পারে।
  • রক্তক্ষরণ হয়ে হেমাটোসিল হতে পারে।
  • ইনফেকশন।

সতর্কতার সঙ্গে অপারেশন করলে এসব জটিলতা থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।
হাইড্রোসিল অতি সামান্য ব্যথামুক্ত সমস্যা মনে হলেও এর জটিলতা অনেক। অনেক সময় রোগ নির্ণয়ে দেরি হলে জটিলতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে সঙ্গে হার্নিয়া থাকলে যদি নির্ণয় না হয়ে থাকে তবে হার্নিয়ার জটিলতা দেখা দিতে পারে। অনেক সময় অণ্ডকোষের টিউমারের (ক্যান্সার) ফলে হাইড্রোসিল হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত রোগ নির্ণয় করা অত্যন্ত জরুরি। তাই একে সামান্য সমস্যা না ভেবে উপযুক্ত সময়ে উপযুক্ত সার্জনের শরণাপন্ন হওয়াই শ্রেষ্ঠ উপায়।

লেখকঃ সহকারী অধ্যাপক, সার্জন
শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বরিশাল